kalerkantho


এইচএসসি প্রস্তুতি

যুক্তিবিদ্যা দ্বিতীয় পত্র

আবদুল কুদ্দুস, প্রভাষক, ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা   

২১ এপ্রিল, ২০১৭ ০০:০০



প্রথম অধ্যায়

যৌক্তিক সংজ্ঞা

উদ্দীপকটি পড়ে নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও :

‘মানুষ’ পদের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে আমিন তার বন্ধু শুভকে বলল, ‘মানুষ হয় এমন প্রাণী, যারা খাবার খায় ও পানি পান করে। ’ শুভ তখন বলল, ‘মানুষ হয় দুই হাতবিশিষ্ট প্রাণী।

’ তাদের তৃতীয় বন্ধু মাহিন বলল, ‘সব পদেরই সংজ্ঞা দেওয়া সম্ভব নয়। ’

ক) সংজ্ঞার্থ পদ কাকে বলে?

খ) দুর্বোধ্য সংজ্ঞা কেন হয়?

গ) আমিন ও শুভর কথায় সংজ্ঞার কোন কোন অনুপপত্তি ঘটেছে? ব্যাখ্যা করো।

ঘ) মাহিনের কথাটির যথার্থতা মূল্যায়ন করো।

 

উত্তর :

ক) কোনো পদের অর্থ স্পষ্ট করার জন্য জাত্যর্থের যে বিবৃতি থাকে তাকেই সংজ্ঞার্থ পদ বলে।

খ) সংজ্ঞার দ্বিতীয় নিয়ম লঙ্ঘন করলে দুর্বোধ্য সংজ্ঞা হয়। দ্বিতীয় নিয়মটি হচ্ছে ‘যে পদের সংজ্ঞা দিতে হবে সে পদ থেকে সংজ্ঞা স্পষ্টতর হবে; সংজ্ঞায় কোনো দুর্বোধ্য বা রূপক শব্দ ব্যবহার করা যাবে না। ’ এই নিয়ম লঙ্ঘন করলে দুর্বোধ্য ও রূপক সংজ্ঞা অনুপপত্তি ঘটে। যেমন বৃক্ষ হলো সবিতাতপ নিরোধক পাদপ। এখানে বৃক্ষের সংজ্ঞায় যে শব্দগুলো ব্যবহার করা হলো তা বৃক্ষের অর্থ স্পষ্ট করার চেয়ে বরং আরো দুর্বোধ্য ও জটিল করে ফেলেছে। তাই এখানে দুর্বোধ্য সংজ্ঞা অনুপপত্তি ঘটেছে।

গ) আমিন ও শুভ মানুষ পদের সংজ্ঞায় যথাক্রমে বাহুল্য ও অবান্তর সংজ্ঞা দিয়েছে।

যখন জাত্যর্থের অতিরিক্ত গুণ হিসেবে উপলক্ষণ উল্লেখ করা হয়, তখন সেখানে বাহুল্য সংজ্ঞা অনুপপত্তি ঘটে। উপলক্ষণ হচ্ছে জাত্যর্থ নিঃসৃত অনিবার্য গুণ। উপলক্ষণ দুই ধরনের—জাতিগত ও উপজাতিগত। জাতির আবশ্যকীয় গুণ হলে জাতিগত আর উপজাতির আবশ্যকীয় গুণ হলো উপজাতিগত উপলক্ষণ হয়। মানুষ প্রাণী জাতির অন্তর্ভুক্ত। প্রাণীর জাত্যর্থ প্রাণিত্ব থেকে অনিবার্যভাবে খাবার খাওয়া ও পান করা গুণ নিঃসৃত হয়। উদ্দীপকে আমিনের কথায় মানুষের এ দুটি গুণ এসেছে; তাই এটি জাতিগত উপলক্ষণ এবং সে কারণে এখানে বাহুল্য সংজ্ঞা অনুপপত্তি ঘটেছে।

আবার যখন সংজ্ঞায় জাত্যর্থের অতিরিক্ত গুণ হিসেবে অবান্তর লক্ষণ উল্লেখ করা হয়, তখন অবান্তর বা আপতিক সংজ্ঞা অনুপপত্তি ঘটে। পদের যে গুণ জাত্যর্থের অংশ নয়, জাত্যর্থ থেকে নিঃসৃতও হয় না; কিন্তু ওই পদের সঙ্গে সম্পৃক্ত সেসব গুণকে অবান্তর লক্ষণ বলে। যেমন—মানুষের দুই হাত, দুই পা, দুই চোখ, জন্মস্থান, গায়ের রং ইত্যাদি। উদ্দীপকে শুভ মানুষের সংজ্ঞায় দুই হাতবিশিষ্ট প্রাণী বলায় এতে অবান্তর সংজ্ঞা অনুপপত্তি ঘটেছে।

ঘ) মাহিনের কথাটি যথার্থ। অর্থাৎ সব পদের সংজ্ঞা দেওয়া সম্ভব নয়। নিচে এর ব্যাখ্যা করা হলো।

শ্রেণিবাচক ও জাত্যর্থবিশিষ্ট পদেরই সংজ্ঞা দেওয়া সম্ভব। জাত্যর্থ হচ্ছে কোনো পদের সাধারণ ও আবশ্যিক গুণ, যা ওই পদের অন্তর্ভুক্ত সবার মধ্যে থাকে। জাত্যর্থের মধ্যেই আসন্নতম জাতি ও বিভেদক লক্ষণ থাকে। যেসব পদের সংজ্ঞা দেওয়া যায় না—যুক্তিবিদরা সেগুলোকে বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করেন। যেমন—

(১) সর্বোচ্চ জাতি : সর্বোচ্চ বা পরম জাতি হচ্ছে দ্রব্য। দ্রব্যের আসন্নতম জাতি ও বিভেদক লক্ষণ নেই; তাই এর জাত্যর্থ নির্ণয় করা যায় না আর সে কারণে সংজ্ঞাও প্রদান করা সম্ভব নয়।

(২) স্বকীয় নামবাচক পদ : এ ধরনের পদ অর্থহীন হওয়ায় এদের অপরিহার্য গুণের উল্লেখ সম্ভব নয়। আর সে কারণে সংজ্ঞা দেওয়া যায় না। যেমন—রহিম, করিম, খালিদ ইত্যাদি নামবাচক পদের সংজ্ঞায়ন করা যায় না।

(৩) বিশিষ্ট গুণবাচক নাম : লাল, নীল, হলুদ ইত্যাদি রং বা গুণের নামের সংজ্ঞা দেওয়া যায় না; কারণ এগুলোর বিভেদক লক্ষণ নির্ণয় করা যায় না।

(৪) পরম নিয়ম : প্রকৃতির নিয়মানুবর্তিতা নীতি, কার্যকারণ নিয়ম প্রভৃতি পরম নিয়মের সংজ্ঞা দেওয়া যায় না। কারণ এসবের আসন্নতম জাতি নেই এবং জাত্যর্থ নির্ণয়ও সম্ভব নয়।

(৫) মৌলিক মানসিক গুণ বা অবস্থা : যেমন সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা—এগুলোর সংজ্ঞা দেওয়া যায় না। এগুলোকে কোনো শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত করা যায় না এবং জাত্যর্থ নির্ণয় করাও সম্ভব নয়।

(৬) অনন্য মৌলিক ধারণা : দেশ, কাল, আত্মা, ঈশ্বর—এগুলো অনন্য মৌলিক ধারণা। এগুলোকে অন্য জাতির অন্তর্ভুক্ত করা যায় না; তাই সংজ্ঞায়ন করা যায় না।

(৭) বিশিষ্ট বস্তু : একক বা বিশিষ্ট বস্তুর অসংখ্য বৈশিষ্ট্য থাকে। এ ক্ষেত্রে কিছু মৌলিক বৈশিষ্ট্যের উল্লেখের মাধ্যমে আমরা এগুলোকে চিনতে পারি, কিন্তু এভাবে এগুলোর সংজ্ঞা দেওয়া সম্ভব নয়। যেমন—আকাশ, মাটি, বায়ু ইত্যাদির সংজ্ঞা দেওয়া যায় না।

সুতরাং আমরা বলতে পারি, মাহিনের কথায় যৌক্তিক সংজ্ঞার সীমাবদ্ধতার ইঙ্গিত এসেছে। অর্থাৎ সব কিছুর সংজ্ঞা দেওয়া সম্ভব নয়।


মন্তব্য