kalerkantho


অবহেলা-কারসাজির কবলে ডিজিটাল ভূমি ব্যবস্থাপনা

আপেল মাহমুদ   

২২ জুলাই, ২০১৫ ০০:০০



অবহেলা-কারসাজির কবলে ডিজিটাল ভূমি ব্যবস্থাপনা

জমিজমার দলিলপত্র নিয়ে বেশির ভাগ মানুষকেই জটিল সমস্যায় পড়তে হয়। এর থেকে উত্তরণের পথ তাদের জানা নেই।

উত্তরণের উপায় হিসেবে সরকারের পক্ষ থেকে কয়েক শ বছরের পুরনো ভূমি ব্যবস্থাপনাকে আধুনিক করার কথা বলা হচ্ছে বটে; কিন্তু বাস্তবে কিছুই ঘটছে না। দেশের ভূমি ব্যবস্থাপনা ডিজিটাইজেশনের জন্য বেশ কিছু উদ্যোগ সরকার নিলেও সেসব আলোর মুখ দেখছে না। মুখ থুবড়ে পড়ে আছে এ-সংক্রান্ত সব প্রকল্প। এর পেছনে সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অবহেলার পাশাপাশি যুগ যুগ ধরে জমির দলিলপত্র নিয়ে কারসাজি করে টাকা রোজগারের অসাধুচক্রগুলোর ষড়যন্ত্র রয়েছে বলে অভিযোগ আছে।

গত কয়েক বছরের বাজেট বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী ভূমি ডিজিটাইজেশনের ওপর জোর দিয়ে অর্থ বরাদ্দ রেখেছেন বললেও তা খাতাপত্রেই থেকে গেছে। এবারও বাজেট বক্তব্যে ভূমি ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়ন করতে ১৫২টি উপজেলার ল্যান্ড জোনিং ম্যাপ-সংবলিত প্রতিবেদন প্রণয়ন করা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন অর্থমন্ত্রী। আরো ৪০টি উপজেলায় এটি প্রণয়নের কাজ চলছে। এ ছাড়া জামালপুর সদর উপজেলার তিনটি মৌজায় ডিজিটাল ভূমি জরিপ সম্পন্ন করা হয়েছে মূলত ভূমি মালিকানা সনদ প্রবর্তন করার জন্য। বরগুনা জেলার আমতলী ও রাজশাহী জেলার রহনপুর উপজেলায় একই কার্যক্রম চলছে।

অর্থমন্ত্রী আরো বলেন, ডিজিটাল পদ্ধতিতে ভূমির নকশা ও খতিয়ান প্রণয়নের জন্য ঢাকা জেলার সাভার উপজেলার পাঁচটি মৌজায় একটি পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। নরসিংদী জেলার পলাশ উপজেলার ৪৮টি মৌজায় একই কার্যক্রম চলছে।

কিন্তু কালের কণ্ঠ'র অনুসন্ধানে জানা যায়, সাভার ও পলাশ উপজেলায় অত্যন্ত ধীরগতিতে পাইলট প্রকল্পের কাজ চলছে। প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নানা দুর্নীতি ও ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ উঠেছে। ঘুষের বিনিময়ে সরকারি জমি ব্যক্তির নামে আবার ব্যক্তির সম্পত্তি সরকারের নামে রেকর্ড করার মতো গুরুতর অভিযোগও আছে। সাভার উপজেলার রাজফুলবাড়িয়া গ্রামের বাসিন্দা হাবিবুর রহমান অভিযোগ করে বলেন, 'কয়েক বছর আগে ২০ হাজার টাকা ঘুষ দিয়ে তিন বিঘা জমির রেকর্ড করিয়েছি। এখন আবার ডিজিটাল জরিপ করার জন্য ৩০ হাজার টাকা ঘুষ দাবি করছেন জরিপ অফিসাররা। '

নরসিংদীর পলাশে ২০০৯ সালে ডিজিটাল পদ্ধতিতে নকশা ও খতিয়ান জরিপ শুরু হয়। কিন্তু অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির কারণে ছয় বছরেও তা শেষ করা যায়নি।

বাজেট বক্তব্যে বলা হয়েছে, দেশের ২০টি উপজেলায় ভূমি ই-সেবা চালু করা হয়েছে। কৃষিভূমি সুরক্ষা ও ভূমি ব্যবহার আইনের খসড়া প্রণয়ন করা হয়েছে, যা অচিরেই চূড়ান্ত করা হবে। সরকারের লক্ষ্য ২০১৯ সালের মধ্যে সব ভূমি অফিসের অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং ২০২০ সালের মধ্যে সব ভূমি অফিসকে ডিজিটাইজড সেবাকেন্দ হিসেবে গড়ে তোলা।

দলিল রেজিস্ট্রি ব্যবস্থা ডিজিটাইজ করার জন্য একটি পাইলট প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। ঢাকা, যশোর ও কুমিল্লার পাঁচটি অফিসে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করার কথা ছিল। এরই মধ্যে দুই বছর পেরিয়ে গেছে। প্রাথমিক বাজেটের প্রায় ৫০ কোটি টাকা খরচ হয়ে গেছে, অথচ কাজই শুরু করা হয়নি।

সূত্র জানায়, এসি ল্যান্ড অফিসগুলো ডিজিটাল পদ্ধতির আওতায় আনার জন্য ২০০৩ সালে পাইলট প্রকল্প শুরু করা হয় রাজধানীর ডেমরায়। প্রয়োজনীয় কম্পিউটার, যন্ত্রপাতি কেনা হয়। কিন্তু রহস্যজনক কারণে প্রকল্পটি বন্ধ হয়ে যায়। যন্ত্রপাতি পড়ে থাকতে থাকতে নষ্ট হয়ে যায়। পরে সের দরে সেসব বিক্রি করা হয়। প্রায় এক কোটি টাকা জলে গেছে। ডেমরা রাজস্ব সার্কেলের ডেমরা, মতিঝিল ও সবুজবাগ তহশিল অফিস ২০০৫ সাল পর্যন্ত কম্পিউটারাইজড পদ্ধতিতে পরিচালিত হয়েছে। এরপর দেশের ভূমি ব্যবস্থাপনার ডিজিটাইজেশনের প্রথম উদ্যোগটি আর শুরু হয়নি।

এসব প্রকল্প কী কারণে বন্ধ হয়ে যায় এবং কিভাবে প্রকল্পের অর্থ লুটপাট হয়, তা নিয়ে কেউ মাথা ঘামায়নি। কোনো তদন্ত কমিটি হয়নি। প্রকল্প বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর নতুন প্রকল্প হাতে নেওয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশ রেজিস্ট্রেশন সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন সূত্রে জানা যায়, ২০১৩ সালে প্রথমে দেশের পাঁচটি সাবরেজিস্ট্রি অফিস এবং তিনটি জেলা রেকর্ড রুম ডিজিটাল পদ্ধতির আওতায় আনার পরিকল্পনা করা হয়। ঢাকা সদর, তেজগাঁও, উত্তরা, যশোর সদর ও কুমিল্লা সদর সাবরেজিস্ট্রি অফিস এবং ঢাকা, কুমিল্লা ও যশোর জেলা রেকর্ড রুম পরিকল্পনাভুক্ত হয়। পরে পর্যায়ক্রমে সব সাবরেজিস্ট্রি অফিস ও জেলা রেকর্ড রুমে ডিজিটাল পদ্ধতি চালুর পরিকল্পনা করা হয়। এ জন্য প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয় ১৯১ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৫০ কোটি টাকা নিবন্ধন পরিদপ্তরের নিজস্ব তহবিল (আইজিআর ফান্ড) থেকে সংগ্রহ করার কথা বলা হয়। অবশিষ্ট ১৪১ কোটি টাকা অর্থ মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু দুই মন্ত্রণালয় বিভিন্ন অজুহাতে অর্থ ছাড় করছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। বেশ কয়েকজন সাবরেজিস্ট্রার বলেন, প্রায় তিন বছর পার হয়েছে; কিন্তু ডিজিটাল দলিল রেজিস্ট্রির বিষয়টি নিয়ে কেউ কিছু বলছে না।

অবসরপ্রাপ্ত সচিব এস এম জহিরুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, 'দেশের ভূমি ব্যবস্থাপনার গোড়ায়ই অব্যবস্থাপনা লুকিয়ে রয়েছে। বিশেষ করে ভূমি জরিপ ঘিরে দুর্নীতির যে বীজ রোপণ করা হয় তা দীর্ঘদিন বয়ে বেড়াতে হয়। ঘুষের বিনিময়ে একজনের জমি অন্যজনের নামে রেকর্ড করে, ফলে দেশে লাখ লাখ মামলার সৃষ্টি হচ্ছে। মৌসুমি আমিনরা যুগ যুগ ধরে ভূমি জরিপের নামে অর্থ লুটপাট চালালেও আজ পর্যন্ত একজন আমিনের বিচার হয়নি। তারা সরকারি চাকরিজীবী না হওয়ায় তাদের বিচার দূরের কথা, জিজ্ঞাসাবাদ পর্যন্ত করা সম্ভব হয়নি। '

বাংলাদেশ রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরকে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেয় বর্তমান সরকার। এ জন্য ডিজিটাল পদ্ধতিতে ভূমি জরিপ পরিচালনা করার জন্য পদক্ষেপ নেওয়া হলেও নানা অজুহাতে সেই পদক্ষেপ খাতাপত্রেই সীমাবদ্ধ। অধিদপ্তরের ভেতরে থাকা একটি শক্তিশালী চক্রই চাইছে না তাদের কার্যক্রম ডিজিটাইজড হোক। তাহলে তাদের দীর্ঘদিনের ঘুষ-দুর্নীতি বন্ধ হয়ে যাবে।

সম্প্রতি দেশের সব তহশিল অফিসকে ডিজিটাইজ করার জন্য একটি প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে, যা বাস্তবায়ন করছে ভূমি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন ভূমি সংস্কার বোর্ড। প্রকল্পের প্রথম পর্বে ঢাকা ও সিলেট বিভাগের সব তহশিল অফিসে দুটি ল্যাপটপ ও একটি করে প্রিন্টার্স দেওয়া হয়েছে। অচিরেই অন্যান্য বিভাগে ল্যাপটপ ও প্রিন্টার্স দেওয়া হবে বলে ভূমি সংস্কার বোর্ড সূত্রে জানা গেছে।

তহশিল অফিসে ল্যাপটপ দেওয়া হলেও এখনো পর্যন্ত সেখানে কম্পিউটার অপারেটরের কোনো পদ সৃষ্টি করা হয়নি। পদ নেই অথচ সেখানে ল্যাপটপ দেওয়া হচ্ছে- বিষয়টি ঘোড়া কেনার আগে ঘোড়ার জিন কেনার সঙ্গে তুলনা করছেন ভূমি অফিসসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

তহশিলদার ও সহকারী তহশিলদারকে ১৫ দিনের কম্পিউটার ট্রেনিং দিয়ে তাঁদের হাতে ল্যাপটপ তুলে দেওয়ার বিষয়টিকে হাস্যকর হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। যাঁরা এখন পর্যন্ত কিবোর্ডে পর্যন্ত হাত রাখতে পারেন না, তাঁদের ল্যাপটপ দিয়ে কাজ করার জন্য বলা হয়েছে। ফলে তহশিল অফিসগুলোতে বিষয়টি নিয়ে রীতিমতো বিশৃঙ্খলা চলছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক তহশিলদার বলেন, "দুই সপ্তাহে কম্পিউটারের 'ক'ও শিখতে পারিনি। অথচ আমাদের কম্পিউটারে কাজ করতে বলা হচ্ছে। পরিকল্পনাহীন এ ধরনের প্রকল্প কখনো সফল হবে না। মূলত প্রকল্পের কোটি কোটি টাকা জলে ফেলার জন্যই এ ধরনের হঠকারী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। অদূর ভবিষ্যতে ল্যাপটপ ও প্রিন্টার্সগুলো ভাঙারিতে পরিণত হবে। "

ভূমি প্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, 'দীর্ঘদিন ধরে দেশের ভূমি অফিসগুলো ঘুষ-দুর্নীতির সূতিকাগার হিসেবে পরিণত হয়েছে। অনেক চেষ্টা করেও তা নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না। তা থেকে জাতিকে রেহাই দিতে হলে মাঠ পর্যায়ে ভূমি প্রশাসনকে ডিজিটালাইজ করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। সরকার ইতিমধ্যে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। এর সুফল পেতে কিছুটা সময় লাগবে। হঠাৎ করেই তো এত বড় কাজ শেষ করা যাবে না। কিছু ক্ষেত্রে ডিজিটালাইজেশনের কাজ ধীরগতিতে হচ্ছে এ কথা সত্য। তবে তা অচিরেই ত্বরান্বিত করা হবে। জমির রেকর্ড-পর্চা ও ম্যাপ ডিজিটালাইজেশন দ্রুত শেষ করার জন্য মন্ত্রণালয় কাজ করে যাচ্ছে। দেশের প্রতিটি উপজেলায় একটি করে সহকারী সেটেলমেন্ট অফিস স্থাপনের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। এর কাজ শেষ করতে পারলে ডিজিটালাইজেশনের কাজ অনেক দূর এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে। '

রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, সরকার প্রায় পাঁচ বছর আগে দেশের প্রতিটি উপজেলায় ডিজিটাইজড ভূমি ব্যবস্থাপনার একটি করে অফিস গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়। এ জন্য ২০১২ সালে সারা দেশে ৪০০ সহকারী সেটেলমেন্ট অফিসার নিয়োগ দেওয়া হয়। পদটি প্রথম শ্রেণির নন-ক্যাডারভুক্ত। এর অধীনে ১৩ জনের একটি অফিস সেটআপ করে তাঁরা সার্বক্ষণিকভাবে জমির ডিজিটাল জরিপ ম্যাপ, পর্চা তৈরি করবেন। কিন্তু গত তিন বছরেও এসব অফিস গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। কাজ শুরু করা তো দূরের কথা, কোনো লোকবলও নিয়োগ দেওয়া হয়নি। বর্তমানে ৪০০ প্রথম শ্রেণির সহকারী সেটেলমেন্ট অফিসার বসে বসে কোটি কোটি টাকার বেতন-ভাতাসহ সরকারি সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছেন। একাধিক সহকারী সেটেলমেন্ট অফিসার জানান, তাঁরা কাজ করতে চান। কিন্তু অফিস এবং লোকবল না থাকায় কয়েক বছর ধরে বসে বসে বেতন-ভাতা নিচ্ছেন।

সোনারগাঁ উপজেলা সহকারী সেটেলমেন্ট অফিসার মনীষ কুমার সাহা কালের কণ্ঠকে বলেন, 'আমার পোস্টিং সোনারগাঁয় হলেও সেখানে কোনো অফিস বা লোকবল নেই, যে কারণে তেজগাঁও সাতরাস্তা মোড়ের ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরেই অফিস করতে হচ্ছে। '

মনীষ কুমার সাহা জানান, উপজেলা পর্যায়ে সেটেলমেন্ট অফিসের কার্যক্রম শুরু হলে দেশের জমিজমা বিরোধ অনেকাংশে কমবে। জমিসংক্রান্ত মামলা-মোকদ্দমার হাত থেকে লাখ লাখ মানুষ পরিত্রাণ পাবে। বিশেষ করে গ্রামগঞ্জে জমির সীমানা নিয়ে বিরোধ বেশি হয়। ডিজিটাইজড হলে সেটা একেবারে থাকবে না। জাল পর্চা, ম্যাপ কিংবা দলিল করে কেউ কারো জমি দখল করে নিতে পারবে না। তাই অচিরেই উপজেলা সেটেলমেন্ট অফিসের যাত্রা শুরু হওয়া উচিত।


মন্তব্য