kalerkantho

শুক্রবার । ২ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী বাংলা

রচনা

লুত্ফা বেগম, সিনিয়র শিক্ষক বিএএফ শাহীন কলেজ হকুর্মিটোলা, ঢাকা   

১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



বর্ষাকাল

 

 

ভূমিকা : বাংলাদেশ ঋতুবৈচিত্র্যের দেশ। ঋতুচক্রের পালায় একসময় বর্ষা আসে বাংলাদেশে তার স্নিগ্ধ, সজল রূপ নিয়ে।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণে বর্ষার রূপ যতটা সুস্পষ্টভাবে ধরা পড়ে, অন্য কোনো ঋতু ততটা নয়। কবির ভাষায়—

এসেছে বরষা, এসেছে নবীনা বরষা

গগন ভরিয়া এসেছে ভুবন ভরসা।

 

ঋতুচক্রে বর্ষার স্থান : ঋতুচক্রে গ্রীষ্মের পরই বর্ষার অবস্থান। আষাঢ়-শ্রাবণ এই দুই মাস বর্ষাকালের জন্য নির্দিষ্ট থাকলেও বাস্তবে বর্ষাকাল এই দুই মাসের গণ্ডি পেরিয়ে যায়। তবে আষাঢ়-শ্রাবণ মাসেই বর্ষার রূপ পরিপূর্ণভাবে প্রকাশ পায়। কবির ভাষায়—

আষাঢ় সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল, গেলরে দিন বয়ে,

বাঁধন-হারা বৃষ্টিধারা ঝরছে রয়ে রয়ে।

 

বর্ষার আগমন : বর্ষার আগমনরীতি যেমন বিচিত্র, তেমনি অভিনব। আকাশে নবীন মেঘের সমারোহে, গুরু গুরু গর্জনে, বিদ্যুতের শিহরণে, অবিরাম বৃষ্টিপাতের শব্দে ঘোষিত হয় তার আগমনী বার্তা, যা কবি কণ্ঠে ধ্বনিত হয় এভাবে—

ঐ আসে ঐ অতি ভৈরব হরষে

জল-সিঞ্চিত ক্ষিতি সৌরভ রভসে,

ঘন-গৌরবে নব যৌবনা বরষা

শ্যাম গম্ভীর সরসা।

 

বর্ষার কারণ : বাংলাদেশে বর্ষা ঋতু আগমনের পেছনে ভৌগোলিক কারণ রয়েছে। গ্রীষ্মকালে মৌসুমি বায়ু ভারত মহাসাগর থেকে প্রচুর জলীয়বাষ্প ধারণ করে উত্তর-পূর্ব দিকে অগ্রসর হয়। এ বায়ু প্রবাহ হিমালয়ে বাধা পেয়ে নিম্নাঞ্চলে প্রচুর বৃষ্টিপাত ঘটায়। বাংলাদেশ হিমালয়ের নিম্নাঞ্চলে অবস্থিত বলে এখানে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়।

 

বর্ষাকালে পল্লীর রূপ : বর্ষাকালে পল্লীর মাঠ-ঘাটে পানি থই থই করে। মাঠের প্রান্তদেশে ঘরবাড়িগুলো তাল-তমাল, কলা-আম-জামগাছের কুঞ্জ নিয়ে পানির ওপর ভাসতে থাকে। তখন ডিঙি নৌকা অথবা কলার ভেলাই হয় যাতায়াতের প্রধান বাহন। কবির ভাষায়—

বর্ষাকালে পল্লি ভাসে চতুর্দিকে বারি,

বৃষ্টি পড়ে টাপুর-টুপুর দেয় না খেয়া পাড়ি।

 

জনজীবনে বর্ষার উপকারিতা : পল্লীবাসী কৃষকের জন্য বর্ষা নিয়ে আসে ফসলের সমারোহ। বর্ষার পানিতে ধান ও পাটের চারা পরিপুষ্ট হয়। মোটকথা, বাংলার কৃষকের অন্ন-বস্ত্র, সুখ-সমৃদ্ধি এই বর্ষা ঋতুর ওপরই নির্ভরশীল।

 

মানব মনে বর্ষার প্রভাব : টাপুর-টুপুর বৃষ্টি পতনের শব্দ এ ঋতুতে মানুষের মনে গভীর প্রভাব ফেলে। এ সময় মানুষ হারানো, সুন্দর, আনন্দময় দিনগুলোর কথা মনে করে উদাস হয়ে যায়। কবির ভাষায়—

আজ মেঘের জটা, উড়িয়ে দিয়ে নৃত্য কে করে,

ওরে বৃষ্টিতে মোর ছুটেছে মন, লুটেছে এই ঝড়ে।

 

বর্ষার সম্পদ : বর্ষা ঋতু কেবল ফসলের সম্ভাবনাই বয়ে আনে না, এ ঋতুতে প্রচুর ফুল ফোটে ও ফল পাওয়া যায়। কদম, কেয়া, জুঁই, দোলনচাঁপা, হিজল—এ ঋতুরই ফুল। তাই তো কবি মনের আনন্দে বলে ওঠেন—

গুরু গুরু ডাকে দেয়া, ফুটিছে কদম কেয়া।

আর আম, জাম, কাঁঠাল গ্রীষ্মের ফল হলেও বর্ষা ঋতুর পুরোটাজুড়েই এই রসাল ফলগুলো পাওয়া যায়। টাটকা শাকসবজিও এ ঋতুরই দান।

 

বর্ষার অপকারিতা : বর্ষা গ্রামীণ মানুষের জীবনে আনন্দের সঙ্গে সঙ্গে দুঃখ-কষ্টও বয়ে আনে। অনবরত বৃষ্টিপাতের ফলে রাস্তাঘাট কর্দমাক্ত হয়ে যায়। সর্বনাশা বন্যায় কৃষকের আবাদি ফসল নষ্ট হয়। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম তখন বেড়ে যায়। এ ছাড়া জ্বর, আমাশয় ও ডায়রিয়া রোগের প্রকোপও বেড়ে যায়।

 

উপসংহার : বাংলাদেশের এ অপরূপ প্রাকৃতিক ঐশ্বর্য বর্ষারই অবদান। তাই বর্ষার কিছু অপকারিতা থাকলেও তার উপকারের মাত্রা অনেক বেশি বলে এ ঋতুকে আমরা অন্তর থেকে স্বাগত জানাই।

 

বাংলাদেশের পাখি

ভূমিকা :

দোয়েল-কোয়েল ময়না কোকিল

সবার আছে গান

পাখির গানে, পাখির সুরে

মুগ্ধ সবার প্রাণ।

পাখ-পাখালির দেশ বাংলাদেশ।

সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এ দেশে আমরা নানা রকমের পাখি দেখতে পাই। এদের মধ্যে রং, আকার ও স্বভাবের পার্থক্য রয়েছে। কোনোটি দেখতে সুন্দর, আবার কোনোটি দেখতে খুব বিশ্রী। কোনোটির কণ্ঠস্বর মধুর, আবার কোনোটির কণ্ঠস্বর কর্কশ। তাই তো কবি বলেছেন—

কাক-কোকিলের একই বর্ণ

স্বরে কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন।

ঋতু পরিক্রমায় নানা উপচারের মধ্যে পাখি নিঃসন্দেহে অন্যতম।

 

এ দেশের পাখি :

গরু ডাকে, হাঁস ডাকে, ডাকে কবুতর

গাছে ডাকে শত পাখি সারা দিন ভর।

বাংলাদেশ অসংখ্য পাখির আবাসভূমি। কাক, কোকিল, চড়ুই, বাবুই, শালিক, শকুন, টিয়া, টুনটুনি, ময়না, মাছরাঙা, দোয়েল, কোয়েল, বক, ঘুঘু, কাঠঠোকরা, ফিঙে, বউকথাকও, সারস, পানকৌড়ি, ডাহুক, বুলবুল, কবুতর, শ্যামা, বাজ, চিল, হাঁস ও মুরগি—এ দেশের বহুল পরিচিত পাখি। বৈশিষ্ট্য অনুসারে এই পাখিগুলোকে বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে।

 

গানের পাখি : দোয়েল-চড়ুই মিলে কিচিরমিচির

গান শুনি ঘুঘু আর টুনটুনিটির।

গানের দেশ, সুরের দেশ, আমাদের এই বাংলাদেশ। এ দেশে পাখির কণ্ঠে ধ্বনিত হয় মধুর সুর। বুলবুলের গানে মোহিত হয়ে কবি নজরুল তাই লিখেছেন—

মোহাম্মদের নাম জপেছিলি, বুলবুলি তুই আগে।

তাই কিরে তোর কণ্ঠেরই গান এমন মধুর লাগে।

বউকথাকও, কোকিল, দোয়েল, শ্যামা, বুলবুল প্রভৃতি গানের পাখি হিসেবে ব্যাপক পরিচিত। মধুর কণ্ঠস্বরের জন্য কোকিল সবার কাছে প্রিয়। এ দেশে বসন্তে বার্তাবহ পাখি হিসেবেও কোকিল পরিচিত। দোয়েল আমাদের জাতীয় পাখি। সারা বছরই নানা পাখি আমাদের গৃহাঙ্গন গানে গানে ভরিয়ে তোলে।

 

পোষা পাখি : পাখির সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে আমাদের দেশে অনেকেই পাখি পোষে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে—টিয়া, ময়না, কবুতর, কাকাতুয়া ও কোয়েল। টিয়া ও ময়না মানুষের কণ্ঠস্বর নকল করে কথাও বলতে পারে। তাই তো গানে গানে ধ্বনিত হয় এসব পাখির নাম—

বুলবুল পাখি ময়না-টিয়ে

আয় না যা না গান শুনিয়ে।

 

গৃহ প্রাঙ্গণের পাখি : যেসব পাখি সচরাচর আমাদের চারপাশে বিরাজ করে, সেগুলোকে বলা হয় গৃহ প্রাঙ্গণের পাখি। এদের মধ্যে রয়েছে হাঁস ও মুরগি। মানুষ এগুলোকে পুষে থাকে।

 

শিকারি পাখি : চিল, বাজ, শকুন শিকারি পাখি হিসেবে পরিচিত। এ পাখিগুলো হাঁস-মুরগির বাচ্চা শিকার করে আহার করে। মাছরাঙা, বক পাখিও জলাশয়ের ধারে-কাছেই অবস্থান করে। সুযোগ পেলেই এরা ছোট ছোট মাছ ধরে আহার করে।

 

কারিগর পাখি : বাবুই শিল্পী পাখি। তাল, খেজুর ও বাবলাগাছে এদের ঝুলন্ত বাসা উন্নত কারিগরি দক্ষতার পরিচয় বহন করে। বাবুই পাখির কারিগরি দক্ষতায় ঈর্ষাকাতর হয়ে তাই তো চড়ুই পাখি বলেছে—

কুঁড়ে ঘরে থেকে করো শিল্পের বড়াই।

 

জলচর পাখি : এ দেশের খাল-বিল-নদী-নালায় যেসব পাখির অবাধ বিচরণ লক্ষ করা যায়, সেগুলো হলো—হাঁস, মাছরাঙা, পানকৌড়ি, কাদাখোঁচা, গাঙচিল, ডাহুক, সারস ও বক। কবির ভাষায়—

পচা ডোবা হতে বিরহিনী ডাক, ডাকিতেছে ঝুরি ঝুরি,

কিষান ছেলেরা কালকে তাহার বাচ্চা করেছে চুরি।

 

অতিথি পাখি : শীতের শুরুতে সাইবেরিয়া অঞ্চলের প্রচণ্ড শীত থেকে বাঁচতে কিছু কিছু পাখি বাংলাদেশের হাওর-বিলে অল্প সময়ের জন্য অবস্থান করে। এগুলোকেই অতিথি পাখি বলে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে চা-পাখি, পিপিট, খঞ্জনা, কাদাখোঁচা, বলাকা ইত্যাদি।

 

উপসংহার :

বাংলাদেশ বৈচিত্র্যে ভরা। এ দেশে জানা-অজানা বহু পাখির আাানাগোনা চলে ঋতুতে ঋতুতে। পাখিরা পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই এসব পাখি যাতে নিরাপদে ও নিজেদের খাপ খাইয়ে চলতে পারে সে ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। এ জন্য পাখি সংরক্ষণ আইন চালু করতে হবে এবং জনগণ যাতে এ আইন মান্য করে সেদিকে দৃষ্টিপাত করতে হবে।


মন্তব্য