দলীয় মনোনয়নে ‘বাণিজ্যলক্ষ্মী’!-330689 | প্রথম পাতা | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

সোমবার । ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১১ আশ্বিন ১৪২৩ । ২৩ জিলহজ ১৪৩৭


দলীয় মনোনয়নে ‘বাণিজ্যলক্ষ্মী’!

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

১ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



দলীয় মনোনয়নে ‘বাণিজ্যলক্ষ্মী’!

ঝালকাঠির কাঁঠালিয়া উপজেলার পাটকেলঘাটা ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন শহিদুল ইসলাম হৃদয়। তাঁর অভিযোগ, তৃণমূল আওয়ামী লীগ তাঁকে চেয়ারম্যান পদে মনোনয়ন দিতে সংগঠনটির জেলা পর্যায়ে সুপারিশ পাঠিয়েছিল। কিন্তু টাকার বিনিময়ে জেলা আওয়ামী লীগ নেতারা পাটকেলঘাটা ইউপির জন্য শিশির দাসের নাম পাঠান কেন্দ্রে। পরে দল শিশির দাসকেই মনোনয়ন দেয়।

ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার দেউলা ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন সাবেক ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি সদ্য আওয়ামী লীগে যোগ দেওয়া অ্যাডভোকেট আসাদুজ্জামান বাবুল। তৃণমূলের নেতাকর্মীরা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক শাহজাদা তালুকদারের নাম ঠিক করে জেলায় পাঠিয়েছিল। শাহজাদা তালুকদার অভিযোগ করেছেন, টাকার বিনিময়ে জেলা নেতারা বিএনপি থেকে ডিগবাজি দিয়ে আওয়ামী লীগে আসা আসাদুজ্জামান বাবুলকে মনোনয়ন দিয়েছেন।

দেশে প্রথমবারের মতো দলীয় প্রতীকে ইউপি নির্বাচনের প্রথম ধাপে ৭৩৮টি ইউনিয়নে ভোট হবে ২২ মার্চ। এরই মধ্যে দলগুলো তাদের মনোনয়ন পাওয়া প্রার্থীদের তালিকা প্রকাশ করেছে। ২ মার্চ মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার না করলে এঁরাই হবেন চেয়ারম্যান পদে দলের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী। বড় দুটি রাজনৈতিক দল ইউপি নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী মনোনয়নে তৃণমূলকে দায়িত্ব দেয়। ইউনিয়ন, উপজেলা আর জেলা নেতাদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটি তৃণমূলের মত নিয়ে প্রার্থী নির্বাচনের কথা ছিল। কিন্তু তৃণমূলের নেতাকর্মী, মনোয়নবঞ্চিত প্রার্থীদের অনেকে অভিযোগ করেছেন, তাঁদের মত উপেক্ষা করা হয়েছে। জেলা নেতৃত্ব বা কেন্দ্র তাদের পছন্দের প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়েছে। আর এ ক্ষেত্রে টাকার লেনদেন হয়েছে বলেই তাঁদের অভিযোগ।

কাঁঠালিয়া উপজেলার পাটকেলঘাটায় যেমন তৃণমূলের মতের বাইরে মনোনয়ন বাণিজ্য করে দলের অন্য নেতাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে, তেমনি বোরহানউদ্দিন উপজেলার দেউলা ইউনিয়নে সদ্য ডিগবাজি দিয়ে দলে

 ভেড়া নেতার ভাগ্যেও মনোনয়নের শিকা ছিঁড়েছে। সারা দেশে খোঁজ করে মনোনয়ন বাণিজ্যের এমন অনেক নজিরই মিলেছে। বিএনপিতে মনোনয়ন বাণিজ্যের কিছু অভিযোগ থাকলেও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগে এ অভিযোগ অসংখ্য। মনোনয়নবঞ্চিতরা যেমন অভিযোগ করেছেন, তেমনি তৃণমূল নেতৃত্বও বলছেন, মনোনয়ন বাণিজ্য করে কিভাবে তাঁদের মতামতকে দলিত করা হয়েছে।

তৃণমূলকে উপেক্ষা করে মনোনয়ন বাণিজ্যের সঙ্গে তৃণমূলও ‘বাণিজ্য’ করেছে—এমন অভিযোগও উঠেছে। তৃণমূলের সমর্থন চেয়ে কেউ কেউ টাকা বিলিয়েছেন, আর এই ‘টোপ’ গিলে পছন্দের প্রার্থীকে নির্বাচন করে আসার ঘটনাও ঘটেছে অনেক ইউনিয়নে।

বরিশাল : বরিশালের বানারীপাড়ার সৈয়দকাঠি ইউনিয়ন যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মান্নান মৃধা আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন। মনোনয়নবঞ্চিতরা অভিযোগ তুলেছেন, টাকার বিনিময়ে তিনি মনোনয়ন কিনেছেন। বিদ্রোহী প্রার্থী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক আহ্বায়ক ও চেয়ারম্যান মোয়াযযম হোসেন মন্টু বলেন, ‘টাকার কাছে আমার মনোনয়ন ছিনতাই হয়েছে। যাতে ভোট ছিনতাই না হতে পারে, সে জন্যই ভোটে এসেছি।’ অন্য দুই বিদ্রোহী প্রার্থী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুর রাজ্জাক ও সদস্য আনোয়ার হোসেন মৃধারও একই অভিযোগ, এই ইউনিয়নে টাকার কাছে হেরে গেছে তৃণমূলের মত।

উপজেলার বিশারকান্দি ইউনিয়নে দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-প্রচার সম্পাদক আমিনুল ইসলাম শান্ত। তবে বিদ্রোহী প্রার্থী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি বর্তমান ইউপি চেয়ারম্যান ওমর ফারুক বলেছেন, অর্থনৈতিক লেনদেনে মনোনয়ন বিবেচিত হওয়ায় তিনি বঞ্চিত হয়েছেন। আরেক ইউনিয়ন বাইশারির মনোনয়ন পেয়েছেন মাইনুল হাসান মোহাম্মদ। তবে বঞ্চিত হয়ে বিদ্রোহী হিসেবে মাঠে আছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের জেষ্ঠ সহসভাপতি তাজেম আলী হাওলাদার এবং উপজেলা আওয়ামী লীগের সমাজসেবা সম্পাদক শাকিল খান। তাঁরা বলেছেন, টাকার কাছে তাঁদের মনোনয়নও হেরেছে। তবে কারা টাকা নিয়েছেন, এ ব্যাপারে স্পষ্ট করে কেউ কিছুই বলছেন না।

প্রথম ধাপে বরিশালের ৭৪টি ইউনিয়নে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। মনোনয়নদৌড়ে বেশ কয়েকজন বর্তমান চেয়ারম্যান ছিটকে পড়েছেন। তাঁরা বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন। এ ছাড়া ইউনিয়ন পর্যায়ের প্রথম সারির বেশ কয়েকজন নেতা বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন। তাঁদের অনেকেই নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, টাকার বিনিময়ে নতুন মুখের অনেকেই মনোনয়ন পেয়েছেন। তবে এ ব্যাপারে প্রকাশ্যে তাঁরা দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিতে চাচ্ছেন না।

বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট তালুকদার মো. ইউনুস কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অনেকেরই প্রত্যাশা ছিল মনোনয়ন পাবেন। কিন্তু সব সময় প্রত্যাশার সঙ্গে প্রাপ্তি এক হয় না। তখনই বঞ্চিতরা আজেবাজে মন্তব্য করেন। যেহেতু টাকার বিষয়টি আমার নজরে এসেছে, এ ব্যাপারে দলীয় কর্মীদের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।’

ভোলার সাত উপজেলার বেশ কয়েকটি ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের অনেক নেতা ও মনোনয়নপ্রত্যাশী বর্তমান চেয়ারম্যান এবার দলীয় মনোনয়ন থেকে বাদ পড়েছেন। এর মধ্যে অনেক প্রার্থী রয়েছেন, যাঁরা বিএনপি থেকে সদ্য আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, ওই ইউপি চেয়ারম্যান প্রার্থীরা মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে আওয়ামী লীগদলীয় নৌকা প্রতীকের মনোনয়ন পেয়েছেন। ভোলা সদর উপজেলার শিবপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ নেতা সিরাজুল ইসলাম রাকিব অভিযোগ করেন, ইউপি নির্বাচনে এবার আওয়ামী লীগে মনোনয়ন বাণিজ্য হয়েছে। তিনি আরো অভিযোগ করেন, ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি-সম্পাদকদের যাঁরা মোটা অঙ্কের টাকা দিয়েছেন, তাঁরাই এবার দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন। ফলে আওয়ামী লীগের ত্যাগী নেতারা এবার দলীয় মনোনয়ন থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।

এ ইউনিয়ন থেকে ভোলা পৌরসভার সাবেক প্যানেল মেয়র জসিমউদ্দিনকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। প্রায় একই অভিযোগ তুলেছেন বোরহানউদ্দিন উপজেলার কাচিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ নেতা নুরুল আমিন হাওলাদার নিরব। তিনি বলেন, টাকার বিনিময়ে ওই ইউনিয়নে বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আব্দুর রব কাজিকে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয়। একই উপজেলার দেউলা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ নেতা শাহজাদা তালুকদার অভিযোগ করেন, শুধু টাকার বিনিময়ে বিএনপি থেকে আসা অ্যাডভোকেট আসাদুজ্জামান  বাবুল আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন। টাকার বিনিময়ে হাসাননগর ইউনিয়নে ডিগবাজি দেওয়া নেতা আলগমীর চৌধুরীকে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন ওই ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ নেতা মানিক হাওলাদার। দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশী বর্তমান ইউপি চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতারা দলীয় মনোনয়ন থেকে বাদ পড়ায় নিজ নিজ ইউনিয়নে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ও তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। অনেক এলাকায় আবার প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ঝালকাঠিতে চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। চার উপজেলার ৩১টি ইউনিয়নেই মনোনয়ন নিয়ে অভিযোগ করেন মনোনয়নবঞ্চিতরা। জানা যায়, ঝালকাঠি সদর উপজেলার কেওড়া, গাভারামচন্দ্রপুর, ধানসিঁড়ি, কীর্ত্তিপাশা, নথুল্লাবাদ ইউনিয়নে দলের তৃণমূল নেতাকর্মীদের মতামত উপেক্ষা করে জেলা আওয়ামী লীগ তাদের পছন্দ অনুযায়ী প্রার্থীর নাম পাঠিয়েছে। একই অভিযোগ করা হয়েছে জেলার আরো তিনটি উপজেলায়। নলছিটি উপজেলার মগড়, রানাপাশা, ভৈরবপাশা, সিদ্ধকাঠি, দপদপিয়া ও কুশঙ্গল; কাঁঠালিয়ার পাটকেলঘাটা ও শৈলজালিয়া এবং রাজাপুর উপজেলার সদর, সাতুরিয়া ও মঠবাড়ি ইউনিয়নে দলের তৃণমূলের মতামত উপেক্ষা করেই মনোনয়ন দেওয়া হয়।

কাঁঠালিয়ার পাটকেলঘাটা ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন শহিদুল ইসলাম হৃদয়। তিনি অভিযোগ করেন, টাকার বিনিময়ে জেলা আওয়ামী লীগ নেতারা পাটকেলঘাটা ইউনিয়নে শিশির দাসের নাম পাঠিয়েছেন। তাঁকেই দলের মনোনয়ন দেওয়া হয়। অথচ তৃণমূল নেতাকর্মীরা এখনো তাঁর পক্ষে নির্বাচন করছেন।

রানাপাশা ইউনিয়নের আওয়ামী লীগ সভাপতি মনোনয়নবঞ্চিত আবদুল হামেদ মোল্লা বলেন, ‘আমার জনপ্রিয়তা থাকা সত্ত্বেও দল মনোনয়ন দেয়নি। টাকার বিনিময়ে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে আবদুস সালামকে। সালাম ও তাঁর লোকজনের জন্য আমি মনোনয়নপত্র দাখিল করতে পারিনি। উপজেলা পরিষদ চত্বরে বসে আমাকে মারধর করে মনোনয়নপত্র ছিনিয়ে নেয় তারা। তাদের ভোট নেই বিধায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হতে চাইছে।’

নরসিংদী : ইউনিয়ন পরিষদের মনোনয়ন নিয়ে প্রকাশ্যে বিরোধে জড়িয়ে পড়েছেন বেলাব উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শমসের জামান ভূঞা লিটন ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মনিরুজ্জামান খান। উপজেলা আওয়ামী লীগ ইচ্ছুক প্রার্থীদের কাছে দলীয় মনোনয়নপত্র বিক্রি ও সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে। পরে সাধারণ সম্পাদক মনিরুজ্জামান খান স্থানীয় সংসদ সদস্য নুরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূনের ঢাকার বাসায় বসে প্রার্থী নির্বাচনের চেষ্টা চালান। তবে সভাপতি শমসের জামান ভূঞা লিটন তাঁদের বিরুদ্ধে তৃণমূলের মতামত উপেক্ষা করে অর্থের বিনিময়ে মনোনয়ন দেওয়ার অভিযোগ তুলে বাধা হয়ে দাঁড়ান। এ অবস্থায় জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নজরুল ইসলাম হীরু (বীরপ্রতীক) সংকট নিরসনে বৃহস্পতিবার উভয় পক্ষের সঙ্গে আলোচনায় বসেন। কিন্তু লিটন নিজের অবস্থানে অনড় থাকায় জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি তৃণমূলের ভোটে প্রার্থী নির্বাচনের নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে উপজেলা আওয়ামী লীগের কমিটি বিলুপ্তির। তবে গত রবিবার জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল মতিন ভূইয়া কালের কণ্ঠকে কমিটি বিলুপ্ত করা হয়নি বলে জানিয়েছেন।

জেলা আওয়ামী লীগের নির্দেশে মনোনয়নপ্রত্যাশী প্রার্থীরা সমর্থন আদায়ে ওয়ার্ড ও ইউনিয়নের কাউন্সিলরদের কাছে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেন। যে যাঁর মতো করে রেজুলেশন তৈরি করে দলীয় নেতাকর্মীদের কাছ থেকে স্বাক্ষর সংগ্রহ করেছেন। কোনো কোনো ইউনিয়নে প্রতিটি স্বাক্ষর সংগ্রহ করতে ১০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়েছে বলে জানিয়েছে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা।

উজিলাব ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বেলায়েত হোসেন বুলবুল বলেন, ‘শুক্রবার ইউনিয়নের সভাপতি আবুল কাশেম আলকাছ সব ওয়ার্ডের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে ডেকে প্রত্যেককে ১০ হাজার টাকা দিয়ে পছন্দের অরাজনৈতিক প্রার্থীর পক্ষে রেজুলেশনে স্বাক্ষর নিয়েছেন। অথচ দলের নিবেদিতপ্রাণ একাধিক প্রার্থী থাকা সত্ত্বেও তাঁদের সভায় ডাকা হয়নি।’

উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ও বাজনাব ইউনিয়নের মনোনয়নপ্রত্যাশী সালাউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘রাজনীতি রাজনীতির জায়গায় নেই। এ সমস্যাটা নেতারা সৃষ্টি করেছেন। তারা ব্যর্থ হয়ে আবার তৃণমূলের কাছে এসেছেন। কিন্তু বিধি অনুযায়ী কোনো সভা না করেই প্রার্থীরা যে যাঁর মতো করে কাউন্সিলরদের স্বাক্ষর আদায় করেছেন। কোনো কোনো স্বাক্ষর আদায় করতে এক থেকে দেড় লাখ টাকা বিনিময় হয়েছে বলে শোনা যাচ্ছে। যেহেতু টাকা খরচ করে রাজনীতি করতে পারব না, তাই দৌড়াইনি।’

তৃণমূলের সমর্থন আদায় করেও নিজের মনোনয়ন নিয়ে শঙ্কিত বাজনাব ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাকিল মাহমুদ স্বপন। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘২০ জন কাউন্সিলরের মধ্যে আমাকে ১৪ জন সমর্থন জানিয়েছেন। সেই রেজুলেশনের কপি আমি এমপি মহোদয়ের কাছে জমা দিয়েছি। কিন্তু খবর বেরিয়েছে, আমার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি মোখলেছুর রহমানের নাম দলীয় মনোনয়নের জন্য কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। অথচ মোখলেছুর রহমান ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি ছিলেন। তিনি বঙ্গবন্ধুর খুনি রিসালদার মুসলেহউদ্দিনের নিকটাত্মীয়।’

এ ব্যাপারে জানতে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মনিরুজ্জামান খানের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে একাধিকবার চেষ্টা করেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

অর্থের সঙ্গে বিএনপিতে যোগ হয়েছে দুই ধারার বিভক্তি। ফলে কেন্দ্রে পাঠানো তালিকায় বিএনপির অনেক জনপ্রিয় নেতার নাম না থাকার অভিযোগ উঠেছে। এরই প্রতিবাদে গত শুক্রবার উজিলাব বাজারে আমলাব ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি আউয়াল ভূইয়ার সভাপতিত্বে এক প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিবাদ সভায় চর উজিলাব ইউনিয়নে উপজেলা জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক শাহজাহানের নাম মনোনয়নের জন্য প্রস্তাব পাঠানোয় ক্ষোভ জানানো হয়।

সররাবাদ ইউপির চেয়ারম্যান জহিরুল হক তানভীর বলেন, ‘আওয়ামী লীগ আর বিএনপি বলেন, সব মনোনয়নই টাকার বিনিময়ে হচ্ছে। আমার ব্যাপক জনপ্রিয়তা থাকা সত্ত্বেও সাবেক সংসদ সদস্য সরদার সাখাওয়াত হোসেনের সমর্থক হওয়ার অপরাধে টাকার বিনিময়ে আরেকজনের নাম মনোনয়নের জন্য কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে।’

এদিকে শিবপুর উপজেলায়ও আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে মনোনয়ন বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশী জয়নগর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি বাদল মিয়া অভিযোগ করেন, ‘তৃণমূলের শতভাগ সমর্থন থাকার পরও কেন্দ্রে আমার নাম প্রস্তাব করা হয়নি। ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকার কাছে দলীয় স্বার্থ বিসর্জন দিয়েছেন উপজেলার শীর্ষ নেতারা।’

তবে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সামসুল আলম ভূঞা রাখিল বলেন, ‘আওয়ামী লীগ বৃহৎ দল। তাই মনোনয়নবঞ্চিতরা মনোযন্ত্রণা থেকে এসব মিথ্যা অভিযোগ তুলছেন।’

ময়মনসিংহ : জেলার ফুলপুরের ১০টি ইউনিয়নের সাতটিতেই বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী রয়ে গেছেন। অনেক ইউনিয়নেই মনোনয়ন বাণিজ্যের কথা প্রকাশ্যে বলাবলি করছে স্থানীয় ও দলীয় লোকজন। তবে মনোনয়নবঞ্চিত চেয়ারম্যান প্রার্থীরা নিজেদের ভবিষ্যৎ বিবেচনায় এখনই মুখ খুলতে নারাজ। এদিকে মনোনয়ন বাণিজ্য দিয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে একেবারে দলই ছেড়ে দিয়ে আনুষ্ঠানিক ভাবে আ. লীগে যোগ দিয়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছেন রামভদ্রপুর ইউনিয়নের বিএনপি নেতারা।

ফুলপুর বিএনপির স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, বিএনপির দলীয় মনোনয়ন নিয়ে শুরু থেকেই বিভিন্ন ইউনিয়নে নানা গুঞ্জন ছিল। এর মাঝে ‘টাকার খেলা’ শব্দটি মাঠেঘাটে চাউর হয়েছে। যখন দলীয় মনোনয়নের প্রকাশ ঘটে তখন অনেকেই ক্ষুব্ধ হন। শেষ পর্যন্ত ১০টি ইউনিয়নের মাঝে সাতটিতেই বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী রয়ে যান। এগুলো হলো ভাইটকান্দি, সিংহেশ্বর, ফুলপুর, পয়ারী, রূপসী, বালিয়া ও বওলা।

বিদ্রোহী প্রার্থীরা তাঁদের মনোনয়ন না পাওয়া নিয়ে খোলামেলা অনেক কথা বললেও পত্রিকায় এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করতে চান না। পয়ারী ইউনিয়নের বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী সাবেক চেয়ারম্যান আবু মন্নাফ এ ব্যাপারে বলেন, ‘৩৫ বছর ধরে বিএনপি করি। কিন্তু মনোনয়ন পেলাম না।’ কেন মনোনয়ন পেলেন না? এ প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘সব কথা তো আর বলা যায় না।’ আরেকজন বিদ্রোহী প্রার্থী বলেন, দলের মনোনয়ন নিলামে উঠেছে।

তবে মাঠে হাঁড়ি ভেঙেছেন রামভদ্রপুর ইউনিয়নের বিএনপি নেতারা। মনোনয়ন বাণিজ্যের অভিযোগ তুলে গত ২৫ ফেব্রুয়ারি রামভদ্রপুর ইউনিয়ন বিএনপির নেতারা দল বেঁধে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছেন। এ ব্যাপারে রামভদ্রপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি (বর্তমানে যোগ দিয়েছেন আওয়ামী লীগে) এনামুল কবীর বাবুল বলেন, বিএনপির প্রার্থিতা ঠিক করার জন্য তাঁদের কমিটির ৪৭ জনের মাঝে ৩৫ জন উপস্থিত ছিলেন। এর মাঝে ৩৩ জনই খালেদ মোশাররফ সোহাগকে দলীয় সমর্থন ও মনোনয়ন দেওয়ার জন্য সুপারিশ করেন। কিন্তু সাবেক এমপি শাহ শহীদ সারওয়ার তৃণমূলের মতামতকে উপেক্ষা করে বর্তমান চেয়ারম্যান রোকুনোজ্জামানকে মনোনয়ন দেন। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে তাঁদের ইউনিয়নের ও ওয়ার্ড কমিটির ১৫১ জনের মাঝে ১৪৭ জনই দল থেকে পদত্যাগ করে অনুষ্ঠান করে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছেন। তিনি বলেন, সাবেক বিএনপিদলীয় এমপি শাহ শহীদ সারোয়ার প্রায় অর্ধকোটি টাকার মনোনয়ন বাণিজ্য করেছেন।

এ ব্যাপারে শাহ শহীদ সারোয়ারকে একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। তাঁর ঘনিষ্ঠজনরা জানিয়েছেন, মনোনয়ন নিয়ে দলীয় নেতাকর্মীদের নানা প্রশ্ন এড়াতেই সাবেক এমপি এখন অতি নিকটজন ছাড়া কারোরই ফোন ধরেন না।

মুন্সীগঞ্জ : সিরাজদিখানের বাসাইল ইউনিয়নে অওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী ইউপি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জহিরুল ইসলাম টিটু অভিযোগ করে বলেছেন, ‘মনোনয়ন বাণিজ্যের কারণে আমি দলীয় মনোনয়ন পাইনি। এখানে ৬০ লাখ টাকায় দলীয় মনোনয়ন বিক্রি হয়েছে। মনোনয়নের দিন আমি ১১ জন কাউন্সিলর নিয়ে কমিটির সামনে উপস্থিত হই। কিন্তু ৬০ লাখ টাকার বিনিময়ে আমাকে মনোনয়নবঞ্চিত করা হয়। শুধু আমি কেন, সিরাজদিখানে অধিকাংশ ইউনিয়নে তৃণমূলের ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়ন না করে অর্থের বিনিময়ে যার তার হাতে দলীয় মনোনয়ন তুলে দেওয়া হয়েছে।

একই উপজেলার ইছাপুরা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও মনোনয়নপ্রত্যাশী রফিকুল হক অরুণ বলেন, ‘মনোনয়ন কমিটি আমার ইউনিয়নে কোনো প্রকার ভোটাভুটি না করে দলীয় প্রার্থী নির্বাচন করেছে। অর্থের বিনিময়ে এখানে মনোনয়ন বিক্রি করা হয়েছে। তিনি দাবি করে বলেন, ‘অনেক টাকার বিনিময়ে আমার নানা রকম সমস্যা দেখিয়ে কোনো প্রকার ভোটাভুটি না করেই এখানে মনোনয়ন বিক্রি হয়েছে, যা ভবিষ্যৎ আওয়ামী লীগের জন্য সুখকর হবে না।’

মনোনয়নবঞ্চিত লতুব্ধি ইউনিয়নের আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও বর্তমান চেয়ারম্যান হাফেজ মোহাম্মদ ফজলুল হক বলেন, ‘আমার ইউনিয়নে স্বজনপ্রীতি করে আমাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। আমি স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছি। সেখানেও প্রশাসনে প্রভাব খাটিয়ে আমার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীকে দিয়ে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ দাখিল করে আমার মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। আমি আপিল করেছি। তবে বাসাইল ও কোলা ইউনিয়নসহ বেশ কয়েকটি ইউনিয়নে মনোনয়নকে কেন্দ্র করে ব্যাপক টাকার বাণিজ্য হয়েছে।

উপজেলার কোলা ইউনিয়নে ঘটেছে অন্য রকম ঘটনা। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার এক দিন আগে গত ১০ ফেব্রুয়ারী বিএনপি থেকে ওই ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান মীর লিয়াকত আলী আওয়ামী লীগে যোগ দেন। যোগ দিয়েই তিনি মনোনয়ন পান আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে। এই ইউনিয়নের সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থী কোলা ইউপি আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও উপজেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য নাসির উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘তৃণমূলের ভোটে আমি বিজয়ী হলেও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক সদ্য আওয়ামী লীগে যোগ দেওয়া লিয়াকত আলীকে নির্বাচিত করেন। এখানে টাকার কাছে রাজনীতির হার হয়েছে। আওয়ামী লীগের লোকজন এখানে বোবা কান্না কাঁদছে। শেখ হাসিনার নির্বাচনী নীতিমালাও এখানে কাজে লাগেনি। কোলা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ এখানে বিক্ষোভ মানববন্ধন করলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। তাই বাধ্য হয়েই আমি এখন স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছি।’

শ্রীনগরের ষোলঘর ইউপি আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি ও বর্তমান চেয়ারম্যন হাজী আব্দুস সালাম অভিযোগ করেছেন এখানে আওয়ামী লীগ টাকার কাছে বিক্রি হয়ে গেছে। এখানে সরাসরি স্থানীয় এমপি হস্তক্ষেপ করেছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর দাবি তৃণমূলের ভোটারদের টাকায় কিনে নেওয়া হয়েছিল। এখানে পাঁচজন সম্ভাব্য প্রার্থী থাকলেও কেউ ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেননি। পরে এমপি একজনকে ধরে এনে ভোটাভুটি করিয়ে তাঁর পছন্দের প্রার্থীকে এখানে মনোনয়ন দিয়েছেন। ঘোষঘরের আওয়ামী লীগ এখন কাঁদছে। বিষয়টি তিনি জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. মহিউদ্দিনকে জানিয়েছেন বলে কালের কণ্ঠকে জানান।

শুধু ষোলঘরই নয়, এমন অভিযোগ রয়েছে তন্তর, বীরতারা, শ্রীনগর সদরসহ বেশে কয়েকটি ইউনিয়নে।

শ্রীনগর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও স্থানীয় সংসদ সদস্য বাবু সুকুমার রঞ্জন ঘোষ বলেন, ‘শ্রীনগরে ইউপি নির্বাচনে আওয়ামী মনোনয়নে আমার জ্ঞাতমতে কোনো প্রকার টাকার বাণিজ্য হয়নি। ষোলঘরের সালাম গতবার আওয়ামী লীগের প্রার্থী ছিলেন না। উনি ওনার মতো করে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। এ বছর উনি দলের কাছে মনোনয়ন চাননি। তাই এ ব্যাপারে মন্তব্য করতে চাই না।’

এ ব্যাপারে সিরাজদিখান উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. মহিউদ্দিন আহমেদ তাঁর প্রতিক্রিয়ার বলেছেন, কাউন্সিলরদের ভোটাভুটির মাধ্যমে মনোনয়ন কমিটি প্রার্থী দিয়েছে। কমিটি টাকা খেয়ে মনোনয়ন দিয়েছে—এটি ডাহা মিথ্যা কথা। এ ধরনের ঘটনা সিরাজদিখানের ১৪টি ইউনিয়নের কোথাও ঘটেনি। তবে কাউন্সিলর বা ভোটাররা টাকা খেয়ে ভোট দিলে দিতেও পারে। তাতে কমিটির করার কিছুই ছিল না। কারণ ভোট যার পক্ষে পড়েছে কমিটি তাঁকেই প্রার্থী করেছে।

প্রতিবেদন তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন বরিশাল ব্যুরোপ্রধান রফিকুল ইসলাম, ঝালকাঠি প্রতিনিধি কে এম সবুজ, ভোলা প্রতিনিধি শিমুল চৌধুরী, নরসিংদীর সুমন বর্মণ, ময়মনসিংহের নিয়ামুল কবীর সজল ও মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি মাসুদ খান।

 

মন্তব্য