kalerkantho


পাঠ প্রস্তুতি

অষ্টম শ্রেণি : চারু ও কারুকলা

মো. জাকির হোসেন, সিনিয়র শিক্ষক, বিএএফ শাহীন কলেজ, কুর্মিটোলা, ঢাকা   

১৫ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



পৃথিবীর বিখ্যাত শিল্পী ও শিল্পকর্ম

 

১। ‘মাত্র সাঁইত্রিশ বছরের জীবনে তিনি পৃথিবীতে রেখে গেছেন অমূল্য সব শিল্পকর্ম’—শিল্পীর নাম উল্লেখ করে তাঁর সম্পর্কে যা জান লেখো।

উত্তর : মাত্র সাঁইত্রিশ বছরের জীবনে যে শিল্পী পৃথিবীতে রেখে গেছেন অমূল্য সব শিল্পকর্ম তিনি ভিনসেন্ট ভ্যান গগ।

১৮৫৩ সালের ৩০ মার্চ হল্যান্ডের ছোট্ট একটি গ্রামে ভিনসেন্ট ভ্যান গগ জন্মগ্রহণ করেন। বাবা ছিলেন গ্রাম্য দরিদ্র পাদরি। ২৭ বছর বয়সে ভ্যান গগ চিত্রশিল্পীর জীবন স্থির করে তাঁর ছোট ভাই থিওকে প্যারিসে চিঠি লেখেন। এরপর থেকে ছোট ভাইয়ের সাহায্য-সহযোগিতায় ভ্যান গগ অনেক ছবি আঁকলেন। কিন্তু জীবদ্দশায় তিনি মাত্র দুটি ছবি বিক্রি করেছিলেন। ভ্যান গগ মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন একদিন তাঁর ছবির সমাদর হবে। তাঁর সে ধারণা সত্যি হয়েছে। তাঁর মৃত্যুর পর আজ কোটি কোটি ডলারে ছবি বিক্রি হচ্ছে।

তাঁর বিখ্যাত ছবিগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য দিনমজুর, আত্মপ্রতিকৃতি, পোস্টম্যান, তাঁতি, একটি গাছ, আলোর দৃশ্য, সূর্যমূখী ফুল প্রভৃতি।

নিজের কুিসত মুখশ্রী ও জীবনের প্রতি তীব্র হতাশা তাঁকে ক্রমে উন্মাদ করে তোলে। ১৮৯০ সালে মাত্র সাঁইত্রিশ বছর বয়সে এই মহান শিল্পী আত্মহত্যা করেন।

 

২। রবীন্দ্রনাথের চিত্রকর্ম সম্পর্কে যতটুকু জেনেছ তা বর্ণনা করো।

উত্তর : রবীন্দ্রনাথকে এত দিন আমরা কবি হিসেবে জেনে এসেছি। আজ আমরা রবীন্দ্রনাথকে জানব চিত্রশিল্পী হিসেবে। প্রবীণ বয়সে এসে একজন শিল্পীর মতোই ছবি আঁকতে থাকেন রবীন্দ্রনাথ। তাঁর ছবি আঁকার পূর্বকথা ও ইতিহাস কেনো আকস্মিক ঘটনা নয়। আঁকার বাসনা তাঁর দীর্ঘদিনের। তা ছাড়া ঠাকুরবাড়িতে বড় ভাই জ্যোতিরিন্দ্রনাথ, ভ্রাতুষ্পুত্র অবনীন্দ্রনাথ ও গগনেন্দ্রনাথ অনেকেই সে সময় ছবি এঁকেছেন। ঠাকুরবাড়ির ভেতরে-বাইরে বিচিত্রা সভা ও অন্যান্য সংগঠনের সুবাদে রবীন্দ্রনাথ নিজেও চিত্রচর্চার কাজে খবরদারি করেছেন। তাঁর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ জীবনস্মৃতি থেকে জানা যায় দুপুরবেলা জাজিম বিছানো কোণের ঘরে ছবি আঁকার খাতা নিয়ে রবীন্দ্রনাথ আঁকাজোঁকা করেছেন। তিনি বলেছেন, যা চোখের সামনে আছে বা প্রতিদিন আমরা দেখছি তা-ই যথেষ্ট নয়—শিল্পীকে দেখতে হবে একটা বিশেষ কিছু, যা তাঁকে সৃষ্টিশীল করবে। শেষ ১০ বছরে রবীন্দ্রনাথ অনেক ছবি এঁকেছেন। সাহিত্যকর্ম করতে গিয়ে কখনো কখনো তিনি শিল্পকর্মের মধ্যে প্রবেশ করেছেন; অনেক কবিতার মাঝে শব্দ কেটে কেটে বিচিত্র সব জীবজন্তুর ছবি এঁকে ফেলেছেন। রবীন্দ্রনাথের প্রথম

চিত্রপ্রদর্শনী হয় ১৯৩০ সালে ইউরোপের কয়েকটি দেশে। তাঁর কয়েকটি ছবির নাম—নিসর্গ, প্রতিকৃতি, মা ও ছেলে, মুগল, আদিম প্রাণী, নৃত্যরত রমণী, অবসর ইত্যাদি। প্রকৃতিরই বহু চেনা রূপ আমরা দেখি নতুন করে ভিন্নমাত্রায় চিত্রশিল্পী রবীন্দ্রনাথের কল্যাণে।

 

৩। লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির পর শিল্পজগতের ইতিহাসে বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী কথাটি সম্পর্কে তোমার বিশ্লেষণ লেখো।

উত্তর : লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির পর শিল্পজগতের ইতিহাসে বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী হিসেবে যিনি বিখ্যাত তিনি শিল্পী পাবলো পিকাসো।

২৫ অক্টোবর ১৮৮১ সালে স্পেনের মালাগা শহরে পিকাসোর জন্ম। শিশুকালেই ছবি আঁকার হাতেখড়ি তাঁর বাবার কাছ থেকেই। পিকাসোর মধ্যে ছিল ছবির প্রতি গভীর অনুরাগ। তিনি যখন তিন বছরের শিশু, হাতের কাছে পেনসিল কিংবা কাঠকয়লা পেলে কাগজ কিংবা মেঝের ওপরেই ছবি আঁকতে আরম্ভ করে দিতেন। তাঁর বিখ্যাত কাজের মধ্যে রয়েছে গুয়ের্নিকা, তিন নর্তকি, দি গ্রেসেস, গার্ল বিফোর মিরর এবং আরো অনেক। তিনি ভাস্কর্য, কারুশিল্প, মঞ্চসজ্জা, পোশাক পরিকল্পনা, পোস্টার, এচিং, লিথোগ্রাফ, বইয়ের অলংকরণ প্রতিটি ক্ষেত্রে ছিলেন অসাধারণ। পিকাসো শুধু শিল্পীই নন, কবিও ছিলেন। প্রকৃতপক্ষে পিকাসোর জীবনটাই ছিল এক বিরাট শিল্প। মৃত্যুতেও যে শিল্পের শেষ হয় না।

১৯৭৩ সালের ৮ এপ্রিল ফ্রান্সে পিকাসোর শিল্পজীবনের চিরসমাপ্তি ঘটে।

 

৪। বাংলাদেশের ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) প্রতিষ্ঠাতা শিল্পী কে? তাঁর সম্পর্কে লেখো।

উত্তর : বাংলাদেশের ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) প্রতিষ্ঠাতা শিল্পী পটুয়া কামরুল হাসান।

১৯২১ সালে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ জেলায় কামরুল হাসান জন্মগ্রহণ করেন। চিত্রকলায় শিক্ষা গ্রহণ করেন কলকাতায়। ১৯৪৭ সালের পর তিনি বাংলাদেশে আসেন। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের সঙ্গে ১৯৪৮ সালে ঢাকায় সরকারি চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন এবং এখানে তিনি প্রায় ১২ বছর শিক্ষকতা করেন। ১৯৩৯ থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত ব্রতচারী আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। এরপর মণিমেলা ও মুকুল ফৌজ নামে শিশু কিশোর সংগঠন গড়ার উদ্যোগ নেন। তিনি ছিলেন মুকুল ফৌজের প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে অন্যতম।

কামরুল হাসান অনেক উল্লেখযোগ্য কাজ করেছেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ চলাকালে ‘এই জানোয়ারদের হত্যা করতে হবে’ লেখা ইয়াহিয়ার জানোয়ারের মতো তাঁর আঁকা পোস্টার চিত্রটি মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ছিল উৎসাহ ও প্রেরণার এক অস্ত্র। তিনি বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতীকের নকশা করেন। বাংলাদেশ সরকার তাঁকে একুশে পদকে ভূষিত করেন।

কামরুল হাসানের বিখ্যাত ছবিগুলো হলো—নবান্ন, তিনকন্যা, উঁকি, বাংলার রূপ, জেলে, পেঁচা, গণহত্যার আগে ও পরে ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। ঢাকার জাতীয় জাদুঘরে তাঁর আঁকা অনেক ছবি সংরক্ষিত আছে।

‘দেশ আজ বিশ্ব বেহায়ার খপ্পরে’ শিরোনামে জীবনের শেষ স্কেচ চিত্রটি তিনি আঁকেন মৃত্যুর আগ মুহূর্তে। ১৯৮৮ সালের ২ ফেব্রুয়ারি কবিতা উৎসবে হূদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে তিঁনি মৃত্যুবরণ করেন। ১৯৮৮ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মসজিদ চত্বরে তাঁকে সমাহিত করা হয়।


মন্তব্য