kalerkantho


পদ্মা সেতুতে ‘দুর্নীতির ষড়যন্ত্র’

গুজব ছড়ানোর শাস্তি কি কাম্য নয়?

১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



পদ্মা সেতুতে ‘দুর্নীতির ষড়যন্ত্র’

পদ্মা সেতু নির্মাণে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলে বিশ্বব্যাংক ও তাদের স্থানীয় অনুসারীরা ছয় বছর আগে যা করেছিল, তা পদ্মার বিশাল জলরাশিকেও রীতিমতো ঘোলা করে দিয়েছিল। সাধারণ মানুষ বিশ্বাস-অবিশ্বাসের মাঝখানে এক দিশাহীন অবস্থার মধ্যে পড়েছিল।

বিশ্বব্যাংকের তৎকালীন বাংলাদেশ প্রধান, কয়েকটি গণমাধ্যম ও টক শোর কিছু চেনা মুখ ‘এত বড় দুর্নীতি’র জন্য সরকার ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও কর্মকর্তাদের তুলাধোনা করছিলেন প্রতিদিন। চাপে থাকা সরকার মন্ত্রীকে সরিয়ে দিয়েছিল। একজন সচিব ও একজন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল এবং তাঁদের কিছুদিন কারাবাসও করতে হয়েছিল। অভিযোগ ছিল, পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিয়োগ পেতে কানাডার একটি কম্পানি ঘুষ দিতে চেয়েছিল। বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এ ব্যাপারে দুই দফা তদন্ত করেও অভিযোগের সত্যতা পায়নি। পূর্বোক্তরা তখন দুদককেও একহাত নিয়েছিল। এই রটনার পরিপ্রেক্ষিতে মামলা হয় কানাডার একটি আদালতেও। সম্প্রতি সে মামলার রায় হয়েছে। আদালত একে নিছকই অনুমান ও গুজব হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন এবং কানাডার সেই কম্পানির অভিযুক্ত তিন কর্মকর্তাকে অব্যাহতি দিয়েছেন। এ খবর বাংলাদেশে পৌঁছার পর থেকেই দ্বিধাদ্বন্দ্বে থাকা বাংলাদেশের মানুষ সংবিৎ ফিরে পেয়েছে। জাতিকে কলঙ্কিত করার জন্য তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে আসছে। ক্ষোভ প্রকাশ করছেন ভুয়া অভিযোগের কারণে যাঁরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন তাঁরাও। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, বিশ্বব্যাংকের মতো একটি বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান এমন অন্যায় আচরণ কেন করল?

বিশ্বব্যাংকের এমন আচরণের নানা দিক এখন পত্রপত্রিকায় উঠে আসছে। পদ্মা সেতু প্রকল্পের দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির প্রধান ছিলেন অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী। তিনি শুধু দেশে নন, আন্তর্জাতিকভাবেও একজন খ্যাতিমান প্রকৌশলী ও শিক্ষাবিদ। তাঁর নেতৃত্বে মূল্যায়ন কমিটি প্রথম দফায় পাঁচটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানকে যোগ্য বিবেচনা করেছিল। সেই তালিকা বিশ্বব্যাংকের কাছে পাঠানো হলে বিশ্বব্যাংক পুনরায় দরপত্র আহ্বান করতে বলে। দ্বিতীয় দফায়ও পাঁচটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানকে বাছাই করে তালিকা পাঠানো হয়। কিন্তু বিশ্বব্যাংক তালিকার বাইরে একটি চীনা প্রতিষ্ঠানকে কাজ দিতে বলে। মূল্যায়ন কমিটি জানায়, কম্পানিটি কিছু ভুয়া তথ্য দেওয়ায় তাদের বিবেচনা করা হয়নি। পরে জানা যায়, চীনা কম্পানির অজান্তেই তাদের বাংলাদেশি এজেন্ট সই জাল করে এই দরপত্র দিয়েছিল। চীনা কম্পানি তখন দরপত্র প্রত্যাহার করে নেয় এবং এজেন্সি বাতিল করে। এতে আহত হয়ে বিশ্বব্যাংক দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তোলে এবং চুক্তি বাতিল করে। যে মানুষের ভেতর ন্যূনতম দেশপ্রেম আছে, তারা বিশ্বব্যাংকের এই আচরণ মেনে নিতে পারে না। এই রায়ে বাংলাদেশ সরকারের নৈতিক জয় হয়েছে। প্রমাণিত হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু করার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তা ছিল সঠিক।

বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের প্রধান উন্নয়ন সহযোগী। কিছুদিন আগে বিশ্বব্যাংকের প্রধান বাংলাদেশ সফর করে গেছেন এবং বর্ধিত উন্নয়ন সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। কিন্তু যাঁদের কারণে পদ্মা সেতু তিন বছর পিছিয়ে গেল, বাংলাদেশ অপমানিত হলো, তাঁদের জবাবদিহি করাটা কি বিশ্বব্যাংকের কর্তব্য নয়? স্থানীয় যাঁরা সেদিন কোনো তথ্য-প্রমাণ ছাড়াই দেশের কপালে কলঙ্কতিলক এঁকেছিলেন, তাঁদেরও বিচারের মুখোমুখি করা যায় কি না তা ভেবে দেখতে হবে, তা না হলে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি বন্ধ হবে না


মন্তব্য