kalerkantho


প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী প্রস্তুতি । বাংলা

লুৎফা বেগম, সিনিয়র শিক্ষক, বিএএফ শাহীন কলেজ, কুর্মিটোলা, ঢাকা

৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী প্রস্তুতি ।  বাংলা

পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের ১৪ নম্বরে থাকছে রচনা। প্রশ্নে চারটি বিষয়বস্তুর ওপর রচনা থাকবে, এর মধ্যে একটির উত্তর দিতে হবে। মান ১০।

গত ৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮ তারিখে প্রকাশিত মডেল টেস্টের ১-১৩ নম্বর প্রশ্নের উত্তর ছিল গত সংখ্যায়। আজ থাকছে সর্বশেষ প্রশ্ন (১৪) অর্থাৎ রচনার উত্তর

প্রশ্নের প্রতিটি রচনার সঙ্গে ইঙ্গিত কিংবা উপশিরোনাম দেওয়া থাকবে, সেগুলোর আলোকে ২০০ শব্দের মধ্যে রচনা লিখতে হবে।

 

ক. আমার মা

ভূমিকা : এই পৃথিবীতে সন্তানের সবচেয়ে আপনজন হলেন তার মা। সন্তানকে গর্ভে ধারণ, জন্মদান, তার বেড়ে ওঠা থেকে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত একজন মা-ই সন্তানের জন্য সবচেয়ে বেশি সময় দিয়ে থাকেন। মায়ের সান্নিধ্যে থেকেই সন্তান প্রকৃত মানুষ হয়ে ওঠে। মায়ের এই স্নেহময়ী রূপের সঙ্গে আর সবার মতো আমিও পরিচিত বলে পৃথিবীতে আমার মা-ই আমার সবচেয়ে প্রিয় শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার মানুষ।

প্রিয় মানুষের পরিচয় : আমাদের প্রাত্যহিক জীবনযাত্রায় যাঁকে আমরা সবচেয়ে বেশি সময় কাছে পাই, তিনি কিন্তু একজন মা। আমার বাবাও আমার কাছে পরম শ্রদ্ধার পাত্র, তার পরও মাকে সারাক্ষণ কাছে পাই বলে আমার যত আদর-আবদার-আহ্লাদ—সবই মাকে ঘিরে থাকে।

গুণাবলি : আমি আমার মা-বাবার একমাত্র সন্তান। কিন্তু আমার ছয় বছর বয়সের সময় বাবা চাকরিসূত্রে বিদেশে যান। তিনি বছরে মাত্র এক মাসের জন্য দেশে আসেন। যদিও বাবার সঙ্গে টেলিফোনে মাঝেমধ্যেই কথা হয়, তবু মাকেই আমি সারাক্ষণ কাছে পাাই। মা এমনভাবে আগলে রেখে আমাকে বড় করে তুলেছেন যে বাবার অভাব তিনি বুঝতেই দেন না। তিনি একা ঘরে-বাইরের যাবতীয় দায়িত্ব-কর্তব্য পালন করে আমার দেখভাল করেন। আমার পড়াশোনার হাতে খড়িও মায়ের কাছেই। এখনো মনে পড়ে, মা আমাকে বই কিনে দেওয়ার আগে অক্ষর পরিচয়ের জন্য প্লাস্টিকের বিভিন্ন রঙের বাংলা-ইংরেজি বর্ণমালা, অঙ্ক শেখানোর জন্য প্লাস্টিকের ইংরেজি-বাংলা সংখ্যা ইত্যাদি কিনে দিতেন। ওগুলো দিয়ে খেলতে খেলতেই আমি তিন বছর বয়সের মধ্যে সব অক্ষর-সংখ্যা চিনে ফেলি। তারপর মা যখন ছড়া-ছবির বই কিনে দিলেন, সেগুলো বানান করে একা একাই পড়তে পারতাম। এখনো মা আমার পড়া তৈরিতে সাহায্য করেন। প্রতিদিন স্কুলের ডায়েরি চেক করেন। প্রয়োজনে বিষয়-শিক্ষকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এসব দায়িত্ব পালনে এক দিনের জন্যও তাঁর শৈথিল্য দেখিনি। এ কারণে আমি কখনো পড়ালেখায় ফাঁকি দিতে পারিনি। আমার লেখাপড়ার প্রতি দায়িত্ব পালন ছাড়া মা সংসারের আরো যেসব দায়িত্ব পালন করেন, তা উল্লেখ না করলে আমার মায়ের গুণাবলির প্রকাশ অসম্পূর্ণ থেকে যায়। আমার কোনো ভাই-বোন না থাকলেও আমাদের পরিবারে আমার দাদা-দাদি থাকেন। আমার মা নিজে তাঁদের সেবা-যত্ন করেন এবং আমাকেও তাঁদের সেবা-যত্ন করতে শিখিয়েছেন। আমাদের সবাইকে খাইয়ে তারপর তিনি খেতে বসেন। আমি যাতে অসুস্থ হয়ে না পড়ি, সে জন্য তিনি সব সময় স্বাস্থ্যসম্মত খাবার পরিবেশন করেন। আর অসুস্থ হয়ে পড়লে দ্রুত নিরাময়ের জন্য সব রকম বিধি-ব্যবস্থা করেন।

কেন প্রিয় : আমার মা একজন দায়িত্বশীল মহিলা। তিনি সুচারুভাবে হাসিমুখে সব দায়-দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। কোনো দিন তাঁকে কারো বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ করতে শুনিনি। নিজের সুখ-সুবিধার চেয়ে অন্যের সুখ-সুবিধার দিকে দৃষ্টি আমাকে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাশীল করে তোলে। তিনি আমাকে সব সময় ভালো মানুষ হয়ে ওঠার শিক্ষা দেন। আমার পড়ালেখায় যাতে একঘেয়েমি না আসে, সে জন্য আমার পছন্দের গল্পের বইগুলো কিনে দেন। এসব কারণে তিনি আমার প্রিয় ও আদর্শ মা হয়ে উঠেছেন।

উপসংহার : শিশুকাল থেকে মা আমাকে পরম যত্নে যেভাবে বড় করে তুলেছেন, তাঁর প্রতিদিনের কাজকর্মে সেটি আমি অনুভব করি। তাই আমিও যতটা পারি মায়ের কাজ-কর্মে সাহায্য করি। তিনি যাতে আমার কোনো কথায়-আচরণে কষ্ট না পান, সে জন্য সচেতন থাকি। আমি বিশ্বাস করি, মায়ের কথামতো চললেই একদিন সত্যিকারের মানুষ হব।

 

খ. একুশে ফেব্রুয়ারি/আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস

ভূমিকা : ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেরুয়ারি

আমি কি ভুলিতে পারি’

(একুশের গান : আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী)

বাঙালির জাতীয় জীবনের এক ঐতিহ্যবাহী দিন একুশে ফেব্রুয়ারি। এটি এখন সারা বিশ্বে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃত। এ দিবসের সঙ্গে বাঙালির জীবনের অনেক ত্যাগ, মহিমা, আবেগ ও আনন্দ জড়িত। এদিন আমাদের জাতীয় জীবনে অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা তোলা, বন্দি অবস্থা থেকে মুক্তির প্রেরণা জোগায়। এদিনেই বাঙালি তার বুকের ভেতর লুকিয়ে থাকা সাহসিকতা ও মনোবলের প্রকাশ ঘটায়।

ঐতিহাসিক পটভূমি : মাগো, ওরা বলে, সবার কথা কেড়ে নেবে,

তোমার কোলে শুয়ে গল্প শুনতে দেবে না।

বলো মা, তাই কী হয় ?

(মাগো ওরা বলে : আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ্)

১৯৪৭ সালের দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হয়। তার পর থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানিরা এ দেশের নিরীহ মানুষের ওপর নানা রকম অন্যায়, নিপীড়ন ও অত্যাচার চালায়। তারা বাঙালি জাতিকে পঙ্গু করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। এ জন্য তারা প্রথমেই বাঙালির মুখের ভাষার ওপর আঘাত হানে। তারা উর্দুকে এ দেশের রাষ্ট্রভাষা করার অপচেষ্টায় মেতে ওঠে। কিন্তু বাঙালি দমে যাওয়ার জাতি নয়। ফলে সারা দেশে ব্যাপক প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে ওঠে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে পাক সরকার ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি সারা দেশে ১৪৪ ধারা জারি করে। সেদিন প্রাণশক্তিতে পরিপূর্ণ ছাত্রসমাজ ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ স্লোগান নিয়ে রাজপথে বেরিয়ে পড়ে। বর্বর পাক সরকার এ মিছিলের ওপর নির্বিচারে গুলি চালালে শহীদ হন রফিক, সালাম, জব্বার, বরকতসহ আরো অনেকে। একপর্যায়ে পাক সরকার বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়।

শহীদ মিনার : বর্তমান ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের সামনে ভাষাশহীদদের স্মৃতি রক্ষার্থে ১৯৬২ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি তৈরি হয়েছে শহীদ মিনার। এখানেই শহীদ হয়েছিলেন আবুল বরকত। প্রতিবছর একুশে শহীদ মিনারে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণের মাধ্যমে ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়। তা ছাড়া দিনব্যাপী চলে নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

একুশে ফেব্রুয়ারির চেতনা : ইটের মিনার ভেঙেছে ভাঙুক।

একটি মিনার গড়েছি আমরা

চার কোটি কারিগর বেহালার সুরে,

রাঙা হৃদয়ের বর্ণলেখায়। (স্মৃতিস্তম্ভ : আলাউদ্দিন আল আজাদ)

১৯৫২ সালে ভাষাকে কেন্দ্র করেই বাঙালি অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছে। একুশে চেতনা সেদিক থেকে একটি মূল্যবোধ, জীবনাদর্শ, যা আমাদের প্রতিবাদী করে তোলে এবং সর্বপ্রকার নিপীড়ন ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়ে স্বকীয় সত্তাস্বরূপে প্রতিষ্ঠিত ও বিকশিত হওয়ার আহ্বান জানায়।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস : বর্তমানে একুশে ফেব্রুয়ারি শুধু বাঙালির একার নয়। ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেসকো একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। সেই থেকে সারা বিশ্বে এই দিনটি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে। পৃথিবীর সব জাতির মাতৃভাষার প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা প্রদর্শনের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় এ দিনটি।

উপসংহার : বাংলাই পৃথিবীর একমাত্র ভাষা যা এসেছে রক্তের বিনিময়ে। মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় একুশে ফেব্রুয়ারি তাঁরা জীবন দিয়েছিলেন বলেই আজ আমরা প্রাণের ভাষা বাংলায় কথা বলতে পারছি। তাই একুশের চেতনা আমাদের প্রত্যেকের অন্তরে লালন করতে হবে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে নিজের জীবনকে বিলিয়ে দেওয়ার জন্য সদা প্রস্তুত থাকতে হবে।

 

ক. আমার পোষা প্রাণী

ভূমিকা : মানুষ সমাজে বাস করে। সমাজে বসবাসের ফলে মানুষে-মানুষে যেমন স্নেহ-প্রীতির সম্পর্ক গড়ে ওঠে, তেমনি অন্য জীবের সঙ্গেও মানুষের মমত্বের সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারে। হৃদয়ের সেই মমত্ববোধ থেকেই মানুষ আদিম কাল থেকেই বিভিন্ন গৃহপালিত জীব, প্রাণী-পাখি ইত্যাদি পুষে থাকে। মানুষ কখনো গৃহস্থালি প্রয়োজনে গরু, ঘোড়া , মহিষ, ছাগল, কুকুর, বিড়াল হাঁস-মুরগিসহ বিভিন্ন পাখি পুষে থাকে। কিন্তু তার পরও সেই প্রাণীর প্রতি তার এক ধরনের মমতা জন্মে। তবে শুধু মনের আনন্দে কোনো প্রাণী লালন-পালন করলেই তাকে পোষা প্রাণী বলে। আমার পোষা প্রাণীর নাম কুকুর।

পোষা প্রাণীর বর্ণনা : আমার পোষা কুকুরটিকে আমি খুব ছোট অবস্থায় আমাদের বাড়ির গেটের সামনে পাই। আমাকে গেট খুলে ভেতরে ঢুকতে দেখে ওটিও আমার পেছন পেছন চলে আসে। আমি তখন কুকুরছানাটিকে একটা সরু দড়ি দিয়ে বারান্দায় থামের সঙ্গে বেঁধে রাখি। তারপর ওটাকে বাটিতে করে দুধ খেতে দিলে একটু একটু করে সবটাই খেয়ে ফেলে। কুকুরটির পেট ভরে যাওয়ায় ওটি আমার দিকে চেয়ে আনন্দে লেজ নাড়তে থাকে। আমি তখনই সিদ্ধান্ত নিই ওটাকে পোষার। ছানাটির গায়ের রং ছিল একেবারে বাদামি, তাই আমি আদর করে কুকুরছানাটির নামও রাখি ব্রাউনি। ব্রাউনির থাকার জন্য একটা টেলিভিশনের বাক্স দিয়ে ঘর বানিয়ে দিই।

খাদ্যাভ্যাস : আমার ব্রাউনি কুকুরছানাটি আস্তে আস্তে বড় হলে ওর খাদ্যাভ্যাসও আমি বদলে দিই। এখন ব্রাউনি আমাদের মতোই ভাত-মাছ-মাংস সবই খায়। একটা আলাদা প্লেটে আমি ওর জন্য ভাত-মাছ-মাংস মাখিয়ে সামনে ধরে ‘ব্রাউনি’ বলে ডাকলেই দ্রুত ছুটে এসে লেজ নেড়ে প্রথমে আনন্দ প্রকাশ করে, তারপর চেটেপুটে পুরোটাই খেয়ে নেয়। তবে হাড়-মাংস পেলে খুবই খুশি হয়।

কেন প্রিয় : কুকুর এমনিতেই প্রভুভক্ত জীব। আমি স্কুল থেকে বাসায় ঢোকার আগে কলিংবেল টিপলে ব্রাউনি ঘেউ ঘেউ করতে থাকে। গেট খুলতে দেরি হলে একছুটে আমার মায়ের কাছে যায়। আবার দৌড়ে গেটে আসে। যতক্ষণ গেট কেউ না খোলে ততক্ষণ সে ঘেউ ঘেউ করতেই থাকে। আমি বাসায় প্রবেশ করে ওর সঙ্গে দু-একটা কথা বললে ও আনন্দে জেল নাড়তে থাকে, কখনো বা মাটিতে হুটোপুটি খেতে থাকে। এ ছাড়া ব্রাউনি বাসায় অপরিচিত কাউকে ঢুকতে দেখলে অনবরত ঘেউ ঘেউ করতে থাকে। আমরা ঘুমালেও ব্রাউনি সারা রাত বাসা পাহারা দেয়। একটা খুটখাট শব্দেও সে ঘেউ ঘেউ করতে থাকে। ফলে বাসা থেকে কোনো কিছু হারানোর ভয় আমরা করি না। এসব কারণে ব্রাউনি শুধু আমারই নয়, পরিবারের সবার প্রিয় হয়ে উঠেছে।

উপসংহার : আমার কুকুরছানাটিকে আমি নিজে রাস্তা থেকে কুড়িয়ে এনে বড় করেছি বলে ওটির প্রতি আমার গভীর মমতা জন্মেছে। ওটিকে পাড়ার কোনো দুষ্টু ছেলে ধরল কি না, কেউ মারল কি না অথবা হারিয়ে গেল কি না—বাড়ি ফিরে যতক্ষণ ওটিকে না দেখি ততক্ষণ এসব ভাবনা হয়। ব্রাউনি আমার অবসরের সঙ্গী। ওর সঙ্গে আমি বন্ধুর মতো খেলা করি, কথা বলি, বিভিন্ন রকম খাবার দিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষাও চালাই। এককথায় আমি আমার পোষা কুকুরছানা ব্রাউনিকে লালন-পালন করে খুব আনন্দ পাই।

 

গ. বিজয় দিবস

ভূমিকা : আমাদের জাতীয় জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বিজয়লাভ। দীর্ঘ ৯ মাস যুদ্ধ শেষে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বর্বর পাকিস্তানিদের পরাজিত করে এ দিনটিতে আমরা বিজয় অর্জন করি। এ দিনে আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ হয়েছিল হানাদারমুক্ত। আমরা পেয়েছি স্বাধীন সার্বভৌম একটি দেশ, একটি নিজস্ব মানচিত্র ও পতাকা। বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর ঠিকানা। তাইতো কবি গর্বের সঙ্গে উচ্চারণ করেন—

একটি সাগর রক্ত ঢেলে

ফুটলো যে ফুল পাপড়ি মেলে

এই বাংলায় বিজয় এলো ডিসেম্বরের শেষে

(বিজয় এলো : ওয়াসেফ এ খোদা)

বিজয় দিবসের পটভূমি : বাঙালির জাতীয় জীবনের এই অবিস্মরণীয় গৌরবময় বিজয় সহজে আসেনি। দীর্ঘ পথপরিক্রমায় অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষার ফলে এ বিজয় লাভ সম্ভব হয়েছে। ১৯৪৭ সালে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরপরই পশ্চিম পাকিস্তান পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলার মানুষের ওপর শোষণক্রিয়া চালায়। বাঙালির প্রাপ্য অধিকার ছিনিয়ে নেওয়ার ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকচক্র লিপ্ত হয়। প্রতি পদেই তারা এ দেশের মানুষের ওপর অত্যাচারের স্টিমরোলার চালায়। এর চূড়ান্ত রূপ ধারণ করে ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ মধ্যরাতে। সে রাতে তারা গণহত্যা, লুটপাট, অগ্নিসংযোগসহ নানা ধরনের বর্বরতা চালায় সারা দেশে। তখন বাংলার মানুষ পাকিস্তানিদের অপতৎপরতা রুখে দেয়। দীর্ঘ ৯ মাস ধরে চলে স্বাধীনতাযুদ্ধ। অবশেষে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাক বাহিনীর জেনারেল নিয়াজি আত্মসমর্পণ করলে বাংলাদেশ বিজয় লাভ করে। কবির ভাষায়—    

আবার দেখি নীল আকাশে

পায়রা মেলে পাখা

মা হয়ে যায় দেশের মাটি

তার বুকেতেই থাকা

(রৌদ্র লেখে জয় : শামসুর রাহমান)

বিজয় দিবস উদ্‌যাপন : বিজয় দিবস উদ্‌যাপিত হয় মহাসমারোহে। এদিন সারা দেশ ছেয়ে যায় লাল-সবুজের সাজে। বাড়ির ছাদে, দোকানে, রাস্তায়, গাড়ির সামনে, স্কুল-কলেজে, এমনকি রিকশার হ্যান্ডেলেও শোভা পায় লাল-সবুজ রঙের জাতীয় পতাকা। রাজধানী ঢাকার রাস্তায় বিভিন্ন সাংস্কৃতিকগোষ্ঠী আয়োজন করে গণমুখী নানা অনুষ্ঠানের। ওই দিন ভোরে আমরা সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করি। এ ছাড়া সকালবেলায় ঢাকার জাতীয় প্যারেড ময়দানে সেনাবাহিনীর উদ্যোগে কুচকাওয়াজের আয়োজন করা হয়। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, কূটনীতিবিদ ও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতিতে হাজার হাজার মানুষ এই কুচকাওয়াজ উপভোগ করেন। দেশের প্রতিটি জেলায়ও উৎসবমুখর পরিবেশে এ দিনটি পালিত হয়।

দিবসটির তাৎপর্য : হানাদারের সঙ্গে জোরে

লড়ে মুক্তি সেনা

তাদের কথা দেশের মানুষ

কখনো ভুলবে না

(রৌদ্র লেখে জয় : শামসুর রাহমান)

১৬ই ডিসেম্বর বিজয় লাভের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতি নিজেদের বীর জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে। এই দিনটির মাধ্যমে আমরা নতুন প্রজন্মকে এবং বিশ্বকে বারবার স্মরণ করিয়ে দিই আমাদের মুক্তিযুদ্ধের কথা, শহীদের কথা। বাঙালি জাতির জীবনে এই দিনটির গুরুত্ব অনেক। এই বিজয় দিবসে বিশ্বের বুকে লালসবুজের পতাকা নিয়ে উদিত হয় বাংলাদেশ নামের একটি সূর্য। এ দিনটি বাঙালিকে অধিকার আদায়ে সত্যনিষ্ঠ সংগ্রামে নিজের জীবন বিলিয়ে দেওয়ার আমন্ত্রণ জানায়। সে জন্য জাতীয় জীবনে এ দিবসের গুরুত্ব ও তাৎপর্য অপরিসীম।

উপসংহার : পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে

রক্ত লাল, রক্ত লাল, রক্ত লাল

জোয়ার এসেছে জনসমুদ্রে

রক্ত লাল, রক্ত লাল, রক্ত লাল

বিজয় দিবস আমাদের জাতীয় দিবস। তাই বিজয় দিবসের চেতনাকে জাতীয় জীবনের সর্বত্র ছড়িয়ে দিতে হবে। বিজয় দিবসের চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে জাতীয় উন্নতির জন্য আমাদের সবাইকে সব ভেদাভেদ ভুলে একযোগে দেশের উন্নয়নে কাজ করে যেতে হবে। তাহলেই আমাদের এ বিজয় অর্জন সার্থক হবে।

 

 

 

 



মন্তব্য