kalerkantho


সার্কের অস্তিত্ব সংকট

ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে

৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



সার্কের অস্তিত্ব সংকট

দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা বা সার্কের আসন্ন শীর্ষ সম্মেলন শুধু স্থগিতই হয়নি, সার্কের ভবিষ্যৎ নিয়েও সৃষ্টি হয়েছে অনিশ্চয়তা। পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে আগামী নভেম্বরে এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু প্রতিবেশী দেশে সন্ত্রাসী হামলায় উসকানি, সন্ত্রাসীদের মদদ দেওয়া ও অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে পাকিস্তানের অব্যাহত হস্তক্ষেপের কারণে চারটি দেশ ইসলামাবাদে যাবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে। দেশগুলো হচ্ছে বাংলাদেশ, ভারত, আফগানিস্তান ও ভুটান। এ অবস্থায় বর্তমানে সার্কের সভাপতির দায়িত্ব পালনকারী দেশ নেপালের পক্ষ থেকে সম্মেলন স্থগিতের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। গণমাধ্যমে এমন খবরও এসেছে, সম্মেলনের বিকল্প স্থান খোঁজা হচ্ছে। পাকিস্তানে এ সম্মেলন না হয়ে অন্য কোথাও হলে পাকিস্তান তাতে যোগ দেবে কি না তা নিয়েও সন্দেহ আছে। এমনিতেই তিন দশকে সার্ক কোনো কার্যকর সংস্থা হিসেবে গড়ে উঠতে পারেনি। তদুপরি উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সার্কের ভবিষ্যৎ কী হবে, তা নিয়েও নানা ধরনের সংশয় তৈরি হয়েছে।

বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় নিজেদের সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সারা দুনিয়ায়ই আঞ্চলিক সহযোগিতার নানা ধরনের উদ্যোগ তৈরি হয়েছে। অনুরূপ লক্ষ্য নিয়ে সার্কেরও যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৮৫ সালে। কিন্তু ৩১ বছরেও সার্ক কার্যকর কোনো উন্নয়ন উদ্যোগ বা পদক্ষেপ নিয়ে এগিয়ে যেতে পারেনি। ২০১৪ সালে নেপালের রাজধানী কাঠমাণ্ডুতে অনুষ্ঠিত ১৮তম সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে আশা করা হয়েছিল বিদ্যুৎ, সড়ক ও রেল যোগাযোগ উন্নয়নে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি সম্পাদিত হবে। শেষ মুহূর্তে এসে সেই চুক্তিগুলোও করা যায়নি মূলত পাকিস্তানের বিরোধিতার কারণে। অথচ আঞ্চলিক উন্নয়নের জন্য বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও যোগাযোগ অবকাঠামোর উন্নয়ন সবচেয়ে জরুরি। আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও আন্তসীমান্ত সন্ত্রাস কমানোর ক্ষেত্রেও সার্ক কোনো ভূমিকা পালন করতে পারেনি। সেখানেও মূল প্রতিবন্ধকতা এসেছে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে। বাংলাদেশে ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রশ্নে পাকিস্তান প্রথমেই ত্রিপক্ষীয় চুক্তি ভঙ্গ করেছিল। এরপর জনগণের ম্যান্ডেটের ভিত্তিতে পূর্ববর্তী মহাজোট সরকারের আমলে দেশীয় মানবতাবিরোধী অপরাধকারীদের বিচার শুরু হলে পাকিস্তান নজিরবিহীনভাবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে থাকে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশবিরোধী প্রচার চালাতে থাকে। পাকিস্তানের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের বিরুদ্ধে বাংলাদেশে জঙ্গি-সন্ত্রাসীদের মদদ দেওয়ার অভিযোগ ক্রমেই জোরদার হতে থাকে। পাকিস্তান থেকে আসা জঙ্গিরা প্রতিবেশী দেশ ভারতে একের পর এক হামলা চালাতে থাকে। একই কাজ করতে থাকে আরেক প্রতিবেশী দেশ আফগানিস্তানের সঙ্গেও। ফলে পাকিস্তানকে সঙ্গে নিয়ে কোনো আঞ্চলিক সহযোগিতার উদ্যোগ কখনোই ফলপ্রসূ হবে না বলে মনে করে অধিকাংশ দেশ। এরই প্রতিফলন দেখা গেছে চারটি দেশের ইসলামাবাদে অনুষ্ঠেয় ১৯তম শীর্ষ সম্মেলন বর্জনের ঘোষণায়।

বন্ধুত্ব, সুসম্পর্ক, সহযোগিতা—এসবের জন্য সবচেয়ে জরুরি পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাস। বলতে দ্বিধা নেই, পাকিস্তান যা করছে, তাতে সেই আস্থায় চিড় ধরেছে। এ অবস্থায় সার্কে পাকিস্তান থাকলে তা কোনো দিনই ন্যূনতম কার্যকর কোনো সংস্থা হবে বলে মনে হয় না। অথচ বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কার্যকর আঞ্চলিক সহযোগিতার কোনো বিকল্প নেই। তাই সার্কের সদস্য দেশগুলোকে কার্যকর সার্ক গঠনের বিষয়টি নতুন করে চিন্তা করতে হবে। পাশাপাশি নিজেদের স্বার্থেই পাকিস্তানকে আয়নায় নিজের মুখ দেখতে হবে।


মন্তব্য