kalerkantho


পঞ্চম শ্রেণি : বাংলা

রচনা

লুত্ফা বেগম, সিনিয়র শিক্ষক বিএএফ শাহীন কলেজ কুর্মিটোলা, ঢাকা   

১৩ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০




পঞ্চম শ্রেণি : বাংলা

হাজার হাজার প্রশিক্ষিত ইংরেজ সৈন্য আর গোলা-বারুদের বিরুদ্ধে অল্প সংখ্যক যোদ্ধা নিয়ে লড়াই করেন তিতুমীর

শহীদ তিতুমীর

ভূমিকা : ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে যাঁর নামটি জড়িত, তিনি হলেন সৈয়দ মীর নিসার আলী ওরফে তিতুমীর।

জন্ম পরিচয় : তিতুমীর ভারতের পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনা জেলার বশিরহাট মহকুমার চাঁদপুর (মতান্তরে হায়দারপুর) গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে ১৭৮২ সালে জন্মগ্রহণ করেন।

তিতুমীর নামকরণ : সৈয়দ মীর নিসার আলীর শিশুকালে একবার কঠিন অসুখ হয়। রোগ সারানোর জন্য তাঁকে দেওয়া হয় ভীষণ তেতো ওষুধ। সেই তেতো ওষুধ শিশুটি আনন্দের সঙ্গে ১০-১২ দিন খায়। এ জন্য ওর ডাকনাম রাখা হয় তেতো। তেতো থেকে তিতু। তার সঙ্গে মীর লাগিয়ে হলো তিতুমীর।

শিক্ষাজীবন : তিতুমীর তাঁর গ্রামের মাদ্রাসায় পড়তেন। সেখানে পড়াকালে অল্প সময়েই তিনি ধর্ম শিক্ষক হাফেজ নেয়ামত উল্লাহর প্রিয় পাত্র হয়ে ওঠেন।

স্বদেশ চেতনা : তিতুমীরের জন্মলগ্নে পরাধীন ভারতবর্ষে একদিকে ইংরেজ, অন্যদিকে দেশীয় জমিদাররা অত্যাচার চালাত।

তিতুমীর ছোটবেলা থেকেই এসব দেখতেন আর অত্যাচারীদের হাত থেকে দেশের মানুষের মুক্তির উপায় খুঁজতেন।

শারীরিক শক্তি অর্জন : সেকালে গ্রামে গ্রামে ডন কুস্তি ও শরীরচর্চার ব্যায়াম হতো। শেখানো হতো মুষ্টিযুদ্ধ, লাঠিখেলা, তীর ছোড়া আর অসিচালনা। উদ্দেশ্য ছিল ইংরেজ তাড়ানোর জন্য গায়ে শক্তি সঞ্চয় করা। তিতুমীর একে একে সবই শিখে নেন।

অসাম্প্রদায়িক মনোভাব : তিতুমীর একবার ওস্তাদের সঙ্গে বিহার সফরে গিয়ে মানুষের দুরবস্থা দেখে মনে মনে দেশকে স্বাধীন করার চিন্তা করেন। তাই তিনি মুসলমানদের সত্যিকার মুসলমান হতে আর হিন্দুদের অত্যাচারী জমিদারদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে আহ্বান জানান। উভয় পক্ষই তাঁর আহ্বানে সাড়া দেয়।

মক্কা গমন : মাত্র ৪০ বছর বয়সে ১৯২২ সালে তিতুমীর মক্কায় যান হজ পালন করতে। সেখানে পরিচয় ঘটে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম ব্যক্তিত্ব ধর্মপ্রাণ সংগ্রামী পুরুষ শাহ সৈয়দ আহমদ বেরলভীর সঙ্গে। তিতুমীর তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন।

স্বাধীনতার ঘোষণা : তিতুমীর দেশে ফিরে মুক্তিকামী জনসাধারণকে নিয়ে ঘোষণা দিলেন ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়তে, নীলকরদের রুখতে আর নিজেদের সংগঠিত হতে।

বাঁশের কেল্লা স্থাপন : তিতুমীর ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে প্রথম বাধা পান জমিদারদের কাছ থেকে। তখন তিনি নিজ গ্রাম ছেড়ে বারাসাতের নারিকেল বাড়িয়ায় গিয়ে একটি দুর্ভেদ্য বাঁশের দুর্গ নির্মাণ করেন, যার নাম নারিকেল বাড়িয়ার ‘বাঁশের কেল্লা’। তাঁর এ কেল্লায় সৈন্যসংখ্যা ছিল চার-পাঁচ হাজার। আর তাঁর দখলে ছিল চব্বিশ পরগনা, নদীয়া ও ফরিদপুর জেলা। ইংরেজদের কোনো কর্তৃত্বই ছিল না এসব অঞ্চলে।

ইংরেজদের সঙ্গে যুদ্ধ : তিতুমীর তাঁর দুর্গে শিষ্যদের ইংরেজদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধ কৌশল শিক্ষা দেন। এ খবর ইংরেজ শাসকদের কানে পৌঁছলে ১৮৩০ সালে তিতুমীরকে দমন করার জন্য ম্যাজিস্ট্রেট আলেকজান্ডারকে পাঠানো হয়। কিন্তু আলেকজান্ডার তাঁর সিপাহি বাহিনী নিয়ে পরাস্ত হন। ১৮৩১ সালের ১৯ নভেম্বর আবার সেনাপতি কর্নেল স্টুয়ার্ড বাঁশের কেল্লা আক্রমণ করেন। স্টুয়ার্ডের হাজার হাজার প্রশিক্ষিত সৈন্য আর গোলা-বারুদের বিরুদ্ধে মাত্র চার-পাঁচ হাজার সৈন্য নিয়ে পেরে উঠলেন না তিতুমীর। ইংরেজদের গোলার আঘাতে ছারখার হয়ে যায় তাঁর বাঁশের কেল্লা, আর প্রাণপণ যুদ্ধে শহীদ হলেন তিতুমীরসহ অসংখ্য মুক্তিকামী বীরসৈনিক।

উপসংহার : আজ থেকে প্রায় পৌনে ২০০ বছর আগে তিতুমীর পরাধীন ভারতবর্ষের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছিলেন। ইংরেজদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার যুদ্ধে বীর তিতুমীরই হলেন বাংলার প্রথম শহীদ।

 

টেলিভিশন

ভূমিকা : ‘টেলিভিশন’ এমনই এক জাদুর বাক্স, যা বর্তমান পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের মধ্যে বিনোদনের শ্রেষ্ঠ মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে। বেতার যন্ত্র ও চলচ্চিত্রের পর টেলিভিশনই হচ্ছে অত্যাশ্চর্য আবিষ্কার।

নামকরণ : ল্যাটিন শব্দ ‘টেলি’ (ঞবষব) এবং ‘ভিসিও’ (ঠরংরড়) থেকে টেলিভিশন শব্দটি এসেছে। ‘টেলি’ শব্দের অর্থ দূরত্ব এবং ‘ভিসিও’ শব্দের অর্থ দেখা। অর্থাৎ যে যান্ত্রিক পদ্ধতির মাধ্যমে দূরের কোনো দৃশ্যকে দেখতে পাওয়া যায়, তাকে টেলিভিশন বলে।

আবিষ্কার : জার্মান বিজ্ঞানী পল নিপকও সর্বপ্রথম টেলিভিশন যন্ত্রের উদ্ভাবন সম্পর্কে তাঁর অভিমত ব্যক্ত করেন। এর ওপর ভিত্তি করে ১৯২৫ সালে ইংরেজ বিজ্ঞানী জন বেয়ার্ড টেলিভিশন আবিষ্কার করেন। বহু পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে ১৯৪৫ সালে এ যন্ত্রটি পূর্ণরূপ লাভ করে।

সম্প্রচার : সর্বপ্রথম ব্যবসায়িক ভিত্তিতে টেলিভিশন চালু করে লন্ডনের ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং করপোরেশন (বিবিসি)। আমাদের বাংলাদেশে টেলিভিশন চালু হয়েছে ১৯৬৫ সালে। প্রথমে ঢাকার ডিআইটি (রাজউক) ভবন থেকে টেলিভিশনের সম্প্রচার শুরু হয়। পরে চট্টগ্রাম, সিলেট, রংপুর, খুলনা ও ময়মনসিংহে উপকেন্দ্র স্থাপিত হওয়ায় সমগ্র বাংলাদেশ টেলিভিশন প্রচারের আওতায় এসেছে। ১৯৯৬ সালে চট্টগ্রামে পূর্ণাঙ্গ টেলিভিশন ভবন নির্মিত হয়েছে এবং সেখানে একটি পৃথক কেন্দ্র চালু হয়েছে।

টেলিভিশনের ব্যবহার : টেলিভিশন প্রায় সব দেশেই ব্যাপকভাবে প্রচলিত। আমাদের দেশে টেলিভিশন মূলত খবর ও বিনোদনের মাধ্যম হিসেবেই কাজ করছে। স্যাটেলাইট টিভি ও ডিশ অ্যান্টেনার মাধ্যমে এ দেশের টিভি দর্শকরা বিনোদনের অনেক সুযোগ পাচ্ছে।

টেলিভিশনে শিক্ষা : শিক্ষার্থীদের দিকনির্দেশনা, বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা বৃদ্ধি, ভাষা শিক্ষা প্রভৃতি ক্ষেত্রে টেলিভিশন শিক্ষকের মতো ভূমিকা পালন করছে। দেশের আপামর জনগোষ্ঠীকে গণশিক্ষা কার্যক্রমের আওতায় আনার ক্ষেত্রে টেলিভিশনের কার্যকারিতা অনেক।

জনপ্রিয় সংবাদমাধ্যম : বর্তমান বিশ্বের প্রচারমাধ্যম হিসেবে টেলিভিশন বিশেষ স্থান করে নিয়েছে। তথ্যের পাশাপাশি ছবি ও সংলাপ সরাসরি প্রচার করে এটি। সারা বিশ্বের মানুষ বস্তুনিষ্ঠ ও নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম হিসেবে এ যন্ত্রের ওপর ক্রমে নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে।

উপকারিতা : টেলিভিশন থেকে আমরা বহু উপকার পেয়ে থাকি। আমাদের কৃষিপ্রধান দেশে কৃষির মান উন্নয়নে টেলিভিশন রাখছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। দেশের জনগণকে সচেতন ও দায়িত্বশীল হিসেবে গড়ে তোলার জন্য আমাদের টেলিভিশন এরই মধ্যে কাজ শুরু করেছে। জনসংখ্যা ও বেকার সমস্যা মোকাবেলা করায় টেলিভিশন বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে ব্যাপকভাবে গণসচেতনতা সৃষ্টি করেছে। স্বাস্থ্য সম্পর্কেও প্রদান করছে বিশেষ জ্ঞান। দেশ-বিদেশের খবর প্রচার ছাড়াও সাংস্কৃতিক চেতনা বিকাশে যেমন—সংগীত, নৃত্য, আবৃত্তি, বিতর্ক, নাটক ইত্যাদিতে রাখছে অনন্য ভূমিকা।

অপকারিতা : সুষ্ঠু ও সুচারুভাবে যদি টেলিভিশনকে পরিচালিত না করা হয়, তাহলে পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে এর কুফল দেখা দেয়। কুরুচিপূর্ণ নাচ, গান, নাটক ইত্যাদি জনগণের নৈতিক চরিত্রের স্খলন ঘটায়। অতিরিক্ত টেলিভিশন দেখলে ছাত্র-ছাত্রীদের লেখাপড়ার যথেষ্ট ক্ষতি হয় এবং দৃষ্টিশক্তিরও অপচয় সাধিত হয়।

উপসংহার : বর্তমানে টেলিভিশন বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় প্রচারমাধ্যম। তাই আমাদের টেলিভিশনের অনুষ্ঠানের মান আরো বাড়াতে হবে।

 


মন্তব্য