kalerkantho


সাক্ষাৎকার
অকথিত হুমায়ূন আহমেদ

তিনি প্রেমিক হিসেবে অসাধারণ

১১ জুন, ২০১৮ ০০:০০



তিনি প্রেমিক হিসেবে অসাধারণ

মেহের আফরোজ শাওন। কণ্ঠশিল্পী ও অভিনেত্রী হিসেবে তাঁর স্বতন্ত্র ও সম্মানজনক পরিচিতি আছে। এ ছাড়া তিনি আর্কিটেক্ট। তিনি কিংবদন্তি কথাশিল্পী হুমায়ূন আহমেদের স্ত্রী। বাংলা ভাষার সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখকের স্ত্রী হিসেবে তিনি এক জীবন কাটিয়েছেন। বিপুলসংখ্যক পাঠকের অনুরাগ ও আগ্রহ আছে তাঁর কাছে হুমায়ূন আহমেদের যেকোনো গল্প শোনার ও জানার ব্যাপারে। হুমায়ূন আহমেদের খানিক সঙ্গ পেয়েই অনেকে নিজেকে সুখী ও ধন্য মনে করত, সেখানে তাঁর সঙ্গে এক জীবন কাটানো বড় ব্যাপার। একই সঙ্গে শাওনের নিজের জীবনের গল্প ও শিল্পচর্চা নিয়েও পাঠকের অনুরাগ আছে। হুমায়ূন-ছায়ায় মিশে থাকা শাওনের জীবনের আনন্দ-বেদনার কথা এবং অকথিত কিছু গল্পও শুনব, যা এর আগে তিনি বলেননি; যে গল্পের মধ্য দিয়ে অজানা হুমায়ূন আহমেদকে জেনে ওঠা সম্ভব হবে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মাসউদ আহমাদ

 

 

আপনি কেমন আছেন?

শুরুতেই আপনি সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটা করলেন। কেমন আছি—আমি আসলে নিশ্চিত নই। কিন্তু যখন একটু চিন্তা করি, তখন মনে হয়, আমি অনেকের চেয়ে অনেক ভালো আছি। সেই ভালো থাকার জন্য আমি সৃষ্টিকর্তার কাছে কৃতজ্ঞ।

 

সম্প্রতি আপনি কলকাতায় একটি মঞ্চে গান গাইলেন জীবনমুখী গানের শিল্পী নচিকেতার সঙ্গে। এ সম্পর্কে কিছু বলুন।

অল্প কথায় বলি—নচিকেতার সঙ্গে গান করাটা আমার জন্য খুব চমৎকার একটি অভিজ্ঞতা ছিল। কারণটা হচ্ছে এই, আমরা যারা নাইনটিজের মানুষ, আমাদের প্রজন্ম যারা ওই সময় শৈশব-কৈশোরের সময়টা পার করেছি, তখন আমাদের সবারই নচিকেতা, কবীর সুমন ও অঞ্জন দত্তের গান এবং তাঁদের নিয়ে অনেক ফ্যান্টাসি কাজ করত। তখন তো ইউটিউব ছিল না, ক্যাসেট ছিল। তাঁদের গানগুলো শুনতে শুনতে মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল। বিশেষ করে নচিকেতা আর অঞ্জন দত্তের গান; কলকাতায় গিয়ে সে রকম একজন শিল্পীর সঙ্গে এক স্টেজে গান গেয়েছি, এটা তো অনেক সৌভাগ্যের ব্যাপার। চমৎকার অভিজ্ঞতা। পাশাপাশি আরেকটা বিষয় আমার ভালো লেগেছে, আপনাদের কালের কণ্ঠে আমার গান নিয়ে একটা ফিচার বেরিয়েছে গত ১৭ মের সাপ্তাহিক বিনোদন ক্রোড়পত্রে, সেখানে দেখলাম লেখা হয়েছে—নচিকেতার কথা এসেছে; সেখানে তিনি বলছেন, তিনি ২০১২ সাল থেকে হুমায়ূন আহমেদের লেখা পড়ছেন। খুব ভালো লেগেছে। তিনি দুঃখ করে বলেছেন, কেন তিনি আরো আগে থেকে তাঁর লেখা পড়লেন না। কেন ভালো লেগেছে, তা নিয়ে তিনি সুন্দর করে ব্যাখ্যাও করলেন। আর সহশিল্পীর সঙ্গে তাঁর যে ভদ্রতা—তিনি স্টেজে আমার একটু পরে এসেছেন। তাঁকে বলা হলো যে বাংলাদেশ থেকে একজন অতিথি এসেছেন, গান করবেন। তিনি স্টেজে উঠে আমাকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানালেন। আমার কাছে পুরো বিষয়টা এমন একটা আনন্দময় ব্যাপার মনে হলো, ঠিক যেন স্বপ্নের মতো। মানুষ অনেক কিছু স্বপ্ন দেখে—এটা করব, ওটা হব। কিন্তু আমার বেলায় যেটা হয়েছে, স্বপ্ন না দেখেও তা পূরণ হয়েছে। এটা এমন একটা স্বপ্ন, যেটা কখনো দেখিনি। আর নচিকেতার সুরে আমি একটা গানে কণ্ঠ দিয়ে এসেছি কলকাতায়, জুলফিকার রাসেলের কথায়। এটা দেবাশীষ গঙ্গোপাধ্যায়ের কম্পোজে একটি মৌলিক গান। গানটির শিরোনাম ‘ইলশেগুঁড়ি’। সম্ভবত ঈদের পরপরই গানটি রিলিজ হবে।

 

পরিচয় বা সম্পর্কের আগে হুমায়ূন আহমেদকে আপনি প্রথম কখন দেখেন?

হুমায়ূন আহমেদকে প্রথম দেখি ১৯৯১ সালে, বাংলাদেশ টেলিভিশনের অফিসে নওয়াজিশ আলী খানের রুমে। ‘জননী’ নামে একটি টেলিফিল্ম নির্মিত হবে, সেখানে অডিশন দিতে যাই আমি। সেই টেলিফিল্মের রচয়িতা ছিলেন হুমায়ূন আহমেদ। নওয়াজিশ আংকেল ছিলেন পরিচালক। সেখানেই তাঁকে প্রথম দেখি। আমাকে স্ক্রিপ্ট দেওয়া হলো, আমি পড়লাম। পরে সংলাপ বলতে দেওয়া হলো। আমার ডায়ালগ শুনে হুমায়ূন আহমেদ বললেন, হ্যাঁ, এই মেয়ে পারবে। পটপট করে কথা বলে। পরে তিনি আমার মাকে বললেন, টেলিফিল্মের শুটিং হবে ময়মনসিংহ ও রাজশাহীতে; আমি যেতে পারব কি না? কাজের সূত্রে যেসব কথাবার্তা হয় আর কি।

 

হুমায়ূন আহমেদ বেঁচে থাকতে দখিন হাওয়ার দরজা সব সময় খোলা থাকত এবং চুরি বা কোনো অঘটন ঘটত না। এখনো কি দরজা খোলা থাকে?

দখিন হাওয়ার দরজা এখনো খোলাই থাকে। আলহামদুলিল্লাহ, কোনো রকম অঘটন ঘটেনি বা চুরি হয়নি গত ছয় বছরে।

তিনি বেঁচে থাকতে আপনার সংসার একরকম ছিল, এখন আবার অন্য রকম। দুই পর্বের জীবন নিয়ে একটু যদি বলেন...

তিনি বেঁচে থাকতে আমার সংসার যেমন ছিল, এখনো তেমনই আছে। পার্থক্যটা শুধু এই যে তখন আমার সংসারে জমজমাট ভাব ছিল। সন্ধ্যার পর প্রচুর মানুষ আসত। কোনো দিন একা খেতে হয়নি আমাদের। আর কোনো দিন দুপুরবেলা দেখা গেল, পাঁচ-ছয়জন খাচ্ছি। রাতের বেলা খাচ্ছি হয়তো ১৮ বা ২০ জন। রোজ একটু আড্ডা—শিল্পী-সাহিত্যিকদের নিয়ে আড্ডা, বন্ধুদের নিয়ে আড্ডা, কিংবা কাছের মানুষদের নিয়ে আড্ডা লেগেই থাকত। এখন হয়তো সেই পরিমাণ আড্ডা আর নেই। নেই মানে এখন আসলে একেবারেই আড্ডা হয় না। এখন আমার আর দুই ছেলের আড্ডা হয়। সেটার একটা অন্য রকম সৌন্দর্য আছে, একটা সাংসারিক মায়া আছে এবং এখনো আমাদের মায়ার সঙ্গে হুমায়ূন আহমেদ দখিন হাওয়ায় জড়িয়ে আছেন। আমাদের প্রতিটি আড্ডায়, আমাদের প্রতিটি কর্মকাণ্ডে, এমনকি সুখ বা দুঃখের সময় বা বিপদের মুহূর্তে তিনি আমাদের পাশে মায়া নিয়ে জড়িয়ে আছেন।

 

সারা দিন তো কাজের চাপে সময় কেটে যায় মানুষের। কিন্তু দিন শেষে নিজের কাছে ফেরার অবসর ঠিক তৈরি হয়ে যায়। তখন চারপাশ যত শান্ত হয়ে আসে, একাকিত্বটা সামনে চলে আসে বড় হয়ে। আপনার সেই একান্ত সময়ে তিনি কতটা জুড়ে থাকেন?

আমি যে আজ নিজেকে অনেক কাজে ব্যস্ত করে ফেলেছি, এর পেছনে একটাই কারণ—কাজে ব্যস্ত থাকলে মানুষ অনেক কিছু ভুলে থাকতে পারে। আপনি নিজেই প্রশ্নটা সুন্দর করে বললেন—দিন শেষে মানুষ যখন ঘরে ফেরে তখন একাকিত্ব বড় হয়ে ওঠে বা রাতটা অনেক বড় হয়ে যায়। সেই রাতের একাকিত্বটা অন্য রকম হয়। আমার একাকিত্বের কতটা জুড়ে তিনি থাকেন যদি সেটা বলি, ইনফ্যাক্ট তাঁকে ছাড়া তো আমার একাকিত্বের কোনো কারণই থাকতে পারে না। আমার তো সবই আছে—বাবা আছে, মা আছে, ভাই-বোন এবং বাচ্চারা আছে। নাই যদি বলি—তাহলে তো আমার বড় জিনিসটাই নাই। আমার সবচেয়ে আপনজন কে আমার কাছে? এই একাকিত্ব আসলে ভাষায় বুঝিয়ে বলা কঠিন। এই প্রশ্নের উত্তর কোনো ইন্টারভিউয়ের উত্তর হিসেবে দেওয়া আসলে সম্ভব নয়। আপনি যদি আমাকে কোনো প্রশ্ন না করেন তাহলে হয়তো আমি অনেক কিছু বলতে পারব। সেটা আবার একেক সময় একেক রকম হবে। আমার কাছে কখনো মনে হয়, আমার ঘরটা একটা কবর হয়ে গেছে। এখন, এই মুহূর্তে এটুকু মনে পড়ল বলে বলতে পারলাম। কখনো মনে হয়, আমার ঘরের চারটা দেয়াল আস্তে আস্তে ছোট হয়ে আসছে। আমি ধীরে ধীরে স্থবির হয়ে যাচ্ছি। তখন এই বিশাল ঘরটাই আমার কাছে ভীষণ ছোট লাগে। মনে হয় যে আমি এখানে থাকতে পারছি না, আমার শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। এ রকম মুহূর্তে, যখন আমার খুব কষ্ট হয়, যন্ত্রণা বোধ করি, তখন বাচ্চাগুলোকে আমার বুকের ভেতরে আঁকড়ে ধরি। তখন মনে হয়, না, এই বিশাল শূন্যতার মাঝেও আমার একটা শান্তির জায়গা আছে। একটা জানালার ফাঁক দিয়ে সুন্দর একটু বাতাস আসছে। সেই বাতাস হচ্ছে আমার বাচ্চাগুলো। ইচ্ছা করলেই সেই বাতাস গ্রহণ করতে পারি। কিন্তু প্রায়ই আমার মনে হয় যে আমার দম আটকে আসছে। যদি এমন হতো—বেঁচে থাকতেই হবে বা বেঁচে থাকাটা আসলে আমাদের হাতে না, তাহলে হয়তো আমি মারা যেতাম। তখন হয়তো বেঁচে থাকার কোনো আরজি ফিল করতাম না। আমি এখন বেঁচে আছি কারণ বেঁচে থাকতে হয়। আবার এটাও সত্য, আমি আমার বাচ্চাদের জন্য বেঁচে আছি। এ রকম কোনো নিয়ম যদি না থাকত তাহলে হয়তো আমি বাঁচতাম না।

 

তাঁর সঙ্গে কাটানো আনন্দময় কোনো একটি মুহূর্তের গল্প যদি বলেন, যা আগে কখনো বলেননি...

বিশেষভাবে একটি মুহূর্তের কথা বলা কঠিন। কারণ এত এত আনন্দময় মুহূর্ত কাটিয়েছি। আর যেসব বলিনি কখনো, সেসব আসলে বলার মতো না। কিংবা নিজে যদি কখনো লিখি, তখন হয়তো লিখব। আচ্ছা, একটা বলি—তিনি তো আসলে মানুষকে চমকে দিতে পছন্দ করতেন। আমাকে চমকে দেওয়ার জন্য তিনি বহু সময়ে বহু কিছু করেছেন। একটা ঘটনার কথা বলি। তখন ১৯৯৬ সাল। আমার এসএসসি পরীক্ষা চলছে। আমার সিট পড়েছিল রাজারবাগ গার্লস বা বয়েজ স্কুলে। প্রথম পরীক্ষাটা যখন দিতে গেছি, তখন ‘নক্ষত্রের রাত’ নাটকের শুটিং চলছে। শুটিং শেষ পর্যায়ে, অল্প কিছু কাজ বাকি আছে। পরীক্ষা দিয়ে আমি বেরোলাম। গাড়িতে উঠব। হঠাৎ দেখি, অদূরে একটা গাড়িতে হুমায়ূন আহমেদ বসে আছেন। হাতে একটা ডাব। আমাকে দেখে গাড়ি থেকে বেরিয়ে এলেন। তাঁর আসার ব্যাপার পুরোটাই ছিল আমাকে সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্য। তখন তিনি নিজেও অস্বস্তি বোধ করছিলেন, তিনি এত বিখ্যাত একজন মানুষ, পরীক্ষার হলের সামনে ডাব নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। তাই প্রথমে গাড়ির ভেতরে বসে ছিলেন। আমি সেই বিষয়ে এতই মজা পেয়েছিলাম যে ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না। আমি ভীষণ সারপ্রাইজড হয়েছিলাম। আমার প্রতি তাঁর যে অনুরক্ততা বা মুগ্ধতা তা বোঝানোর প্রবল একটা চেষ্টা তাঁর মধ্যে ছিল। আমার প্রতি তাঁর কত মায়া সেটা বোঝানোর জন্যও এটা একটা ভালো অবলম্বন হতে পারে। তিনি এটা ভেবেও খুব ইমব্যালান্স হচ্ছিলেন যে আমার কোনো পরিচিত মানুষ দেখে ফেললে ব্যাপারটা কেমন হবে। বিষয়টি আমার মনে খুব রেখাপাত করেছিল।

 

তাঁর স্বভাব ও চরিত্রের কোন বিষয়গুলো আপনাকে মুগ্ধ করত?

মুগ্ধ হওয়ার কথা যদি বলেন, তাহলে তাঁর চরিত্রের যে বিষয়টি আমাকে ভীষণ মুগ্ধ করত সেটা হচ্ছে মানুষের প্রতি তাঁর প্রবল মমত্ববোধ। অসুস্থ না হলে বা কোনো কারণে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত না থাকলে তিনি সাধারণত মানুষের সঙ্গে মিশতেন। সাধারণ মানুষের প্রতি তাঁর মায়া ও ভালোবাসা দেখানোর ব্যাপারটা খুব শেখার মতো একটা বিষয় ছিল। আমরা নরমালি যেটা করি, কোনো মানুষকে সাহায্য করতে গেলে সেই সাহায্য করার ব্যাপারটাকে একটা অনুষ্ঠান বানিয়ে ফেলি। বন্যার্তদের সাহায্য করতে গেলেও সেটাকে অনুষ্ঠানের পর্যায়ে নিয়ে যাই। সেই ছবিগুলো টিভিতে চলে আসে। ফেসবুকে দিই। ফেস্টুন হয়, ব্যানার হয়। আমি হুমায়ূন আহমেদকে দেখেছি পর্দার অগোচরে থেকে একদম নীরবে মানুষের জন্য কিছু করে যেতে। মানুষকে হেল্প করার বিষয়টা কিন্তু দায়িত্বের জায়গা থেকে না; তাঁর খারাপ লাগত। তিনি কাঁদতেন। কাঁদা বলতে আমি হাউমাউ করে কাঁদার কথা বলছি না, তাঁর হৃদয়টা কাঁদত। তিনি অনেক গল্প করতেন। গল্প করতে করতে তখন তিনি বলতেন, দেখো, আমার খারাপ লাগে।

 

তিনি নিজেই সরাসরি সাহায্য করতেন?

না, তিনি কাউকে দায়িত্ব দিতেন। অভিনেতা চ্যালেঞ্জারকে দায়িত্ব দিতেন। বলতেন যে আমি অমুক জায়গায় রাস্তার পাশ দিয়ে আসছিলাম। হঠাৎ দেখলাম যে একটা ছেলে তার বাবাকে সঙ্গে নিয়ে ঘুরছে চিকিৎসার জন্য। তুমি একটু খবর নাও তো, সত্যিই সে অসুস্থ কি না; তার শরীরটা খারাপ কি না। সত্যিই যদি অসুস্থ হয়, তাহলে তার বাবা কেন তাকে নিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরবে?

 

তারপর?

হুমায়ূন আহমেদ চাইলেই তাকে ১০ বা ১০০ টাকা দিয়ে আসতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। তিনি যেটা করলেন, বাসায় ফিরে এসে চ্যালেঞ্জারকে দায়িত্ব দিলেন, ছেলেটি আসলেই অসুস্থ কি না। অসুস্থ হলে তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে বলতেন। পরে দেখা গেল, ছেলেটি আসলেই অসুস্থ। তার প্রস্টেটের একটা প্রবলেম ছিল। তিনি নিজেকে আড়ালে রেখে ছেলেটির চিকিৎসার পুরো খরচ দিলেন অভিনেতা চ্যালেঞ্জারের মাধ্যমে। বাচ্চাটি এবং তার পরিবার জানতেই পারেনি, কে তাদের চিকিৎসার খরচ দিয়েছে। তারা অনেকবার জিজ্ঞেস করেছে, কে করল? আল্লাহ কারে পাঠাইল? হুমায়ূন আহমেদ মানা করে দিয়েছিলেন তাঁর কথা যেন প্রকাশ না করা হয়। জানার পর তাঁর জন্য তারা দোয়া করবে বা অন্য কিছু, তিনি এসব চাইতেন না। পরে আমরা সেই ছেলেকে দেখতে গিয়েছিলাম তার গ্রামে। চ্যালেঞ্জার সাহেবই নিয়ে গিয়েছিলেন আমাদের। এ রকম অনেক ঘটনা আছে তাঁর জীবনের। আমার কি মনে হয় জানেন, আমি হুমায়ূন আহমেদের স্ত্রী হিসেবে বলছি না, একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে বলব, আমি যেটা দেখেছি, একজন মমত্ববোধসম্পন্ন মানুষকে দেখেছি।

 

সেলিব্রিটিদের প্রতি মানুষের প্রেম নতুন কিছু নয়। হুমায়ূন আহমেদ তো তুমুল জনপ্রিয় মানুষ ছিলেন। তাঁর প্রেমে পড়েছে কেউ—সাক্ষাতে বা ফোনে বা চিঠি লিখেছে—এমন বিষয় বুঝতে পারলে আপনার কেমন অনুভূতি হতো?

আমার সব সময় খুব মায়া লাগত। এ রকম ঘটনা অনেক ঘটেছে যে প্রথমে একটা বিষয় ক্লিয়ার করে নিই, আমি কিন্তু সেলিব্রিটি হুমায়ূন আহমেদের প্রেমে পড়িনি। আমি মানুষ হুমায়ূন আহমেদের প্রেমে পড়েছি এবং প্রেমে পড়ার ব্যবস্থাটা তিনি নিজেই করেছিলেন। কিন্তু যখনই কোনো মেয়েকে দেখেছি, আমার বিয়ের আগে বা বিয়ের পরে দেখেছি যে একজন তুমুল জনপ্রিয় বা শীর্ষে থাকা একজন হুমায়ূন আহমেদের প্রেমে বা মোহে কেউ একজন পড়েছে, তখন আমার খুব মায়া লাগত। এটা ভেবে যে কিছু কিছু চাওয়ার আসলে পরিণতি থাকে না। কিছু কিছু চাওয়ার কোনো পাওয়া হয় না। সেই জায়গা থেকে আমার খুব মায়া লাগত।

 

আপনার ঈর্ষা হতো না?

না, আমার কখনো ঈর্ষা হতো না। আমার মনে হতো যে সেলিব্রিটি মানুষের বা হুমায়ূন আহমেদের মতো মানুষদের উচিত যারা যারা তাঁর প্রতি অনুরক্ত তাদের প্রত্যেককে একটু একটু করে সময় দেওয়া। সবাইকে তো আর গ্রহণ করা বা ফিরিয়ে দেওয়া যায় না। কিন্তু প্রত্যেকের জন্য একটু করে সময় রাখা উচিত। প্রত্যেকের আবেগকে আসলে মূল্য দেওয়া উচিত। এই বিষয়টা হুমায়ূন আহমেদের ক্ষেত্রে আমার মনে হতো।

 

এ বিষয়ে আনন্দের বা বেদনার কোনো অভিজ্ঞতা আপনার হয়েছে?

তা তো হয়েছে। এগুলো না আসলে বলা উচিত না। আমাদের বাসায় বেশ কিছু মেয়ে ভক্ত বা তরুণী ভক্ত এসেছে। তারা যেকোনোভাবে থেকে যেতে চায়। তারা আজীবন বুয়া হিসেবে থেকে গিয়ে রান্না করে তাঁকে খাওয়াতে চায়। একজন ছিল এমন—তার একটাই চাওয়া, হুমায়ূন আহমেদ যখন লিখবেন সে তখন তাঁকে চা বানিয়ে খাওয়াবে। তার আর কিছু চাওয়া নেই। আরেকজন ছিল, সে বাসায় এসে বসে থাকত। প্রথমে দারোয়ানের রুমে বসে থাকত। পরে তাকে বাসায় আসার অনুমতি দেওয়া হতো। সে বলত, ড্রইংরুমে বসে থাকবে। আর কিছু চাওয়ার নেই তার। একজন এমন মেয়ে ছিল, সে চাইত যে হুমায়ূন আহমেদকে সে এক দিনের জন্য বিয়ে করবে। সে তাঁর সঙ্গে এক দিনের একটা সংসার চায়। এ রকম ইন্টারেস্টিং সব ঘটনা আছে। এই যে ভক্তরা হুমায়ূন আহমেদের প্রতি অনুরক্ত বা প্রেম দেখিয়েছে, এ ক্ষেত্রে আমার কখনো কোনো ঈর্ষা কাজ করেনি। কখনোই হয়নি। প্রচণ্ড একটা মমত্ববোধ কাজ করেছে।

 

আপনাদের তো প্রেমের বিয়ে ছিল? প্রথম দিকে প্রেমটা ছিল একতরফা হুমায়ূন আহমেদের দিক থেকেই?

আমি আসলে প্রথমে বুঝতেই পারিনি এটাকে প্রেম বলে কি না। আমার কোনো ধারণা ছিল না। আমার মনে হয়েছিল যে এটা একটা রসিকতা। কিন্তু পরে, খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বুঝে ফেলেছি যে এটা আসলে রসিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না।

 

তাঁর নাটকে অভিনয়ের সূত্রে যোগাযোগটা তৈরি হয়, কিন্তু অভিনয় না থাকলেও তিনি আপনাকে ডেকে পাঠাতেন?

রাইট। প্রেমে পড়লে এই আকুলতা তো সবার মধ্যেই থাকে বা তৈরি হয়। এখন দেখেন, দুজন মানুষের মধ্যে যখন আগ্রহ বা ভালোবাসার জায়গাটা তৈরি হয়, তখন কিন্তু তাকে দেখতে ইচ্ছা করে। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী মানুষ কী করে? ঘুরতে যায়, লং ড্রাইভে যায়, রেস্টুরেন্টে খেতে বসে বা পার্কে দেখা করে; তাই না? কিন্তু সেটা আসলে হুমায়ূন আহমেদের মতো এমন একজন মানুষের ক্ষেত্রে সম্ভব ছিল না।

 

এমনও তো হয়েছে, আপনার প্রতি তাঁর যে অনুরাগ ও অস্থিরতা, সেগুলো প্রকাশ পেয়েছে অন্যভাবে। দু-একটা যদি বলেন...

হুম। এটা সত্য। আর তাঁর পক্ষে তো ওটাই সবচেয়ে সহজ ছিল যে নাটকের শুটিংয়ের জন্য ডেকে পাঠানো। যখন আমার সিকোয়েন্স থাকত তখন তো এমনিতেই যেতে হতো। কিন্তু যখন সিকোয়েন্স থাকত না, তখনো তিনি ডেকে পাঠাতেন। কিন্তু যখন দেখতেন যে সিকোয়েন্স ছাড়া ডেকে পাঠানোটা দৃষ্টিকটু হয়ে যাচ্ছে, অনেকের কাছে খারাপ লাগছে, তখন তিনি কী করতেন—বলতেন যে না না, একটা নতুন দৃশ্য আছে। একটু দাঁড়াও, আমি লিখে দিচ্ছি। তিনি প্রচুর সিকোয়েন্স এমন বানিয়েছেন। এমন অনেক সিকোয়েন্স তিনি শুট করেছেন, যেটা আসলে নাটকে দেখানোই হয়নি। আমাকে ডাকার অজুহাতটা আড়াল করার জন্য তিনি এসব করতেন আর কি।

 

আপনার প্রতি তাঁর মুগ্ধতা নানাভাবেই তো প্রকাশ পেয়েছে। এ ক্ষেত্রে গানের বিষয়টা বারবার এবং বড় করে এসেছে। প্রথম দিকে ব্যক্তি শাওন, নাকি শিল্পী শাওনকে তিনি বেশি পছন্দ করতেন?

আমার মনে হয়, প্রথম দিকে তিনি...দেখুন, আপনারা যখন ইন্টারভিউ নেন, তখন ভাবি বা আমি আগেও ভাবতাম এসব নিয়ে। এমনকি বিয়ের পর, তাঁকে প্রশ্নও করেছি, তারপর গত ছয় বছরেও অনেক ভেবেছি। কিন্তু হুমায়ূন আহমেদ একেক সময় একক রকম উত্তর দিতেন। কখনো বলতেন যে গান। কখনো বলতেন, ব্যক্তি শাওন। আমি পড়াশোনায় প্রচণ্ড স্টুডিয়াস ছিলাম। মনোযোগী। সবাই যখন শুটিংয়ের ফাঁকে আড্ডা দিত, আমি পড়ায় মন দিতাম। আমার শট শেষ—আমি টেবিল-চেয়ারে বসে অঙ্ক করা বা অন্য কোনো পড়া পড়ছি। আমার সামনে এসএসসি পরীক্ষা। পরীক্ষায় ভালো করতে হবে, তা নিয়ে একটা তাগিদ ছিল। আমার পড়ার এই ব্যাপারটা দেখে হুমায়ূন আহমেদ বলতেন, এই বয়সে তোমার মা তোমাকে জোর করে পড়াবে, এই দৃশ্য দেখে আমি অভ্যস্ত। কিন্তু তুমি অন্য রকম। সবাই আড্ডা দিচ্ছে, মজা করছে, ফান করছে। সেসব বাদ দিয়ে তুমি পড়াশোনা করছ। তিনি বলতেন, এই ব্যাপারটা আমাকে খুব মুগ্ধ করত। প্রসঙ্গে ফিরে আসছি, তিনি একেক সময় একেক রকম বলতেন। আমার যেটা মনে হয়, এখন যেটা মনে হচ্ছে; তিনি আসলে একাকিত্বে ভুগতেন। অনেকের মাঝে থেকেও মানুষ একা হতে পারে বা একাকিত্বে ভুগতে পারে। আবার একা থেকেও অনেক মানুষের উপস্থিতি টের পেতে পারে। শুটিং স্পটে তিনি যখন খেতে বসতেন বা লিখতে বসতেন বা তিনি একা একা কিছু ভাবতেন, আমার মনে হতো, তিনি খুব একাকী ফিল করছেন। কখনো এমনও হয়েছে, তিনি খাচ্ছেন, আমাকে ডেকে পাঠিয়েছেন।

 

ডেকে তিনি আপনাকে কী বলতেন?

কাছে আসার পরে বলেছেন, তুমি একটু বেড়ে খাওয়াও। কিংবা বললেন যে তুমি পাশে বসে থাকো। তখন, সত্যি বলতে আমার খুব খারাপ লাগত। আমার প্রচণ্ড মমত্ববোধ তৈরি হয়েছিল। মনে হয়েছিল, এই মানুষটা, যাঁকে আমরা দূর থেকে এত বড় যে জায়গায় দেখি, একটা পাহাড়ের চূড়ায় চলে গিয়েও মানুষ কিন্তু একা হয়ে যায়। আবার পাশে থেকেও, সঙ্গে থেকেও পাশে না থাকা, জীবনের সুরগুলো না মেলা—এসব কিন্তু মানুষের জীবনে ঘটে। তিনি আমার সঙ্গ বা আমার সঙ্গে গল্প করে খুব আনন্দ পেতেন। গল্প সবার সঙ্গে করে কিন্তু মজা পাওয়া যায় না। তাঁর একা লাগলে আর কাউকে ডাকতেন না। আমাকে পাশে ডাকতেন। এখন আমার মনে হয়, আমি হয়তো তাঁর গল্পটা মনোযোগ দিয়ে শুনতাম এবং লজিক্যালি তাঁকে কিছু কথা বলতাম। কথা কিন্তু একজন বলল আর একজন শুনল, এভাবে হয় না। তিনি যখন কোনো কথা বলতেন, আমি শুনেই চুপ থাকতাম না। আমিও কথা বলতাম এবং রিঅ্যাকশন দেখাতাম। তিনি হয়তো একটা বিষয়ে হতাশ হয়েছেন। আমি বলতাম, আপনি কি এভাবে চেষ্টা করেছেন? বিষয়টা নিয়ে এভাবে না ভেবে ওভাবে চিন্তা করে দেখেছেন? এই বিষয়টা তিনি পছন্দ করতেন। তিনি বলতেন, কুসুম, তোমার সঙ্গে কথা বলে গল্প করে আরাম পাওয়া যায়।

 

আপনার সঙ্গে গল্প করে তিনি আরাম পেতেন?

তিনি অদ্ভুত কিছু শব্দ ব্যবহার করতেন। আমরা যেমন কোনো ছবি দেখে বলি, মজা পেলাম। তিনি তেমন বলতেন আরাম পাই। গল্প করে আরাম পেয়েছি। আমার ধারণা, কনভারসেশনের কিছু আরাম আছে। সেই আরামটা সবার সঙ্গে পাওয়া যায় না। আমার এখন মনে হয় যে এসব কারণেই তিনি আমাকে ডেকে পাঠাতেন। একটা সংসারে দীর্ঘদিন থাকার ফলে কিছু জিনিস হারিয়ে যায়। আমরা দেখি যে কেউ হয়তো গান শুনে প্রেমে পড়ে। পরে আর গান গাইতে দেয় না। নাচ দেখে প্রেমে পড়ে। কিন্তু বিয়ের পরে আর নাচ করতে দেয় না। একটা ফটোশুটের ছবি দেখে প্রেমে পড়ে, পরে আর মডেলিং করতে দেয় না। এভাবে অনেক কিছু বদলে যায়। হুমায়ূন আহমেদের আমার সঙ্গে যেটা চেঞ্জ হয়নি কোনো দিন, সেটা হচ্ছে আমার গান। আর আমার গল্প বলা এবং এমন কোনো দিন যায়নি, তিনি বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিয়েছেন আর একটু পর পর বলেননি যে ‘এই কুসুম, তুমি বলো’ কথাটা বলেননি। তুমি খুব সুন্দর করে বলতে পারো। তাঁর ধারণা ছিল যে আমি অনেক সুন্দর করে গল্প বলতে পারি। আমার প্রতি তাঁর এই মুগ্ধতা জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ছিল। আমার গানের প্রতি মুগ্ধতা এবং কথা বলার প্রতি মুগ্ধতা।

আপনাকে তিনি ‘টেপ রেকর্ডার’ বলে সম্বোধন করতেন। প্রথম কবে তিনি এটা ব্যবহার করেন?

১৯৯৫ সালে তিনি এই শব্দ প্রথম ব্যবহার করেন। যখন ‘নক্ষত্রের রাত’ নাটকের শুটিং চলছিল এবং তখনো আমার সঙ্গে তাঁর কোনো প্রণয় হয়নি, তখন ব্যাপারটা ছিল এমন যে একবার শুনেই আমি গাইতে পারতাম যেকোনো গান। গান গাইতে পারার এ বিষয়টা তিনি খুবই পছন্দ করেছিলেন। তিনি শুধু গান পছন্দ করতেন, তা নয়। তিনি অভিনয় করে বলতেন, এই টেপ রেকর্ডার, বসো; এখন আমরা ওই গানটা শুনব বলেই তিনি দুষ্টুমি করে ক্যাসেটে টিপ দিয়ে গান প্লে করার ভঙ্গি করতেন। আবার থামতে হলে তিনি বলতেন, পজ। এভাবে বলতেন। আমি এখনো যেকোনো গান একবার শুনলেই গাইতে পারি। কোনো একটি গান শুনলেই মাথার ভেতরে বসে যায়।

 

আপনি কখন অনুভব করলেন যে আপনিও তাঁর প্রেমে পড়েছেন?

আমি? আমার ভেতরে ভালোলাগাটা কাজ করত। তিনি আমাকে চিঠি লিখতেন। সেই চিঠি পড়ে নিজেকে খুব গুরুত্বপূর্ণ মানুষ মনে হতো। যদিও প্রথমে আমি বিষয়টা ফান ভেবেছিলাম, এত বড় একজন মানুষ সত্যিই আমাকে পছন্দ করেন? পছন্দ করার ইঙ্গিত কিন্তু তিনি দেননি। তিনি সরাসরি ভালোবাসার ইঙ্গিতটাই দিয়েছেন। ‘আমার তোমাকে খুব ভালো লাগে’ টাইপের ইঙ্গিত না, ভালোবাসার ইঙ্গিতটাই দিয়েছেন। কিছুদিন বিষয়টা নিয়ে ভাবলাম। মনে হলো, তিনি ফান করছেন। কিন্তু আমি নিজেই ফিল করলাম, তিনি ফান করছেন না। তখন আমার ভেতরে একটা অহংকার ও মুগ্ধতার ব্যাপার তৈরি হলো। তাঁর অনেক কিছুই আমার ভালো লাগতে শুরু করল। কিন্তু কখন যে কী হয়ে গেল। কখন আমিও তাঁর প্রেমে পড়েছি, এটা আসলে আমি ঠিক বলতে পারব না।

 

এর কত দিন পর টের পেলেন, তাঁকেও আপনি চান এবং বিয়ে করবেন?

বিয়ের বিষয়টা মাথায় আসেনি। কিংবা আমিও আলাদা করে এটা নিয়ে ভাবিওনি। টুকরো টুকরো অনেক কিছুই হচ্ছিল, কথা ও ভাবনা শেয়ার করা চলছিল। কিন্তু বিয়ে নিয়ে সরাসরি কোনো আলাপ হয়নি। একবার কি হলো—হুমায়ূন আহমেদ তাঁর একটা ইচ্ছার কথা প্রকাশ করলেন যে তিনি শেষ জীবন সেন্ট মার্টিনসে কাটাতে চান। তিনি আমাকে পাশে চান। আমি তখন তাঁর পাশে থাকব কি না। তিনি চিঠিতে এসব কথা আমাকে জানালেন। তিনি তাঁর ক্রিয়েটিভিটি নিয়ে তখন খুব লোনলি ফিল করছেন।

 

তিনি লোনলি ফিল করছেন বলেই সেন্ট মার্টিনসে আপনাকে পাশে চাইলেন?

একটা ব্যাপার কী জানেন, সাধারণ মানুষ যখন প্রেমে পড়ে এবং একটা পর্যায়ে আসে তখন বলে দেয় যে আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই। হুমায়ূন আহমেদের মতো মানুষরা এভাবে বলেন না। এটা বুঝে নিতে হয়। তাঁদের বলার ভঙ্গিটাই এ রকম। এখন এটা বিয়ের জন্য বলা নাকি অন্য কিছু, সেটা বুঝে নিতে হয়।

 

আমরা জানি, লেখক ও বাবা হিসেবে তিনি অসাধারণ। কিন্তু প্রেমিক হিসেবে তিনি কেমন ছিলেন?

অসাধারণ। আমার মনে হয়, লেখক হিসেবে তিনি যেমন অসাধারণ তার চেয়ে অন্যান্য বিষয়ে তিনি আরো বেশি অসাধারণ। বাবা হিসেবে তিনি অসাধারণ। তিনি প্রেমিক হিসেবে লেখকের চেয়ে বেশি অসাধারণ। তিনি একজন ঘরোয়া মানুষ এবং কিড। স্বামী হিসেবেও তিনি অসাধারণ। তিনি বন্ধু হিসেবেও অনেক ভালো।

 

আপনার সঙ্গে যখন তাঁর বিয়ে হয়, তখনো তো আপনি স্টুডেন্ট। আপনার পড়ালেখা ও সৃজনশীল কাজে তাঁর প্রেরণা ও সহযোগিতা কতটুকু ও কিভাবে পেয়েছেন?

আমার যখন বিয়ে হয় তখন আমি ইউনিভার্সিটিতে পড়ি। আমি পড়ছিলাম ফোর্থ ইয়ারে, আর্কিটেকচারে। খুব কঠিন একটা বিষয়। তখন একটা ব্যাপার ঘটল। বিয়ের কয়েক দিন আগে থেকে কাউকে কিছু না বলে ক্লাসে যাওয়া বন্ধ করে দিই। এই যে ক্লাসে যাওয়া বন্ধ করে দিই, বিয়ের আড়াই বছর পর পর্যন্ত আমি আর ক্লাসে যাইনি। হয়তো এমনও হতে পারত যে আমার পড়াশোনা ওখানে আটকে যাবে। কিন্তু আমার বিয়ের পর পর হুমায়ূন আহমেদ যে কথাটা বারবার করে বলতে থাকতেন, একটা বছরের জন্য পড়ালেখাটা কেন শেষ করলাম না। শেষ করো। পড়ালেখাটা শেষ করো। তিনি নানাভাবে ইনস্পায়ার করতেন। শেষ দিকে তিনি যেটা করেছেন, আমার ছেলের বয়স যখন আড়াই বছর, তিনি একদিন আমাকে খোঁচা মেরে কতগুলো কথা বললেন, এটা মনে হয় আমার ভেতরের জেদটাকে জাগিয়ে দেওয়ার জন্য। তিনি বললেন, দেখো, ছেলেটা তো বড় হচ্ছে। ও যখন বড় হয়ে জিজ্ঞেস করবে, কী জানবে? বাবার সম্পর্কে সে জানবে, হুমায়ূন আহমেদ পিএইচডি করে ডক্টর হয়েছে। আর মায়ের সম্পর্কে সে কী জানবে? মা ইউনিভার্সিটির ড্রপ আউট? এইচএসসি পাস, নাকি ম্যাট্রিক পাস মাত্র? আমি এটা হতে দেব না। আমাদের ছেলে হীনম্মন্যতায় ভুগবে এটা শুনলে। এটা তো হতে দেওয়া যায় না। তুমি আজই ইউনিভার্সিটিতে যাবে, রেজিস্ট্রেশন করবে এবং অতি দ্রুত তোমার পড়ালেখা শেষ করবে।

 

আপনি তখন কী করলেন?

আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। মানে বাচ্চাটাকে খাওয়াতে হতো। খুবই ছোট বাচ্চা। আমাকেই সব দেখতে হয়। আমি ভেবেই পেলাম না, আমি বাইরে গেলে কে বাচ্চাটা দেখবে? কে টেক কেয়ার করবে? আমার মায়ের কাছে বাচ্চা থাকবে বা তাঁর মায়ের কাছে—এটা আমি কখনো চাইনি। আমার মা অবশ্য বারবার বলেছিল তার কাছে রাখতে। কিন্তু আমি সেটা একদমই মানতে পারি না। কারণ প্রতিটা মুহূর্তে এমনকি ঘুমানোর সময়ও তো আমি বাচ্চাকে পাশে নিয়ে ঘুমাব। আর অন্য সময়গুলোতেও বাচ্চাকে চোখের আড়াল হতে দিতে চাই না। তখন হুমায়ূন আহমেদ বললেন, তোমার চিন্তা করতে হবে না। বাচ্চা আমি দেখব। কাউকে হেল্প করার জন্য আনার কথা হয়েছে, তিনি সাপোর্ট করেননি এবং সত্যি সত্যি বাচ্চাকে খাওয়ানো, ঘুম পাড়ানো থেকে শুরু করে সব ধরনের কাজ তিনি একাই করেছেন। প্রকৃতপক্ষে আমাকে পড়তে দিয়ে মায়ের দায়িত্বটুকু তিনি পালন করেছেন। এক হাতে সব কিছু সামলেছেন। তিনি যদি এত বড় দায়িত্ব পালন না করতেন, আমি পারতাম না। এখন আমি ভাবি কী জানেন, উৎসাহ দেওয়ার জন্য পড়াতে না, সামনে বসে থেকে বলতে হয় না, পড়ো। বাচ্চাকে তো দেখেছেনই, প্রজেক্ট চলাকালীন আমার জুনিয়র স্টুডেন্টরা কে কী খাবে, কী বাজার হবে, কী রান্না হবে সব কিছু তিনি দেখেছেন, তদারকি করেছেন। সংসারের পুরো দায়িত্ব তিনি একাই পালন করেছেন বলেই আমার পক্ষে পড়ালেখাটা শেষ করা সম্ভব হয়েছে। আমি আর্কিটেক্ট হিসেবে সার্টিফিকেট অর্জন করেছি।

 

সকালে ঘুম ভাঙার পর আপনি দেখতেন যে হুমায়ূন আহমেদ লিখছেন, আপনার কাছে দৃশ্যটি পবিত্র দৃশ্য বলে মনে হতো। আপনার এই অনুভূতি নিয়ে একটু বলুন।

আমি আসলে ভোরে উঠতে পারি না। এমনিতে লেট নাইটে ঘুমাই, ফলে সকালে উঠতে দেরি হয়ে যেত। হুমায়ূন আহমেদ কী করতেন, তিনি রাত ৩টা বা ৪টায় ঘুমালেও সাড়ে ৭টা বা ৮টায় উঠে পড়তেন। উঠে কী করতেন, চা বানিয়ে চা খেয়ে তিনি বারান্দায় লিখতে বসে যেতেন। আমি হয়তো আরো আধাঘণ্টা বা এক ঘণ্টা পরে উঠতাম। উঠে নাশতা বানিয়ে তাঁর সামনে দিতাম। ঘুম ভাঙার পরে প্রথম যে দৃশ্যটা দেখতাম, তিনি লিখছেন। দৃশ্যটা দেখে আমার এত ভালো লাগত, মনে হতো যে একটা পবিত্রতম দৃশ্য দেখছি। এটা দেখে দেখে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু কোনো দিন যখন দেখতাম যে তিনি লিখতে বসেননি, আমি ঘুমের ভান করে পড়ে থাকতাম, যেন তিনি লেখা শুরু করেন এবং তাঁকে লিখতে দেখার দৃশ্যটা দেখে আমার ঘুমটা ভাঙে। ফলে আরো কিছু সময় মটকা মেরে পড়ে থাকতাম, জোর করে। আমি চোখটা খুলে ওই দৃশ্যটাই দেখতে চাই। বেডরুমের পাশেই তাঁর লেখার একটা ছোট জলচকি থাকত। মেঝেতে বসে লিখতেন। আর হাতে সিগারেট ও চা। পর পর তিন কাপ চা খেতেন। সিগারেট শেষ করে তিনি সেই কাপে সিগারেটটা ডুবিয়ে দিতেন। তাঁর এই সৃষ্টির সৌন্দর্যটা আমার অসম্ভব সুন্দর লাগত। তিনি তখন একা একা কথা বলতেন। কথা বলা মানে জোরে জোরে কথা বলা নয়, তিনি হয়তো গল্পের ডায়ালগটা বিড়বিড় করে বলছেন। আনন্দের কোনো একটা দৃশ্য লেখার সময় একা একাই তিনি হেসে ফেলছেন। আবার দুঃখের কোনো কিছু লেখার সময় কেঁদে ফেলছেন। তাঁর চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। আমার কাছে এই দৃশ্যটা, মানে ক্রিয়েশনের যে বিউটিটা অসম্ভব সুন্দর লাগত। ঐশ্বরিক কোনো দৃশ্য মনে হতো।

 

তিনি সাধারণত কখন লিখতেন?

সকালবেলা। ৩৬৫ দিনই তিনি সকালবেলা লিখতেন। শুধু বইমেলায় চাপের সময় বা ঈদ সংখ্যার লেখার চাপের জন্য তিনি সন্ধ্যায়ও লিখতেন। কিন্তু সন্ধ্যার সময় তিনি লিখতে পছন্দ করতেন না। কারণ তিনি বলতেন, সন্ধ্যায় লিখলে তাঁর মধ্যে একটা অস্থিরতা কাজ করে। ভোরবেলাটা তাঁর লেখার প্রিয় সময় ছিল।

 

তাঁর লেখার পদ্ধতি ও কৌশল সম্পর্কে কিছু বলুন।

কোনো পদ্ধতি নেই। কাগজ ও কলম। তিনি সাদা কাগজ এবং তিন টাকা দামের বলপয়েন্ট কলমে লিখতেন। লেখার জন্য তাঁর ইনভেস্টমেন্ট কম। কম্পিউটারে লিখতেন না। লেখার জন্য তাঁর আয়োজন ছিল খুবই সামান্য। পরে দুপুরবেলা প্রকাশকের কোনো লোক এসে যা কিছু লিখতেন, সেসব নিয়ে যেতেন। সেই লেখা কম্পোজ হওয়ার পরে সন্ধ্যায় তাঁকে দিয়ে যেত। তিনি সেটা পড়তেন। পুনর্লিখন করতেন। কখনো আলাদা কাগজে লিখে সেটা কাঁচি দিয়ে কেটে জোড়া লাগিয়ে দিতেন মূল লেখার সঙ্গে।

 

শুনেছি, লেখার সময় আশপাশে বাচ্চা কাঁদছে, মানুষের তুমুল হৈ-হল্লা হচ্ছে—এসব তাঁর কানে একদমই যায় না। লেখায় মগ্নতার কারণে এমন হতো? আপনার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে যদি একটু বলেন...

এসব একদমই তিনি গ্রাহ্য করতেন না। টিভিতে হিন্দি গান বাজছে কি না, বাচ্চা কাঁদছে বা পাশের বাসায় ঝগড়া হচ্ছে, অন্য বিল্ডিংয়ে কেউ কাউকে মেরে ফেলছে কি না...কোনো কিছুই তাঁর কানে ঢুকত না। একবার আমরা এটা টেস্ট করে দেখেছি।

 

হুমায়ূন আহমেদের যেকোনো লেখাই পাঠক আগ্রহভরে গ্রহণ করেছে, কিন্তু নিজের লেখালেখি নিয়ে তাঁর বিবেচনা কেমন ছিল?

তিনি নিজের লেখার সবচেয়ে বড় ভক্ত ছিলেন। তাঁর সবচেয়ে খারাপ লেখাটা, ভক্তরা যেভাবে বলে, তিনি সেভাবে বলতেন না; তিনি বলতেন, বাহ্ ভালোই তো। এটা ছিল হুমায়ূন আহমেদের একটি দিক। কিন্তু সাধারণত তিনি হেলাফেলা করে লিখতেন না। যদিও বইমেলার সময় বা ঈদ সংখ্যার জন্য অনেক সময় তিনি হেলাফেলা করে লিখতে বাধ্য হতেন। এখন ভাবি, তিনি চাইলেই হয়তো চাপটা এড়িয়ে যেতে পারতেন। তিনি সরাসরি মানুষকে না বলতে পারতেন না। অনেকে এসে বলতেন, স্যার, আপনি বই না দিলে তো এবার বইমেলায় স্টলই করব না বা খেতেই পাব না; ঈদের আগে নাটকের জন্য যে চাপ, ঈদ সংখ্যার জন্য সম্পাদকের যে চাপ...এ ধরনের চাপ। তিনি হয়তো এসব চাপ এড়াতে পারতেন। আবার মানুষকে তিনি কষ্ট দিতে পছন্দ করতেন না। ফলে চাপগুলো এড়াতে চাননি। কিন্তু পরে আবার বলতেন, ধুর, এই লেখাটা না লিখলেও পারতাম। আমার ব্যক্তিগত ধারণা, তিনি ইচ্ছা করলেই এসব চাপ এড়িয়ে আরো কিছু ভালো লেখা লিখতে পারতেন।

 

বইমেলায় তাঁর বইয়ের বিক্রি নিয়ে তিনি নাকি খুব উত্তেজিত থাকতেন?

এটা সত্যি। তিনি খোঁজখবর নিতেন এবং ব্যাপারটা খুব এনজয় করতেন। একবার হলো কী, নতুন বই প্রকাশের পর প্রথম পাঁচ দিনে অনেক বই বিক্রি হয়েছে। তখন তিনি অন্যপ্রকাশের মাজহারকে ডেকে বললেন, আচ্ছা মাজহার, তুমি হিসাব করে বের করো তো, আমার বইয়ের প্রতিটা শব্দের মূল্য কত? একবার সত্যি হিসাব করে বের করা হয়েছিল তাঁর বইয়ের প্রতিটা শব্দের মূল্য কত হয়। কত টাকা বেরিয়েছিল—চার শ কত টাকা যেন। এখন আমার সঠিক মনে নেই। তিনি বললেন, আরে, আমি যে ‘কেন’ লিখি বা ‘কী’ লিখি এটারও একটা মূল্য আছে। এটা তিনি দুষ্টুমি করে বলতেন। কিন্তু খুব উত্ফুল্ল থাকতেন বিষয়টা নিয়ে। কখনো তাঁকে টায়ার্ড হতে দেখিনি ভক্তদের প্রশ্নের উত্তর দিতে।

নিজের কোন লেখাগুলোকে তিনি তাঁর প্রিয় বা পছন্দের লেখা বলতেন?

‘মধ্যাহ্ন’ তাঁর প্রিয় লেখা ছিল। আর নিজের লেখা বেশির ভাগই তিনি পছন্দ করতেন। কোনো কোনো লেখা পড়ে তিনি বলতেন যে তাঁর আরাম লাগছে। আবার বলতেন যে এই লেখাটা কম ভালো। তবে তিনি নিজের লেখার ভক্ত ছিলেন। কিন্তু এটাও বলতেন, সময় নিয়ে লিখলে অমুক লেখাটা আরেকটু ভালো লিখতে পারতাম।

 

তিনি নাকি ফুলহাতা নতুন শার্ট পরে ঘুমাতে যেতেন...এ বিষয়ে জানতে চাই।

এর পেছনের রহস্যটা হচ্ছে, তিনি বলতেন, সবাই তৈরি হয় অন্যের জন্য। কিন্তু আমি সেজেগুজে তৈরি হই আমার নিজের জন্য, আমার কাছের মানুষদের জন্য। নতুন শার্টটা আমি আমার নিজের জন্য পরি। বাইরে যাওয়ার সময় সবচেয়ে কোঁচকানো শাটর্টা, হয়তো বোতাম ছেঁড়া বা উল্টাপাল্টা রং লাগানো শার্ট পরেও যেতেন। তাঁর বহু প্যান্ট আমাকে ফেলে দিতে হয়েছে। কারণ নতুন প্যান্ট পরে তিনি ছবি আঁকতে বসেছেন, জায়গায় জায়গায় রঙের দাগ লেগেছে। কী করব, দেখা গেল ওই প্যান্ট পরে বাচ্চাকে স্কুল থেকে আনতে চলে গেছেন, কোনো অনুষ্ঠানে কিংবা কোনো স্টেজে চলে গেছেন বক্তৃতা দিতে। ফলে ফেলে না দিয়ে উপায় ছিল না।

 

ব্যক্তিগতভাবে তিনি কী ধরনের জীবন যাপন করতেন?

ব্যক্তিগতভাবে তিনি খুব সাধারণ জীবন যাপন করতেন। কিন্তু তাঁর ঝোক ছিল, তিনি কষ্ট করে যে টাকা অর্জন করেছেন বা ফিন্যানশিয়াল সাপোর্টটা পেয়েছেন তা দিয়ে তিনি জমিজমা কিনবেন বা ব্যাংকে জমিয়ে রাখবেন, এই আগ্রহ তাঁর একদমই ছিল না। তিনি বলতেন, কি, ব্যাংকে দুই লাখ টাকা আছে? চলো তাহলে কোথাও বেড়াতে যাই। ব্যাংকে কিছু টাকা জমলেই তাঁর অস্থির লাগতে শুরু করত। তখন তিনি পুরো টাকাটা খরচ করার একটা পাঁয়তারা করতেন। হয়তো নুহাশপল্লীতে একটা মূর্তি বানালেন। মূর্তি বানাতে খরচ করলেন দেড় লাখ টাকা, ভাঙতে খরচ করলেন দুই লাখ টাকা।

 

মূর্তি বানানোর পরে ভেঙেও ফেলতেন?

হ্যাঁ, পছন্দ না হলে তিনি একদম ভেঙে ফেলতেন। হয়তো একটা গোল ঘর বানালেন। কয়েক দিন সেখানে হৈ-হল্লা করলেন। হঠাৎ একদিন বললেন, কেমন যেন লাগছে। বিখাউজ। বিশ্রী। দামড়া সাইজ হইছে। এই আসো, ভাঙো, এটা ভেঙে ফেলো। জীবনযাপনে তিনি সাধারণ আবার কখনো রাজার মতো ছিলেন।

 

ধর্মের রীতিনীতি পালন করতেন?

ধর্মের রীতিনীতি নিয়মিত পালন করতে পারতেন না, কিন্তু তিনি একটা জিনিস নিয়মিত পালন করতেন। সব সময় মাগরিবের নামাজটা তিনি নিয়মিত পড়তেন। মাগরিবের ওয়াক্তটা তাঁর পছন্দের একটা সময় ছিল। আমি জানি না কেন, তিনি বলতেন, আসর থেকে মাগরিবের সময়টা তাঁর খুব ভালো লাগত। ফলে সেই সময়টায় অন্যরা হয়তো হাসি-আড্ডায় পার করছে, কিন্তু তিনি নামাজটা পড়তেন এবং মনে কোনো প্রশ্ন এলে অনুসন্ধান করার চেষ্টা করতেন। তবে নিউ ইয়র্কে চিকিৎসা চলাকালীন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েছেন।

 

তুমুল আড্ডাবাজ ও জনপ্রিয় এই মানুষটি প্রকৃতপক্ষে বড় নিঃসঙ্গ ছিলেন, আপনি কি ধরতে পেরেছিলেন?

আমার কাছে মনে হয়, তিনি একটা সময় পর্যন্ত নিঃসঙ্গ ছিলেন। পরবর্তী সময়ে আর ছিলেন না। তিনি তাঁর জীবনের শেষ কয়েকটা বছর বা বেশ কয়েকটা বছর রাজার মতো যাপন করেছেন এবং সন্তুষ্টি নিয়ে পৃথিবী ত্যাগ করেছেন। এটা আমি নিশ্চিত হয়ে বলতে পারছি।

 

নিঃসঙ্গতার বিষয় নিয়ে তিনি আপনাকে কিছু বলতেন?

হ্যাঁ, বলেছেন। আমার সঙ্গে বলেছেন, বন্ধুদের কাছে বলেছেন। জীবনের শেষ দিকে যখন তিনি চিকিৎসার জন্য আমেরিকায় ছিলেন তখন তাঁর অনেক পুরনো স্কুলের বন্ধুরা আসতেন; ঢাকার নিয়মিত বন্ধু নন, অনেক পুরনো বন্ধু যাঁরা আমেরিকায় থাকতেন, তাঁদের কাছে তিনি তাঁর জীবনের না পাওয়ার বেদনার কথা বলতেন। বলতেন যে এই কাজগুলো করলে হয়তো তাঁর জীবনে ভালো হতো, যে কাজগুলো করলে তিনি কমপ্লিট ফিলিং নিয়ে মারা যেতে পারবেন।

 

তিনি কোন কাজের কথা বলতেন?

তিনি পাঁচটি ইচ্ছা বা কাজের কথা বলতেন, যে কাজগুলো করলে তিনি আরো কিছুদিন বাঁচতে পারতেন বলে মনে করতেন। তিনি বলতেন, এই পাঁচটি কাজ করতে পারলে, পাঁচটি কাজ আমি করেছি, কিন্তু করেছি দেরি করে, আর একটু আগে করতে পারলে আরো ভালো হতো। যদি আরো আগে করতে পারতাম, তাহলে আমার বাচ্চাদের বড় হওয়াটা আমি দেখে যেতে পারতাম। আমি আরো কিছুদিন বেশি বাঁচতে পারতাম। যেমন তিনি একা একা বসবাস শুরু করেন ১৯৯৯ সালে, যখন পুরোপুরি তাঁকে গৃহত্যাগী হতে হয়। মানে বাসা ত্যাগ করতে যখন তিনি বাধ্য হন। ১৯৯৯ সালে তিনি দখিন হাওয়ায় একা থাকা শুরু করেন। আমার সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয় ২০০৪ সালে। তিনি মৃত্যুর প্রায় ৮-১০ মাস আগে বলতেন, আমি খুব ভুল করেছি। ভুলটা কী? আমি যখন বাসা থেকে বেরিয়েই গেলাম, সেই সময়টায় সিদ্ধান্তটা নিয়ে নিতে পারলে ভালো হতো। বাচ্চারা আরো কিছুটা বড় হতো। আমি আরো পাঁচ বছর বেশি বাঁচতে পারতাম। বাচ্চাগুলোকে বড় হতে দেখে বাঁচতে পারতাম। এই ধরনের কিছু ইচ্ছার কথা, না পাওয়া বেদনার কথা তিনি বলতেন। কাজগুলো করেছি, কিন্তু আরেকটু আগে করলে মনে হয় ভালো হতো। আমি রিটায়ার করেছি, ইউনিভার্সিটির চাকরিটা আরো আগে ছেড়ে দিলে হয়তো আরো কিছু ভালো বই লিখতে পারতাম। ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে টিচিং প্রফেশনের জন্য আমার অনেক সময় চলে গেছে; যদি আরেকটু আগে—তিনটা বছর বা পাঁচটা বছর আগে চাকরিটা ছেড়ে দিতাম, তাহলে আরো কিছু ভালো বই লিখে যেতে পারতাম। এই ধরনের কিছু আক্ষেপের কথা তিনি বলতেন।

 

কিন্তু তিনি ফুল প্রফেসর হয়ে চাকরি ছাড়বেন, এটাও তাঁর পরিকল্পনায় ছিল...

হ্যাঁ, এ ধরনের ইচ্ছাও ছিল। ইচ্ছাটা যখন ছিল, তখন তিনি এ কথা বলেননি। কিন্তু জীবনের শেষ মুহূর্তে এসে তিনি এ কথাগুলো বলতেন।

 

তিনি পাঁচটি ইচ্ছার কথা বলতেন, আপনি তো সব বললেন না।

আমি তাঁর দুটো ইচ্ছার কথা বললাম, বাকিগুলো বলব না। হা হা হা...

 

বাজারে দেশি-বিদেশি নতুন সিনেমা এলে নিজে পছন্দ করে কিনে আনতেন। কিন্তু তিনি কাঁচাবাজারে যেতেন কি? মাছ, মাংস, তরকারি ইত্যাদি কিনতেন?

অবশ্যই যেতেন। বাজারে যাওয়াটা তাঁর পছন্দের বিষয় ছিল। তখন ডিভিডি গ্যালাক্সি বলে একটা দোকান ছিল রাইফেল স্কয়ারে। দোকানের লোকজন হুমায়ূন আহমেদকে লিফট থেকে নামতে দেখলেই বড় করে মুচকি হাসি দিত। কারণ আজ অনেক ডিভিডি তাঁকে গছিয়ে দিতে পারবে। কারণ একসঙ্গে তিনি ৭০-৮০টা করে ডিভিডি কিনে ফেলতেন।

 

এক দিনেই এত ডিভিডি কিনতেন?

এক দিনেই এবং একসঙ্গে। আমার বাসায় ডিভিডি রাখার জায়গা হতো না, এত ডিভিডি। ফেলতেও পারতাম না, মায়া লাগত। তবু যেগুলো মাস্টার প্রিন্ট সেগুলো রেখে বাকিগুলো হয়তো কাউকে দিয়ে দিতাম। এটা ছিল তাঁর শখ। আরেকটা শখ ছিল শাকসবজি ও মাছ কেনা। বড় মাছ। তিনি মাছ কিনতে খুব পছন্দ করতেন। নিজে দেখে বেছে মাছ কিনতেন। এক মাছওয়ালা আর মাংসের দোকানদারের সঙ্গে তাঁর ভালো সম্পর্ক হয়ে গিয়েছিল। মাছ কেনার সময় তিনি খুব মজা করতেন। চিতল মাছ তিনি খুব পছন্দ করতেন। মাছ দেখে দাম জিজ্ঞেস করতেন। বলতেন, কত করে কেজি? মাছওয়ালা বলল, ১২০০ টাকা কেজি। তিনি বলতেন, আরে কী বলো? এত বড় মাছ মাত্র ১২০০ টাকা কেজি? দাম আরো বাড়িয়ে বলো।

 

তিনি যে হুমায়ূন আহমেদ, এটা কি মাছওয়ালারা জানত?

হ্যাঁ, জানত। তারা হুমায়ূন আহমেদকে স্যার বলত। একবার আমার শুঁটকি কিনতে হবে। আমি বললাম, চলো। দোকানি হয়তো আমাকে চেনে। দাম জিজ্ঞেস করলাম, দোকানি বলল, আপা, ৪০০ টাকার নিচে দেওয়া যাবে না। হুমায়ূন আহমেদ পেছন থেকে বলতেন, আরো বাড়িয়ে দাম বলেন। তিনি বাজারে গিয়ে এমন ফান করতেন। একবার ঈদে তিনি বললেন, পাঁচটা কালারফুল এবং দামি পাঞ্জাবি কিনব। আমি বললাম, কার জন্য? তিনি বললেন, এখন না, পরে বলব। এটা সারপ্রাইজ। জিজ্ঞেস করলাম, সাইজ কেমন? তিনি আইডিয়া দিলেন। পাঞ্জাবি কেনার পর তিনি ঈদের আগে আগে নিউ মার্কেটে চলে গেলেন। মাছওয়ালাকে পাঞ্জাবি দিয়ে বললেন, ধরো। এটা তোমার ঈদের উপহার। মাছওয়ালা তো হতভম্ব। তারা তো এটা ভাবতেই পারেনি। একজন কাস্টমার তাকে পাঞ্জাবি উপহার দেবে, তাও সিল্কের পাঞ্জাবি। এভাবে সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্যটা ছিল খাসির মাংস কিনতেন যার কাছে, সেখানে গিয়ে। ওই লোক একদিন বলেছিল, স্যার, আজ মাংস নিয়েন না। কতটা প্রিয় হলে এমন কথা দোকানি বলতে পারে। সেই লোক পাঞ্জাবি উপহার পেয়ে হাতে রক্ত লেগে আছে সেই অবস্থায়ই পাঞ্জাবি পরে ফেলল। নতুন পাঞ্জাবিতে রক্তের ছোপ ছোপ দাগ লেগে গেছে। পাঞ্জাবি গায়ে দিয়ে সে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলেছে, আমার হুমায়ূন আহমেদ স্যার দিছে, আমার হুমায়ূন আহমেদ স্যার দিছে...। এ রকম দৃশ্য না দেখলে ফিল করা যাবে না, কী দারুণ একটা ব্যাপার!

 

বিয়ের পর আপনি দ্বিতীয়বার তাঁর প্রেমে পড়েছিলেন, বিশেষ কিছু কারণে। এ বিষয়ে জানতে চাই...

বাচ্চাদের প্রতি তাঁর যে মমতা, সেটা ছিল সাংঘাতিক। আমি আমার বাচ্চাদের গোসল করাতেই পারিনি। একটা ব্যাপার আছে না, সাত দিনের বাচ্চাকে মানুষ গোসল করাতে ভয় পায়। অনেকে ছোট বাচ্চাকে কোলে নিতে ভয় পায়। আমার বাবাকে দেখেছি, কাজিনদের দেখেছি, ছোট বাচ্চা কোলে নিতে ভয় পায়। আমার ক্ষেত্রে যেটা হলো, তিন দিনের বাচ্চাকে কোলে নিয়ে হেঁটে হেঁটে হুমায়ূন আহমেদ ঘুম পাড়িয়ে দিচ্ছেন। গোসল করাচ্ছেন। সারা রাত পাহারা দিচ্ছেন। বুকে নিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিচ্ছেন। আমার তখন মনে হতো, আমি কি নিষাদ-নিনিতের মা নাকি হুমায়ূন আহমেদ তাদের মা? রাতের বেলায় হয়তো বাচ্চা ঘুমাচ্ছে না, জ্বর বা পেটে ব্যথা। আমি বলতাম, তুমি ঘুমিয়ে পড়ো, আমি দেখছি। হুমায়ূন আহমেদ উল্টো আমাকে বলতেন, তুমি ঘুমিয়ে পড়ো। আমি বাচ্চাকে দেখছি। সারা রাত বাচ্চাকে কোলে নিয়ে হাঁটছেন। ঘুম পাড়াচ্ছেন। আমরা বাইরে দূরে থেকে যে মানুষটাকে দেখি, ভাবি যে সেলিব্রিটি, তাদের মতো মানুষদের মধ্যে হয়তো ঘরোয়া ব্যাপারগুলো থাকে না। হুমায়ূন আহমেদ খুব ঘরোয়া মানুষ ছিলেন। বাসায় যারা কাজ করত, গৃহকর্মী; তাদের পড়াশোনা করানোর ব্যাপারে তাঁর বিপুল আগ্রহ ছিল। একটা সময়ে দেখা গেল যে আমাদের বাসায় কোনো কাজের মেয়ে থাকে না। কেন? কমপ্লেইন হিসেবে ওরা বলে, ওই বাসায় গেলে পড়তে হয়। জোর করে পড়ানো হয়। হুমায়ূন আহমেদ একবার পুরস্কার ঘোষণা করলেন গৃহকর্মীদের জন্য। কেউ যদি পত্রিকার হেডলাইন পড়ে শোনাতে পারো, তাহলে পুরস্কার দেওয়া হবে। কী পুরস্কার? বেতন ৫০০ টাকা বাড়িয়ে দেওয়া হবে। অথবা নিজের নাম লিখতে পারলে বেতন বাড়িয়ে দেওয়া হবে। অনেকেই তখন নাম সই করা শিখে ফেলত।

 

হুমায়ূন ভোজনরসিক ছিলেন। তিনি খেতে পছন্দ করতেন বলে আমরা জেনেছি, যদিও তাঁর আহার ছিল সীমিত। তিনি কী কী খাবার পছন্দ করতেন?

তিনি নিজে খাওয়ার চেয়ে খাওয়াতে পছন্দ করতেন। খেতে বসে টেবিল ভরা খাবার না দেখলে তাঁর খুব অস্বস্তি বোধ হতো। তিনি অনেক সময় রেগে যেতেন টেবিল ভরা খাবার না দেখতে পেলে। তিনি খুব পছন্দ করতেন মগজ ভুনা। তবে এখানে একটা ব্যাপার আছে। তিনি যে আইটেমটা পছন্দ করতেন, সেটা একেকজন রাঁধুনির কাছে একেকটা আইটেম পছন্দ করতেন। যেমন তিনি মাজহারুল ইসলামের হাতের চিংড়ি রান্না পছন্দ করতেন। আমার মায়ের হাতের রান্না মগজ ভুনা পছন্দ করতেন। হুমায়ূন আহমেদের নিজের মায়ের হাতের ডিমের কারি রান্না পছন্দ করতেন। আবার আমার হাতের রান্না গরুর মাংস পছন্দ করতেন । তিনি কলিজা ভুনা পছন্দ করতেন। খাসির সিনার মাংস পছন্দ করতেন। চিতল মাছের পেটি ও কোপ্তা পছন্দ করতেন। এ ছাড়া ছোট মাছ, কলার মোচা পছন্দ করতেন। বকফুলের বড়া পছন্দ করতেন। কখনো কলার থোড় পছন্দ করতেন, যেটা বেসন দিয়ে রান্না করতে হয়।

 

তাঁর রান্নার হাত কেমন ছিল?

তিনি গরুর মাংস ভালো রান্না করতে পারতেন। আর কোরবানির মাংস রান্না করতে পছন্দ করতেন। কোরবানির পর তিনি এক দিন রাঁধতেন। কিন্তু এটা এমন নয় যে প্রায়ই রাঁধতেন।

 

হুমায়ূন আহমেদের লেখায়, নাটক-সিনেমায় কিছু মজার বা আজগুবি কাণ্ড ঘটতে দেখা যেত। বাস্তবেও তিনি এগুলো করতে পছন্দ করতেন?

তিনি বাস্তবেও এমন অনেক কিছু ঘটিয়েছেন। যেমন মিথ্যা ভূতের গল্প বানানো, মিথ্যা ভূতের ভয় দেখানো। ভূত পুরা সাজিয়ে, আলোর খেলা দেখিয়ে ভূত বানানো থেকে শুরু করে উড়ে চলে যাচ্ছে ইত্যাদি নানা কিছু করে শুটিং স্পটের মানুষকে চমকে দিতে পছন্দ করতেন। এসব তিনি বানাতেন। কিছু সামনাসামনি বানাতেন আর কিছু পর্দায় বানাতেন। এসব সত্যি করে ফুটিয়ে তোলার জন্য আমাকে কত স্ক্রিপ্টে অভিনয় করতে হয়েছে। কত অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার ভান করতে হয়েছে।

 

তাঁর আগ্রহের বিষয়ের মধ্যে ছিল বন্ধুদের ডেকে বাসায় আড্ডা দেওয়া এবং টেলিভিশনে বাংলাদেশের খেলা হলে দেখা। এ বিষয়ে টুকরো কিছু বলুন, যা আপনার কাছে অন্য রকম মনে হয়েছে।

ওরে বাবা! এটা তাঁর আগ্রহের বিষয় না, বলা যেতে পারে উদ্যাপনের বিষয় ছিল। খেলা দেখার সময় উপস্থিত সবার জন্য বাংলাদেশি জার্সি কেনা, এটা শুধু বাংলাদেশি খেলা চলার সময়ে; অন্য কোনো খেলায় নয়। জার্সি কিনে খেলা দেখা হতো। নানা ধরনের খাবারের আয়োজন করা হতো। তিনি যদি মনে করতেন, বাংলাদেশ হেরে যাচ্ছে হুমায়ূন আহমেদ নিজেই কুফা, তাই বাংলাদেশ হেরে যাচ্ছে, তখন তিনি অন্য রুম থেকে একটু হেঁটে আসতেন। আবার লোভও সামলাতে পারতেন না, খেলা দেখার জন্য টিভির সামনে বসে যেতেন। তিনি নারায়ণগঞ্জে মাঠে বসে খেলা দেখার জন্য এক হাজার স্কয়ার ফুটের একটা ফ্ল্যাটই কিনে ফেলেছিলেন। পাগলের মতো চিন্তাভাবনা ছিল আর কি। পরে অবশ্য তাঁর চিকিৎসার সময় সেই ফ্ল্যাট বিক্রি করে ফেলা হয়েছে। সর্বপ্রথম ওই ফ্ল্যাটটা বিক্রি করা হয়।

 

হুমায়ূন আপনাকে কুসুম নামে ডাকতেন, কিন্তু আপনার নাম কুসুম ছিল না। এখন কি সেই ডাক মিস করেন?

এই প্রশ্নের উত্তর আমি দেব না। আপনি এই উত্তরটা লিখবেন যে, আমি এর উত্তর দেব না।



মন্তব্য