kalerkantho


এসএসসি প্রস্তুতি

বাংলা দ্বিতীয় পত্র

প্রবন্ধ রচনা

লুত্ফা বেগম, সিনিয়র শিক্ষক, বিএএফ শাহীন কলেজ, ঢাকা   

৩ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



বাংলা দ্বিতীয় পত্র

বাংলাদেশের বেকার সমস্যা ও তার প্রতিকার

ভূমিকা : কোনো দেশের জনশক্তির তুলনায় কর্মসংস্থানের স্বল্পতার ফলে সৃষ্ট সমস্যাই বেকার সমস্যা। বর্তমান বাংলাদেশে এই সমস্যা জটিল ও প্রকট আকার ধারণ করেছে। যা বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল একটি দেশের অর্থনীতির জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ। এ সমস্যা ক্রমেই জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ক্ষুদ্র আয়তনের এই দেশে কর্মসংস্থানের পরিধিও অতি সীমিত। সুতরাং বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান বাংলাদেশের পক্ষে সহজসাধ্য নয়।

 

বেকারত্ব কী : কোনো সক্ষম ও যোগ্য ব্যক্তি ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও যদি প্রচলিত মজুরি গ্রহণ করে কাজ করার সুযোগ না পায়, তাহলে সেই অবস্থার নাম বেকারত্ব। তবে কর্মক্ষম ব্যক্তি যদি কাজ করতে অনীহা প্রকাশ করে কিংবা শারীরিক ও মানসিকভাবে কাজ করতে অক্ষম হয়, তবে তার অবস্থাকে বেকারত্ব বলা যাবে না। কাজের উপযুক্ত ব্যক্তি যদি নিজের যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ না পেয়ে নিম্নমানের কাজ করতে বাধ্য হয়, তবে তা অর্ধ বেকারত্বের মধ্যে পড়ে।

 

বেকারত্বের প্রকারভেদ : বেকারত্ব একটি বিশাল সমস্যা। এই বেকারত্বেরও রয়েছে নানা বিভাজন। যেমন স্থায়ী বেকারত্ব, অস্থায়ী বেকারত্ব, সাময়িক বেকারত্ব, ছদ্মবেশী বেকারত্ব, মৌসুমি বেকারত্ব, প্রযুক্তিগত বেকারত্ব, প্রচ্ছন্ন বেকারত্ব ইত্যাদি।

মৌসুমি বেকারত্ব : নির্দিষ্ট সময়ের পরের সময় যদি কোনো কাজ না থাকে, তাহলে তা মৌসুমি বেকারত্ব। আমাদের দেশে একেক মৌসুমে একেক রকম কাজের বা লোকের চাহিদা থাকে। ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সেই বিশেষ ধরনের কাজের কোনো সুযোগ থাকে না। এ রকম বেকারত্বই মৌসুমি বেকারত্ব।

প্রযুক্তিগত বেকারত্ব : কারিগরি ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের ফলে এ ধরনের বেকারত্ব সৃষ্টি হয়।

প্রচ্ছন্ন বেকারত্ব : নির্দিষ্ট কাজে প্রয়োজনের অতিরিক্ত শ্রম বিনিয়োগই প্রচ্ছন্ন বেকারত্ব। অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে এ বেকারত্ব পরিলক্ষিত হয়। আমাদের দেশে কৃষিক্ষেত্রে প্রচ্ছন্ন বেকারত্ব বিদ্যমান।

সাময়িক বেকারত্ব : কোনো কোনো ক্ষেত্রে বছরের মাত্র কয়েক মাস কাজ থাকে, বাকি সময় কাজ থাকে না। এ ধরনের বেকারত্বকে সাময়িক বেকারত্ব বলে।

ছদ্মবেশী বেকারত্ব : মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে এ ধরনের বেকারত্ব বেশি দেখা যায়। তারা উৎপাদন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি জড়িত নয়, কিন্তু পরোক্ষভাবে তাদের অবদান আছে। এ ধরনের বেকারত্বকে ছদ্মবেশী বেকারত্ব বলে।

বেকারত্ব যে ধরনের হোক না কেন, তা কখনো কাঙ্ক্ষিত নয়।

 

বাংলাদেশের বেকারত্ব : বাংলাদেশ বেকারত্বের ভারে জর্জরিত। বাংলাদেশে প্রকৃত বেকার লোকের সংখ্যা কত, তার কোনো সঠিক তথ্য পাওয়া যায় না। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর শ্রমশক্তি জরিপ ২০১৫-এর প্রাথমিক ফলাফল অনুযায়ী, দেশে মোট শ্রমশক্তি প্রায় ছয় কোটি। এর মধ্যে কর্মক্ষেত্রে নিয়োজিত শ্রমশক্তির সংখ্যা পাঁচ কোটি ৪৫ লাখ এবং কাজ খুঁজছেন এমন শ্রমশক্তির সংখ্যা প্রায় ৫৫ লাখ; যাদের বেকার বলে চিহ্নিত করা যায়। প্রতিবছর বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে ১৫ লাখ শ্রমবাজারে প্রবেশ করে। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় এক কোটির অধিক শিক্ষিত ও দক্ষ এবং তার চেয়েও বেশি অশিক্ষিত ও অদক্ষ বেকার বা প্রচ্ছন্ন বেকার। এ সংখ্যাকে বিশেষজ্ঞরা বলেন মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩০ শতাংশ।

 

বেকারত্বের কারণ : বেকারত্বের ক্ষেত্রও আমাদের দেশে বহুমাত্রিক অর্থাৎ প্রত্যেক সেক্টরেই রয়েছে উল্লেখযোগ্য বেকারত্ব। যেমন শহুরে কলকারখানার শ্রমিক বা গ্রামের কৃষি শ্রমিক—উভয় ক্ষেত্রেই রয়েছে অসংখ্য বেকার। এরা শ্রমজীবী বা চাকরিজীবী, নিম্নবিত্ত বা মধ্যবিত্ত। এই বেকারত্বের কারণ, বাংলাদেশ মূলত কৃষিনির্ভর ও স্বল্প পুঁজির দেশ। শিল্পায়নের সুযোগ এখানে সীমিত। তাই অশিক্ষা ও দারিদ্র্যের পাশাপাশি পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের অভাবে এ দেশে শিক্ষিত বেকারের সুযোগ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর একটি বড় কারণ, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা মোটেও কর্মমুখী নয়। দ্বিতীয়ত, আমাদের দেশের শিক্ষিত তরুণরা শিক্ষালাভের পর কেউ পিতৃপেশায়—যেমন কৃষি, চাষাবাদ, কুটির শিল্প ইত্যাদি কাজে আর ফিরে যেতে চায় না। ফলে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ ছাড়া বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির নব নব আবিষ্কার, অনেকের হাতের কাজ একজনকে দিয়ে করার মতো প্রযুক্তির প্রয়োগের ফলে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশে বর্তমানে একদিকে অশিক্ষা বা শিক্ষাবঞ্চিত তরুণ, অন্যদিকে শিক্ষিত অথচ অদক্ষ যুবসমাজ—এ দুই বিপরীতমুখী স্রোতধারা বেকারত্বের সমস্যাকে ভয়াবহ রূপ দিয়েছে, দেশের ভবিষ্যৎ করে তুলছে অন্ধকারাচ্ছন্ন। বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশে কর্মক্ষম অথচ কর্মহীন জনগোষ্ঠী সার্বিক অর্থনীতির ওপর মারাত্মক হুমকিস্বরূপ। বেকারত্বের অভিশাপে অনেকেই নৈতিকতা হারিয়ে ফেলছে। আমাদের সমাজজীবন হয়ে উঠেছে জটিল থেকে জটিলতর।

 

প্রতিকারের উপায় : বেকার সমস্যা আমাদের একটি জাতীয় সমস্যা, যা প্রচণ্ড নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। বাংলাদেশের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এই বিপর্যয় ঠেকাতে নিম্নবর্ণিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা আবশ্যক—

♦ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি। এ উদ্দেশ্যে গ্রামাঞ্চল ও শহরাঞ্চলে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প প্রসারের জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

♦ বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।

♦ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ জনশক্তিতে পরিণত করে বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য প্রেরণ করতে হবে।

♦ বৃত্তি ও কর্মমুখী শিক্ষার সম্প্রসারণ ঘটিয়ে আত্মকর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে।

♦ সারা বছর চাষের উপযোগী ফসল উৎপাদনের ব্যবস্থা করতে হবে।

♦ যুবসমাজকে নানা ক্ষুদ্র কর্ম বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে কর্মে নিয়োগ করতে হবে।

♦ গ্রামাঞ্চলভিত্তিক নানা প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে, যাতে গ্রামাঞ্চলের মানুষের সেখানে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা যায়।

♦ চাকরি করার সনাতনী মনোভাব ত্যাগ করে শিক্ষিত যুবকদের আত্ম-উন্নয়নমূলক কর্মের প্রতি আগ্রহী করে তুলতে হবে। শিক্ষার হাত কর্মের হাতে পরিণত করতে হবে।

 

উপসংহার : কর্মহীন জীবন অভিশপ্ত ও অন্ধকার। একে কর্মের আলোয় আলোকিত করে তুলতে হবে। আমাদের নিরাশা দূরে সরিয়ে সৃষ্টির উল্লাসে মেতে উঠতে হবে। সর্বোপরি যুবসমাজের বেকারত্বের অভিশাপ ও অপবাদ ঘোচাতে হলে এবং জাতির কাঁধ থেকে বেকারত্বের বিশাল বোঝা নামাতে হলে সরকারকে যেমন এগিয়ে আসতে হবে, তেমনি জনগণকেও সম্মিলিত প্রচেষ্টা চালাতে হবে।

 



মন্তব্য