kalerkantho

গল্প

রঙের মিস্ত্রি

ইসহাক খান

১১ জুন, ২০১৮ ০০:০০



রঙের মিস্ত্রি

অঙ্কন : জাহিদুল হক রনি

রসিকতা তার স্বভাব। নিজের পেশা নিয়েও রসিকতা করে প্রদীপ পাল। জিজ্ঞেস করলে বলে, ‘আমি ভাই রঙের মিস্ত্রি। রং মাখানো আমার কাজ। তাতেই ভগবান দুইটা ডাল-ভাতের ব্যবস্থা করিচ্ছে।’ মানুষটির রসিকতাই জীবনের প্রধান অংশ। হাসি ছাড়া কথা নেই। অজাতশত্রু তার সান্নিধ্যে এসে যে কেউ গলে কাদা হয়ে যায়। মিডিয়ায় এক নামে প্রদীপ পাল সবার প্রিয়। নিখুঁত তার কাজ। ভাঙা চোয়ালে কোটরে বসা চোখ। বাঁ চোখটা আবার ট্যারা। কালচে অবয়ব। একবার তাকালে দ্বিতীয়বার তাকাতে ইচ্ছা করে না। সেই মুখে রং মাখানোর পর রঙের মিস্ত্রি প্রদীপের কাছেই হয়ে যায় অচেনা। এই কি সেই মুখ? একটু আগে যার দিকে দ্বিতীয়বার তাকাতে ইচ্ছা করেনি, সেই মুখ এমন আকর্ষণীয় হয়ে রং ছড়াচ্ছে। রঙের কী বাহার! প্রদীপের প্রথম প্রথম ভীষণ বিস্ময় জাগত। এখন অবশ্য গা-সওয়া হয়ে গেছে।

কাজের সময় এক মুখ বেশিক্ষণ দেখা হয় না প্রদীপের। তার কাজ সবার মুখে রঙের প্রলেপ দেওয়া। মিডিয়ায় তাদের অনেক বাহারি নাম—কেউ বলে মেকআপ ম্যান, কেউ বলে মেকআপ আর্টিস্ট, কেউ বলে রূপসজ্জাকর; কিন্তু প্রদীপ মজা করে নিজেকে বলে রঙের মিস্ত্রি।

তার কাজের অবসর নেই। একে একে তার সামনে অভিনেতা-অভিনেত্রীরা এসে বসেন, তাঁরা তাঁদের চরিত্রের ধরন বলেন আর সেই অনুযায়ী প্রদীপ ব্রাশ দিয়ে মুখে রং মাখতে থাকে। বৃদ্ধকে তরুণ আর তরুণকে বৃদ্ধ বানাতে তার জুড়ি নেই। ভেলকিবাজির মতো তার রঙের খেলা। রঙের আঁচড়ে মুহূর্তে চেহারার নকশা বদলে যাচ্ছে।

প্রথম যেদিন এই কাজের জন্য ওস্তাদের সঙ্গে এফডিসি আসে, বিস্ময়ে তার কথা বের হয়নি। চারপাশ দেখে আর বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়। যাঁদের এত দিন সিনেমার রুপালি পর্দায় দেখেছে, সেই জ্যান্ত মানুষগুলো এখন তার সামনে। ওস্তাদ মোমেন মিয়া তাকে যত কাজের ফিরিস্তি বলে, প্রদীপ তত বেশুমার স্তম্ভিত হয়ে নির্বাক চেয়ে থাকে স্বপ্নপুরীর মানুষদের দিকে। প্রদীপ অবাক হয়েছে ওস্তাদ মোমেন মিয়ার কাজ দেখেও। কী চেহারা মুহূর্তে কী হয়ে যাচ্ছে! ওস্তাদের হাতে জাদু আছে।

প্রদীপের মন খারাপ হয়েছিল নায়ক আকাশকে দেখে। প্রদীপ ভীষণ ভক্ত আকাশের। আকাশের ছবি কেটে ঘরের বেড়ায় লাগিয়ে রেখেছে। তেমন ছবি পেলে কেটে পকেটে নিয়ে ঘুরত। সেই রাজপুত্রের মতো মানুষটার এই হাল! গালে টোসকা পড়া। মুখে বসন্তের দাগ। মাথায় একটাও চুল নেই। ওস্তাদ মোমেন মিয়া নায়ক আকাশের মুখে রঙের পলিশ করে সব দাগ আড়াল করে দিয়ে যখন মাথার আলগা চুল ঠিকঠাক করছিল, তখনই প্রদীপ হাঁ মুখে তাকায়। তখনই প্রদীপ বুঝতে পারে, তার প্রিয় নায়কের মাথায় চুল নেই। মাথা আস্ত বেল। আলগা চুল পরে অভিনয় করে। বেল মাথার আকাশকে দেখলে সে চিনতে পারত না। বরং চমকে উঠত।

এখন আর আগের মতো চমক লাগে না; বরং বিরক্তই লাগে। কিন্তু পেশা বলে কথা। আর তো কিছু শেখেনি প্রদীপ পাল। কাজের সন্ধানে ঢাকা এসে দেখা হয় ওর গাঁয়ের সুনীল পালের সঙ্গে। গাঁয়ে প্রদীপের নামডাক হয়েছিল মূর্তি গড়ায়। দুর্গাপূজার সময় বালক বয়সে বাবা হরিশ পালের সঙ্গে মূর্তি গড়ায় লেগে যেত। কাজের নিষ্ঠায় বাবাকে ছাপিয়ে গেলে প্রদীপের নামও ছড়িয়ে পড়ে। সেই খবর পূজায় গ্রামে আসা সুনীল পালের কানেও আসে। সুনীলদের বাড়িতে বার্ষিক দুর্গাপূজা হয় আড়ম্বরে। সুনীল পালরা অবস্থাপন্ন। শিক্ষিত পরিবার। সুনীলের বাবা এলএমএফ ডাক্তার। বিস্তর জমিজমা। সুনীলরা জাত ব্যবসা করেন না। সুনীল বিসিএস পাস করে সরকারি আমলা হয়েছেন। তাঁর পোস্টিং এফডিসিতে। সেখানকার তিনি মহাপরিচালক। সুন্দরী শিক্ষিতা স্ত্রী। পূজার ছুটিতে সদলবলে গাড়ি নিয়ে গ্রামে বেড়াতে যান।

রাতে যখন মূর্তির সামনে আরতি চলছিল, তখন প্রদীপকে কাছে ডেকে সুনীল ওর ব্যাপক প্রশংসা করলে প্রদীপ বিনম্রভাবে মাটির দিকে তাকিয়ে থাকে। মনে মনে ওর খুব খুশি খুশি লাগছিল। সুনীল হেসে জিজ্ঞেস করেন, কিরে প্রদীপ, শুনলাম এবার ঠাকুর নাকি তুই গড়েছিস?

প্রদীপ মাথা নামিয়ে বিনীতভাবে বলে, আজ্ঞে কর্তা।

তোর প্রতিমা দেখে মনে হচ্ছিল, বড্ড চেনা মুখের মূর্তি। কার চেহারার সঙ্গে যেন হুবহু মিল। কাকে মনে করে প্রতিমা গড়েছিস, প্রদীপ?

প্রদীপ উত্সাহ পেয়ে বলে, সুচিত্রা সেনের মুখ আঁকছি, কর্তা।

অবাক হয়ে সুনীল পাল বলেন, তুই সুচিত্রা সেনকে চিনিস? দেখেছিস কখনো?

সিনেমায় দেখেছি।

কোথায় দেখলি সিনেমা?

বাজারে।

বাজারে আবার সিনেমা হল হলো কবে?

ভিসিআরে দেখছি।

সুনীল দুটি কারণে অবাক হলেন। বাজারে ভিসিআর দেখা যায়। আর সেই সিনেমা দেখে প্রদীপ সুচিত্রা সেনকে চিনেছে, পছন্দ করেছে এবং তাঁর মুখ কল্পনা করে প্রতিমা বানিয়েছে।

দুজনের তারপর অনেক কথা হয়। প্রদীপ একসময় আসল কথা পাড়ে। বলে—বাবু, দেশগিরাম থেকে কাজকাম কমি যাচ্ছে। খাওয়ার টানাটানি হচ্ছে। আগের মতো আর পূজা হয় না। আগে এই এলাকায় কম করেও দশটা প্রতিমার অর্ডার পেতাম। এখন মোটে দুইটা। আপনাদের বাড়ি আর সলপের জেলেপাড়ায়। আপনারা পূজা বন্ধ করলি আমাদের আর উপায় থাকবি না। না খেয়ে উপোস করতে হবে। একটা কাম জুটিয়ে দেন না, বাবু। শুনছি আপনার মেলা খেমতা। সরকারের মস্ত বড় অফিসার।

সুনীল পাল প্রদীপকে সঙ্গে করে ঢাকায় এনে এফডিসিতে নামকরা রূপসজ্জাকর মোমেন মিয়ার হাতে সঁপে দিয়ে বলেছেন—মোমেন সাহেব, ছেলেটার অনেক প্রতিভা। দেখেন তো কাজে লাগানো যায় কি না। আর প্রদীপকে বলেছেন, এই ওস্তাদের পেছনে লেগে থাক; ডাল-ভাত কেন, আরো অনেক কিছুর ব্যবস্থা হয়ে যাবে।

ডাল-ভাত এমন এক নেশা, যার কাছে পৃথিবীর তাবত্ বিষয় অসহায়। এই ভাতের জন্য হাত পাতছে মানুষ। আরো কত কী করছে! দেহব্যবসার মতো নোংরা কাজও করছে। এসব প্রদীপের নিজের চোখে দেখা। তাইতো কাজের প্রতি তার অবহেলা নেই। বরং ভীষণ নিষ্ঠাবান। তার পুরস্কারও সে পেয়েছে। শ্রেষ্ঠ রূপসজ্জাকর হিসেবে দুবার জাতীয় পুরস্কার, একবার সাংবাদিকদের দেওয়া পুরস্কার। ইদানীং প্রদীপ পাল একজন সহকারী রেখেছে। তাকে হাতে ধরে কাজ শেখায়। ছোট ধরনের যত কাজ নয়ন দাস করে। প্রদীপ পাল করে বড় কাজ। নায়ক-নায়িকার মেকআপ, অল্পবয়সী কাউকে বৃদ্ধ বানানো, কারো মুখে ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি, কুড়ি বছরের মেয়েকে বুড়ি বানানো—এই ধরনের জটিল কাজ করে প্রদীপ পাল। খুচরাখাচরি কাজ করার ধৈর্য প্রদীপ পালের নেই। তার সহকারী সব দেখভাল করে। শুটিংয়ের সময় ক্যামেরাম্যান হঠাত্ ক্যামেরা থামিয়ে বলে উঠলেন, নায়িকার ঠোঁটে ঘাম। অমনি পরিচালকের সহকারী চেঁচিয়ে হাঁক দিলেন, মেকআপ। মেকআপ।

সঙ্গে সঙ্গে আয়না আর পাফ হাতে ছুটে যেতে হয় মেকআপম্যানের। আগে প্রদীপ পাল ছুটত, এখন ছোটে নয়ন দাস।

প্রদীপ পালের ভালো লাগা অন্য জায়গায়। সিনেমার পোকা সে। পূজার সময় বন্ধুদের সঙ্গে শহরে গিয়ে সিনেমা দেখেছে দল বেঁধে। একই সিনেমা দুবার না দেখলে আশ মিটত না। সিনেমার পোকা ছিল প্রদীপ। হলের দারোয়ানকে ওর হিংসা হতো। সে বিনা পয়সায় নিয়মিত সিনেমা দেখতে পারে। তারও দারোয়ান হওয়ার শখ চেপেছিল; কিন্তু সাহস করে কাউকে বলতে পারেনি।

সেই সিনেমা কম্পানির মূল জায়গা, যেখানে সিনেমা তৈরি হয়, সেখানেই তার কর্ম জুটেছে। এতে প্রদীপ মনে মনে ভীষণ উচ্ছ্বসিত। সকাল-বিকাল সে তার প্রিয় মানুষদের কাছ থেকে দেখে। তাঁদের সান্নিধ্যে তার সময় কাটে। এর চেয়ে আনন্দের আর কী হতে পারে।

চল্লিশ পেরোনো প্রদীপ এখনো কুমার। ঘটেনি দ্বৈত জীবনের নাটক। ঘটতে যাচ্ছিল, কিন্তু প্রবল স্রোতের তোড়ে সব স্বপ্ন খড়কুটোর মতো ভেসে গেছে। সেই থেকে তার জীবন হাহাকারের মধ্যে ডুবে আছে। সেটা সে কাউকে বুঝতে দেয় না। কথায় কথায় রসিকতা করে। অন্যকে আনন্দ দিতে তার যত সুখ। ঘর বাঁধার স্বপ্ন আর মনে জাগেনি। প্রদীপ পাল জাগতে দেয়নি।

নয়ন দাস মাঝেমধ্যে জানতে চায়, খাওয়াদাওয়ার কষ্ট। দাদা, আপনি বিয়া করলেন না ক্যা?

ওস্তাদের বিয়া নিয়া তোর বুঝি ঘুম হচ্ছে না?

ঠিকই কইছেন, ওস্তাদ। আমি প্রায়ই ভাবি, শেষ জীবনে আপনাকে দেখাশোনা করবে কে?

কেন, তুই করবি। পারবি না?

সবাইকে দিয়ে কি সব হয়, দাদা? দীর্ঘশ্বাস ফেলে নয়ন। নয়নের এই কথার পর প্রদীপ খামোশ হয়ে যায়। মূল্যবান কথা বলেছে নয়ন। সবাইকে দিয়ে সব হয় না। মা মারা যাওয়ার পর বাবা বড় নিঃসঙ্গ হয়ে গিয়েছিলেন। তাঁকে দেখাশোনা করার কেউ ছিল না। যখন তিনি বিছানায় পড়লেন তখন দেখা দিল মহাসমস্যা। তাঁকে খাওয়ানো, গোসল ও পায়খানা-প্রক্ষালন করানোর কেউ নেই। প্রদীপের তখন টাকার অভাব ছিল না। ছিল আপনজনের অভাব। এই ধরনের সেবা আপন লোক ছাড়া হয় না।

শুটিং স্পটের আড্ডার মূল জায়গা হলো মেকআপ রুম। মেকআপরুম এসি করা। ক্যামেরার সামনে শট দিয়েই শিল্পীরা এসে মেকআপরুমে আড্ডায় বসে যান। মেকআপরুমের আরো একটি বিশেষ আকর্ষণ প্রদীপ পাল। তার সঙ্গে আড্ডা দিতে, তার কথা শুনতে সবাই আগ্রহী। প্রদীপ পাল রসালো গল্প বলতে বেশ পারঙ্গম। তার কথা শুনে সবাই হেসে লুটোপুটি খায়, কিন্তু সে হাসে না। তার তখনকার গম্ভীর ভাব দেখে সবাই উল্টো উচ্চৈঃস্বরে হাসতে থাকে।

একজন প্রতিষ্ঠিত নায়িকা খোঁচা দিয়ে বলেন, প্রদীপদার সবই ভালো। শুধু...

শুধু কী? পাল্টা প্রশ্ন করেন সহ-অভিনেতা হাসি বেপারী। হাসি বেপারী খল চরিত্রে অভিনয় করেন। লোকজনের ধারণা, ব্যক্তিজীবনেও তিনি খল। তাঁদের ব্যাপারে মানুষের ধারণা একপেশে। চলচ্চিত্রজগতের মানুষ তা মনে করে না। হাসি বেপারীকে তাঁরা অভিনেতা হিসেবে ভীষণ মূল্যায়ন করেন। তাঁর প্রশ্নে নায়িকা জুলি হাসতে হাসতে বলেন, দাদার সবই ভালো, শুধু ঘরখানা খালি। নায়িকা জুলির কথায় সবাই হেসে উঠলে প্রদীপ পাল লাজুক হেসে বলে, একা থাকার যে কী মজা সেটা যারা থাকে শুধু তারাই তার স্বাদ বোঝে। কী বলেন, হাসি ভাই?

এই কথায় হাসি বেপারীর জম্পেশ হাসি মুহূর্তে উবে যায়। বেশ কিছুদিন আগে তাঁর স্ত্রী তাঁকে ছেড়ে চলে গেছেন। পত্রপত্রিকায় এ নিয়ে বিস্তর রসালো কাহিনি লেখা হয়েছে। বিনোদ পত্রিকায় ‘হাওয়া থেকে পাওয়া’ কলামে নানাভাবে ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে হাসি বেপারীর কাহিনি লেখা হয়। তিনি নাকি নিত্যনতুন নায়িকাদের নিয়ে রাত কাটান। ইন্ডাস্ট্রিতে তাঁকে সবাই ফুর্তিবাজ খলনায়ক হিসেবে জানে। প্রদীপদার এই কথায় আবার হাসির রোল পড়লে কেউ কেউ বাঁকা চোখে প্রদীপ পালের দিকে তাকায়। একজন কৌতুক অভিনেতা হাসির ছলে বলেন, তাহলে কি আমাদের ভালো মানুষ প্রদীপদাও হাসি বেপারীর মতো নিত্যনতুনদের নিয়ে নরক গুলজার করেন?

আবার দম-ফাটানো হাসি। এবার প্রদীপ পালও হাসিতে যোগ দেয়। হাসতে হাসতে বলে, সব মাছই গু খায়, শুধু ঘাওড়া মাছের নাম হয়।

হাসি বেপারী এবার উঠে প্রদীপ পালের পা ছুঁয়ে সালাম করে বলেন, দাদা, লাখ কথার এক কথা বলেছেন। সুযোগ পেলে সব শালাই খামচি দেয়। দোষ হয় শুধু এই হাসি বেপারীর।

সিনিয়র নায়িকা বলেন, এর কারণ কী, জানো? প্রশ্ন করে সিনিয়র নায়িকা নিজেই বলেন, আমাদের দর্শকরা মনে করে, ভিলেনরা ব্যক্তিজীবনেও ছায়াছবির চরিত্রের মতো খারাপ। রাস্তাঘাটে তোমাদের দেখলে পাবলিক বিরূপ মন্তব্য করে না?

করে না মানে? যা-তা বলে। একজন ভদ্রমহিলা মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে রাস্তা পার হওয়ার জন্য অপেক্ষা করছেন। আমি রিকশায় যাচ্ছিলাম। আমার রিকশা সিগন্যালে তাঁর কাছাকাছি দাঁড়াতে মহিলা মুখ ঝামটা দিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে বলেন, হারামজাদা খচ্চরটা মরেও না।

আবার হাসির ঠমক উথলে ওঠে। হাসি থামতেই   সিনিয়র নায়িকা বলেন, আমি মনে করি, এটাই তোমাদের অভিনয়ের সার্থকতা। তুমি যথাযথভাবে খল চরিত্র ফুটিয়ে তুলতে পেরেছ বলেই দর্শকরা তোমাকে ঘৃণা করে। তাদের এই ঘৃণাই তোমার বড় পুরস্কার।

হাসি বেপারী এবার ভাব নিয়ে কথা শুরু করতে যাচ্ছিলেন, এই সময় সহকারী পরিচালক এসে জমে যাওয়া জম্পেশ আড্ডায় পানি ঢেলে দিলেন। বললেন, লাইট ক্যামেরা রেডি। ভিলেন ও হিরোইনকে কল করেছেন ডিরেক্টর স্যার।

আড্ডা ভেঙে যাওয়ায় সবাই বিমর্ষ মুখে পরস্পরের দিকে তাকায়। নায়িকা ও খলনায়ক দুজনই বিরক্ত মুখে উঠে পড়তে বাধ্য হন। বাকি যাঁরা ছিলেন তাঁরা অনেকক্ষণ জমানোর মতো কথা খুঁজে পান না। একজন বলে ওঠেন—দাদা, যা-ই বলেন, সবারই স্থায়ী ঠিকানার দরকার আছে।

সিনিয়র নায়িকা বলেন, সে তো এক শ বার। সব শেষে মানুষ ঘরেই ফেরে।

এমন কথায় প্রদীপ পাল লাজবাব। সে-ও বিশ্বাস করে, দিন শেষে সব পাখি ঘরে ফেরে। ঘরই সব প্রাণীর শান্তিময় স্বর্গ। সেই স্বর্গের দুয়ারে এসে হোঁচট খেয়েছে প্রদীপ পাল। সেই থেকে ও ভাবনা আর মাথায় জায়গা হয়নি। ঝেড়ে ফেলেছে মাথা থেকে।

অনেক দিন আগের কথা। সকাল থেকে একটি ডাগর চোখের শ্যামলা মেয়ে মেকআপরুমে বসে আছে। উঠতি যুবতি। শ্যামলা রঙের মেয়েটির চেহারাটা ভারি মিষ্টি। চোখে-মুখে অপার কৌতূহল। কতক্ষণ হলো মেয়েটি এখানে বসে আছে প্রদীপ পাল খেয়াল করেনি। যখন খেয়াল করে দেখে মেয়েটি বারবার দরজার বাইরে যাচ্ছে আবার বিষণ্ন মুখে এসে বসছে। প্রদীপ তাকে জিজ্ঞেস করে, আপনি কার কাছে এসেছেন?

বজলু ভাই আমাকে নিয়ে এসেছেন।

বজলু ভাই কে? এখানে কী করেন তিনি?

আমারে কইছে, হে ডাইরেক্টর।

প্রদীপ পাল মনে মনে হেসে ফেলে। ভাবে, এই নামে কোনো ডিরেক্টর আছে বলে তো মনে হচ্ছে না। প্রদীপ পাল বুঝে ফেলে, মেয়েটিকে মিথ্যা টোপ দেওয়া হয়েছে। এই বয়সে কম তো দেখল না। কত মেয়ে এভাবে ভুল পথে গিয়ে পথ হারিয়ে নিরুদ্দেশ হয়ে গেছে! মেয়েটির ওপর তার মায়া হয়। প্রদীপ পাল আবার জিজ্ঞেস করে—

কোথায় তিনি?

তা তো বলতে পারব না। আমাকে এখানে বসতে বলে সে বেরিয়ে গেছে।

শুটিং দেখতে এসেছেন?

জি।

তাহলে শুটিংয়ের জায়গায় যান। এখানে বসে থাকলে কি শুটিং দেখতে পারবেন?

মেয়েটি কী যেন ভাবে। তার মনে কথার ভিড়। সেটা প্রদীপ পাল বুঝতে পারে। প্রদীপ পাল মেয়েটিকে আবার জিজ্ঞেস করে, তিনি আপনাকে কী বলেছেন?

কইছে, আমাকে সিনেমায় চান্স দিয়া দেবে।

আপনার সঙ্গে তাঁর পরিচয় হলো কিভাবে?

সে আমার দুলাভাইয়ের বন্ধু।

আপনি অভিনয় করতে চান?

জি।

আগে কখনো অভিনয় করেছেন?

না। একবার স্কুলে ‘যেমন খুশি তেমন সাজো’তে আমি বেগম রোকেয়া সাজছিলাম।

প্রদীপ পালের এবার দম ফাটিয়ে হাসি উঠে আসে; কিন্তু নিজেকে সংযত করে মেয়েটিকে ভালো করে খেয়াল করে। কাছে গিয়ে বলে, বেগম রোকেয়া সাজা আর অভিনয় করা কি এক? ক্যামেরার সামনে অভিনয় করা খুব কঠিন। কথাগুলো মনে মনে ভাবল প্রদীপ পাল। মুখে কিছু বলল না। মেয়েটি তখন নিজে নিজে হড়হড় করে কথা বলে যাচ্ছে, আমি প্রতিদিন অভিনয় করি।

কোথায়?

আয়নার সামনে, একলা একলা।

এবার হাসি অবদমন করা প্রদীপ পালের জন্য ভীষণ কষ্টকর হয়ে উঠল। ভেতরটা হাসির দমকে কুলকুল করছে। নিজেকে সামলে নিয়ে প্রদীপ পাল ভাবল, মেয়েটিকে মেকআপ করে দেখা যেতে পারে মেকআপ করলে কেমন দেখায়। প্রদীপ বলে, আপনি এইখানে এসে বসেন। প্রদীপ পাল মেকআপের জন্য বসার চেয়ার দেখিয়ে সেখানে বসতে বললে মেয়েটি অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে।

প্রদীপ পাল বলে, অবাক হয়েছেন মনে হয়! আমি আপনাকে মেকআপ করে দেখি আপনাকে কেমন দেখা যায়। তারপর স্টিল ক্যামেরায় আপনার ফটো তুলে দেখতে হবে আপনার ফটো কেমন আসে। এটাকে আমরা বলি ফটোশুট। অনেকের চেহারা সুন্দর, কিন্তু ছবিতে ভালো আসে না। আবার কারো কারো চেহারা তেমন সুন্দর না, কিন্তু ছবিতে দারুণ আসে। এটাকে আমরা বলি ফটোজেনিক চেহারা।

মেকআপ করতে করতে আরো কথা হয় দুজনের। মেয়েটি বলে, আমার খুব শখ অভিনয় করার। আমি ঘুমের ঘোরে স্বপ্নের মধ্যেও অভিনয় করি। বলেই মেয়েটি হাসলে প্রদীপ পাল এবার দমিয়ে রাখা হাসির কপাট খুলে দিলে তার হাসি বেরোল শব্দ করে। তারপর নিজেকে হালকা বোধ হয়।

কী নাম আপনার? প্রদীপ পাল মেকআপ করতে করতে জিজ্ঞেস করে।

আমার নাম মালতি।

নাম শুনে প্রদীপ পাল মনে মনে হাসে। আবার ভাবে, অসুবিধা নেই, পরিচালক ওই নাম পাল্টে নতুন নাম দেবেন। সিনেমায় নায়ক-নায়িকার কারোরই আসল নাম থাকে না। সবারই নকল নাম। কুদ্দুসের নাম হয়ে যায় জারিফ খান।

মেয়েটি মগ্ন হয়ে প্রদীপ পালের দিকে তাকিয়ে থাকে। দুজনের চোখাচুখি হলে মেয়েটি বলে—দাদা, আপনি অভিনয় না কইরা এই কাম করতাছেন ক্যা? আপনার যা চেহারা, মাশাল্লাহ সুপার। সব নায়ক ফেল।

প্রদীপ পাল নিজের চেহারাটা ভালো করে খেয়াল করে। মেয়েটি মিথ্যা বলেনি। তার চেহারায় সিনেমার বিখ্যাত নায়ক নায়করাজ রাজ্জাকের মতো ছাঁট আছে। ভালোই তো। প্রদীপ পাল হেসে বলে, আমি অভিনয় করতে পারি না। তাই অভিনয়ের চেষ্টা করি নাই।

এখন করেন। সময় তো যায় নাই।

না। এই মিস্ত্রিগিরি আমার ভালো লাগে।

কী গিরি?

মিস্ত্রিগিরি। মেয়েটি জোরে হেসে ওঠে। প্রদীপ পাল অপলক তাকিয়ে মেয়েটির হাসি দেখে। হাসলে মেয়েটিকে আরো সুন্দর লাগে। একেবারে অন্য রকম।

মেকআপ শেষ। প্রদীপ নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না। একটু আগে শ্যামলা যে মেয়েটি বিষণ্ন মুখে এখানে বসে ছিল, এই কি সে-ই? মেকআপে আমূল বদলে গেছে মেয়েটির চেহারা। দারুণ লাগছে দেখতে। মেয়েটিও নিজেকে চিনতে পারছে না। হাসতে হাসতে বোকার মতো বলে, আমি এত সুন্দর! আপনার হাতে জাদু আছে। কেমনে কী করলেন, আমার চেহারাই বদলায়া দিলেন। আমি নিজেই নিজেরে চিনবার পারতাছি না।

লাঞ্চ ব্রেকে সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়ে খাওয়ার জন্য। শুটিংয়ের খাওয়া বেশ মুখরোচক। নানা পদের তরকারি থাকে। ভর্তা, ভাজি, মাছের ঝোল, ভুনা মাংস। নায়ক-নায়িকারা চাইলে আরো পদ এনে দেওয়া হয়। সহকারী প্রদীপ পালের জন্য খাবার নিয়ে এলে প্রদীপ পাল ইশারায় বলে, আরো একজনের খাবার নিয়ে এসো। সহকারী আরো একটি খাবার নিয়ে এলে মেয়েটির দিকে এগিয়ে দিতে ইশারা করে। তারপর মেয়েটিকে খেতে বলে। ততক্ষণে মেয়েটির লজ্জা ভেঙে গেছে। তার ওপর মেয়েটি ভীষণ ক্ষুধার্ত। সকাল থেকে পেটে দানাপানি পড়েনি। সে চেটেপুটে মজা করে পেট ভরে খেয়ে নেয়।

খাওয়ার পরপরই শুরু হয় কাজের তোড়জোড়। শিল্পীদের কাজের তাড়া দিতে পরিচালক আব্দুল হান্নান নিজেই আনমনে মেকআপ রুমে ঢুকে পড়েন। তাঁকে দেখে প্রদীপ পাল হেসে সালাম দেয়। টুকটাক কথা হয় তাঁদের। মেয়েটির দিকে চোখ যেতেই পরিচালক হান্নান থমকে তাকান। জিজ্ঞেস করেন, কে এই মেয়ে?

প্রদীপ পাল হাসিমুখে বলে, আমার চেনা। অভিনয় করতে চায়। চলবে, বস?

আব্দুল হান্নান মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছেন মেয়েটির দিকে। প্রদীপের কথা তাঁর কানে যায়নি। প্রদীপ পাল এবার তাড়া দিয়ে মেয়েটিকে বলে, বসে আছ কেন? সালাম করো। ইনি খুব নামকরা ডাইরেক্টর। মেয়েটি ঝুপ করে হান্নানের পায়ের ওপর পড়ে পা ছুঁয়ে সালাম করে।

কি বস, চলবে?

তুমি এক কাজ করো। স্টিল ক্যামেরা ম্যানকে দিয়ে ওর কয়েকটি ছবি তোলো। আব্দুল হান্নান নিজের মতো বলে দ্রুত বেরিয়ে যান।

স্টিল ক্যামেরা ম্যান মালতিকে নিয়ে ঝরনা স্পটে গিয়ে নানা ভঙ্গিতে কয়েকটি ছবি তোলেন। পরিচালক হান্নানের পছন্দ হয়। সেদিনই মেয়েটির কাজ জুটে যায়। বান্ধবীর চরিত্রে যে মেয়েটির অভিনয় করার কথা ছিল, অসুস্থ থাকায় সে আসতে পারেনি। তার চরিত্রে মালতিকে জুড়ে দেওয়া হলো। ফিল্মে এমন ঘটনা হরহামেশা ঘটে। নানা কারণে এমন ঘটনা ঘটে। মালতি প্রথম শটেই উতরে যায়। দেখে প্রদীপের মনটা খুশিতে ভরে ওঠে।

মালতি শট দিয়ে এলে তার উচ্ছ্বাস যেন ফেটে পড়ে। মেকআপরুমে ঢুকেই সে প্রদীপ পালের পা ছুঁয়ে সালাম করে। বলে—দাদা, আজ আমার মনের আশা পুরা হইছে। আমার বিশ্বাসই হইতাছে না, আমি ক্যামেরার সামনে অভিনয় করছি। সব আপনার দৌলতে হইছে। আপনে আমারে যা করতে কইবেন, আমি তা-ই করমু। আপনে আমার সব। ভগবানের পরই আপনে।

প্রদীপ এই সময়ের মধ্যে আপনি থেকে তুমিতে নেমেছে। বলে, তোমার দুলাভাইয়ের বন্ধু এলে তখন কী করবে?

ক্ষোভ প্রকাশ করে মালতি বলে, আসুক। সারা দিন আমারে অচিন জায়গায় ফালায়া রাইখা হে ভাগছে। হেই মিয়া কেমন মানুষ? আসুক আগে, মুখের ওপর না কইরা দিমু। তার সঙ্গে আমার আর কোনো সম্পর্ক নাই।

তুমি থাকবে কোথায়? এখানে তোমার কে আছে?

এই প্রশ্নে মালতি মাথা নামিয়ে থাকে। মালতির ঢাকায় কেউ নেই, যেখানে সে রাত্রি যাপন করতে পারে।

ব্যাপারটা বুঝতে পারে প্রদীপ। বলে, কোথাও থাকার ব্যবস্থা না থাকলে আপাতত আমার বাসায় থাকতে পারো। তবে কষ্ট করে থাকতে হবে।

এই কথাটা শোনার জন্য মালতি কান পেতে অপেক্ষা করছিল। শুনেই মন জুড়িয়ে গেল। খুশিতে পারলে মালতি নেচে ওঠে।

এক দিনের শুটিংয়ের টাকাও পেল মালতি। টাকা হাতে পেয়ে মালতির উচ্ছ্বাস আরো বেড়ে যায়। আনন্দ রাখার জায়গা পাচ্ছে না। কী করবে বুঝে উঠতে পারছিল না। ইচ্ছা হচ্ছে নেচে-গেয়ে একাকার করে তোলে। এই আনন্দঘন মুহূর্তে আকস্মিক প্রদীপ বিষাদিত প্রশ্নটি করে, তাহলে বজলুর কী হবে? সে যদি সামনে এসে দাঁড়ায়?

মালতি ক্ষোভের সঙ্গে বলে, সে আইলে জুতা দিয়া বাইড়ায়াম। ব্যাটা সেই সকালে আমারে এখানে ফালায়া থুইয়া গেছে, আর কোনো খবর নাই। আমি কিমুন আছি, কী খাচ্ছি তার কোনো হদিস না নিয়া আমার ওপর খবরদারি করতে আইলে ওর খবর আছে। আমি বুইঝা গেছি ওর মনে অন্য মতলব। আপনে বজলুর চিন্তা বাদ দেন। ওরে আমি সামলামু। আমার সামনে আইলে এমন দাবড় দিমু, বাপ বাপ কয়া পালাইব। বলেই হাসতে থাকে মালতি। প্রদীপেরও হাসি চড়ে মুখে। তবে নিঃশব্দে হাসে মালতির অলক্ষ্যে।

বজলু আর না এলে মালতি প্রদীপের বাসায় এসে নিজের মতো সব গোছাতে থাকে। ঘরদোর পরিষ্কার করার কাজে লেগে যায়। এটা তাকে কেউ বলে দেয়নি। সে নিজে থেকে কাজগুলো শুরু করে। বার দুই বাধা দিয়েছে প্রদীপ। মালতি কানে তোলেনি। উল্টো বলেছে, ঘর আওলাঝাওলা থাকলে আমার খুব খারাপ লাগে।

আমার তো ঘর গোছানোর লোক নেই।

হ, ঠিকই কইছেন। ঘর গোছানোর কাম মাইয়া মানুষের। দাদা, আপনে বিয়া করেন নাই ক্যা?

মালতির আকস্মিক এমন প্রশ্নে প্রদীপ থতমত করে জবাব দেয়। হেসে বলে, বিয়া করার মতো মেয়ে পাই নাই। কেউ এই রংমিস্ত্রিকে বিয়া করতে রাজি হয় নাই।

মালতি হাসে। এইটা কোনো কথা কইলেন?

ঠিকই বলছি। আসলেই কেউ আমাকে বিয়ে করতে রাজি হয়নি। তুমি করবা? প্রদীপের মুখ ফসকে কথাটা বেরিয়ে গেলে মালতি শব্দ করে হেসে ওঠে। তাতে সে কী বোঝায়, প্রদীপ বুঝতে পারে না; কিন্তু মনের মধ্যে এক ধরনের চঞ্চলতা তৈরি হয়। প্রেম প্রেম ভাব খেলা করে।

প্রদীপের মনে নতুন স্বপ্ন টগবগিয়ে ওঠে। এমন একটি মেয়ের কথা সে-ও ভেবেছিল মনে মনে। আজ কি সেই স্বপ্ন মিলে গেল? সেই স্বপ্ন বুকে জড়িয়ে প্রদীপ আবেশে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। রাতে মালতিকে নিয়ে বাসরঘরের স্বপ্ন দেখে প্রদীপ পাল।

মালতি পরের ছবিতে নায়িকা। হান্নানের এই ছবিতে দুই নায়িকার এক নায়িকা মালতি। মালতির নাম বদলে গেছে। মালতি এখন লতা। প্রডিউসার আদর করে নাম দিয়েছেন। নতুন ফ্ল্যাট কিনে দিয়েছেন। ব্যস, তাতেই সব উল্টে গেছে। মালতি এখন আর প্রদীপের না, প্রডিউসারের। নতুন ছবির শুটিং হবে বিদেশে। মালতি এখন আরো ওপরে উঠে গেছে।

অনেক দিন পর মালতির সঙ্গে প্রদীপের দেখা হয়। প্রদীপ তখন একজন শিল্পীর মেকআপ নিয়ে ব্যস্ত। সেই সময় মেকআপরুমে ঢোকে মালতি। তখন তার রমরমা অবস্থা। হিট নায়িকা। প্রদীপ মালতিকে দেখে ভীষণ খুশি হয়। উচ্ছ্বাস নিয়ে বলে, কেমন আছ, মালতি? কত দিন পর তোমাকে দেখলাম।

মালতি তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে জবাব দেয়, আমি মালতি না, আমার নাম লতা। একজন সুপারহিট নায়িকার নাম জানো না, এখানে তুমি কাজ করো কিভাবে?

রাগের মুখে মালতি বেরিয়ে যায়। প্রদীপ মনে মনে কষ্ট পেলেও এখানকার বাস্তবতা সে জানে। এই কারণে বিষয়টি তেমন আমলে নেয় না; কিন্তু আরো একটি ধাক্কা তার জন্য অপেক্ষা করছে, সেটা সে অনুমান করতে পারেনি। সেই ছবি থেকে বাদ হয়ে যায় প্রদীপ।

সেই থেকে প্রদীপের স্বপ্ন, প্রডিউসার হবে সে। অনেক হয়েছে রংমিস্ত্রির কাজ, আর না। সিনেমা বানাবে। দুর্দান্ত সিনেমা। দুপুর আর বিকেলের গল্প। নায়িকা হবে নতুন মুখের একজন। আর বিকাল হবে মালতি। প্রদীপ নিজের হাতে নিখুঁতভাবে মালতির মুখে বলিরেখা ফুটিয়ে তুলবে।



মন্তব্য