kalerkantho


সৃজনশীল প্রশ্ন

সপ্তম শ্রেণি : বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়

তাহেরা খানম, সহকারী শিক্ষক, ইসলামিয়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, সূত্রাপুর, ঢাকা   

৮ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



উদ্দীপকটি পড়ে নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও :

সরদার বিশ্বনাথ ইংরেজবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেন। তিনি এ আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তিনি ১২ জন সঙ্গীসহ তিনি ইংরেজদের হাতে ধরা পড়েন, সবাই প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত হন। কিন্তু তাঁদের আন্দোলন থেমে থাকেনি। পরবর্তী সময়ে তিতুমীর ইংরেজবিরোধী আন্দোলন চালিয়ে যান। তাঁর নেতৃত্বে চব্বিশ পরগনা, নদিয়া, ফরিদপুর নিয়ে এক বিরাট ভূখণ্ড মুক্তাঞ্চলে পরিণত হয়। অবশেষে তিনি ওই আন্দোলনে শহীদ হন।

(ক) রাজা দ্বিতীয় মহীপালের শাসনকাল উল্লেখ করো।

(খ) ‘কৈবর্ত বিদ্রোহ’ বলতে কী বোঝো?

(গ) উদ্দীপকে বাংলার কোন আন্দোলনের কথা বলা হয়েছে? ব্যাখ্যা করো।

(ঘ) ‘বাংলার কৃষকদের প্রতি ইংরেজদের বৈষম্যমূলক আচরণ ও নির‌্যাতনের ফলেই এ আন্দোলন সংঘটিত হয়েছিল। ’—উক্তিটির যথার্থতা মূল্যায়ন করো।

উত্তর :

(ক) রাজা দ্বিতীয় মহীপালের শাসনকাল ১০৭০-১০৭৭ খ্রিস্টাব্দ।

(খ) কৈবর্ত বিদ্রোহ হচ্ছে পাল রাজাদের বিরুদ্ধে বাংলার জেলে, কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষের বিদ্রোহ।

পাল রাজত্বের শেষের দিকের রাজাগণ তেমন যোগ্য ছিলেন না। তাঁদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ উঠতে থাকে। গ্রামবাংলায় গরিব মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। একসময় সাধারণ মানুষ একজোট হয়ে পাল রাজাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শুরু করে। অবশেষে রাজা দ্বিতীয় মহীপালের শাসনকালে (১০৭০-১০৭৭ খ্রি.) তাঁর বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ কৃষক আর জেলে সম্প্রদায়ের মানুষ বিদ্রোহ শুরু করে। ইতিহাসে এই বিদ্রোহ কৈবর্ত বিদ্রোহ নামে পরিচিত।

(গ) উদ্দীপকে বাংলার নীল বিদ্রোহের কথা বলা হয়েছে।

উনিশ শতকের প্রথমার্ধে বাংলার নীলচাষিরা ইংরেজদের বিরুদ্ধে কঠোর আন্দোলন গড়ে তুলেছিল। বাংলার ইতিহাসে এই আন্দোলন নীল বিদ্রোহ নামে পরিচিত। এ আন্দোলনের প্রবাদপুরুষ ছিলেন সরদার বিশ্বনাথ। পরবর্তী সময়ে তিতুমীরের নেতৃত্বে এ আন্দোলন চরম আকার ধারণ করে। একপর‌্যায়ে এ আন্দোলনে সাধারণ মানুষ, এমনকি ইংরেজদের দোসর জমিদাররাও নীলকরদের বিরুদ্ধে কৃষকদের পক্ষে যোগদান করেন।

উদ্দীপকে বলা হয়েছে, সরদার বিশ্বনাথ ছিলেন ইংরেজবিরোধী আন্দোলনের একজন প্রবাদপুরুষ। তিনি ছিলেন একটি গুরুত্বপূর্ণ সংগ্রামের নায়ক। ১৮০৮ সালে ১২ জন সঙ্গীসহ তিনি ইংরেজদের হাতে ধরা পড়ে সবাই প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত হন। এ ঘটনার সঙ্গে নীল বিদ্রোহের মিল খুঁজে পাওয়া যায়। ইংরেজরা বাংলা থেকে লুট করা সম্পদ তাদের দেশে পাচার করে সেখানে শিল্প-কারখানা গড়ে তোলে। ফলে ইউরোপে শিল্প বিপ্লব ঘটে। প্রথম দিকে সেখানে প্রসারিত হয় কলের তাঁত। এ সময় বেশির ভাগ কাপড় হতো সাদা। কাপড় সাদা করা ও সাদা রাখার কাজে নীল ছিল খুব কার্যকর। এ কারণে ইউরোপে নীলের ব্যাপক চাহিদা দেখা দেয়। এ সময় অধিক মুনাফার লোভে ইংরেজ বণিকরা বাংলার কৃষকদের নীলচাষে বাধ্য করতে লাগল। নীলচাষে যে খরচ হতো সে তুলনায় ইংরেজরা কৃষকদের খুব কম টাকা দিত। ফলে কৃষকরা নীলচাষ করতে চাইত না। কিন্তু ইংরেজরা কৃষকদের নীলচাষে বাধ্য করার জন্য অত্যাচারের পথ বেছে নেয়। কৃষকরা বাধ্য হয়ে ইংরেজদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলে। এ আন্দোলনের প্রথম নেতৃত্ব দেন সরদার বিশ্বনাথ। পরবর্তী সময়ে তিতুমীর এর নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। এ আন্দোলনই ইতিহাসে নীল বিদ্রোহ নামে পরিচিত। ওপরের আলোচনা থেকে বোঝা যায়, উদ্দীপকে বাংলার নীল বিদ্রোহের কথা বলা হয়েছে।

(ঘ) ‘বাংলার কৃষকদের প্রতি ইংরেজদের বৈষম্যমূলক আচরণ ও নির‌্যাতনের ফলেই এ আন্দোলন সংঘটিত হয়েছিল। ’—উক্তিটি যথার্থ।

বাংলার কৃষকদের নীলচাষে বাধ্য করার ফলে নীলচাষিরা যখন অসহায় হয়ে পড়েছিল এবং তাদের ওপর ইংরেজদের অত্যাচার যখন চরমে উঠেছিল, তখন বাংলার কৃষক তথা নীলচাষিরা এই বিদ্রোহ শুরু করে।

উক্তিটিতে বলা হয়েছে, বাংলার কৃষকদের প্রতি ইংরেজদের বৈষম্যমূলক আচরণ ও নির‌্যাতনের ফলেই এ আন্দোলন সংঘটিত হয়েছিল। এখানে আন্দোলনটি দ্বারা নীল বিদ্রোহকে বোঝানো হয়েছে। বাংলা থেকে লুট করা সম্পদ নিয়ে ইংরেজরা যখন তাদের দেশে শিল্প-কারখানা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি করতে থাকে, তখন তাদের দেশে নীলের চাহিদা ব্যাপক বৃদ্ধি পায়। তাই অধিক মুনাফার আশায় তারা নীলচাষের জন্য কৃষকদের বাধ্য করতে লাগল। কিন্তু ফসলি জমিতে নীলচাষ করলে কৃষকের ক্ষতি হতো। কারণ ইংরেজরা যে দাম দিত তাতে কৃষকদের উত্পাদন খরচ উঠত না। তা ছাড়া কৃষিজমিতে নীলচাষ করায় ভোগ্যপণ্যের  উত্পাদন কমে যায়। ফলে খাদ্যদ্রব্যের সংকট দেখা দেয়। এ কারণে চাষিরা সহজে নীলচাষ করতে চাইত না। কিন্তু ইংরেজরা বাংলার কৃষকদের নীলচাষে বাধ্য করার জন্য তাদের ওপর অত্যাচার চালায়। তারা কৃষকদের লাভ-লোকসানের দিকে না তাকিয়ে শুধু নিজেদের লাভের দিকেই নজর দেয়। তারা কৃষকদের প্রতি নানা রকম বৈষম্যমূলক আচরণ ও আমানুষিক নির‌্যাতন চালায়। নীলচাষিদের অত্যাচারের কথা সেকালের বিখ্যাত কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের ভাষায় বোঝা যায়—‘নীলকরের কী অত্যাচার/এই নীলে সকল নিলে এদের নিলে (লিলা) বোঝা ভার। ’ আর তাদের অত্যাচারের মর্মস্পর্শী চিত্র ফুটে উঠেছে দীনবন্ধু মিত্রের ‘নীলদর্পণ’ নাটকে। ইংরেজদের অত্যাচার, নির‌্যাতন এবং বৈষম্যমূলক আচরণ যখন মাত্রা ছাড়িয়ে যায়, তখন এ দেশের কৃষক সমাজ নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য জীবন বাজি রেখে ইংরেজদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে লিপ্ত হয়। আর এ সংগ্রামই হচ্ছে বাংলার নীল বিদ্রোহ।

সুতরাং ওপরের আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, উক্তিটি যথার্থ ও যুক্তিযুক্ত।


মন্তব্য