kalerkantho


ধর্মের বিরুদ্ধে লিখলে গ্রেপ্তার করা হবে

নিজস্ব প্রতিবেদক    

১০ আগস্ট, ২০১৫ ০০:০০



ধর্মের বিরুদ্ধে লিখলে গ্রেপ্তার করা হবে

যেসব ব্লগার মুক্তমনা পরিচয় দিয়ে ধর্মের বিরুদ্ধে লেখালেখি করে তাদের অপরাধী হিসেবে গণ্য করে গ্রেপ্তার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এখন থেকে ব্লগাররা ব্লগে কী লেখেন সে বিষয়ে খোঁজ রাখবেন গোয়েন্দারা। যাঁদের ব্লগে ধর্ম বিষয়ে আপত্তিকর মন্তব্য, কটূক্তি পাওয়া যাবে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হবে। গতকাল রবিবার আইনশৃঙ্খলাসংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এ ছাড়া যারা ব্লগারদের হত্যা করেছে তাদেরও দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সভা শেষে কমিটির সভাপতি শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি পরিষ্কারভাবে বলতে চাই- এসব হত্যাকাণ্ড রাজনৈতিক। যেসব রাজনৈতিক অপশক্তি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাতে চেয়েছিল, দেশে সাংবিধানিক শূন্যতা আনতে চেয়েছিল, সেসব অপশক্তিই আবার দেশে আইনশৃঙ্খলার অবনতি দেখানোর জন্য সুপরিকল্পিতভাবে ঘটনাগুলো ঘটাচ্ছে। এ বিষয়ে আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সক্রিয় থাকবে। আর এর পেছনে কারা রয়েছে তাদের খুঁজে বের করা হচ্ছে।’
এদিকে গতকাল বিকেলে পুলিশ সদর দপ্তরে এক বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হক ব্লগারদের ‘সীমা লঙ্ঘন’ না করার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে কেউ লেখালেখি করবেন না। এমন লেখালেখির প্রমাণ পেলে তাঁর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করা গুরুতর অপরাধ, এতে সর্বোচ্চ ১৪ বছরের সাজা হতে পারে।’ তিনি আরো বলেন, ‘লেখালেখির সময় আমরা যেন সীমা লঙ্খন না করি, সে ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। আমি মুক্তমনাদের সীমা লঙ্ঘন না করার আহ্বান করছি।’
আইনশৃঙ্খলাসংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভা গতকাল দুপুরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়। এতে অংশ নেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, পানিসম্পদমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী নূরুল ইসলাম বিএসসি, শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু। এ ছাড়া আইজিপি এ কে এম শহীদুল হক, বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আজিজ আহমেদ, র‌্যাবের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তা এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম, যুগ্ম সচিব মফিজুল হকসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে শুরু হয়ে পৌনে ৩টার দিকে সভা শেষ হয়।  
সভায় উপস্থিত থাকা একাধিক সূত্রে জানা যায়, ব্লগাররা ব্লগে কী ধরনের লেখা লিখে থাকেন তা নিয়ে সভায় আলোচনা করেন র‌্যাবের এক কর্মকর্তা। ব্লগারদের কয়েকটি লেখা তিনি পড়েও শোনান। এতে ধর্মের নানা বিষয়ে কটূক্তি রয়েছে। এসব শোনার পর সভায় একজন মন্তব্য করেন, একজন তার মুক্ত চিন্তা প্রকাশ করতেই পারেন; কিন্তু শুধু নির্দিষ্ট একটি ধর্মকে নিয়ে লিখলে সেটা যে ইচ্ছাকৃত তা সবাই বুঝতে পারেন। কেউ তার মুক্ত চিন্তা প্রকাশ করতে গিয়ে আরেকজনের ধর্মীয় অনভূতিতে আঘাত হানতে পারেন না। সেটি আইনের চোখে অপরাধ। ব্লগারদের লেখা এবং তাদের হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনার পর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যেসব ব্লগার ব্লগে ধর্ম নিয়ে কটূক্তি করবে তাকে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা হবে। সেই সঙ্গে সেসব ব্লগার হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে আর তারা এ ধরনের কর্মকাণ্ড করতে সাহস না করে। ব্লগার হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না তা খুঁজে দেখতে গোয়েন্দাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সূত্র মতে, দেশের বিভিন্ন এলাকায় যেসব ভূমি জবরদখল করে রাখা হয়েছে সেগুলো উদ্ধার করার সিদ্ধান্ত হয়েছে সভায়। এতে বলা হয়, মন্ত্রী, এমপি থেকে শুরু করে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি বা প্রভাবশালী ব্যক্তি যার দখলেই অন্যের জমি থাকুক না কেন তা উদ্ধার করা হবে। কোন ব্যক্তির জমি দখল করা হয়েছে এমন অভিযোগ থানা গ্রহণ করতে পারবে। পরে পুলিশ তদন্ত করে একটি প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে পাঠাবে। মন্ত্রণালয় থেকে পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে নির্দেশ দেওয়া হবে।
পরে আমির হোসেন আমু সাংবাদিকদের বলেন, দখল বিষয়ে স্থানীয়ভাবে যাতে থানা মামলা গ্রহণ করে সুষ্ঠু সমাধান করতে পারে, সে ব্যাপারে বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা লক্ষ করেছি, ভুয়া পাসপোর্ট তৈরি করে সরকারি আদেশ দিয়ে বিদেশ গিয়ে কাজ করছেন অনেকে। সে ব্যাপারে সরকারি কর্মচারীদের পাসপোর্ট দিতে মন্ত্রী বা এমপিদের দিয়ে তদন্ত করা হয় সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে।’
সভায় সাম্প্রতিক সময়ের শিশু হত্যার ঘটনাগুলো নিয়েও আলোচনা হয়েছে। রাজন হত্যার বিষয়ে বলা হয়েছে, মামলার প্রধান আসামি কামরুলকে আনা না হলেও চার্জশিট দিয়ে দিতে হবে। কামরুলকে ফেরত আনতে সৌদি আরবের সঙ্গে সরকারের যোগাযোগ হচ্ছে বলেও জানানো হয়।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে মন্ত্রীর ধন্যবাদ : শিশু হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে শিল্পমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, ‘আপনারা জানেন সিলেটের রাজনের হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের ইতিমধ্যে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি নেওয়া হয়েছে। অভিযোগপত্র প্রস্তুত হচ্ছে, যেকোনো মুহূর্তে অভিযোগপত্র দেওয়া হবে। খুলনার রাকিব হত্যাকারীদেরও ধরা হয়েছে। এসব বিষয়ে সরকার এবং সকারের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৎপর রয়েছে। নির্বাচন বানচালের চেষ্টা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সফলভাবে মোকাবিলা করেছে। ৯৩ দিনের অপতৎপরতা মোকাবিলা করতে সমর্থ হয়েছে। দেশ ও জনগণের স্বার্থে সফল হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ধন্যবাদ দিতে হয়।’
ব্লগারদের ‘সীমা লঙ্ঘন’ না করার পরামর্শ আইজিপির : ব্লগার ও শিশু হত্যার বিষয়ে আলোচনার জন্য গতকাল বিকেলে একটি বৈঠক হয়েছে পুলিশ সদর দপ্তরে। বৈঠক শেষে এক সংবাদ সম্মেলনে আইজিপি এ কে এম শহীদুল হক বলেন, ব্লগার ও মুক্তমনা লেখকদের পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সব ইউনিটকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে কোনো বিষয়ে লেখালেখি না করার জন্য তিনি ব্লগারদের প্রতি আহ্বানও জানিয়েছেন।
ব্লগার নিলয় হত্যাকাণ্ড প্রসঙ্গে পুলিশপ্রধান বলেন, শিগগিরই এই হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন করা হবে। এই হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে আগাম কোনো তথ্য পুলিশের কাছে ছিল না। জিডি না নেওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ বিষয়ে অভিযোগ আসার পর তিনটি সংস্থা তদন্ত করেছে। এ ধরনের কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তার পরও ইস্যুটি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
শিশু হত্যার ব্যাপারে আইজিপি বলেন, শিশু হত্যা ও শিশু নির্যাতন কোনোভাবেই কাম্য নয়। এগুলো প্রতিরোধ
করতে সব ইউনিটকে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কমিউনিটি পুলিশের কার্যক্রম আরো জোরদার করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, শিশু হত্যাকাণ্ড বিচ্ছিন্ন ঘটনা। এগুলো ধূর্ত অপরাধীদের কাজ। এসব মামলা দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে বিচার করা হয়। এ ব্যাপারে পুলিশও কাজ করবে।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত আইজিপি (বিশেষ শাখা) জাবেদ পাটওয়ারি, অতিরিক্ত আইজিপি (প্রশাসন) মোখলেসুর রহমান, অতিরিক্ত আইজিপি (সিআইডি) শেখ হিমায়েত হোসেন, র‌্যাবের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ, ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া, ডিআইজি (আপারেশন) চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন, ডিআইজি (ক্রাইম) হেলাল উদ্দিন ভদরী, সিনিয়র তথ্য কর্মকর্তা এ কে এম কামরুল আহছান প্রমুখ।


মন্তব্য