kalerkantho


অষ্টম শ্রেণি : বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়

সৃজনশীল প্রশ্ন

তাহেরা খানম, সহকারী শিক্ষক মিরপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, মিরপুর, ঢাকা   

১৫ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



অষ্টম শ্রেণি : বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়

পর্তুগিজ নাবিক ভাস্কো দা গামা ভারতের কালিকট বন্দরে পৌঁছেন ১৪৯৮ সালে

ঔপনিবেশিক যুগ ও বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রাম

 

উদ্দীপকটি পড়ে নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও :

১। প্রাচীনকাল থেকেই বাংলাদেশ ধন-সম্পদে পরিপূর্ণ ছিল। এ জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে বণিকরা এ দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে আসত। কিন্তু এসব ব্যবসায়ী বা বণিক একসময় প্রভাবশালী হয়ে ওঠে এবং দেশের রাজশক্তিতে পরিণত হয়। তারা এ দেশের জনগণের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ করতে থাকে। এদের মধ্যে সপ্তদশ শতকে আসা বণিকদের ভূমিকা ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

(ক) ইংল্যান্ডে দি ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানি প্রতিষ্ঠিত হয় কত সালে?

(খ) ভারতবর্ষে বিশ্ববাণিজ্য কিভাবে বিস্তার লাভ করেছিল?

(গ) উদ্দীপকে সপ্তদশ শতকে বাংলাদেশে কোন বণিকদের আগমনের কথা বোঝানো হয়েছে? ব্যাখ্যা করো।

(ঘ) ওই বণিকরা বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সম্পদকে কিভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল? যুক্তিসহ বর্ণনা করো।

উত্তর :

(ক) ইংল্যান্ডে দি ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৬০০ সালে।

(খ) ইউরোপে যুগান্তকারী বাণিজ্য-বিপ্লবের ফলে ভারতবর্ষে বিশ্ববাণিজ্য বিস্তার লাভ করেছিল।

১৪ শতক থেকে ইউরোপে যুগান্তকারী বাণিজ্য-বিপ্লবের সূচনা হয়।

তখন একদিকে তাদের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ও সংগঠনগুলো শক্তিশালী হতে শুরু করে আর অন্যদিকে কাঁচামাল ও উৎপাদিত সামগ্রীর জন্য বাজারের সন্ধানও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ১৪৯৮ সালে পর্তুগিজ নাবিক ভাস্কো দা গামা দক্ষিণ ভারতের কালিকট বন্দরে পৌঁছে ভারতবর্ষকে বিশ্ব-বাণিজ্যে বিস্তারের প্রতিযোগিতার মধ্যে নিয়ে আসেন। আর দক্ষ নাবিক আল বুকার্ক ভারত মহাসাগরে কর্তৃত্ব অধিকার করে এককথায় পুরো ভারতের বহির্বাণিজ্য করায়ত্ত করে নেন।

(গ) উদ্দীপকে সপ্তদশ শতকে বাংলাদেশে ওলন্দাজ, দিনেমার, ইংরেজ ও ফরাসি বণিকদের আগমনের কথা বোঝানো হয়েছে।

হল্যান্ডের অধিবাসীরা ডাচ্ বা ওলন্দাজ নামে পরিচিত। তারা ১৬০২ খ্রিস্টাব্দে ‘ডাচ্ ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানি’ নামের একটি বাণিজ্য সংঘ গঠন করে বাংলাদেশে ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা করে। দিনেমাররা ছিল ডেনমার্কের অধিবাসী। ১৬১৬ সালে তারা ‘ডেনিস ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানি’ গঠন করে বাংলাদেশে বাণিজ্যিক কার্যক্রম চালায়। ১৬০০ সালে ২১৭ জন ইংরেজ বণিক ‘ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানি’ নামের একটি বণিক সংঘ গঠন করে বাংলাদেশে ব্যবসা-বাণিজ্য করে। সর্বশেষ ১৬৬৪ সালে ফরাসিরা ‘ফরাসি ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানি’ গঠন করে এ দেশে ব্যবসা করে।

উদ্দীপকে বলা হয়েছে, প্রাচীনকালে বাংলাদেশের ধন-সম্পদে আকৃষ্ট হয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে বণিকরা আগমন করেছিল। প্রথমে তারা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে এলেও পরবর্তী সময় রাজশক্তিতে পরিণত হয়। তারা এ দেশের জনগণের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ করে। সপ্তদশ শতকে বাংলাদেশে ওই বণিকরা আগমন করেছিল এবং তাদের আচরণও ছিল অনুরূপ। ওলন্দাজ বণিকরা মাদ্রাজের নাগাপট্রম এবং পশ্চিমবঙ্গের চুচূড়া ও বাকুরায় বাণিজ্যকুঠি স্থাপন করে। তারা বাংলাদেশ থেকে কাঁচা রেশমি সুতা, সুতি কাপড়, চাল, ডাল, তামাক ইত্যাদি পণ্য বিদেশে রপ্তানি করত। দিনেমাররা তাঞ্জোরের ট্রাংকুবার এবং পশ্চিম বাংলার শ্রীরামপুরে বাণিজ্যকুঠি স্থাপন করে ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা করে। ইংরেজরা ইংল্যান্ডের রানি প্রথম এলিজাবেথের কাছ থেকে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ব্যবসা করার সনদ লাভ করে। ১৬১২ সালে মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের কাছ থেকে তারা সুরাটে বাণিজ্যকুঠি স্থাপন করার অনুমতি লাভ করে। ১৬১৬ সালে মুসলিম পট্রমে তাদের দ্বিতীয় বাণিজ্যকুঠি স্থাপন করে। এ ছাড়া তারা পর্যায়ক্রমে আগ্রা, আহমেদাবাদ প্রভৃতি স্থানেও কুঠি স্থাপন করে। সপ্তদশ শতকে বিদেশি বণিকদের মধ্যে সব শেষে আসে ফরাসিরা। তারা সুরাট, পণ্ডিচেরি, চন্দননগর, মাহে, কারিকল, মুসলিম পট্রম, বালেশ্বর, কাশিমবাজার প্রভৃতি স্থানে বাণিজ্যকুঠি স্থাপন করে ব্যবসা কার্যক্রম পরিচালনা করে। এসব বণিকের সবাই পরবর্তী সময় এ দেশের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করে এবং জনগণের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ করে।

(ঘ) সপ্তদশ শতকে আসা বিদেশি বণিকরা সম্পদ পাচার করে এ দেশের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিয়েছিল।

ইউরোপের কতিপয় দেশে খনিজ সম্পদের আবিষ্কার, সমুদ্রপথে বাণিজ্যের বিস্তার এবং কারিগরি ও বাণিজ্যিক বিকাশের ফলে অর্থনীতি চাঙ্গা হয়ে ওঠে। ফলে ইউরোপে যুগান্তকারী বাণিজ্য বিপ্লবের সূচনা হয়। তাদের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ও সংগঠনগুলো শক্তিশালী হতে শুরু করে। অন্যদিকে কাঁচামাল ও উৎপাদিত সামগ্রীর জন্য তারা বাজারের সন্ধানে নেমে পড়ে।

উদ্দীপকে ওলন্দাজ, দিনেমার, ইংরেজ ও ফরাসি বণিকদের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। কেননা সপ্তদশ শতকে এসব বণিক বাংলাদেশে বাণিজ্য করতে এসেছিল। বাণিজ্যের নামে এ দেশে এলেও পরবর্তী সময় তারা অনেক প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। তারা একদিকে এ দেশের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করে, অন্যদিকে এ দেশের মূল্যবান সম্পদ তাদের নিজ নিজ দেশে পাচার করতে থাকে। তারা বাংলাদেশ তথা ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন স্থানে বাণিজ্যকুঠি স্থাপন করে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে থাকে এবং এ দেশ থেকে পণ্যসামগ্রী বিদেশে রপ্তানি করে মুনাফা অর্জন করতে থাকে। পুঁজির জোর ও উন্নত কারিগরি জ্ঞানকে সমন্বয় করে এসব বিদেশি বণিক এ দেশের স্থানীয় শ্রমিকদের খাটিয়ে বড় বড় শিল্প-কারখানা স্থাপন করে। ফলে তারা প্রচুর মুনাফা অর্জন করতে থাকে এবং এসব মুনাফা বিদেশে পাচার করতে থাকে, যা অর্থনীতির ভাষায় পুঁজি পাচার নামে খ্যাত। এভাবে এ দেশের সম্পদ পাচার করে বাংলাদেশ তথা ভারতীয় উপমহাদেশের অর্থনীতিকে তারা পঙ্গু করে দিয়েছিল। উল্লিখিত বণিকরা যদি এভাবে বাংলাদেশের সম্পদ পাচার না করত তাহলে এ দেশ আরো অনেক উন্নত হতো।

সুতরাং আমরা বলতে পারি যে উদ্দীপকে ইঙ্গিতকৃত ওলন্দাজ, দিনেমার, ইংরেজ ও ফরাসি বণিকরা বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সম্পদকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল।


মন্তব্য