kalerkantho


সর্বনাশা কোচিং বাণিজ্য

শ্রেণিকক্ষেই পাঠদানে শিক্ষকদের বাধ্য করুন

৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



সর্বনাশা কোচিং বাণিজ্য

শিক্ষার সঙ্গে জাতীয় উন্নতির সম্পর্ক নিবিড়। শিক্ষাহীনতা দেশ পিছিয়ে রাখে, মানহীন শিক্ষায় অগ্রগতির সম্ভাবনার অপচয় হয়। দেশে শিক্ষা নিয়ে নানাবিধ উদ্যোগ নেওয়া হলেও সার্বিক চিত্রটি হতাশার। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষার্থীর সংখ্যা, পাসের হার—সবই বাড়ছে, কমছে শিক্ষার মান। কথা ছিল, যোগ্য শিক্ষকের সাহচর্যে একজন শিক্ষার্থী তার মেধার সর্বোচ্চ বিকাশ ঘটানোর সুযোগ পাবে, শিক্ষক হবেন রোল মডেল। শিক্ষকদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ দায়িত্বের এই জায়গার প্রতি সুবিচার করছেন না। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষাদানের চেয়ে কোচিংয়ের নামে গলা কাটায় তাঁদের বেশি আগ্রহ। শিক্ষকদের এই স্বার্থপরতার বলি হচ্ছে কোটি কোটি শিক্ষার্থী। এ জন্য কর্তৃপক্ষের দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারিব্যবস্থাও কম দায়ী নয়। সরকারি এই দুর্বলতা এমনই প্রকট যে নীতিমালা করেও কোনো লাভ হচ্ছে না।

সরকার কোচিং বাণিজ্য বন্ধে নীতিমালা প্রকাশ করে ২০১২ সালে।

স্রেফ নজরদারির অভাবে উদ্যোগটি ফল দেয়নি। গতকাল কালের কণ্ঠ’র একাধিক প্রতিবেদনে শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্যের ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (মাধ্যমিক) কোচিং বন্ধ করার নীতিমালা সর্বক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে না পারার কথা উল্লেখ করে বলেছেন, শিক্ষা আইন পাস হয়ে গেলে কোচিং-প্রাইভেটের লাগাম টানা সম্ভব হবে। তবে এ বিষয়ে শিক্ষকদের কমিটমেন্ট ও অভিভাবকদের সচেতনতা বৃদ্ধি দরকার বলেও তিনি মত দেন। প্রশ্ন হচ্ছে, নতুন আইন কোচিং বন্ধ করবে কী করে! এর চূড়ান্ত খসড়ায়ই তো আনুষ্ঠানিক বৈধতা দেওয়া হয়েছে শিক্ষা বাণিজ্যের। শিক্ষাবিদরা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে আসছেন। শ্রেণিশিক্ষা থেকে সরে এসে শিক্ষাকে কোচিংনির্ভর করে ফেলার ক্ষতিকর দিকগুলো ইতিমধ্যেই নানাভাবে প্রকাশ পাচ্ছে। একদিকে লাখ লাখ শিক্ষার্থী জিপিএ ৫ নিয়ে মাধ্যমিক-উচ্চ মাধ্যমিক পাস করছে। অন্যদিকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ইংরেজিসহ বিভিন্ন বিভাগে ভর্তির জন্য ছাত্রছাত্রী মিলছে না। অতিরিক্ত ব্যয়বহুল কোচিং ব্যবস্থা অনেক ঘরে অর্থনৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনছে, নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে পারিবারিক সম্পর্কেও। অতিরিক্ত চাপ অনেক অভিভাবককে অসুস্থ করে দিচ্ছে।

সরকার নানাভাবে শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়েছে, শিক্ষা উপকরণেও আধুনিকতা এসেছে। শিক্ষকরা একটু আন্তরিক হলেই শ্রেণিকক্ষে মানসম্মত পাঠদান করতে পারেন। তাঁরা তা না করে কোচিংয়ে বাধ্য করছেন। বিষয়টি নীতিমালার লঙ্ঘনই শুধু নয়, অমানবিক ও অনৈতিক। নীতিমালা করে তার বাস্তবায়ন না করা কিংবা আইনে ফাঁকফোকর রেখে দেওয়ার প্রবণতা শিক্ষাসহ বিভিন্ন খাতকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে। প্রশ্ন হচ্ছে, যে খাতটিকে জাতির মেরুদণ্ড বলা হয়, তার সঙ্গে আমরা আপস করছি কার স্বার্থে?

কোচিং বাণিজ্য বন্ধে সরকারের উচ্চ মহল থেকেও বারবার অভিভাবকদের সচেতন হওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে। কিন্তু অভিভাবকরা বলছেন, তাঁরাও নিরুপায়, কারণ ক্লাসে পড়ানো হয় না। শিক্ষকদের ক্লাসে না পড়ানোর এই অন্যায় মনোভাব বন্ধ করতে হবে। জাতিকে মেধাশূন্য করার কোনো প্রবণতাই আর বরদাশত করা যাবে না।


মন্তব্য