kalerkantho


সেই বাসচালকের যাবজ্জীবন

তারেক-মিশুকের মতো অকালমৃত্যু বন্ধ হোক

২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



সেই বাসচালকের যাবজ্জীবন

বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা নৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিনিয়ত বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটছে, অনেকে সারা জীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে পড়ছে। প্রাণঘাতী সব দুর্ঘটনাই শোকাবহ ও বেদনাদায়ক। তার পরও কিছু কিছু দুর্ঘটনা সারা দেশকে নাড়া দিয়ে যায়। শোকে স্তব্ধ করে দেয়। তেমনি একটি দুর্ঘটনা ঘটেছিল ২০১১ সালের ১৩ আগস্ট মানিকগঞ্জের ঘিওরে। নিহত হয়েছিলেন বাংলাদেশের গণমাধ্যম ও চলচ্চিত্রাঙ্গনের দুই কীর্তিমান পুরুষ তারেক মাসুদ ও মিশুক মুনীর এবং তাঁদের মাইক্রোবাসে থাকা আরো তিন যাত্রী। বেপরোয়া গতির যে বাসটি তাঁদের মাইক্রোবাসকে দুমড়ে-মুচড়ে দিয়েছিল, সেই বাসচালকের শাস্তির দাবিতে মানুষ তখন রাস্তায় নেমে এসেছিল। দীর্ঘ ছয় বছর পর গতকাল বুধবার সেই মামলার রায় হয়েছে। বাসচালক জামির হোসেনকে বেপরোয়া গাড়ি চালানো ও অবহেলার দায়ে সংশ্লিষ্ট আইনে সর্বোচ্চ সাজা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তাতে দেশের বাস ও ট্রাকচালকদের সংবিৎ ফিরবে কি? বন্ধ হবে কি সড়কে স্বেচ্ছাচারিতা?

পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, ২০০৯ থেকে ২০১৬ সালের জুলাই পর্যন্ত সময়ে দেশে প্রায় ২০ হাজার সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে।

আর এসব দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে ১৮ হাজারেরও বেশি মানুষ। আহত হয়েছে আরো প্রায় ১৫ হাজার মানুষ, যাদের অনেকেই চিরতরে পঙ্গু হয়ে গেছে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, এসব দুর্ঘটনার দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি ঘটে বাস ও ট্রাকের কারণে। অথচ সড়কের এই মৃত্যুদানবের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণের কোনো উদ্যোগই চোখে পড়ে না। নামমাত্র হাইওয়ে পুলিশ থাকলেও তাদের জনবল খুবই কম। দায়িত্ব পালনে আন্তরিকতারও অভাব রয়েছে। আছে আধুনিক প্রযুক্তির অভাব। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সড়কগুলোর বিপজ্জনক স্থানগুলোতে গতি পর্যবেক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত সিসি ক্যামেরা থাকলে এবং গতিসীমা অতিক্রম করার সঙ্গে সঙ্গে গাড়িগুলো থামিয়ে আইনিব্যবস্থা নেওয়া গেলে দুর্ঘটনার হার অনেক কমে আসত। অভিযোগ আছে, অনেক বাস-ট্রাক অতিরিক্ত যাত্রী বা মালামাল পরিবহনের জন্য নির্ধারিত মাপের চেয়ে বড় করে বডি তৈরি করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এতে গাড়ির ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং দুর্ঘটনাকবলিত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। ফিটনেসবিহীন অনেক গাড়িও রাস্তায় চলে, যেগুলোর ব্রেক বা নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাও ত্রুটিপূর্ণ। সেই সঙ্গে চালকের লাইসেন্স প্রদানে দুর্নীতি ও অনিয়ম তো আছেই। অভিযোগ আছে, অর্থের বিনিময়ে অনেক অযোগ্য ও অদক্ষ চালক লাইসেন্স পেয়ে যায়। তাদের হাতে গাড়ির স্টিয়ারিং চলে গেলে সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করা কিভাবে সম্ভব?

সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো না গেলে দুর্ঘটনায় মৃত্যুর মিছিল ক্রমেই বাড়তে থাকবে। তারেক মাসুদ ও মিশুক মুনীরের মতো অনেক কীর্তিমানকেই প্রতিনিয়ত আমাদের হারাতে হবে। বাসচালক জামিরের যাবজ্জীবন হয়তো একটি দৃষ্টান্ত হবে, কিন্তু তাতে সারা দেশের বেপরোয়া গাড়ি চালনা বন্ধ হবে না। আমরা চাই, সড়কের শৃঙ্খলা ফেরানোর দিকেই সরকার সর্বোচ্চ মনোযোগ দিক।


মন্তব্য