kalerkantho


প্রবন্ধ রচনা

এসএসসি প্রস্তুতি

বাংলা দ্বিতীয় পত্র

লুত্ফা বেগম হ সিনিয়র শিক্ষক, বিএএফ শাহীন কলেজ, কুর্মিটোলা, ঢাকা   

২ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



এসএসসি প্রস্তুতি

চিকিৎসাক্ষেত্রে বিজ্ঞান

 

ভূমিকা : মানবকল্যাণের প্রত্যয়ে অঙ্গীকার করেই মূলত বিজ্ঞানের সূচনা। আর মানবকল্যাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নীরোগ জীবনের নিশ্চয়তা ও আর্তের নিরাময়। সে জন্য স্বাস্থ্যকে মানুষের মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। আধুনিক বিজ্ঞান তাই তার কল্যাণশক্তি মানুষের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করার জন্য নিয়োজিত করেছে। বিজ্ঞানের বহুমুখী অগ্রযাত্রায় চিকিৎসা ক্ষেত্রে যুগান্তকারী পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। রোগ নির্ণয়, রোগ প্রতিরোধ ও রোগ নিরাময়ে এককথায় মানুষের স্বাস্থ্য সংরক্ষণে বিজ্ঞান আজ পরম আশীর্বাদ হয়ে দেখা দিয়েছে।

 

মানব স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা : যার শরীরী অস্তিত্ব আছে, তারই আছে অসুস্থতা। ফলে মানুষের জীবনের সঙ্গে রোগ-ব্যাধি অবিচ্ছেদ্য হয়ে উঠেছে। চারপাশের প্রকৃতিতে যেমন ছড়িয়ে আছে মারাত্মক জীবাণু, দূষণজনিত রোগঝুঁকি, তেমনি মানুষের শরীরের ভেতরও রয়েছে নানা বৈকল্য ও রোগাক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি। তাই সুপ্রাচীনকাল থেকেই মানুষ রোগমুক্তির জন্য চিকিৎসার উদ্ভাবন করে এসেছে। তবে চিকিৎসার কার্যকারিতা ও রীতি-পদ্ধতির বৈজ্ঞানিক ভিত্তি পেতে সময় লাগে বহুকাল।

 

প্রাচীনকালের চিকিৎসাপদ্ধতি : উনিশ শতক পর্যন্ত চিকিৎসা ছিল সম্পূর্ণ অনুমাননির্ভর। রোগ যে কতিপয় জীবাণুর দ্বারা দেহে সংক্রমণ ঘটায়, তা-ও জানা ছিল না অনেকের। সে জন্য রোগ-ব্যাধিকে মনে করা হতো দৈব অভিশাপ কিংবা পাপের প্রায়শ্চিত্ত। চিকিৎসার অভাবে তখন কলেরা, বসন্ত মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছে, আর মহামারির সময়ে মানুষ স্রষ্টা বা দেব-দেবীর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করেছে, চিকিৎসার নামে চলেছে ঝাড়-ফুঁক ও তন্ত্রমন্ত্রের বাড়াবাড়ি।

 

চিকিৎসাবিজ্ঞানের যুগান্তকারী সাফল্যের সূচনা : সিফিলিস রোগ মহামারি আকারে দেখা দেওয়ার পর ইংরেজরা হাজার হাজার রোগীকে চিকিৎসার বদলে দ্বীপান্তরে পাঠিয়ে দিত। বসন্ত রোগ দ্বারা সংক্রমণের ভয়ে রোগীকে নির্মমভাবে জ্যান্ত পুড়িয়ে ফেলা হতো। চিকিৎসাক্ষেত্রে এ অবস্থার মধ্যে বিজ্ঞানের বিজয়বার্তা ঘোষণা করলেন আলেকজান্ডার ফ্লেমিং। বিশ শতকের শুরুতে তিনি পেনিসিলিন আবিষ্কার করলে চিকিৎসাবিজ্ঞানে এক নবযুগের সূচনা হয়। এরপর আবিষ্কৃত হয় ধন্বন্তরি অ্যাসপিরিন। অ্যাসপিরিনকে বলা হয় সর্বরোগের ওষুধ। পরবর্তী সময়ে স্ট্রেপটোমাইসিন ও ক্লোরোমাইসিনের মতো কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিকের আবিষ্কার চিকিৎসাক্ষেত্রে গুণগত পরিবর্তন আনে।

 

চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতির কয়েকটি দিক : চিকিৎসাক্ষেত্রে বিজ্ঞানের বিস্ময়কর, অগ্রযাত্রায় প্রতিদিন আবিষ্কৃত হচ্ছে নতুন নতুন ওষুধ, প্রতিষেধক, প্রতিরোধ ও রোগ নির্ণয় ব্যবস্থা। যেমন—

¤ রোগ নির্ণয়ে চিকিৎসাবিজ্ঞান : রোগ নির্ণয়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভূমিকা অভাবনীয়। এক্স-রে, ইসিজি, এন্ডোসকপি, সিটি স্ক্যান, আলট্রাসনোগ্রাফি, এম আর আই ইত্যাদি আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে বিজ্ঞান রোগ নিরূপণে অভাবনীয় সাফল্য এনে দিয়েছে।

¤ রোগ প্রতিরোধে চিকিৎসাবিজ্ঞান : বৈজ্ঞানিক গবেষণার ফলে প্রাণঘাতী সংক্রামক সব রোগের প্রতিষেধক আবিষ্কৃত হয়েছে। এসব প্রতিষেধকমূলক ওষুধ গ্রহণ করলে রোগ সংক্রমণের আশঙ্কা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। যক্ষ্মা, বসন্ত, হাম, ধনুষ্টংকার, ডিপথেরিয়াসহ ছয়টি রোগের প্রতিষেধক শিশুকালেই দেওয়া হয়। হেপাটাইটিস, ম্যালেরিয়া, টাইফয়েড প্রভৃতি রোগ থেকেও টিকা গ্রহণের মাধ্যমে রক্ষা পাওয়া যায়। যেসব রোগের প্রতিষেধক এখনো আবিষ্কৃত হয়নি, সেসবের কার্যকর প্রতিষেধক আবিষ্কারের জন্য চলছে নিরন্তর গবেষণা। বাংলাদেশ থেকে ইতিমধ্যে কলেরা, বসন্ত, ডিপথেরিয়া প্রভৃতি রোগ নির্মূল করা সম্ভব হয়েছে।

¤ রোগ নিরাময়ে চিকিৎসাবিজ্ঞান : রোগ নিরাময়ে ক্ষমতাসম্পন্ন কার্যকর বিভিন্ন ওষুধ আবিষ্কার করেছে চিকিৎসাবিজ্ঞান। এসব ওষুধের কল্যাণে দুরারোগ্য ব্যাধি নিরাময় করা সম্ভব হচ্ছে। একসময় শল্যচিকিৎসায় বা শিরায় ওষুধ গ্রহণের মাধ্যমে যেসব রোগ নিরাময় হতো, তা এখন মুখে খাওয়া ওষুধেই সারিয়ে তোলা হচ্ছে। হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ, যক্ষ্মাসহ মনোরোগ চিকিৎসার কার্যকর ওষুধ এখন হাতের কাছেই পাওয়া যায়। এমনকি ক্যান্সার, এইডস ইত্যাদি চিকিৎসায়ও ভালো ফল পাওয়া যাচ্ছে।

¤ শল্যচিকিৎসায় অগ্রগতি : আধুনিককালে শল্যচিকিৎসার ক্ষেত্রে অভাবনীয় অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। হৃদরোগ চিকিৎসায় ওপেন হার্ট সার্জারির মাধ্যমে মানুষের জীবন ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, কৃত্রিম হৃদপিণ্ড সংযোজন করে মানুষকে কৃত্রিম জীবন দান করা হচ্ছে। স্নায়ুবৈকল্য প্রতিরোধকল্পে জটিল মস্তিষ্ক সার্জারি চিকিৎসাক্ষেত্রে এক বিস্ময়কর অগ্রগতি এনে নিয়েছে। কিডনি, কর্নিয়া ইত্যাদি একজনের অঙ্গ থেকে অন্যজনের শরীরে প্রতিস্থাপন করা হচ্ছে।

 

অত্যাধুনিক চিকিৎসাপদ্ধতি : অধ্যাপক কুরি ও মাদাম কুরি আবিষ্কৃত রেডিয়ামের সাহায্যে ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীকে নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখানো সম্ভব হচ্ছে বিজ্ঞানের কল্যাণেই। পরমাণু গবেষণাকে রোগ নিরাময়ের কাজে লাগানো আধুনিক বিজ্ঞানের অন্যতম সাফল্য। শরীরের অভ্যন্তরস্থ টিউমার, পাথর প্রভৃতি শরীর না কেটে লেজারের সাহায্যে অপসারণ করা এখন সাধারণ ঘটনা। টেস্ট টিউবের মাধমে নিঃসন্তান দম্পতিকে সন্তানের মুখ দেখানোর মতো কঠিন কাজ আমাদের দেশেও সম্ভব হচ্ছে। বাইপাস সার্জারিতেও আজকাল বক্ষ উন্মোচন করার বদলে লেজার রশ্মি ব্যবহৃত হচ্ছে। ক্লোনিং গবেষণার মাধ্যমে জন্মপর্যায়ে মানুষকে নীরোগ করে তোলার চেষ্টাও চলছে। জিন প্রযুক্তির গবেষণায় এসেছে অভাবনীয় সাফল্য। এর ফলে অনেক দুরারোগ্য ব্যাধি সমূলে ধ্বংস করা সম্ভব হবে।

 

জীবন সাজাতে চিকিৎসাবিজ্ঞান : মানুষের জন্মগত শারীরিক বৈকল্য অথবা দুর্ঘটনার কারণে শারীরিক বিকৃতি থেকে চিকিৎসাবিজ্ঞান মানুষকে স্বাভাবিক জীবন উপভোগের সুযোগ করে দিয়েছে। ঠোঁট কাটা, নাক কাটা প্রভৃতি বিকৃত চেহারাকে অপারেশনের মাধ্যমে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়া হয়। ভোঁতা নাক সুচালো, বাঁকা দাঁত সোজা করা ছাড়াও কসমেটিক সার্জারির মাধ্যমে পোড়া ও এসিডে দগ্ধ মানুষের বিকৃত চেহারা সুন্দর করে তোলার পদ্ধতি জনপ্রিয়তা লাভ করেছে।

 

উপসংহার : চিকিৎসাক্ষেত্রে বিজ্ঞানের অভাবনীয় সাফল্য শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার হ্রাস করে মানুষের গড় আয়ু বাড়িয়ে দিয়েছে, যা বর্তমানে বাংলাদেশে ৭০-এ পৌঁছেছে।  মানবকল্যাণের প্রত্যয়কে অঙ্গীকার করেই যে বিজ্ঞানের যাত্রা সূচনা হয়েছে, সে ক্ষেত্রে চিকিৎসাবিজ্ঞান যে শতভাগ সাফল্য অর্জন করেছে, এ কথা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।



মন্তব্য