kalerkantho


চাঁদাবাজদের স্বর্গরাজ্য বগুড়া

রাত হোক বা দিন, ঐতিহাসিক পুণ্ড্রনগরী বগুড়া পরিবহন চাঁদাবাজদের কাছে স্বর্গরাজ্য। পরিবহন নেতাদের চাঁদা দিয়ে উত্তরাঞ্চলের ১৬টি জেলার প্রায় পাঁচ হাজার যানবাহন চলাচল করছে। বগুড়ার নিজস্ব প্রতিবেদক লিমন বাসারের প্রতিবেদনে ছবি তুলেছেন ঠাণ্ডা আজাদ

১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



চাঁদাবাজদের স্বর্গরাজ্য বগুড়া

বাইপাস রোডে

 

বগুড়ায় বিভিন্ন নামে পরিবহন সমিতি রয়েছে। এর মধ্যে বাস-মিনিবাস মালিক সমিতি, জেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়ন, জেলা বাস মালিক সমিতি, জেলা ট্রাক মালিক সমিতি, জেলা সিএনজি অটোরিকশা মালিক সমিতি, পশ্চিম বগুড়া অটোটেম্পো সিএনজি মালিক সমিতি, গোহাইল রোড সিএনজি মালিক সমিতি, দত্তবাড়ী সিএনজি অটোটেম্পো মালিক সমিতি, পূর্ব বগুড়া অটোটেম্পো সিএনজি মালিক সমিতি, গোহাইল রোড সিএনজি মালিক সমিতি উল্লেখযোগ্য। চাঁদাবাজি করার জন্যই এসব সমিতি গঠন করা হয়েছে।

কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মহাসড়কে তিন চাকার যান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে সরকার। এর পরও টোকেন নিয়ে তারা চলছে। নিবন্ধনবিহীন ১৫ হাজার চালককে মাসিক ৫০০ টাকার টোকেন নিতে হয়। এভাবে মাসে প্রায় ৭৫ লাখ টাকা তোলা হয়। এর বাইরে অটোরিকশার চালককে চেইন চাঁদা হিসেবে প্রতিদিন গড়ে ৭০ থেকে ১২০ টাকা করে দিতে হয়। সে হিসেবে ১৫ হাজার অটোরিকশা থেকে চাঁদা তোলা হয় আরো ৩০ লাখ টাকা।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) ও ট্রাফিক পুলিশের তথ্য মতে, এই জেলায় প্রায় ২৫ হাজার সিএনজিচালিত অটোরিকশা চলাচল করে। এর মধ্যে মাত্র ১০ হাজারের নিবন্ধন আছে।

শহরের মাটিডালি মোড়ে গত এক সপ্তাহ অবস্থান করে দেখা যায়, ফুলবাড়ী ফাঁড়ি ও হাইওয়ে পুলিশের উপস্থিতিতে মহাসড়কে অটোরিকশা চলছে। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত চলাচলকারী পাঁচ শতাধিক অটোরিকশার মধ্যে ১০২টি ছিল নিবন্ধিত। সেখানে বগুড়া মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের নামে ১০ টাকা, পৌরসভার নামে পাঁচ টাকা, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন রাজশাহী বিভাগীয় কমিটির নামে পাঁচ টাকা করে চাঁদা তোলা হচ্ছে। তবে চালকরা জানায়, এর বাইরে দত্তবাড়ী থেকে মহাস্থান বা মোকামতলায় প্রতিবার ৩৫ টাকা চেইন চাঁদা দিতে হয়। মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের মাটিডালি শাখায় পাঁচ টাকা হারে চাঁদা দিতে হয়।

সাতমাথা থেকে শেরপুর পথে ৬০ টাকা চেইন চাঁদা এবং পৌরসভা ও শ্রমিকদের আরো ২৫ টাকা দিতে হয়। আবার কিচক বাসস্ট্যান্ড থেকে দত্তবাড়ী অটোরিকশা মালিক সমিতির নামে ৩৫ টাকা, শিবগঞ্জ পৌরসভার ১০ টাকা চাঁদা দিতে হয়। মহাস্থানের সিএনজি অটোরিকশাগুলোর মাসে একবার ৫০০ টাকায় টোকেন নিতে হয়। চাঁদা না দিলে অটোরিকশা আটকে রাখা হয়।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, দূরপাল্লার বাস থেকে আগে দিন ও রাতে শ্রমিক লীগের নামে টাকা তোলা হতো। ৫৫০টি বাস থেকে দিনে টাকা তোলা হতো জেলা শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক শামসুদ্দিন শেখ হেলালের নামে। রাতের টাকা তোলা হতো মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি আব্দুল লতিফ মণ্ডলের নামে। দিন ও রাতের টাকার ৪৫ শতাংশ যেত জেলা মোটর মালিক সমিতির সাবেক আহ্বায়ক ও জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মঞ্জুরুল আলম মোহনের কাছে। জেলা মোটর মালিক সমিতির কোন্দলে কমিটির কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে। এ কারণে এক মাস হলো এই চাঁদার টাকা মোটর মালিক সমিতি নিচ্ছে না। এখন মহাসড়কে চলাচলরত (কাউন্টার ছাড়া) কোচ থেকে ২৫০ থেকে ৮০০ টাকা করে চাঁদা উঠছে বগুড়া মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের নামে।

একটি সূত্র দাবি করেছে, পরিবহন চাঁদাবাজির টাকায় নেতারা ভারতের শিলিগুড়ি, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডে বাড়ি বানিয়েছেন। তবে তাৎক্ষণিকভাবে এই তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

অটোরিকশার চালকরা জানায়, বগুড়া শহর এলাকায় সিএনজিচালিত অটোরিকশার চাঁদা ওঠে জেলা সিএনজি মালিক সমিতির নামে। একটি অটোরিকশা শহরের রাস্তায় নামাতে গেলে এখানকার মালিক সমিতিকে ২০ হাজার টাকা দিয়ে ভর্তি হতে হয়। এ ছাড়া মোটর শ্রমিক ইউনিয়নকে ১০ হাজার টাকা চাঁদা দিয়ে চালককে সমিতির কার্ড করে নিতে হয়। ভর্তি হওয়ার পর প্রতিদিন সমিতিকে ৫৫ টাকা করে চেইন চাঁদা দিতে হয়।

শহরে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা থেকে শহর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি শহিদুল ইসলাম বাপ্পি ও তাঁর লোকজন চাঁদা আদায় করে। এ ধরনের এক হাজার ২০০ যান চলাচল করে। বনানী থেকে মাঝিড়া, দত্তবাড়ী থেকে মহাস্থানগড় রুটে হিউম্যান হলার চলাচল করে। এখানে বগুড়া জেলা হিউম্যান হলার মালিক সমিতি আছে। এই সমিতিকে ১০ হাজার টাকা দিয়ে প্রতিটি গাড়িকে ভর্তি হতে হয়। এ ছাড়া প্রতিদিন ১০০ টাকা করে চেইন চাঁদা দিতে হয়।

ঢাকাসহ দেশের অন্য স্থান থেকেও প্রায় ৫০০ ট্রাক প্রতিদিন মালপত্র নিয়ে উত্তরবঙ্গে আসা-যাওয়া করে। প্রতিটি থেকে ট্রাক মালিক সমিতির নামে প্রতিদিন ১০০ টাকা হারে চাঁদা তোলা হয়। এ ছাড়া বগুড়ায় কেউ নতুন ট্রাক রাস্তায় নামাতে চাইলে এই সমিতিকে চার হাজার টাকা ভর্তি ফি দিতে হয়।

বগুড়া জেলা ট্রাক মালিক সমিতির সভাপতি আব্দুল মান্নান আকন্দ বলেন, ‘রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের নিয়ে তৈরি করা সংগঠন ও পুলিশ অবৈধ যানবাহন থেকে চাঁদা তোলে।’

সংগঠনের নামে চাঁদার ব্যাপারে বগুড়া জেলা অটোটেম্পো, অটোরিকশা ও সিএনজি পরিবহন মালিক সমন্বয় কমিটি এবং জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সস্পাদক আসাদুর রহমান দুলু বলেন, ‘মাসিক টোকেনের টাকা যায় পুলিশের পকেটে। আর চেইন বাবদ যে টাকা তোলা হয়, তা সংগঠনের উন্নয়ন ও শ্রমিকদের কল্যাণে ব্যয় করা হয়।’

বগুড়া মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক ও জেলা শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক সামসুদ্দিন শেখ হেলাল বলেন, ‘বাস থেকে চাঁদা তোলার ব্যাপারে ফেডারেশনের অনুমতি আছে।’

 

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

‘হাইওয়ে পুলিশের কেউ টাকা নিয়ে মহাসড়কে অটোরিকশা চলাচলের সুযোগ করে দিচ্ছে না। চাঁদার ব্যাপারে জিরো টলারেন্স দেখানো হচ্ছে।’

মোস্তাফিজুর রহমান হাইওয়ে পুলিশের সুপার, বগুড়া



মন্তব্য