kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


জেএসসি প্রস্তুতি : বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়

অনুধাবনমূলক প্রশ্ন

তাহেরা খানম, সহকারী শিক্ষক, মিরপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, মিরপুর, ঢাকা   

১৪ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



বাঙালির সংস্কৃতি ও শিল্পকলা

 

১। সংস্কৃতি বলতে কী বোঝো?

উত্তর : মানুষের জীবন যাপন প্রণালির  সঙ্গে সম্পৃক্ত প্রতিটি কাজ ও জিনিসই তার সংস্কৃতি।

মানুষ যেভাবে জীবন যাপন করে, যেসব জিনিস ব্যবহার করে, যেসব আচার-অনুষ্ঠান পালন করে, যা কিছু সৃষ্টি করে, সব নিয়েই তার সংস্কৃতি। যেমন—খাদ্য, বাসস্থান, তৈজসপত্র, যানবাহন, পোশাক, অলংকার, উৎসব, গীতবাদ্য, ভাষা-সাহিত্য সবই সংস্কৃতির অংশ।

২। টেরাকোটা শিল্প কী?

উত্তর : টেরাকোটা শিল্প হচ্ছে পোড়ামাটির নকশা।

মাটির ফলক বা পাত তৈরি করে তাতে ছবি উত্কীর্ণ করে পুড়িয়ে স্থায়ী রূপ দেওয়া হলে তাকে টেরাকোটা বা পোড়ামাটির শিল্প বলা হয়। দিনাজপুরের কান্তজির মন্দিরে এভাবে পোড়ামাটির শিল্পকর্মে রামায়ণের বাহিনীসহ নানা সামাজিক জীবনের চিত্র ফুটে উঠেছে। পাহাড়পুরের সোমপুর বিহারেও পোড়ামাটির প্রচুর কাজ আছে। এতে সেকালের সমাজ জীবনের ছবি পাওয়া যায়।

৩। তালপাতার পুঁথি সম্পর্কে কী জানো?

উত্তর : তালপাতার পুঁথি হচ্ছে তালপাতার ওপর লিখিত পুঁথি।

পালযুগে তালপাতার পুঁথিতে দেশীয় রং দিয়ে যেসব ছবি আঁকা হয়েছে, তার প্রশংসা আধুনিক কালের বিশ্বের শিল্পরসিকদের কাছ থেকেও পাওয়া যাচ্ছে। হাজার বছর পরেও ছবিগুলো চমত্কার ঝকঝকে রয়েছে। পুঁথিগুলো ছিল বৌদ্ধ ধর্মশাস্ত্রের।

৪। প্রাচীন বাংলার তাঁতশিল্প কেমন ছিল?

উত্তর : প্রাচীন বাংলার তাঁতশিল্প ছিল খুব সমৃদ্ধ।

বাংলার তাঁতশিল্পের সুনাম বহুকালের। প্রাচীন বাংলার দুকুল কাপড়ের বেশ খ্যাতি ছিল। কৌটিল্য বলেছেন, পুণ্ড্রদেশের (উত্তরবঙ্গ) দুকুল শ্যামবর্ণ এবং মণির মতো মসৃণ। দুকুল ছিল খুব মিহি আর ক্ষৌমবস্ত্র একটু মোটা। পত্রোর্ণ নামে এন্ডি বা মুগাজাতীয় সিল্ক তৈরি হতো মগধ ও পুণ্ড্রে। সেকালে এ দেশের দুকুল, পত্রোর্ণ, ক্ষৌম ও কার্পাস কাপড় বিদেশেও রপ্তানি হতো।

৫। নকশি কাঁথা কিভাবে বানানো হয়?

উত্তর : নকশি কাঁথা হচ্ছে গ্রামের সাধারণ মহিলাদের হাতে সেলাই করা নকশাকৃত কাঁথা।

প্রাচীনকাল থেকে বাংলায় নকশি কাঁথা খুব সমাদৃত। গ্রামীণ মহিলারা ঘরে ঘরে কাঁথা সেলাই করে তাতে আশ্চর্য নিপুণতায় গল্পকাহিনী ও ছবি ফুটিয়ে তুলত। এখনো সমাজের দরিদ্র নারীরা এই শিল্পকর্মটি টিকিয়ে রেখেছেন।

৬। চর্যাপদ কী?

উত্তর : চর্যাপদ হচ্ছে বাংলার প্রাচীনতম সাহিত্যকর্ম।  

বাঙালির প্রথম যে সাহিত্যকর্মের সন্ধান পাওয়া যায় তা চর্যাপদ নামে পরিচিত। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী প্রথম নেপালের রাজ দরবার থেকে এগুলো আবিষ্কার করেন। পরে ভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ চর্যাপদের কাল নির্ণয় করেন। তিনি গবেষণা করে জানান, প্রায় দেড় হাজার বছর আগে থেকে বৌদ্ধ সাধকরা এগুলো লিখেছেন। আদি বাংলা সাহিত্যের নমুনা চর্যাগীতির বিখ্যাত রচয়িতাদের মধ্যে ছিলেন লুইপা ও কাহ্নপা।

৭। বৈষ্ণব পদাবলী কী?

উত্তর : বৈষ্ণব পদাবলী হচ্ছে শ্রীকৃষ্ণ ও রাধার কাহিনী নিয়ে রচিত বিশেষ ধরনের গান।

সুলতানি আমলে শ্রীচৈতন্যের বৈষ্ণব ভাবধারার প্রভাবে বাংলায় কীর্তন গান রচনায় জোয়ার আসে। শ্রীকৃষ্ণ ও রাধার কাহিনী নিয়ে এসব আবেগপূর্ণ গান রচিত হয়েছে। এগুলো বৈষ্ণব পদাবলী নামে পরিচিতি। বৈষ্ণব পদাবলীর বিখ্যাত পদকর্তাদের মধ্যে আছেন বিদ্যাপতি, চণ্ডীদাস, জ্ঞানদাস, গোবিন্দ দাস প্রমুখ।

৮। মঙ্গলকাব্য কী?

উত্তর : দেশীয় দেব-দেবীকে নিয়ে রচিত কাব্যকাহিনী মঙ্গলকাব্য নামে পরিচিত।

একসময় বাংলায় দেশীয় দেব-দেবীকে নিয়ে নানা কাব্যকাহিনী রচিত হয়েছে। এগুলো মঙ্গলকাব্য নামে পরিচিত। মুকুন্দরামের চণ্ডীমঙ্গল, ঘনরামের ধর্মমঙ্গল, বিজয়গুপ্তের মনসামঙ্গল এ ক্ষেত্রে বিশেষ উল্লেখের দাবি রাখে। এ ছাড়া ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গল সেকালে বাংলার সমাজচিত্রে পাওয়া যায়।

৯। পুঁথিসাহিত্য কী?

উত্তর : পুঁথি সাহিত্য হচ্ছে পারস্য থেকে পাওয়া নানা কল্পকাহিনী ও রোমান্টিক আখ্যান নিয়ে রচিত কাব্য।

মুসলমান সমাজে পুঁথি      সাহিত্যের ব্যাপক কদর ছিল। পারস্য থেকে পাওয়া নানা কল্পকাহিনী ও রোমান্টিক আখ্যান নিয়ে এগুলো রচিত হতো। সেকালে বাড়ি বাড়ি পুঁথি পাঠের আসর বসত, অবার পুঁথি নকল করে সংরক্ষণও করা হতো। ইউসুফ-জুলেখা, লাইলি-মজনু, সায়ফুল মুলক-বদিউজ্জামান, জঙ্গানামা ইত্যাদি বিখ্যাত সব পুঁথির নাম। আলাওল রচিত পদ্মাবতী বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে বিশেষভাবে আলোচিত।

১০। মধ্যযুগে গদ্য সাহিত্য কিভাবে বিকশিত হয়?

উত্তর : মধ্যযুগে কয়েকজন বিখ্যাত সাহিত্যিকের হাতে গদ্য সাহিত্য বিকশিত হয়।

ইংরেজ আমলে ১৯ শতকে আমাদের দেশে বাংলা গদ্যের সূচনা হয়। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ভিত গড়েছেন। বঙ্কিমচন্দ্র ও সমসাময়িক সাহিত্যিকরা যার ওপর সৌধ তুলেছেন এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাকে শোভন ও সুন্দর করে পূর্ণতা দিয়েছেন। মাইকেল মধুসূদন দত্ত, মীর মশাররফ হোসেন, দীনবন্ধু মিত্র প্রমুখ আধুনিক বাংলা সাহিত্য বিকাশে ভূমিকা রেখেছেন।

১১। বাংলায় নাগরিক গান কিভাবে বিকশিত হয়?

উত্তর : হিন্দুস্তানি উচ্চাঙ্গ সংগীতের প্রভাবে বাংলায় নাগরিক সংগীতের বিকাশ ঘটে।

উত্তর ভারতের সংস্পর্শে এসে হিন্দুস্তানি উচ্চাঙ্গ সংগীতের সঙ্গে বাঙালি সাধকদের পরিচয় ঘটে। তার প্রভাবে এখানে নাগরিক সংগীতের বিকাশ ঘটে। নিধুবাবু, কালী মির্জা প্রমুখ হয়ে রবীন্দ্রনাথের হাতে বাংলার নাগরিক গান উত্কর্ষের শীর্ষে পৌঁছায়। তাঁরই গান আজ আমাদের জাতীয় সংগীত—আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি। এ গানের সুর তিনি নিয়েছেন বাউল গানের সুর থেকে। রবীন্দ্রনাথের পথ ধরে পরে আরো অনেকেই বাংলার নাগরিক গানকে সমৃদ্ধ করেছেন। তাঁদের মধ্যে কাজী নজরুল ইসলাম আপন স্বাতন্ত্র্যে ও বৈচিত্র্যে বিশেষ স্থান অধিকার করে আছেন। মাত্র কুড়ি বছরের সৃষ্টিশীল জীবনে তিনি প্রায় ছয় হাজারের মতো গান লিখেছেন। অতুল প্রসাদ সেন, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, রজনীকান্ত সেন প্রমুখও আধুনিক বাংলা গানের সমৃদ্ধিতে বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন।

১২। বাংলা একাডেমি কী?

উত্তর : বাংলা একাডেমি আধুনিক কালের বাংলার মানুষের মননচর্চা ও সৃজনশীলতা চর্চার কেন্দ্র।

আধুনিক কালের মানুষ মননচর্চা ও সৃজনশীলতা চর্চার জন্য নানা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে। বাংলাদেশেও এ ধরনের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পটভূমিতে এবং ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বাংলা একাডেমি। এটিকে জাতির মননের প্রতীক বলা হয়। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের উন্নতির জন্য এ প্রতিষ্ঠানটি কাজ করে আসছে।

১৩। শিল্পকলা একাডেমি কী?

উত্তর : বাংলার মানুষের চারুকলা ও সংগীত-নাটক-নৃত্য প্রভৃতি ললিতকলা চর্চার কেন্দ্র হচ্ছে শিল্পকলা একাডেমি।

চারুকলা ও সংগীত-নাটক-নৃত্য প্রভৃতি ললিতকলা চর্চার পৃষ্ঠপোষকতা, অবকাঠামোগত সুবিধা সৃষ্টি, গবেষণা ও প্রসারের জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি। সব জেলা শহরে এর শাখা আছে।

১৪। বাংলাদেশে মনন চর্চার জন্য যেসব প্রতিষ্ঠান রয়েছে তার সংক্ষিপ্ত পরিচয় দাও।

উত্তর : বাংলাদেশে মনন চর্চার জন্য বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

বিশ্বের যেকোনো উন্নয়নশীল দেশেই মনন চর্চার জন্য রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়, গণগ্রন্থাগার প্রভৃতি। আর সাংস্কৃতিক নিদর্শন সংরক্ষণ, তা নিয়ে গবেষণা ও তা প্রদর্শনের জন্য রয়েছে জাতীয় জাদুঘর। বাংলাদেশেও সরকারি ও বেসরকারি কয়েকটি জাদুঘর রয়েছে। এ ছাড়া চিড়িয়াখানা, বোটানিক্যাল গার্ডেন বা জাতীয় উদ্যান, নভোথিয়েটার, বিজ্ঞান জাদুঘরসহ নানা প্রতিষ্ঠান এ দেশে গড়ে উঠেছে। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোগেও গড়ে উঠেছে এ ধরনের বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান। রাজশাহীর বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়াম, ঢাকার মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর—এ রকম কয়েকটি প্রতিষ্ঠান।


মন্তব্য