kalerkantho


সপ্তম শ্রেণি

বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়

শামীমা ইয়াসমিন, প্রভাষক, রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ, ঢাকা   

২১ এপ্রিল, ২০১৭ ০০:০০



বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন

সৃজনশীল প্রশ্ন

উদ্দীপকটি পড়ে প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও :

একটি দেশের ছাত্র-জনতা মাতৃভাষায় কথা বলার জন্য এবং নিজ ভাষায় শিক্ষা অর্জনের অধিকার রক্ষার জন্য বুকের তাজা রক্ত উৎসর্গ করেছিল। ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে রাজপথ উত্তাল করেছিল। পরবর্তী সময় এ আন্দোলন থেকেই ওই দেশটির বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রাম চেতনা লাভ করেছিল।

ক) ‘আরেক ফাল্গুন’ উপন্যাসটির রচয়িতা কে?

খ) ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’-এর কর্মসূচি ব্যাখ্যা করো।

গ) উদ্দীপকে উল্লিখিত আন্দোলনের সঙ্গে মিল রেখে পাঠ্য বইয়ের এ ধরনের একটি আন্দোলনের সাদৃশ্য দেখাও।

ঘ) ‘এ ধরনের একটি আন্দোলন বাংলা ভাষাকে পৃথিবীর দরবারে পরিচিত করে দিয়েছে। ’ বিশ্লেষণ করো।

উত্তর : ক) ‘আরেক ফাল্গুন’ উপন্যাসটির রচয়িতা জহির রায়হান।

খ) ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বর মাসে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার উদ্দেশ্যে ঢাকায় নতুন করে ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, সচিবালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সভা-সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ পুনর্গঠিত হয়। ১১ মার্চ ‘বাংলা ভাষা দাবি দিবস’ পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়। ওই দিন সাধারণ ধর্মঘট পালিত হয়। ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ এ কর্মসূচি পালনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

গ) উদ্দীপকে উল্লিখিত আন্দোলনের সঙ্গে বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনের সাদৃশ্য রয়েছে। উদ্দীপক থেকে জানা যায়, একটি দেশের ছাত্র-জনতা নিজেদের মাতৃভাষায় কথা বলার জন্য এবং নিজ ভাষায় শিক্ষা অর্জনের অধিকার রক্ষার জন্য বুকের তাজা রক্ত উৎসর্গ করেছিল। পাঠ্যপুস্তকের আলোকে এখানে ভাষা আন্দোলনের চিত্র ফুটে উঠেছে। ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বর মাসে করাচিতে অনুষ্ঠিত এক শিক্ষা সম্মেলনে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গৃহীত হলে পূর্ব পাকিস্তানে তীব্র প্রতিবাদ শুরু হয়। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি উঠে, লেখালেখি শুরু হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, সচিবালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সভা-সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। পাকিস্তান সরকার ১৪৪ ধারা জারিসহ সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। ১১ মার্চ ‘বাংলা ভাষা দাবি দিবস’ পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়। ওই দিন সাধারণ ধর্মঘট পালিত হয়। ২০ ফেব্রুয়ারি সকাল ১১টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় (ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের সম্মুখ চত্বর) একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সিদ্ধান্ত হয়, ১০ জন করে মিছিল শুরু করা হবে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের দিক থেকে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল এগিয়ে চলে। পুলিশ প্রথমে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে, মিছিলে লাঠিপেটা ও কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে। একপর্যায়ে পুলিশ গুলিবর্ষণ করলে জব্বার, রফিক, সালামসহ আরো অনেকে শহীদ হন এবং অসংখ্য লোক আহত হয়। ১৯৪৭ সালে সূচিত রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন ১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ সালে প্রতিবাদ ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রূপান্তরিত হলো। এ আন্দোলন বাঙালিদের মধ্যে ঐক্য ও স্বাধীনতার চেতনা জাগিয়ে তোলে। উল্লিখিত আলোচনা থেকে এটা স্পষ্ট যে, উদ্দীপকে উল্লিখিত আন্দোলনের সঙ্গে পাঠ্য বইয়ের পূর্ব পাকিস্তানের তথা বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনের সাদৃশ্য রয়েছে।

 

ঘ) বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশে ভাষা আন্দোলন সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করে। ভাষাকেন্দ্রিক এই একই জাতীয়তাবাদের মূলভিত্তি রচনা করে, যা পরবর্তী সময়ে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ১৯৫৩ সাল থেকে ২১শে ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবস হিসেবে দেশব্যাপী পালিত হয়ে আসছে। প্রতিবছর ২১শে ফেব্রুয়ারি শহীদ মিনারে নগ্ন পায়ে হেঁটে ফুল অর্পণ করে আমরা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাই। বাঙালি জাতির কাছে এটি একটি শোকের চেতনায় উজ্জীবিত হওয়ার দিন। ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ইউনেসকো বাংলাদেশের ২১শে ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবসকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে। পৃথিবীতে ছয় হাজারের বেশি ভাষা রয়েছে। এ দিন পৃথিবীর সব ভাষার মানুষ অন্য যেকোনো ভাষা বা সংস্কৃতির প্রতি সম্মান জানায়, সে সুযোগ করে দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের ২১শে ফেব্রুয়ারিতে ভাষার জন্য জনগণের আন্দোলন ও রক্ত দানের ইতিহাস পৃথিবীর জাতিগুলোর নিকট উপস্থাপিত হওয়া সুযোগ হলো। পৃথিবীর সব জাতি ২১শে ফেব্রুয়ারি নিজ নিজ ভাষার গুরুত্ব উপলব্ধি করার সুযোগ পেয়েছে। অতএব বলা যায়, এ ধরনের আন্দোলন বাংলা ভাষাকে পৃথিবীর দরবারে পরিচিত করে দিয়েছে।


মন্তব্য