kalerkantho


নদীও জীবন্ত সত্তা

উচ্চ আদালতের রায় অনুযায়ী ব্যবস্থা নিন

৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



নদীও জীবন্ত সত্তা

নদীবিধৌত পলিমাটি দিয়ে গড়া বাংলাদেশ। নদীমাতৃক এ দেশের প্রকৃতি, জনজীবন, চাষাবাদ—প্রায় সবই নদীনির্ভর। তাই বলা হয়, নদী না বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে না। অর্থাৎ নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ না থাকলে দেশের প্রকৃতি ধ্বংস হবে, চাষাবাদ ব্যাহত হবে এবং বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে জনজীবন। দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশ সে পথেই এগিয়ে চলেছে। পলি জমে নদী ভরাট হওয়া, অব্যাহত দখল ও দূষণে বহু নদী এরই মধ্যে মরে গেছে। বহু নদী মরে যাওয়ার অবস্থায় রয়েছে। এ অবস্থায় হাইকোর্ট গতকাল এক যুগান্তকারী রায় দিয়েছেন। রায়ে ঢাকার পার্শ্ববর্তী তুরাগ নদকে ‘জীবন্ত সত্তা’ ঘোষণা করা হয়েছে। আইনজীবীদের মতে, শুধু তুরাগ নয়, সারা দেশের সব নদীই এখন থেকে জীবন্ত সত্তা হিসেবে পরিগণিত হবে। নদীর ক্ষতি জীবন্ত মানুষের যেকোনো ক্ষতির মতোই অপরাধ বলে গণ্য হবে। ঐতিহাসিক এই রায়ে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে দেশের সব নদ-নদী, খাল-বিল ও জলাশয় রক্ষায় ‘আইনগত অভিভাবক’ ঘোষণা করা হয়েছে। সরকারকে নদীসংক্রান্ত অপরাধ দমনের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন এবং আইন সংস্কারের মাধ্যমে কঠোর শাস্তির বিধান করতে বলা হয়েছে।

বাংলাদেশের বেশির ভাগ নদীর উৎপত্তিস্থল ভারত, নেপাল, চীন বা উজানে থাকা দেশগুলোতে। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এগুলো বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। উজানে ভূমিক্ষয়, নদীগুলোর পানিপ্রবাহের গতি রোধ কিংবা পানি প্রত্যাহার করা হলে বাংলাদেশ অংশে পানিপ্রবাহ কমে যায়। তখন নদী শুকিয়ে যায়, বেশি করে পলি জমে ও চর জাগে। এতে চাষাবাদ ব্যাহত হয়, নৌপরিবহন বন্ধ হয়ে যায়, মাটির গভীরে পানি প্রবেশের পরিমাণ কমে যাওয়ায় পানির স্তর নিচে নেমে যায় এবং মরুকরণ প্রক্রিয়া শুরু হয়। এরই মধ্যে দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে সেই মরুকরণ প্রক্রিয়ার পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছে। আবার বর্ষাকালে যখন নদীর উজানে থাকা সব বাঁধ খুলে দেওয়া হয় তখন আমাদের নদীগুলো সেই পানি ধারণ করতে পারে না। ফলে দেখা দেয় বন্যা। এতে হাজার হাজার কোটি টাকার ফসল নষ্ট হয়। এ অবস্থায় নদীগুলোর নাব্যতা রক্ষায় বাংলাদেশের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা আরো জোরদার করা প্রয়োজন।

গতকাল কালের কণ্ঠে প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদনে বিভিন্ন নদ-নদীর দুরবস্থার যে চিত্র উঠে এসেছে, তা খুবই দুঃখজনক। খুলনার পাঁচটি উপজেলায় নদীর জায়গা দখল করে গড়ে উঠেছে ২৭টি ইটভাটা, অন্যান্য স্থাপনা তো আছেই। একসময়ের প্রমত্তা পদ্মা এই শীতে যেন মরা নদী। বুকজুড়ে ধু ধু বালুচর। কোথাও কোথাও কৃষকদের ফসল ফলানোর চেষ্টা। গড়াই, চন্দনা, হুড়াই, চিত্রা নদীরও একই অবস্থা। কবি জীবনানন্দ দাশের প্রিয়তম নদী ধানসিড়ি এখন একটি মরা খাল। দেশের বেশির ভাগ নদীরই অবস্থা তাই। নদীর জায়গা দখলের মহোৎসব চলছে। বাঁধ দিয়ে নদীকে মেরে ফেলা হচ্ছে। স্থাপনা তৈরি হচ্ছে।

উচ্চ আদালতের এই যুগান্তকারী রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে সরকারকে নদী ও জলাশয় দখলের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। আমরা মনে করি, এই রায় সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশে নদী দখল ও দূষণ বহুলাংশে কমে যাবে।

 



মন্তব্য