kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৯ জানুয়ারি ২০১৭ । ৬ মাঘ ১৪২৩। ২০ রবিউস সানি ১৪৩৮।


দশম শ্রেণি : বাংলা দ্বিতীয় পত্র

অনুচ্ছেদ

লুত্ফা বেগম, সিনিয়র শিক্ষক, বিএএফ শাহীন কলেজ, কুর্মিটোলা, ঢাকা   

৩১ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



যৌতুক প্রথা

বিয়ের চুক্তি অনুসারে কন্যাপক্ষ বরপক্ষকে বা বরপক্ষ কন্যাপক্ষকে যে সম্পত্তি বা অর্থ দেয়, তাকে যৌতুক বা পণ বলে। ঊনবিংশ শতাব্দীতে দেখা যায়, উচ্চবর্ণের ব্রাহ্মণরা প্রচুর যৌতুকসহ শতাধিক বিয়ে করতেন। এসব স্ত্রী তাঁদের পিতৃগৃহেই থাকতেন এবং স্বামীরা হয়তো বছরে একবার তাঁদের দেখতে এসে প্রচুর আতিথেয়তা ভোগ করে আরো কিছু যৌতুক নিয়ে যেতেন। বাংলাদেশের হিন্দু সমাজে কুলীনত্বের কারণে যৌতুক প্রথা বেশ ব্যাপক। উচ্চবর্ণের হিন্দুদের মধ্যে এই প্রথার প্রচলন বেশি। ঊনবিংশ শতাব্দী থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিও কুলীনত্বের মর্যাদা লাভ করেছে অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি কনের পিতার জন্য অত্যাচারের আরো বড় হাতিয়ার হয়েছে। উচ্চশিক্ষার জন্য ভালো চাকরি পায় বলে তা বরের বাজারদর বাড়িয়ে দেয়। ইংরেজি উচ্চশিক্ষার কারণে মুসলমানদের মধ্যেও ক্রমে এই কুলীনত্বের ব্যাপক প্রসার ঘটে। তাদের মধ্যে খানদানি পরিবারের কুলীনত্বের সঙ্গে এই নতুন শিক্ষার কুলীনত্ব যুক্ত হয়ে যৌতুকের প্রথা আরো শক্তিশালী হয়। বাংলাদেশে ১৯৮০ সালে যৌতুক নিষিদ্ধকরণ আইন অনুসারে যৌতুক নেওয়া বা দেওয়া একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কারণ সমাজে এটি একটি সচরাচর ঘটনা যে যৌতুকের কারণে স্ত্রীদের ওপর অত্যাচার ও তাদের হত্যাও করা হয়। মুসলমানদের ব্যক্তি আইন বা শরিয়ত আইন অনুসারে বিয়ের কাবিননামায় লিখিত বা অলিখিত চুক্তির অধীনে স্বামী স্ত্রীকে বাধ্যতামূলকভাবে যে মোহরানা দেয়, তাকে যৌতুক বলা হয় না। ইসলামিক আইনে দেনমোহর সম্পূর্ণভাবে স্ত্রীর প্রাপ্য। বাংলাদেশের আইনে যৌতুক দেওয়া বা দাবি করার জন্য যেকোনো লোককে পাঁচ বছর পর্যন্ত জেল অথবা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড দেওয়া যায়। ১৯৮৩, ১৯৯৫ ও ২০০০ সালে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের আওতায় যদি কোনো স্বামী অথবা তার আত্মীয়স্বজন যৌতুকের কারণে স্ত্রীর মৃত্যু ঘটায় বা গুরুতরভাবে আহত করে বা করার চেষ্টা করে, তবে তার বা তার আত্মীয়স্বজনের মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাবাস দেওয়া হয়। তার পরও এই উপমহাদেশে, বিশেষ করে বাংলাদেশে যৌতুকের ব্যাপারটি আগের মতোই রয়ে গেছে এবং সরকার যৌতুকের কারণে নারীদের প্রতি অত্যাচার কিভাবে রোধ করা যায়, তার আইনি উপায় খুঁজতে ব্যস্ত। ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিবন্ধকতার কারণে নারীরা এখনো উচ্চশিক্ষা এবং ভালো উপার্জনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত। তার পরও সরকার এ ঘৃণ্য প্রথা দূরীকরণের যেসব আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।

 

শিশুশ্রম

আজকের শিশুরাই দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ। কিন্তু আমাদের দেশে অশিক্ষা ও দারিদ্র্যের কারণে অধিকাংশ শিশুই উপযুক্ত কোনো পরিচর্যা পায় না। বরং জীবনের শুরুতে তাদের বের হতে হয় জীবিকার খোঁজে। নিয়োজিত হতে হয় ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে। শিশুশ্রম তাই এ দেশে খুব সাধারণ ব্যাপার হয়ে গেছে। বিদ্যমান শ্রম আইনে শিশুশ্রম নিষিদ্ধ করা সত্ত্বেও ব্যাপক সংখ্যক শিশু ঘরে ও বাইরে অর্থাৎ কল-কারখানা, ওয়ার্কশপ, রেস্টুরেন্ট, মিষ্টির দোকান, মোটর গ্যারেজ, বাস ও টেম্পো, নির্মাণকাজ, চা বাগান, কৃষি ও গৃহকর্ম ইত্যাদিতে নিয়োজিত। এসব কাজে কোনো নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেই। শিশুরা এসব কাজে নিয়োজিত থেকে অনেক সময়ই কেবল জীবন ধারণের খোরাকি পেয়ে থাকে, যা দয়া-দাক্ষিণ্য বলেও বিবেচিত হয়। অনেক ক্ষেত্রে শিশুদের কাজগুলোকে দাসতুল্য বলা যায়। শিশু শ্রমিকদের প্রায়ই তাদের শারীরিক ক্ষমতার চেয়ে কঠিন কাজ দেওয়া হয়। তাদের অনেকেই বিপজ্জনক ধোঁয়া বা গ্যাস অ্যাসবেস্টস, সিসা, সোডিয়াম ইত্যাদি সৃষ্ট অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে কাজ করে। ফলে তাদের চর্মরোগ, হূদরোগ, শ্বাসকষ্ট ইত্যাদি সমস্যায় ভুগতে হয়। গৃহকর্মে নিয়োজিত শিশুদের, বিশেষ করে মেয়েদের নিপীড়নের আশঙ্কা থাকে। অনেক শিশু অগ্নিদগ্ধ হয়ে কারখানায় দুর্ঘটনা, বিষক্রিয়া, জখম ও সহিংসতায় মৃত্যুমুখে পতিত হয়। বাংলাদেশ সংবিধানের ৩৪ অনুচ্ছেদে সব ধরনের জবরদস্তিমূলক শ্রমকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তাই শিশুশ্রমের ক্ষতিকর দিকগুলো সম্পর্কে গণসচেতনতা বাড়িয়ে শিশুর শিক্ষা লাভের অধিকারকে স্বীকৃতি দিতে হবে।


মন্তব্য