kalerkantho

শুক্রবার । ২ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি : যুক্তিবিদ্যা দ্বিতীয় পত্র

উদ্দীপক

মো: আব্দুল কুদ্দুস, প্রভাষক ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজ মোহাম্মদপুর, ঢাকা   

১৮ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



চতুর্থ অধ্যায় : প্রকল্প

মেহেদী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসরুমে ঢুকেই দেখতে পায় ক্লাসের বেঞ্চগুলো এলোমেলো। জানালার কাচ ভাঙা, দেয়াল ক্ষতবিক্ষত এবং ফ্লোরে রক্তের দাগ।

জিনিসগুলো দেখে সে ভাবল, সম্ভবত মারামারি হয়েছে এখানে। পরে সে প্রতিটি জিনিস আরো ভালো করে পর্যবেক্ষণ করতে লাগল। তার অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, কোনো গ্রুপের মারামারি না হলে এ অবস্থা হতো না। রক্তের দাগ তো সুস্পষ্টভাবেই বলছে এখানে রক্তারক্তি হয়েছে, তা ছাড়া পরে সে পত্রিকায়ও এ প্রসঙ্গে একটি ছোট খবর দেখে, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই গ্রুপে মারামারি’।

ক. প্রকল্প কাকে বলে?

খ. যাচাইকরণ কেন প্রকল্পের প্রমাণ?

গ. আরোহ অনুমান প্রক্রিয়ায় উদ্দীপকের ঘটনাটির সম্পর্ক ব্যাখ্যা করো।

ঘ. মেহেদীর কার্যক্রমে কি প্রকল্পের সব স্তরের প্রতিফলন ঘটেছে? মতামত দাও।

 

উত্তর :

ক. প্রকল্প হলো কোনো বিষয়কে বৈজ্ঞানিকভাবে ব্যাখ্যা করার উদ্দেশ্যে প্রণীত আনুমানিক ধারণা।

খ. প্রকল্প প্রমাণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড হলো যাচাইকরণ। এর কারণ, যাচাইকরণের মাধ্যমেই জানা যায় বাস্তবের সঙ্গে প্রকল্পটি কতটুকু সংগতিপূর্ণ। প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে যাচাই করা হলে তাকে প্রত্যক্ষ যাচাইকরণ বলে। পরীক্ষণ ও নিরীক্ষণের মাধ্যমে প্রত্যক্ষ যাচাইকরণ হতে পারে। আবার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে যাচাই করা সম্ভব না হলে পরোক্ষভাবে যাচাই করতে হয়। সেটি অবরোহমূলকভাবে অথবা ঘটনা সংকলনের ভিত্তিতে হতে পারে। তাই বলা যায়, যাচাইকরণ ছাড়া প্রকল্পের প্রমাণ হতে পারে না।

গ. উদ্দীপকের ঘটনাটি প্রকল্পের একটি দৃষ্টান্ত। কারণ আমরা জানি, প্রকল্প হচ্ছে কোনো কিছু সম্পর্কে আনুমানিক ধারণা গঠন। আর এখানে মেহেদী ক্লাসরুমের অবস্থা দেখে প্রাথমিকভাবে ধারণা করে এখানে মারামারি হয়েছে। তাই এটি একটি প্রকল্প। আরোহ অনুমানের সঙ্গে প্রকল্পের সম্পর্ক রয়েছে। নিচে তা ব্যাখ্যা করা হলো।

আরোহ অনুমানের সঙ্গে প্রকল্পের সম্পর্ক নিয়ে তিন ধরনের মতামত পাওয়া যায়। যুক্তিবিদ ফ্রান্সিস বেকন ও বিজ্ঞানী নিউটনের মতে, আরোহের সঙ্গে প্রকল্পের কোনো সম্পর্ক নেই বা আরোহে প্রকল্পের কোনো গুরুত্ব নেই। তাঁদের মতে, নিরীক্ষণ ও অপসারণের সূত্র প্রয়োগ করে প্রাকৃতিক নিয়ম আবিষ্কার করা যায়। এতে প্রকল্পের প্রয়োজন নেই।

যুক্তিবিদ মিলের মতে, আরোহের সঙ্গে প্রকল্পের সম্পর্ক খুব সীমিত। তাঁর মতে, আরোহ কোনো আবিষ্কারের পদ্ধতি নয়, এটা প্রমাণের পদ্ধতি। তাই আরোহের সঙ্গে এর প্রত্যক্ষ সম্পর্ক নেই।

তবে যুক্তিবিদ হিওয়েল ও সমকালীন যুক্তিবিদরা মনে করেন আরোহ অনুমানের সঙ্গে প্রকল্পের সম্পর্ক প্রত্যক্ষ। তাঁরা বলেন, একটি বৈধ প্রকল্প ও একটি আরোহ অনুমান সমপর্যায়ভুক্ত। হিওয়েল বলেন, ‘প্রকল্প হচ্ছে আরোহ অনুমানের প্রারম্ভিক বিন্দু’ (Hypothesis is the starting point of induction.)। তিনি মনে করেন, প্রকল্প ছাড়া আরোহ অনুমান একটি অবাস্তব কল্পনা ছাড়া কিছু নয়। প্রকৃতপক্ষে বেকন ও নিউটন অসংগত প্রকল্পের ইঙ্গিত করে সেগুলোর অপ্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।

অতএব আমরা বলতে পারি, উদ্দীপকের ঘটনার সঙ্গে আরোহ অনুমানের সম্পর্ক খুব ঘনিষ্ঠ।

ঘ. উদ্দীপকে নির্দেশিত মেহেদীর কার্যক্রমে প্রকল্পের চারটি স্তরের প্রতিফলন ঘটেছে। নিচে প্রকল্পের চার স্তরের ভিত্তিতে উদ্দীপকের ঘটনাটিকে ব্যাখ্যা করা হলো।

প্রথম স্তর : ঘটনা নিরীক্ষণ

প্রকল্প হচ্ছে কোনো ঘটনা ব্যাখ্যার জন্য প্রাথমিক ও আনুমানিক ধারণা। স্বভাবতই এ ধরনের প্রাথমিক বা আনুমানিক ধারণা তৈরিতে ঘটনাকে বাস্তবে নিরীক্ষণ করতে হয়। নিরীক্ষণ না করে আনুমানিক ধারণা তৈরি করতে গেলে সেখানে অবাস্তব ও লৌকিক বিষয় চলে আসতে পারে। যেমন—উদ্দীপকে মেহেদী প্রথমেই ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে ক্লাসরুমের ভগ্নাবস্থা দেখতে পায়। আর এর ওপর ভিত্তি করেই সে প্রকল্প তৈরির কাজ শুরু করে।

দ্বিতীয় স্তর : আনুমানিক ধারণা গঠন

ঘটনা নিরীক্ষণের ওপর ভিত্তি করে প্রকল্পের দ্বিতীয় স্তর আনুমানিক ধারণায় উপনীত হতে হয়। ঘটনা নিরীক্ষণের সময় পূর্ব অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে মনের মধ্যে প্রাথমিকভাবে এটি তৈরি হয়। এতে অন্যান্য বিকল্প চিন্তা থেকে মন একটি ধারণার দিকে এগিয়ে যায়। আনুমানিক ধারণা গঠন না করে সামনে এগোনো সম্ভব নয়। তাই এটি প্রকল্পের দ্বিতীয় স্তর। যেমন—মেহেদী প্রাথমিকভাবে ধারণা করে সেখানে কিছু একটি না ঘটলে এ অবস্থা হতো না।

তৃতীয় স্তর : সিদ্ধান্ত গ্রহণ

আনুমানিক ধারণার ওপর ভিত্তি করে আরো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করলে সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়। এটি প্রকল্পের তৃতীয় স্তর। সিদ্ধান্ত গ্রহণই হচ্ছে প্রকল্পের মূল কাজ। কিন্তু এতে বাস্তব অভিজ্ঞতার প্রতিফলন থাকতে হয়। যেমন—উদ্দীপকে মেহেদী সিদ্ধান্ত নেয় সেখানে নিশ্চয়ই মারামারি হয়েছে। কারণ তার অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, মারামারি হলেই এ ধরনের দৃশ্য দেখা যায়।

চতুর্থ স্তর : সমর্থন বা যাচাইকরণ

প্রকল্পের সর্বশেষ স্তর হচ্ছে যাচাইকরণ বা সমর্থন। গৃহীত সিদ্ধান্ত যদি বাস্তবের সঙ্গে সম্পূর্ণ মিলে যায়, তাহলে প্রকল্পটিকে বাস্তব বলে স্বীকার করা হয়। আর যদি না মিলে তাহলে তা বাতিল করে ঘটনা ব্যাখ্যায় নতুন প্রকল্প গঠন করতে হয়। উদ্দীপকে সিদ্ধান্তের সমর্থনে রক্তের দাগ, পত্রিকার খবর প্রমাণ করে মেহেদীর প্রকল্প যাচাইয়ের মাধ্যমে স্বীকৃত হয়েছে।

সুতরাং বলা যায়, মেহেদীর প্রকল্প প্রণয়নের ক্ষেত্রে প্রকল্পের চারটি স্তরেরই প্রয়োগ ঘটেছে। তাই এটি একটি বৈধ প্রকল্প।

 


মন্তব্য