kalerkantho

রবিবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


সপ্তম শ্রেণি : বাংলা প্রথম পত্র

সৃজনশীল প্রশ্ন

লুত্ফা বেগম, সিনিয়র শিক্ষক বিএএফ শাহীন কলেজ কুর্মিটোলা, ঢাকা   

১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



উনিশ শ একাত্তর

ইমদাদুল হক মিলন

 

উদ্দীপকটি পড়ে নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও :

১৯৭১ সালে মধুদের গ্রামে মিলিটারিরা এসে গ্রামের স্কুল ঘরে ক্যাম্প বানায়। গাঁয়ের কিছু লোক ওদের ক্যাম্পে খাবার পৌঁছে দেয়।

সৈনিকগুলো খায়-দায় এবং ঘোরাফেরা করে। মাঝেমধ্যে একে-ওকে ধরে নিয়ে যায়। তার আর খোঁজ পাওয়া যায় না। দশ বছরের ছেলে মধু না বুঝে একদিন স্কুল ঘরের দিকে গেলে মিলিটারিরা ওকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে, আর মধু নিহত হয়।

 

(ক) ইমদাদুল হক মিলনের প্রথম গল্পের নাম কী?

উত্তর : ইমদাদুল হক মিলনের প্রথম গল্পের নাম ‘বন্ধু’।

 

(খ) দীনু যে শহরে বাস করে, সেই শহরের সবাই তার আপনজন কেন?

উত্তর :

ইমদাদুল হক মিলন রচিত ‘উনিশ শ একাত্তর’ গল্পের দীনুর আপন বলতে কেউ নেই। কার সঙ্গে সে শহরে এসেছিল, কার কোলে এসেছিল কেউ জানে না, দীনুও নয়। এমনকি সে হিন্দু না মুসলমান—তাও সে জানে না। সে এই শহরের মানুষজনকে আপন করে নিয়েছে। কাউকে সে বাবা, আবার কাউকে মা ডাকে।

ভাই-বোন, দিদিমা, জ্যাঠা-চাচা, মামা-খালা, পিসিমা সবাই তার বড় আপন। নিজের বাড়ি-ঘর নেই বলে শহরের সব বাড়ি-ঘরই দীনুর নিজের। ইচ্ছা হলে বাড়ি যায়, খিদে পেলে কারো রান্নাঘরে ঢুকে পড়ে। ঘুম পেলে যেকোনো ফাঁকা বিছানায় গুটিসুটি দিয়ে শুয়ে পড়ে। কেউ তাকে কখনো ফেরায় না অর্থাৎ তার আপনজন নেই বলেই কেউ কখনো তাকে ফেরায় না।

 

গ) উদ্দীপকের মধুর নিহত হওয়ার ঘটনাটি ‘উনিশ শ একাত্তর’ গল্পের কোন ঘটনার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ?

উত্তর :

উদ্দীপকের মধুর গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনার সঙ্গে ‘উনিশ শ একাত্তর’ গল্পের দীনুর নিহত হওয়ার ঘটনার মিল রয়েছে।

দশ বছরের দীনুর আপনজন কেউ না থাকায় উনিশ শ একাত্তর সালে সবাই যখন মিলিটারির ভয়ে তাদের মফস্বল শহর থেকে পালিয়ে যায়, কিশোর দীনু তখন সুবলদের শূন্য বাড়িতে রয়ে যায়। একা থাকলে ভয় লাগে বলে ভিক্ষুক জমির চাচার সঙ্গে রাতের বেলা কাটায়। একদিন দীনু খালের পাড় ধরে হাঁটতে হাঁটতে ভাবছিল, সবারই কোথাও না কোথাও যাওয়ার জায়গা আছে। অথচ তার কোনো জায়গা নেই। বুক কাঁপিয়ে দীর্ঘশ্বাস পড়ে দীনুর। সে জমির চাচার খোঁজে চলে যায় বাজারে। দীনু দেখে শহরের কোথাও কোনো মানুষ নেই, সবাই ভয়ে পালিয়েছে। দীনু জমির চাচার কথা ভাবতে ভাবতে হাই স্কুলের কাছাকাছি আসে। ঠিক তখনই মিলিটারিদের একজন নিশানা ঠিক আছে কি না দেখার জন্য খালের ওপর থেকে দীনুকে তাক করে। গুলিবিদ্ধ দীনু দুই হাতে বুক চেপে ধরে। দেখে দশ আঙুলের ফাঁকফোকর দিয়ে জোয়ারের জলের মতো নেমে যাচ্ছে রক্ত। খালপাড়ের সাদা মাটি লাল হয়ে যায়।

‘উনিশ শ একাত্তর’ গল্পের উপর্যুক্ত ঘটনাটি উদ্দীপকের মধুর নিহত হওয়ার ঘটনার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ।

উদ্দীপকের মধুও স্কুল ঘরের দিকে গেলে মিলিটারির একজন তাকে লক্ষ্য করে গুলি করলে সে নিহত হয়।

 

(ঘ) উদ্দীপকটিতে ‘উনিশ শ একাত্তর’ গল্পের আংশিক ভাব প্রতিফলিত হয়েছে মাত্র—মন্তব্যটির যথার্থতা নির্ণয় করো।

উত্তর :

উদ্দীপকের মধুর নিহত হওয়ার ঘটনাটিই কেবল ‘উনিশ শ একাত্তর’ গল্পের দীনুর নিহত হওয়ার ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত, যা গল্পের অংশবিশেষকে ধারণ করে।

এ ছাড়া ‘উনিশ শ একাত্তর’ গল্পে দীনু সম্পর্কে আরো বলা হয়েছে যে দীনু অনাথ। কেমন করে, কবে সে ওই শহরে এসেছে তা সে বা কেউ জানে না। তার আপন কেউ নেই বলে সবাই তাকে ভালোবাসে। কোথাও তার যাতায়াত, খাওয়া-শোয়ায় কোনো বাধা নেই। তাই মিলিটারিদের ভয়ে সুবলরা কলকাতায় চলে যাওয়ার পর দীনু তাদের শূন্য ঘরে গিয়ে ভিক্ষুক জমির চাচাকে নিয়ে থাকে।

দীনু জমির চাচার কাছে বলে সুবলদের চলে যাওয়ার কথা, মিলিটারিদের কথা এবং সুবলদের দিদিমার মুখে শোনা স্বাধীনতার কথা। মিলিটারিদের ভয়ে খোকনরা যখন মামার বাড়ি বকুলতলী চলে যাচ্ছিল, তখন দীনুও তাদের সঙ্গে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু খোকনের মা রাজি হননি, বলেছেন দীনুর কিছু হবে না। দীনু ভাবে, সবারই কেউ না কেউ আছে। কেবল দীনুরই কেউ নেই। তার বুক কাঁপিয়ে দীর্ঘশ্বাস পড়ে।

উদ্দীপকে কেবল মিলিটারিদের অত্যাচার ও মধুর নিহত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। দীনুর মতো মধুর একাকিত্ব এভাবে প্রকাশ পায়নি।

উপর্যুক্ত বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে তাই বলা যায়, উদ্দীপকটিতে গল্পের মূলভাবের প্রতিফলন ঘটলেও কাহিনীর অনেকাংশই প্রকাশ পায়নি।

চরু

হাসান আজিজুল হক

উদ্দীপকটি পড়ে প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও :

বাড়ির জমি চাষাবাদ করার জন্য বিকাশ বাজার থেকে এক জোড়া গরু কেনেন। চার বছর ধরে এ দুটি দিয়ে তিনি হালচাষ করেন। তাঁর স্ত্রী এ দুটিকে লালী ও কালী বলে ডাকেন। লালীর পেটে বাচ্চা থাকায় বিকাশ এটিকে দিয়ে হালচাষ করতে না পারায় ঈদবাজারে বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নেন। এ সিদ্ধান্তে তাঁর স্ত্রী বাদ সাধলে তিনি ক্রুদ্ধ হন। কিছুদিন পর লালী বাচ্চা প্রসব করলে গাভিটির আধা কেজির বেশি দুধ হচ্ছে না দেখে বিকাশ এবার বাচ্চাসহ লালীকে গফুর কসাইয়ের কাছে বিক্রি করে দেন। কসাই পরিপুষ্ট গাভিটিকে জবাই করে কেজি দরে মাংস বিক্রি করল এবং বাচ্চা বড়সড় হলে এটি দিয়েও ভালো ব্যবসা করবে ভাবল। কসাইয়ের প্রতিবন্ধী কন্যা বাচ্চাটিকে পরম যত্নে বড়সড় ও পরিপুষ্ট করে তুলল। একদিন কসাই এটিকে জবাই করে বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নিলে তার কন্যা প্রতিবাদী হয়ে উঠল এবং ইঙ্গিতে এটিকে প্রতিপালনের সিদ্ধান্ত জানাল।

 

(ক) সবার আগে চরুকে ধরার জন্য কে ছুটে আসছিল?

উত্তর : বাবরি চুলওয়ালা হিংসুট লোকটা সবার আগে চরুকে ধরার জন্য ছুটে আসছিল।

 

(খ) চরু তার আশপাশে তার মাকে দেখতে পেল না কেন?

উত্তর : লোভী মানুষের বন্দুকের গুলিতে মা-হরিণ নিহত হয়েছে বলে চরু তার আশপাশে মাকে দেখতে পেল না।

হাসান আজিজুল হক রচিত ‘চরু’ গল্পের হরিণছানা চরু বনের একধারে আপন মনে ঘাস খাচ্ছিল। বিকট একটি শব্দে চমকে উঠে সে মুখ তুলে দেখল বনের একটু উঁচুতে ঝোপের পাশ দিয়ে ধোঁয়া বেরিয়ে আসছে। ঘাস খাওয়ার সময় হরিণ-মা তার পাশে থাকলেও সে সময় সে তার মাকে দেখতে পেল না। কারণ লোভী মানুষের বন্দুকের গুলিতে তার মা মরে গিয়েছিল।

 

(গ) ‘চরু’ গল্পের মূল শিক্ষাটি উদ্দীপকের কোন চরিত্রে এবং কিভাবে ফুটে উঠেছে তা ব্যাখ্যা করো।

উত্তর : ‘চরু’ গল্পের মূল শিক্ষা লোভী মানুষের হিংস্রতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার দিকটি উদ্দীপকের কসাইয়ের প্রতিবন্ধী কন্যা এবং ‘চরু’ গল্পের বোবা-কালা ছেলেটির মধ্যে ফুটে উঠেছে। উদ্দীপকের চাষি বিকাশ লালী নামের গরুটি দুধ দিচ্ছিল না বলে বাচ্চাসহ গফুর কসাইয়ের কাছে বিক্রি করে দেয়। কসাই গাভিটি জবাই করে মাংস বিক্রি করে দিলেও বাচ্চাটি তার প্রতিবন্ধী কন্যা পরম যত্নে বড় করে তোলে। কসাই পরবর্তী সময় সেটিকেও জবাই করতে চাইলে তার কন্যা প্রতিবাদী হলে ইঙ্গিতে ওটাকে পালনের সিদ্ধান্ত জানায়।

উদ্দীপকের কসাইয়ের কন্যার এই প্রতিবাদী মনোভাব ও জীবপ্রেম ‘চরু’ গল্পের বোবা-কালা ছেলেটির চরিত্রে প্রকাশমান। লোভী মানুষরা নিহত হরিণ ও হরিণছানা চরুকে বাড়িতে এনে হরিণ-মায়ের মাংস কেটে বিক্রি করে ফেলে আর চরুকে বড়সড় হওয়ার জন্য পালতে থাকে। হরিণছানার খেলার সাথি হয় বাড়ির বোবা-কালা ছেলেটি। সে চরুকে কচি ঘাস, কেওড়ার পাতা খেতে দেয়। গাঁয়ের মাঠে তাকে নিয়ে যায়, গলা জড়িয়ে ধরে চুমু খায়। দিনে দিনে হরিণছানাটি বড় হতে থাকে। তারপর বাড়ির লোকেরা যখন সিদ্ধান্ত নেয়, ওটা জবাই করে মাংস বাজারে বেচে দেবে, তখন তাদের ইচ্ছার প্রতিবাদ করে বোবা-কালা ছেলেটি। সে কথা বলতে পারে না বলে গোপনে খুঁটিতে বাঁধা চরুর দড়িটা খুলে হ্যাঁচকা একটা টান দিয়ে চরুকে নিয়ে সে ভাঙা বেড়ার তলা দিয়ে রাস্তায় এসে পড়ে। খালের ধারের ছোট নৌকায় চরুকে ঠেলে তুলে দিয়ে নিজেও সেই নৌকায় উঠে নৌকা ছেড়ে দেয়। তারপর খালের ওপারে একদিন যেখানে চরু ঘাস খাচ্ছিল, সেখানে নেমে চরুর গলার দড়ি খুলে তাকে ছেড়ে দেয়। এভাবেই বোবা-কালা ছেলেটি শিকারি লোকদের অন্যায় কাজের প্রতিবাদ করেছিল। আর গল্পের বোবা-কালা ছেলেটির এই নীরব প্রতিবাদের দিকটি উদ্দীপকের কসাইয়ের কন্যার গরুর বাচ্চাটি প্রতিপালনের সিদ্ধান্তের সঙ্গে সম্পর্কিত।

 

(ঘ) অবোধ প্রাণীর প্রতি ‘চরু’ গল্পের কিশোর বালক ও বিকাশের স্ত্রীর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করো।

উত্তর : উদ্দীপকের চাষি বিকাশ চার বছর ধরে চাষাবাদ করার পর জোড়া গরুর লালী নামের গরুটির পেটে বাচ্চা আসায় ওটিকে দিয়ে হালচাষ করতে না পারায় ঈদের বাজারে বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর এ সিদ্ধান্তে তাঁর স্ত্রী প্রতিবাদ করে।

বিকাশের স্ত্রীর এই প্রতিবাদী মনোভাব ‘চরু’ গল্পের বোবা-কালা ছেলেটির চরিত্রে প্রকাশমান। হরিণছানা চরুর মাকে হত্যা করে তাকে গেরস্ত বাড়িতে নিয়ে এলে বাড়ির বোবা-কালা ছেলেটির সঙ্গে সে দিন দিন বড় হয়ে ওঠে। চরুর গায়ের ফ্যাকাসে সাদা রং বদলে ঘন বাদামি হলো আর দেখা দিল সাদা বুটি, এক জোড়া ভালো পালাওয়ালা শিং গজাল মাথায়। ন্যাংটা বোবা-কালা ছেলেটির পরনে প্যান্ট উঠল। তখন বাড়ির লোকগুলো সিদ্ধান্ত নিল চরুকে জবাই করার। চরুকে জবাই করার জন্য যখন ছুরি শাণানো হচ্ছিল, তখন ছেলেটি দাওয়ার বাইরের দিকের বেড়া ভেঙে খুঁটিতে বাঁধা চরুর দড়ি খুলে তাকে নিয়ে খালপাড়ে এসে একটা নৌকায় উঠে নৌকা ছেড়ে দেয়। টের পেয়ে বাড়ির লোকগুলো পিছু নিলেও ছেলেটি খালের ওপারে পৌঁছে ঝোপের ধারে চরুকে ছেড়ে দেয়। এভাবে চরুকে হিংস্র মানুষের কবল থেকে ছেলেটি মুক্তি দেয়। ‘চরু’ গল্পের বোবা-কালা ছেলেটির চরিত্রের এই বৈশিষ্ট্য উদ্দীপকের বিকাশের স্ত্রীর মধ্যে সুপ্ত অবস্থায় ছিল বলে সে লালীকে বিক্রির ব্যাপারে প্রতিবাদ জানিয়েছিল।


মন্তব্য