kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


সাংবাদিকদের বের করে দিয়ে বাদীর সাক্ষ্যগ্রহণ

নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি   

১ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



সাংবাদিকদের বের করে দিয়ে বাদীর সাক্ষ্যগ্রহণ

নারায়ণগঞ্জে চাঞ্চল্যকর সাত খুনের দুই মামলার একটির বাদী বিজয় কুমার পালের সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে গতকাল সোমবার জেলা ও দায়রা জজ সৈয়দ এনায়েত হোসেনের আদালতে। আরেকটি মামলার বাদী সেলিনা ইসলাম বিউটির সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য ৩ মার্চ তারিখ নির্ধারণ করেছেন আদালত।

গতকাল সকাল পৌনে ১১টা থেকে দুপুর সোয়া ১টা পর্যন্ত বিজয় কুমার পালের সাক্ষ্য নেওয়া হয়। শুনানি শুরু হওয়ার আগে সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) সবার উদ্দেশে বলেন, আদালতের নির্দেশনা আছে বিচারপ্রার্থী, আইনজীবী ও মামলা-সংক্রান্ত ব্যক্তি ছাড়া অন্য কেউ আদালত কক্ষে থাকতে পারবেন না। তখন সেখানে থাকা সাংবাদিকরা বেরিয়ে যান।

এদিকে সাক্ষ্যগ্রহণ উপলক্ষে গতকাল সকাল থেকেই আদালতপাড়ায় নেওয়া হয় কঠোর নিরাপত্তা। আদালতের দুই পাশের প্রধান ফটকে রাখা হয় পুলিশের ব্যারিকেড। সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত কেউ আদালতপাড়ায় ঢুকতে পারেনি। এতে অনেক বিচারপ্রার্থী হয়রানির শিকার হয়েছেন।

সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে পিপি অ্যাডভোকেট ওয়াজেদ আলী খোকন জানান, সাত খুনের দুটি মামলার মধ্যে একটির বাদী বিজয় কুমার পাল হলেন নিহত অ্যাডভোকেট চন্দন সরকারের জামাতা এবং অন্যটির বাদী সেলিনা ইসলাম বিউটি হলেন নিহত নজরুল ইসলামের স্ত্রী। গতকাল বিজয় কুমার পালের সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়েছে। পিপি আরো জানান, সাত খুনের দুটি মামলায় চার্জশিটভুক্ত ৩৫ আসামির মধ্যে কারাগারে থাকা ২৩ জনকে আদালতে হাজির করা হয়। তাঁদের মধ্যে নূর হোসেন, এম এম রানা ও তারেক সাঈদের পক্ষে আইনজীবীরা সাক্ষীকে জেরা করার জন্য সময় প্রার্থনা করেন। আদালত তা মঞ্জুর করে আগামী ৭ মার্চ পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করেন। এ কারণে এ তিন আসামির পক্ষে সাক্ষীকে জেরা করা হয়নি। পলাতক ১২ আসামির পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত পাঁচ আইনজীবী ও উপস্থিত ১০ আসামির পক্ষের আইনজীবীরা সাক্ষীকে জেরা করেছেন। অন্য মামলার বাদী সেলিনা ইসলাম বিউটির সাক্ষ্য নেওয়া হয়নি। আগামী ৩ মার্চ তাঁর সাক্ষ্য নেওয়া হবে।

আইনজীবী আনিসুর রহমান মোল্লা বলেন, ‘সোমবার আমরা ১২ পলাতক আসামির পক্ষে বাদীকে জেরা করেছি। পরবর্তী তারিখেও আমরা বাদীকে জেরা করব। ’

আদালতে আসামিপক্ষে উপস্থিত ছিলেন অ্যাডভোকেট আশরাফুজ্জামান, অ্যাডভোকেট খোকন সাহা, সাবেক পিপি সুলতানউজ্জামান, এম এ রশিদ ভূইয়া প্রমুখ।

সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে বিজয় কুমার পাল সাংবাদিকদের বলেন, ‘ঘটনার বিবরণ থেকে শুরু করে মামলা ও আসামিদের ব্যাপারে জানতে চেয়েছে। আমাকে যেসব প্রশ্ন করা হয় তার উত্তর আমি দিয়েছি। ’

এদিকে সাক্ষ্যগ্রহণের সময় আদালতে সাংবাদিকদের থাকতে না দেওয়ার বিষয়ে পিপি ওয়াজেদ আলী খোকন বলেন, ‘স্থান সংকুলান না হওয়ায় আদালতের নির্দেশে শুধু আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীদের আদালতে থাকতে দেওয়া হয়েছে। এটা আদালতের নির্দেশনা ছিল। আমরা পরবর্তী শুনানির সময় যাতে সাংবাদিকরা থাকতে পারেন সে জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে ব্যবস্থা করার চেষ্টা করব। ’

অন্য মামলার বাদী বিউটির পক্ষের আইনজীবী সাখাওয়াত হোসেন খান বলেন, ‘দেশের আলোচিত ঘটনার একটি সাত খুনের মামলা। বিচার হলো প্রকাশ্য আদালতে বিচার। বাদী পক্ষের লোকজনও থাকতে পারবে, আসামিপক্ষের লোকজনও থাকতে পারবে, সংবাদকর্মীরাও থাকতে পারবেন—এটাই হলো প্রকাশ্য আদালতে বিচারের পদ্ধতি। সাংবাদিকদের সামনে একটি স্বচ্ছ বিচারব্যবস্থা হবে সেটাই আমরা চাই। এ মামলায় বিচারের স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার জন্য বিচারকাজ প্রকাশ্যে সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে হতে হবে। অন্যথায় নিহতদের স্বজন ও জনগণের মধ্যে সন্দেহ-সংশয় তৈরি হবে। কিন্তু সোমবার আদালতে আইনজীবী ও সংবাদকর্মীর সংখ্যা অনেক বেশি হওয়ার কারণে সাংবাদিকদের ভেতরে সংবাদ সংগ্রহ করতে দেওয়া হয়নি। যেহেতু আইনজীবীর সংখ্যা বেশি ছিল সেহেতু ন্যায়বিচারের স্বার্থেই এটা করা হয়েছে। আমরা আশা করব পরবর্তী শুনানির দিন নির্দিষ্টসংখ্যক সাংবাদিক যাতে থাকতে পারেন। ’

এর আগে ২৫ ফেব্রুয়ারি সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য থাকলেও সেদিন মামলার অন্যতম আসামি র‌্যাবের চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা তারেক সাঈদকে আদালতে হাজির না করায় সাক্ষ্যগ্রহণ পেছানো হয়।

এদিকে গতকাল সকাল থেকেই সাধারণ মানুষ এমনকি অন্য মামলার বিচারপ্রার্থীদেরও আদালতপাড়ায় ঢুকতে না দেওয়ার বিষয়ে কোর্ট পুলিশ পরিদর্শক হাবিবুর রহমান বলেন, নিরাপত্তার স্বার্থে আদালতপাড়ায় লোকজন প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। তবে সাত খুন মামলার আসামিদের আদালতের কাঠগড়ায় হাজির করার পর আদালতপাড়ার গেট খুলে দেওয়া হয়। এরপর সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বিভিন্ন আদালতের কার্যক্রম শুরু হয়।

সাত খুনের দুটি মামলায় নূর হোসেন ও র‌্যাবের সাবেক তিন কর্মকর্তাসহ মোট ২৩ জন কারাগারে আটক রয়েছেন। র‌্যাব-১১-এর সাবেক তিন কর্মকর্তা হলেন তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, এম এম রানা ও আরিফ হোসেন।

২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের তখনকার প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম, তাঁর বন্ধু মনিরুজ্জামান স্বপন, তাজুল ইসলাম, লিটন ও গাড়িচালক জাহাঙ্গীর আলম এবং আইনজীবী চন্দন কুমার সরকার ও তাঁর গাড়িচালক ইব্রাহিম অপহৃত হন। পরে ৩০ এপ্রিল শীতলক্ষ্যা নদী থেকে ছয়জনের এবং ১ মে একজনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। তদন্ত শেষে গত ৮ এপ্রিল নূর হোসেন, র‌্যাবের সাবেক তিন কর্মকর্তাসহ ৩৫ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। কিন্তু অভিযোগপত্র থেকে এজাহারভুক্ত পাঁচ আসামিকে বাদ দেওয়ায় এবং প্রধান আসামি নূর হোসেনের জবানবন্দি ছাড়া অভিযোগপত্র আমলে নেওয়ায় নারাজি আবেদন করেন সেলিনা ইসলাম বিউটি। আবেদনটি ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ও জজ আদালতে খারিজ হয়ে গেলে বিউটি উচ্চ আদালতে যান। হাইকোর্টের আদেশে বলা হয়, পুলিশ চাইলে মামলাটির অধিকতর তদন্ত করতে পারে এবং হত্যার ষড়যন্ত্র ও পরিকল্পনার ধারা যুক্ত করে নতুন করে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে পারে।

গত ৮ ফেব্রুয়ারি সাত খুনের দুটি মামলায় ৩৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়।


মন্তব্য