kalerkantho


জিম্মি করার প্রবণতা

স্বাস্থ্যসহ সব খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে হবে

২১ এপ্রিল, ২০১৭ ০০:০০



জিম্মি করার প্রবণতা

মানুষ সামাজিক দায়বদ্ধতা অস্বীকার করতে পারে না। কিছু পেশায় এ দায়বদ্ধতা তো আরো বেশি—যেমন স্বাস্থ্যসেবা।

অর্থের চেয়েও ঊর্ধ্বে মানবিকতা—কথাটি চিকিৎসাসংশ্লিষ্ট সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। তা না হলে মানুষের মৌলিক স্বাস্থ্যসেবার অধিকারটিই অরক্ষিত হয়ে পড়ে। হৃদ্যন্ত্রের অসুখ খুবই ঝুঁকিপূর্ণ, এর সঙ্গে জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন জড়িত। অনেক হৃদেরাগীকেই বেঁচে থাকার প্রয়োজনে হৃদ্যন্ত্রে রিং পরাতে হয়। এই রিং দিয়ে এক শ্রেণির ব্যবসায়ী রোগী ও তাদের পরিবারকে জিম্মি করে ফেলেছেন। বাধ্য হয়ে সরকার মূল্য নির্ধারণ করে দিয়েছে। এখন প্রতিবাদে রিং ব্যবসায়ীরা ধর্মঘটে নেমেছেন এবং অসংখ্য হূদেরাগীর জীবনকে বিপন্ন হওয়ার দিকে ঠেলে দিয়েছেন।

ব্যবসায়ীরা অবশ্যই তাঁদের স্বার্থের কথা ভাববেন। কিন্তু নৈরাজ্য টিকিয়ে রাখার কৌশল হিসেবে তাঁরা অসহায় রোগীদের জিম্মি করবেন? এই আচরণ কি অপরাধের শামিল নয়? গত বুধবার ধর্মঘটের কারণে চার শতাধিক রোগীর নির্ধারিত দিনে অস্ত্রোপচার হয়নি, রিং পরানো যায়নি। তাদের মধ্যে অনেককে এখন আরো কয়েক দিন অপেক্ষা করতে হবে নতুন করে শিডিউল পেতে। তত দিন পর্যন্ত হৃদ্যন্ত্রের অসুখ নিয়ে রোগীদের কষ্ট পেতে হবে। বাড়তি খরচ ও ভোগান্তির সঙ্গে স্বাস্থ্যগত বড় বিপদের ঝুঁকি তো আছেই। শুধু রিংই নয়, প্যাথলজিসহ নানা রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা, অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে রোগী রেখে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করাসহ নানা রকম অভিযোগই রয়েছে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে।

মানুষের অসহায়ত্ব ও বিচ্ছিন্নতার সুযোগ নিচ্ছে ঐক্যে শক্তিশালী গোষ্ঠী। তুচ্ছ কারণে, কখনো বা অন্যায্য দাবি আদায়ে যখন-তখন জনগণকে জিম্মি করা হচ্ছে। খুনের দায়ে চালকের মৃত্যুদণ্ড হলে কিংবা ভাড়া-নৈরাজ্য বন্ধ করার চেষ্টা হলে পরিবহন শ্রমিকরা যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেবে। অতীতে এমনকি চিকিৎসকদেরও দেখা গেছে স্বাস্থ্যসেবা বন্ধ রেখে রোগীদের জিম্মি করতে। শিক্ষকদের দেখা গেছে শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ রাখতে।

রিং ব্যবসায়ীরা কয়েক গুণ বেশি দাম রেখে অনেক রোগীকে কেবল পথেই বসাচ্ছেন না, মানহীন রিংও তাদের হাতে ধরিয়ে দিচ্ছেন। এটা এককথায় অন্যায়, অমানবিক। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হচ্ছে মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা। রিং-নৈরাজ্যে লাগাম দিতে মূল্য নির্ধারণ করে দেওয়ার সিদ্ধান্তটি অনেক আগেই আসা উচিত ছিল। সিদ্ধান্ত ঘোষণার পর এখান থেকে পিছু হটার কোনো সুযোগ নেই। সংঘবদ্ধ চক্রের সস্তা কৌশল হচ্ছে ধর্মঘট। মানুষ আইন মানবে না, কর্তৃপক্ষ আইন প্রয়োগ করতে গেলে বাদ সাধবে—তাহলে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা টিকবে কী করে! দাবি-দাওয়া থাকলে ইতিবাচকভাবে তা জানাতে হবে—মানুষকে জিম্মি করার অধিকার কারোর নেই। রিং ব্যবসায়ীদের ধর্মঘটের কারণে একজন রোগীরও যদি মৃত্যু হয় তার নৈতিক দায়দায়িত্ব কি ব্যবসায়ীদের কাঁধেই যাবে না? আইন না মানার প্রবণতা ব্যাপকভাবে মানুষকে পেয়ে বসেছে। এ থেকে আমাদের বেরোতে হবে। এগিয়ে যাওয়ার প্রধান শর্ত শৃঙ্খলা। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা না হলে জাতি হিসেবে আমরা পেছনের সারিতেই পড়ে থাকব; আর সাধারণ মানুষকে খেসারত দিতে তো হবেই!


মন্তব্য