kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


সব্যসাচী লেখকের প্রয়াণ

বাংলা সাহিত্যের অপূরণীয় ক্ষতি

২৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



সব্যসাচী লেখকের প্রয়াণ

চলে গেলেন সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক। তিনি ছিলেন বাংলা সাহিত্যের সর্বাগ্রগণ্য কবিদের অন্যতম।

দুই বাংলায় তাঁর রয়েছে অসংখ্য পাঠক। ৮২ বছর অনেকটাই পরিণত বয়স, তবে তিনি বেঁচে থাকলে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সাহিত্যসহ বাংলা ভাষা নিঃসন্দেহে হতো আরো সমৃদ্ধ। লন্ডনের চিকিৎসকরা হাল ছেড়ে দেওয়ার পরও কবি ছিলেন অবিচল। মাতৃভূমিতে ফিরে যত দিন সম্ভব কাজ করতে চেয়েছিলেন। মৃত্যু পরোয়ানা মাথায় নিয়ে দেশে ফিরেছিলেন, কিন্তু নতুন নাটক লিখতে শুরু করেন—নাম ‘শেষ যোদ্ধা’। এ যেন মরণকে জয় করার অবচেতন ইচ্ছার মূর্তরূপ।

মৃত্যু কড়া নাড়ছিল দুয়ারে। তবু আমৃত্যু সক্রিয় থেকেই বিদায় নেন সব্যসাচী লেখক। সংস্কৃতিকর্মীদের আয়োজনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ৭০তম জন্মদিন উদ্যাপন কমিটির নেতৃত্বে ছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিনের জন্য গান লিখেছেন। স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী পালন নিয়েও তাঁর মহাপরিকল্পনা ছিল। গত শুক্রবারও কালের কণ্ঠে সাময়িকী দশদিকে তাঁর গল্প প্রকাশিত হয়েছে, রোগশয্যায় থেকে তিনি গল্পটি লিখেছিলেন।

সৈয়দ শামসুল হক লিখেছেন অর্ধশতাব্দীর বেশি সময় ধরে। মহাভারতের শ্বেতবাহক অর্জুন দুই হাত দিয়ে সমানে জ্যা আকর্ষণ করতে পারতেন। একইভাবে সাহিত্যের সব শাখায় সৈয়দ হক বিচরণ করেছেন। লেখায় নৈপুণ্য, রচনার প্রাচুর্য, অনুবাদ—এক কথায় সৃষ্টিকর্মের সব শাখাতেই অনায়াস পদচারণ তাঁকে সব্যসাচী লেখকের অভিধা এনে দেয়।

১৯৩৫ সালে কুড়িগ্রাম জেলায় জন্ম। বাবার ইচ্ছা থাকলেও তিনি ডাক্তারি পড়তে রাজি হননি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হয়েছিলেন। পড়াশোনা অসমাপ্ত রেখে বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে বেরিয়ে আসেন এবং লেখালেখিকে একমাত্র ব্রত করে নেন। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বিবিসিতে কাজ করেছেন। পরে সাহিত্যসাধনায় নিমগ্ন হন। মাত্র ২৯ বছর বয়সে বাংলা একাডেমি পুরস্কার পান। কবি একুশে পদকসহ আরো অনেক সম্মাননা ও স্বীকৃতিতে ভূষিত হয়েছেন।

তাঁর সময়ে তিনি উত্তরাধুনিক। শুধু সাহিত্য নয়, চলচ্চিত্র ও সংগীতেও অসামান্য অবদান তাঁর। কাহিনী, চিত্রনাট্য, সংলাপ ও জনপ্রিয় অসংখ্য গান দিয়ে তিনি আমাদের চলচ্চিত্রকে সমৃদ্ধ করেছেন। একটি জাতীয় পত্রিকায় তাঁর লেখা ‘হৃৎকলমের টানে’ কলাম ছিল পাঠকপ্রিয়।

কাব্যনাট্য ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’, ‘নূরলদীনের সারা জীবন’; কাব্যগ্রন্থ ‘পরানের গহীন ভিতর’, ‘বৃষ্টি ও বিদ্রোহীগণ’, ‘বৈশাখে রচিত পংক্তিমালা’সহ অসংখ্য সৃষ্টির রূপকারের এই চলে যাওয়া আমাদের বেদনার্ত করছে। জীবনের কাছে কোনো অপ্রাপ্তি না থাকলেও আরো কিছুদিন কবি বেঁচে থাকতে চেয়েছিলেন, হয়তো নতুন নতুন কাজের স্বপ্নও ছিল। অকাল নয়, বলা যায় পরিণত; এর পরও সৈয়দ হকের এই চলে যাওয়া আমাদের মুহ্যমান করে, বেদনাবিধুর করে।

‘তোমাকে অভিবাদন বাংলাদেশ/তুমি ফিরে এসেছো তোমার মানচিত্রের ভেতরে’ বলে কবি একদিন মাতৃভূমির বন্দনা করেছিলেন; আজ বাংলাদেশ তাঁকে বিদায় জানাচ্ছে। তবে কবির মৃত্যু নেই। শতাধিক গ্রন্থে তিনি অমর থাকবেন। তাঁর সৃষ্টির মাঝেই তাঁকে আমরা ফিরে ফিরে পাব।


মন্তব্য