kalerkantho


অষ্টম শ্রেণি চারু ও কারুকলা

পাঠ প্রস্তুতি

মো. জাকির হোসেন, সিনিয়র শিক্ষক বিএএফ শাহীন কলেজ কুর্মিটোলা, ঢাকা   

২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০




অষ্টম শ্রেণি

চারু ও কারুকলা

ষাট গম্বুজ মসজিদ, খুলনা

প্রথম অধ্যায়

বাংলাদেশের প্রাচীন শিল্পকলা ও ঐতিহ্যের পরিচয়

 

১। নিচে উল্লেখিত স্থানগুলোর মধ্যে যেকোনো ৩টি স্থান সম্পর্কে বর্ণনা করো।

ময়নামতি, মহাস্থানগড়, পাহাড়পুর, ষাট গম্বুজ মসজিদ, কান্তজির মন্দির, বাঘা মসজিদ, তারা মসজিদ।

উত্তর :

কান্তজির মন্দির : বাংলাদেশের প্রাচীন স্থাপত্য শিল্পগুলোর মধ্যে দৃষ্টিনন্দন, শিল্পের অনুপম নির্মাণরীতি, সৌন্দর্য ও ঐতিহ্যে কান্তজির মন্দির বিখ্যাত। দিনাজপুর জেলায় অবস্থিত কান্তজির মন্দিরটি ‘নবরত্ন’ মন্দির নামেও পরিচিত, কারণ তিন তলাবিশিষ্ট এই মন্দিরের ৯টি চূড়া বা রত্ন ছিল। মন্দিরের উত্তর দিকের ভিত্তিবেদির শিলালিপি থেকে জানা যায়, তৎকালীন দিনাজপুরের মহারাজা জমিদার প্রাণনাথ রায় তাঁর শেষ বয়সে মন্দিরের নির্মাণকাজ শুরু করেন। শুরুতে মন্দিরের উচ্চতা ছিল ৭০ ফুট। পরবর্তী সময় ভূমিকম্পে এর চূড়াগুলো ভেঙে যায়।

মন্দির প্রাঙ্গণ আয়তাকার হলেও পাথরের ভিত্তির ওপরে দাঁড়ানো ৫০ ফুট উচ্চতার মন্দিরটি বর্গাকার। ওপরের দিকে তিন ধাপে উঠে গেছে মন্দিরটি। নিচতলায় সব প্রবেশপথে বহু খাঁজযুক্ত খিলান রয়েছে।

মন্দিরের চারদিকের সব খিলান দিয়েই ভেতরের দেবমূর্তি দেখা যায়। দুটি ইটের স্তম্ভ দিয়ে খিলানগুলো আলাদা করা হয়েছে। স্তম্ভ দুটি খুবই সুন্দর ও সমৃদ্ধ অলংকরণযুক্ত।

অন্যান্য মন্দিরের চেয়ে কান্তজির মন্দিরের আলাদা বৈশিষ্টের কারণে এটি অনন্য। পুরো মন্দিরে প্রায় ১৫ হাজারের মতো টেরাকোটা টালি রয়েছে। মন্দিরের বাইরের সম্পূর্ণ দেয়াল পোড়ামাটির উত্কৃষ্ট ফলকচিত্রের অলংকরণে সুশোভিত, এসব ফলকচিত্রে উদ্ভিদ ও প্রাণিকুল, জ্যামিতিক নকশা, রামায়ণ ও মহাভারতের পৌরাণিক কাহিনীর দৃশ্যাবলি তৎকালীন সামাজিক ও অবসর বিনোদনের চমৎকার দৃশ্য খচিত রয়েছে। এ ছাড়া চিত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে নারী-পুরুষ, দেব-দেবী, যোদ্ধা, গায়ক, বাদক, শিকারি, হাতি-ঘোড়াসহ আরো অসংখ্য চরিত্র। ছাঁচ ব্যবহার করে পোড়ামাটির চিত্রিত ফলকগুলো খুবই দক্ষতার সঙ্গে তৈরি করা হয়েছিল। সব কিছু মিলিয়ে এই মন্দির অলংকরণে অদ্বিতীয়। দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্যশিল্পের অনুপম নির্মাণরীতি, সৌন্দর্য ও ঐতিহ্যের কারণে কান্তজির মন্দির সারা বিশ্বের পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় বিষয়।

১৯৬০ সালে স্থানটিকে সংরক্ষিত প্রাচীন কীর্তি হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

ময়নামতি : মাটির স্তূপ ও গড় অঞ্চল খনন করে আবিষ্কৃত জনপদগুলোর মধ্যে কুমিল্লার ময়নামতি বাংলাদেশের প্রাচীন ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ এবং ঐতিহাসিক স্থানগুলোর মধ্যে বিশেষভাব উল্লেখযোগ্য। ময়নামতি কুমিল্লা শহরের প্রায় আট কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত একটি বিচ্ছিন্ন অনুচ্চ পার্বত্য এলাকা। যত দূর জানা যায়, চন্দ্র বংশের সর্বশেষ রাজা গোবিন্দ চন্দ্রের মা রানি ময়নামতির নামানুসারে এ অঞ্চলের নামকরণ হয় ময়নামতি। এটি ছিল প্রাচীন বঙ্গ সমতটের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কেন্দ্র। প্রকৃতপক্ষে এটি একটি প্রাচীন নগরী ও বৌদ্ধ বিহারের অবশিষ্টাংশ। ময়নামতি এলাকায় যেসব নিদর্শন আবিষ্কার হয়েছে সেগুলো হচ্ছে—শালবন বিহার, কুটিলামুড়া, কৌটবাড়ি মুড়া, আনন্দ মুড়া, রূপবান মুড়া, হাতিগড়া মুড়া, চণ্ডি মুড়া, বালাগাজী মুড়া ও ময়নামতি মুড়া ইত্যাদি। তা ছাড়া ময়নামতিতে আরো রয়েছে ওয়ার সেমেট্রি, ময়নামতি জাদুঘর। এর মধ্যে শালবন বিহার অন্যতম।

প্রত্নতাত্ত্বিক খননকাজের ফলে বাংলাদেশের প্রাচীন শিল্পকর্মের অনেক নিদর্শন এখান থেকে উদ্ধার করা হয়। যেমন—স্বর্ণ ও রুপার মুদ্রা, অলংকার, ব্রোঞ্জ ও তামার তৈরি ব্যবহার্যসামগ্রী, পোড়ামাটির ফলক, পোড়ামাটির সিল ও সিলিং, পোড়ামাটির ভাস্কর্য, ব্রোঞ্জ মূর্তি, শিবলিঙ্গ, বিভিন্ন ধরনের হাঁড়ি-পাতিল, হস্তলিপির পাণ্ডুলিপি ইত্যাদি। ময়নামতিতে অসংখ্য ঢিবি, স্মৃতিস্তম্ভ, খননকৃত ধ্বংসাবশেষ ঘটনাবহুল অতীত ও গৌরবের সাক্ষী হয়ে এখনো টিকে আছে। তবে বৌদ্ধ ধ্বংসাবশেষের জন্যই ময়নামতি জনপদটি সর্বাধিক পরিচিত।

মহাস্থানগড় : আমাদের দেশের গৌরবময় ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারক হিসেবে যেসব স্থান বিখ্যাত সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন হলো ‘মহাস্থানগড়’। বগুড়া শহর থেকে উত্তরে করতোয়া নদীর পশ্চিম তীরে মহাস্থানগড় অবস্থিত। আজ থেকে প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে প্রতিষ্ঠিত এই মহাস্থানগড়। প্রথম দিকে এর নাম ছিল

পুণ্ড্রনগর। এর আয়তন প্রায় এক বর্গমাইল।

মহাস্থানগড়ের প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্য থেকে জানা যায় খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দী থেকে পঞ্চাশ শতাব্দীর মধ্যে একটি সমৃদ্ধিশালী জনপদ হিসেবে গড়ে ওঠে এই শহর। বেশ কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত এখানে মৌর্য, গুপ্ত, পাল ও অন্য সামন্তরাজাদের রাজধানী ছিল। এটি চারদিকে প্রাচীরবেষ্টিত বিশাল উঁচু এলাকা। মাটির নিচ থেকে বের হয়ে আসা অত্যন্ত মজবুত কাঠামোর এই প্রাচীর জানিয়ে দেয় কতটা মজবুত ও সুন্দর ছিল সেই নগরী। দৈর্ঘ্যে প্রায় ৫০০০ ফুট, প্রস্থে ৪৫০০ ফুট, ভূমি থেকে উচ্চতা প্রায় ৪০-৪৫ ফুট।

এখানে পোড়ামাটির ফলক ও ভাস্কর্য, স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রা, পাথর ও কাচের পুঁতি পাওয়া গেছে। গোবিন্দভিটা লখিন্দরের মেধ ও গোকুল মেধ নামে কয়েকটি ধর্মীয় পুরাকীতি পাওয়া গেছে। এখানে প্রাচীনকালের একটি দুর্গ ভাঙা অবস্থায় এখনো দেখতে পাওয়া যায়। দুর্গটির পূর্বদিকে করতোয়া নদী এবং অন্য তিন দিকে চওড়া খাদের চিহ্ন রয়েছে। দুর্গের ভেতরে এক টুকরা বিশেষ ধরনের পাথর পাওয়া গেছে। মহাস্থানগড়ের দক্ষিণ-পূর্ব কোনে মোগল আমলে নির্মিত এক গম্বুজের একটি মসজিদ রয়েছে, যা ‘মহাস্থান মসজিদ’ নামে পরিচিত।

২। বাংলাদেশের ১০টি প্রাচীন স্থাপত্যশিল্পের নাম লেখো।

উত্তর : বাংলাদেশের প্রাচীন শিল্পকলার মধ্যে টিকে থাকা উল্লেখযোগ্য হলো স্থাপত্যশিল্প, যা নানা সময়ে বিভিন্ন শাসকের আমলে স্থাপিত হয়েছে। কালের সাক্ষী এসব স্থাপত্যশিল্পের দেয়ালে পোড়ামাটির ফলকচিত্র, পাথরে খোদাই করা ফলক ও শিলালিপি এখানো প্রায় অক্ষত রয়েছে। এরূপ উল্লেখযোগ্য কিছু স্থাপত্যশিল্প হলো—রাজশাহীর বাঘা মসজিদ, কুসুম্বা মসজিদ, পুঠিয়ার রাজবাড়ি মন্দির, খুলনার ষাট গম্বুজ মসজিদ, লাগবাগের দুর্গ, আহসান মঞ্জিল, ঢাকেশ্বরী মন্দির, দিনাজপুরের কান্তজির মন্দির, মুন্সীগঞ্জের ইন্দ্রাকপুর দুর্গ, কুমিল্লার সতেরো রত্ন মন্দির ইত্যাদি।

৩। প্রাচীন শিল্পকলাগুলো কেন ঐতিহ্যবাহী? সে সম্পর্কে তোমার অভিমত ব্যাখ্যা করো।

উত্তর : একটি দেশের সভ্যতা ও সংস্কৃতির ধারক, বাহক হচ্ছে শিল্পকলা। কয়েক শতাব্দী ধরে বিভিন্ন সময়ে করা প্রাচীন শিল্পকর্মগুলো আমাদের অতীতকে ধারণ করে আছে। কোনো একটি দেশের বা জাতির বিশেষ কোনো আচার-অনুষ্ঠান, রীতি-নীতি, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড কয়েক যুগ কিংবা কয়েক শতাব্দী ধরে চলতে থাকলে তা সে দেশের ঐতিহ্য হিসেবে ধরে নেওয়া হয়, তেমনি আমাদের প্রাচীন শিল্পকলাও যেহেতু কয়েক শতাব্দী ধরে টিকে আছে, তাই এগুলোও আমাদের ঐতিহ্যের বিষয়। এই শিল্পকর্মগুলোর মাধ্যমে আমরা সেই সময়ের মানুষদের জীবনযাপন, আচার-অনুষ্ঠান, সভ্যতা ও সংস্কৃতির পরিচয় পাই। তাই প্রাচীন শিল্পকর্ম, স্থাপত্যগুলো যেমন কালের সাক্ষী হয়ে টিকে আছে, তেমনি আমাদের ঐতিহ্যকেও ধারণ করে আছে।


মন্তব্য