kalerkantho


হিন্দু উত্তরাধিকার আইন

নারীদের বঞ্চিত রেখে সমাজ এগোতে পারে না

১১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



হিন্দু উত্তরাধিকার আইন

ভারত বা নেপালের হিন্দু নারীদের সঙ্গে ধর্মীয় বিবেচনায় বাংলাদেশের হিন্দু নারীদের কোনো পার্থক্য নেই। তা সত্ত্বেও সম্পত্তির উত্তরাধিকার প্রশ্নে পূর্বোক্ত দুটি দেশের হিন্দু নারীরা সমানাধিকার ভোগ করে আসছে। অথচ পৈতৃক সম্পত্তিতে এখনো বাংলাদেশের হিন্দু নারীদের কোনো অধিকার নেই বললেই চলে। এমন বৈপরীত্য কেন? বাংলাদেশের সংবিধানে নারী-পুরুষের সমানাধিকারের কথা বলা হয়েছে। নারীনীতিতেও সমানাধিকার নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। তার পরও রাষ্ট্র এ বৈষম্য দূর করার উদ্যোগ নিচ্ছে না কেন? ইসলামসহ বাংলাদেশের অন্যান্য ধর্ম বা সম্প্রদায়ের নারীরাও পৈতৃক সম্পত্তিতে সমানাধিকার ভোগ করে আসছে। তাহলে কেবল হিন্দু নারীরা কেন বঞ্চিত থাকবে?

হিন্দুধর্মের কিছু রক্ষণশীল মানুষ নারীদের এই অধিকার না দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট সরব। যখনই আইন করার কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয় তখনই তারা এই উদ্যোগকে ধর্মের ওপর আঘাত হিসেবে চিত্রিত করার চেষ্টা করে। তাদের মতে, এটি হিন্দুধর্মের রীতি, এখানে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ করার কোনো অধিকার নেই। তাহলে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকার পরও ভারত বা নেপাল হিন্দু নারীদের সমানাধিকার দিয়ে আইন পাস করে কিভাবে? সেসব দেশে কি ধর্মীয় রীতি অগ্রাহ্য করা হয়েছে? ১৯৫৬ সালে ভারত এসংক্রান্ত আইন করেছে। আজ পর্যন্ত হিন্দু পণ্ডিতরা কিংবা হিন্দুধর্মের লোকজন এই আইনের বিরুদ্ধে রাস্তায় নামেনি কেন? স্বাভাবিকভাবেই ধরে নেওয়া যায়, বাংলাদেশের রক্ষণশীল হিন্দুরা ধর্মের ওপর হস্তক্ষেপের যে যুক্তি তুলে ধরে, তা যৌক্তিক নয়, গ্রহণযোগ্য তো নয়ই।

বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের উদারমনা অংশও হিন্দু নারীদের অধিকার রক্ষায় আইন প্রণয়নের পক্ষে। আমরা মনে করি, হিন্দু নারীদের যুগের পর যুগ এভাবে বঞ্চিত রেখে বাংলাদেশ কখনো উন্নত সমাজ গঠনের পথে এগিয়ে যেতে পারে না। তদুপরি, সংবিধান সমুন্নত রাখার স্বার্থেও সংবিধান পরিপন্থী রীতিনীতি থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।

একসময়ের কৃষিভিত্তিক সমাজে জমিই ছিল প্রধান সম্পদ। উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সেই জমি রক্ষার প্রয়োজনে তৈরি হয়েছিল নানা নিয়ম-কানুন। এখন সমাজ বদলেছে। সম্পদের ধরন বদলেছে। মানুষের বিচরণের ক্ষেত্র বদলেছে। আগের অনেক নিয়ম-কানুন এমনিতেই অচল হয়ে গেছে। বলা যায়, পুরনো উত্তরাধিকার রীতিও তার কার্যকারিতা অনেকাংশে হারিয়ে ফেলেছে। তার পরও ধর্মের অযৌক্তিক দোহাই দিয়ে বর্তমান বাংলাদেশে হিন্দু নারীদের এভাবে অধিকারবঞ্চিত করে রাখা মোটেও কাঙ্ক্ষিত নয়। আমরা আশা করি, সরকার হিন্দু উত্তরাধিকার আইন প্রণয়নের বিষয়টি সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করবে। এ ক্ষেত্রে হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতা ও অগ্রসর লোকজনকে নিয়ে একটি কমিটি করে দেওয়া যেতে পারে, তারা আইন সংশোধনের খুঁটিনাটি বিষয়গুলো সুপারিশ করবে। ভারত ও নেপালে প্রচলিত আইনগুলোও বিবেচনা করা যেতে পারে। আমরা চাই, দ্রুত এ বৈষম্যের অবসান হোক।


মন্তব্য