kalerkantho


ঐতিহাসিক ৭ই মার্চ

ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সজাগ থাকতে হবে

৭ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



ঐতিহাসিক ৭ই মার্চ

হাজার বছরের পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে বাঙালি জাতি আজ স্বাধীন। পরাধীনতার সেই শৃঙ্খল ভাঙতে যে ঐতিহাসিক মুহূর্তটি সবচেয়ে বড় অনুঘটকের কাজ করেছে, সেটি হলো ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ বিকেল, যে সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের (তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে) জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ তাঁর মাত্র ১৯ মিনিটের ভাষণটি মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনেছিল মানুষ, পেয়েছিল তাদের কাঙ্ক্ষিত সব দিকনির্দেশনা। বারুদের মতো জ্বলে উঠেছিল দেশ। ভাষণের প্রতিটি শব্দ নির্বাচন করা হয়েছিল অত্যন্ত সুচিন্তিতভাবে, পরিস্থিতি বিবেচনা করে এবং প্রয়োজনের নিরিখে। কবি নির্মলেন্দু গুণ তাঁর এই ভাষণকে একটি ‘মহাকাব্য’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন, আর যিনি এই ভাষণ দিয়েছেন, তাঁকে বলেছেন ‘মহাকবি’। অনেক ঐতিহাসিক তাঁদের গ্রন্থে বঙ্গবন্ধুর ভাষণকে স্থান দিয়েছেন অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে। তাঁদেরও অনেকে বঙ্গবন্ধুকে ‘রাজনীতির কবি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। জাতিসংঘের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ইউনেসকোও বঙ্গবন্ধুর এই অসাধারণ ভাষণটিকে বিশ্বঐতিহ্যের এক অমূল্য সম্পদ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। অথচ কী নিদারুণ দুঃখ ও লজ্জার বিষয় যে বঙ্গবন্ধুর নিজ দেশেই দীর্ঘদিন ধরে এই ভাষণটি নিষিদ্ধ ছিল। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর একটা দীর্ঘ সময় ধরে এমন অপচেষ্টা করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল, নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস জানতে না দেওয়া। ইতিহাস পাল্টে দেওয়া।

স্বাধীন দেশে আবারও অনেক রক্তের বিনিময়ে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ধারা পুনঃ স্থাপিত হয়েছে। ৭ই মার্চ ফিরে এসেছে নতুন মর্যাদায় ও নতুন শক্তিতে। আসলে এই দিনটিই ছিল বাঙালির স্বাধীনতার পথে মোড় পরিবর্তনের দিন। পাকিস্তানি শাসকরা তৈরি ছিল। পঁচিশে মার্চ রাতে যে হামলা চালিয়েছিল, সেটি ৭ই মার্চে চালানোর পরিকল্পনা ছিল। তারা ঠিক করে রেখেছিল, বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দিলেই রেসকোর্স ময়দানে হামলা চালানো হবে, বিমান থেকে বোমা বর্ষণ করা হবে। বঙ্গবন্ধু সচেতন ছিলেন তাদের চক্রান্ত সম্পর্কে। তাই সেই ভাষণে তিনি অত্যন্ত সচেতনভাবে প্রতিটি শব্দ চয়ন করেছেন, যাতে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী সেটিকে তাত্ক্ষণিক স্বাধীনতার ঘোষণা বলে প্রমাণ করতে না পারে। আবার প্রকৃত অর্থে স্বাধীনতারই ঘোষণা দিলেন তিনি। তিনি বললেন, তিনি যদি আর হুকুম দিতে না পারেন, তাহলে কী কী করতে হবে। ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তুলতে হবে। শত্রুকে প্রতিরোধ করতে হবে। প্রয়োজনে আরো রক্ত দিতে হবে। পাকিস্তানি জেনারেলরাও স্বীকার করেছেন, বঙ্গবন্ধুর বুদ্ধিমত্তার কাছে তাঁরা সেদিন হেরে গিয়েছিলেন। সে জন্যই তিনি বঙ্গবন্ধু হয়েছেন, জাতির জনক হয়েছেন, বিশ্বনন্দিত নেতা হয়েছেন।

বাঙালি জাতির জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলোর একটি এই ৭ই মার্চ। ইতিহাস থেকে যাঁরা এই দিনকে মুছে দেওয়ার চেষ্টা করবে, তারা নিজেরাই মুছে যাবে। তার পরও ষড়যন্ত্রকারীদের ষড়যন্ত্র থেমে থাকে না, থাকবে না। যেমন থেমে থাকেনি স্বাধীনতার বিরুদ্ধে পাকিস্তানিদের ষড়যন্ত্র। থেমে থাকবে না তাদের এদেশীয় দোসরদের ষড়যন্ত্র। স্বাধীনতা রক্ষা করতে হলে এবং তা আরো অর্থবহ করতে হলে জাতিকে এসব ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সজাগ থাকতে হবে, সচেতনতার স্তরকে এগিয়ে নিতে হবে।

 


মন্তব্য