শাহাদত চৌধুরীর লেখায় ঢাকার গেরিলা-330691 | প্রথম পাতা | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

শনিবার । ১ অক্টোবর ২০১৬। ১৬ আশ্বিন ১৪২৩ । ২৮ জিলহজ ১৪৩৭


শাহাদত চৌধুরীর লেখায় ঢাকার গেরিলা যুদ্ধ

কাজী হাফিজ   

১ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



শাহাদত চৌধুরীর লেখায় ঢাকার গেরিলা যুদ্ধ

‘গেরিলা রণনীতিতে বেছে নিতে হয় শত্রুর দুর্বলতম অংশ। সে ক্ষেত্রে শত্রুর সবচেয়ে বড় ঘাঁটি রাজধানী শেষ লক্ষ্যস্থল হওয়ার কথা। কিন্তু ঢাকা শহরে যেসব আক্রমণ চালানো হয় তার উদ্দেশ্য সামরিক কৌশলগত আধিপত্য অর্জন ছিল না, উদ্দেশ্যটা ছিল মূলত পৃথিবীকে জানিয়ে দেওয়া—মুক্তিবাহিনী যুদ্ধ করছে ও সহজেই আঘাত হানছে শত্রুর সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যূহে।’

মুক্তিযুদ্ধের সময় ঢাকা শহরে অনেক সফল গেরিলা অপারেশনের অন্যতম রূপকার শাহাদত চৌধুরী গেরিলাযুদ্ধের কৌশল সম্পর্কে এ ধারণাই পোষণ করতেন। ছিলেন সাংবাদিক; মুক্তিযুদ্ধকালে তিনি হাতে তুলে নিয়েছিলেন আগ্নেয়াস্ত্র, গ্রেনেড। স্বাধীনতার পর সংবাদপত্রের জন্য  লেখা একটি প্রতিবেদনে এ ধারণার কথা ব্যক্ত করেন তিনি।

১৯৭২ সালের ১ ডিসেম্বর ‘দৈনিক বাংলা’য় প্রকাশিত হয় তাঁর প্রতিবেদন ‘মানুষের সঙ্গে মিশে যুদ্ধ করেছে গেরিলারা’। স্মৃতিচারণামূলক ওই লেখা এখন মুক্তিযোদ্ধাদের ঢাকায় গেরিলা অপারেশন সম্পর্কিত দলিলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

শাহাদত চৌধুরী তাঁর প্রতিবেদনে আত্মকথা নয়, সাংবাদিকসুলভ নৈর্ব্যক্তিক ভঙ্গিতে সে সময়ের বিবরণ দিয়েছেন। তিনি লিখেন, ‘নভেম্বরের প্রথম দিকে বিবিসির খবরে বলা হয়েছিল, ঢাকা শহর ঘিরে রেখেছে আট হাজার মুক্তিযোদ্ধা। তারা বিচ্ছিন্নভাবে গেরিলা তৎপরতা চালাচ্ছে; কিন্তু যেকোনো সময় একসঙ্গে শহরে প্রবেশ করবে। বিবিসির ভাষ্যকারের তথ্য নির্ভুল বলা যেত যদি তিনি গেরিলাদের সংখ্যাকে দ্বিগুণ করতেন।’

গেরিলা অপারেশনের কৌশল সম্পর্কে জানাতে গিয়ে প্রতিবেদনে তিনি বলেন, এ সম্পর্কে খুব স্পষ্ট করে বলেছিলেন অধিনায়ক (খালেদ মোশাররফ): ‘শহরে যুদ্ধের প্রয়োজন নেই। শত্রুকে শুধু জানিয়ে দাও তোমরা আছ।’ একাত্তরের সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে ঢাকার কয়েকটি দুঃসাহসিক গেরিলা প্লাটুনকে প্রত্যাহার করা হয়। কারণ তাদের কিছু যোদ্ধা ধরা পড়ে শত্রুর হাতে। তখন কর্নেল খালেদ বলেছিলেন, ‘কাউবয় অ্যাডভেঞ্চার গেরিলাযুদ্ধ নয়। গেরিলাযুদ্ধ বীরত্ব দেখানোর জন্য নয়।’

ঢাকা শহরকে ঘিরে অবস্থানরত গেরিলাদের সম্পর্কে নির্দেশ ছিল, ‘যা-ই হোক, মাথা তুলবে না প্রয়োজন ছাড়া।’ ঢাকার পুরনো যে দলটিকে প্রত্যাহার করা হয়েছিল তারাও নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ‘ক্র্যাক’ (ক্র্যাক প্লাটুন) নাম দিয়ে ঢাকার পাশে ত্রিমোহনী, গোরান-বাহিরদা অঞ্চলে ঘাঁটি করে। কর্নেল খালেদ আশা করতেন, নভেম্বর মাসে মেজর হায়দারকে দিয়ে ঢাকা শহরে মিরাকল দেখাবেন। সে জন্যই মেজর হায়দার তাঁর প্রিয় দলটিকে অনেক দিন ক্যাম্পে আটকে রেখেছিলেন। অক্টোবরে কর্নেল খালেদ আহত হলে পুরো সেক্টরের কমান্ড মেজর হায়দারের ওপর ন্যস্ত হয়। তাই তিনি ঢাকায় আসতে পারেননি।

মে মাসে ঢাকা শহরে একটি কথা মুখে মুখে ফিরত, মেজর হায়দার আসছেন। কথাটি মেজর হায়দারকে জানানো হলে তাঁর চোখ-মুখে অদ্ভুত আনন্দ ও প্রত্যয় দেখা যেত। তিনি বলতেন, ‘আমি যাব।’ কিন্তু বাস্তবে তাঁর পক্ষে আসা সম্ভব ছিল না। কারণ গেরিলা অ্যাকশনের অধিনায়ক ছিলেন তিনি। সকাল ৬টায় ঘুম থেকে ওঠা, ছেলেদের প্রশিক্ষণ দেওয়া, ব্রিফ করা, গাড়ি করে বাংলাদেশের ভেতরে তাদের নামিয়ে দেওয়া তাঁর দৈনন্দিন কর্মসূচি ছিল। রাত ৩টার আগে ঘুমাতে পারতেন না। ২ নম্বর সেক্টরের বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর ট্রেনিং ক্যাম্পও। ভারতের সঙ্গে চুক্তি হওয়ার আগেই তিনি কাঁঠালিয়াতে কুমিল্লার কিছু ছেলেকে ট্রেনিং দিয়ে বাংলাদেশের ভেতরে পাঠান দালাল হত্যার জন্য। ঘরের ভেতরের বিভীষণকে আগে শেষ করা প্রয়োজন। প্রথম ব্যাচকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় প্রথমে নবীনগরে, পরে মেলাঘরে। তাদের নিখুঁত গেরিলা হিসেবে তৈরির জন্য নানাভাবে ট্রেনিং দেওয়া হতো। সুবিধা ছিল মেজর হায়দার ছিলেন কমান্ডো বাহিনীর লোক।

নভেম্বর মাস থেকে ঢাকাকে ঘিরে গেরিলারা তৎপরতা বাড়ায়। ‘মানিক গ্রুপ’ সাভার অঞ্চলে আর ত্রিমোহনী, গোরান-বাহিরদায় ‘ক্র্যাক প্লাটুন’। ক্র্যাক প্লাটুনের সদস্যরা এসেই বাংলাদেশের পতাকা তুলে দিয়েছিল স্থানীয় পাঠশালায়—যেখানে তারা থাকত। সেখানে পাক হানাদাররা আক্রমণের চেষ্টা করে, কিন্তু ব্যর্থ হয়। হেলিকপ্টারে করে কমান্ডো নামানোর চেষ্টা করেও তারা পারেনি। পুরো রূপগঞ্জ থানা তখন গেরিলা ক্যাম্পে পরিণত হয়েছে। শীতলক্ষ্যার পাড় ধরে মিলগুলোতে ছিল পাকিস্তানি আর্মির বাংকার। তারা গেরিলা আক্রমণে নাকাল হয়ে আস্তে আস্তে কেটে পড়তে শুরু করে। ৩ ডিসেম্বর ভারতীয় বিমান ঢাকায় এয়ারপোর্টে (তেজগাঁও বিমানবন্দর) বোমা হামলা শুরু করলে লোকজন শহর ছাড়তে শুরু করে। শহরছাড়া লোকজন বাসাবো ও ভাঙা ব্রিজ পার হয়ে বাংলাদেশের পতাকা আর অস্ত্র হাতে মুক্তিযোদ্ধাদের দেখে অবাক হয়ে যায়।

বিমান হামলার রাতে গেরিলারা সবাই পজিশন নিয়েছিল। কারণ রাতে বিমান আক্রমণের বিভিন্ন লক্ষ্যস্থল থেকে পাক আর্মি আর রাজাকাররা ফায়ার শুরু করে বিমানের উদ্দেশ্যে। গেরিলারা প্রথমে ভাবে, চারদিক থেকে অঞ্চলটা ঘেরাও করা হচ্ছে। পরে আকাশে বিমান দেখে বুঝে নেয় ব্যাপারটা কী।

এর ভেতরে ঢাকা শহরে ক্র্যাক প্লাটুন বড় কিছু করেনি। তবে যেদিন বেতারে সপ্তম নৌ-বহর আসার কথা বলা হলো তার পরদিন দুজন গেরিলাকে পাঠানো হলো আমেরিকান সেন্টার উড়িয়ে দিতে। ঢাকা শহরে হানাদারদের নাকের ডগায় ওই সেন্টার উড়িয়ে দেওয়া হলো।

একদিন গুল টেক্সটাইল মিলের শত্রুবাংকারে আক্রমণ করা হয়। বাইরে থেকে শত্রুর রি-ইনফোর্সমেন্ট ঘটে। পুরো এলাকায় যুদ্ধ হয়। শত্রুপক্ষ ২৭টি লাশ রেখে পালিয়ে যায়। গেরিলারা বৃহত্তর আক্রমণ প্রতিরোধের লক্ষ্যে ব্যূহ রচনা করে। এ সময় ঢাকা থেকে দাঙ্গার আশঙ্কার খবর আসে। কিছু গেরিলা শহরে চলে আসে স্টেনগান নিয়ে, দাঙ্গা প্রতিরোধের জন্য।

ঢাকা শহর থেকে বেরোনোর প্রতিটি পথে অ্যামবুশের ব্যবস্থা রাখা হয়। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিটি গ্রুপই অ্যামবুশে অংশ নেয়। কিছু বেসামরিক গাড়িতে করে বিচ্ছিন্নভাবে ফিরতে দেখা যায় শত্রু অফিসারদের। পালিয়ে যাচ্ছিল তারা, আর তখনই ফাঁদে পড়ে। পাক হানাদারদের নিশ্চল হয়ে যেতে দেখে গেরিলারা বুঝেছিল, যুদ্ধ করার ক্ষমতা আর তাদের নেই। যুদ্ধ শেষ হলো বলে।

১১ ডিসেম্বর খবর আসে, ভারতীয় বাহিনী তারাবোর কাছাকাছি এসে গেছে। এর পরই এসে পড়েন ক্যাপ্টেন মালেক, ২ নম্বর সেক্টরের ট্রুপ নিয়ে। তিনি ঠিক করেন, নারায়ণগঞ্জ রোডের পাশে স্লটার হাউসের শত্রুব্যূহে আক্রমণ করবেন। কিন্তু সকালে খবর এলো, শীতলক্ষ্যার ওপর সেকেন্ড বেঙ্গল রেজিমেন্ট প্রতিরক্ষাব্যূহ রচনা করেছে। সব মর্টারের মুখ এদিকে। গেরিলারা মনে করে, বোধ হয় শত্রুর আক্রমণ এদিক থেকেই ঘটবে। ১৩ ডিসেম্বর মেজর হায়দার একা এসে পৌঁছান রূপগঞ্জে। এস ফোর্সের অধিনায়ক কর্নেল শফিউল্লাহর সঙ্গে তাঁর দেখা শীতলক্ষ্যার তীরে। কর্নেল শফিউল্লাহ মেজর হায়দারকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘তোমার ছেলেরা এখানে এভাবে ঘোরাফেরা করছে কেন?’ মেজর হায়দার বলেন, ‘স্যার, এরা ৯ মাস ধরে এখানে আছে। এদের সব চেনা।’

শাহাদত চৌধুরী তাঁর লেখায় বলেছেন, মানুষের সঙ্গে মিশে যুদ্ধ করেছে গেরিলারা। প্রতিটি ঘরে ছিল তাদের ঠাঁই। লোকের বিশ্বাস তাদের আত্মবিশ্বাস দিয়েছে শত্রুকে প্রতিহত করার। গ্রামবাসীরা তাদের ভেতরে জাগিয়েছে দায়িত্ববোধ। একসঙ্গে ঐক্যবদ্ধ আক্রমণ গেরিলারা করতে পারেনি; মেজর হায়দারকে কাছে পেয়েও নতুন আক্রমণের ছক কষার সময় পায়নি। কারণ দরকার হয়নি। ১৬ ডিসেম্বর দুপুরে ১০টি হেলিকপ্টার উড়ে যাচ্ছিল একসঙ্গে—শৌর্যে, অহংকারে। গেরিলারা হঠাৎ এ ঘটনায় বিহ্বল হয়ে পড়ে। তার পরই ফেটে পড়ল উল্লাসে। চারদিক থেকে সবাই ঢুকে পড়ল শহরে—নিজের ইচ্ছায়, স্বাধীনতায়।

মন্তব্য