kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ভালো নয় জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি

নজরদারি বাড়াতে হবে

২৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



ভালো নয় জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি

হাসপাতাল থেকে বলা হলো, নবজাতক মারা গেছে। দুঃখভারাক্রান্ত হৃদয়ে পরিবার শিশুটিকে নিয়ে বাড়ি ফিরে এলো।

দাফনের সময় শিশুটি কেঁদে উঠল। আবার নেওয়া হলো হাসপাতালে। হেলিকপ্টারে করে আনা হলো ঢাকায়। এখানে চিকিৎসকরা জানালেন, নবজাতকের শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল আছে। নির্দিষ্ট সময়ের অনেক আগে ভূমিষ্ঠ হওয়া শিশুটির আরো চিকিৎসা প্রয়োজন। তাহলে ফরিদপুরের ডা. জায়েদ মেমোরিয়াল শিশু হাসপাতালের চিকিৎসকরা শিশুটিকে মৃত ঘোষণা করেছিলেন কিসের ভিত্তিতে? মানুষ কি এখন মরে আবার জীবিত হতে পারে? চিকিৎসকদের এমন অসতর্কতা এটাই প্রথম নয়, আগেও দেখা গেছে। এক হাসপাতালের চিকিৎসকরা বলেছেন, রোগীর দুটি পা-ই কেটে ফেলতে হবে। অন্য হাসপাতালের চিকিৎসায় পা না কেটেই রোগী ভালো হয়ে গেছে, দিব্যি হেঁটে বেড়াচ্ছে—এমন ঘটনাও কম নয়। কেন এমন হবে? তাহলে কি আমাদের চিকিৎসাব্যবস্থায় ‘গোড়ায় গলদ’ বাড়ছে? বৈশ্বিক নানা জরিপেও উঠে আসছে বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি কতটা নাজুক। গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যায়, বিশ্বখ্যাত চিকিৎসা সাময়িকী ল্যানসেট ১৮৮টি দেশের স্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে একটি জরিপ পরিচালনা করেছে। তাতে বাংলাদেশের অবস্থান ১৫১তম। এতে ১৯৯০ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য ৩৩টি সূচকের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় নেপাল ও আফগানিস্তান ছাড়া বাকি সব দেশই বাংলাদেশের ওপরে, অর্থাৎ সেসব দেশের জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি আমাদের তুলনায় ভালো।

আমরা এর মধ্যেই সহস্রাব্দের লক্ষ্যমাত্রা বা এমডিজি অর্জন করেছি। শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার কমেছে। কিছু কিছু উন্নয়নও হয়েছে। কিন্তু এখনো করার অনেক কিছুই বাকি রয়ে গেছে। দেশের ৮০ শতাংশ মানুষের বাস গ্রামে। তারা এখনো জরুরি অনেক স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত। বর্তমান সরকার গ্রামাঞ্চলে প্রায় ২৫ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক চালু করলেও সেগুলোর মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতেও আধুনিক চিকিৎসার সুযোগ নেই বললেই চলে। অনেক কেন্দ্রেই আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম নেই কিংবা বিকল হয়ে পড়ে আছে। স্বাস্থ্যসেবা লাভজনক ব্যবসা হওয়ায় ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠেছে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক। অনেক ক্লিনিকে স্বাস্থ্যসেবার ন্যূনতম মান রক্ষা করা হয় না কিংবা ভুল চিকিৎসায় রোগী মৃত্যুর অভিযোগ প্রচুর। একইভাবে গড়ে উঠেছে বহু বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল। এগুলোর শিক্ষার মান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। কিছু প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সার্টিফিকেট বিক্রির অভিযোগও রয়েছে। আছে বিকল্প চিকিৎসার নামে রোগীদের সঙ্গে প্রতারণার অভিযোগও। আবার চিকিৎসকদের সততা ও আন্তরিকতা নিয়েও প্রশ্ন আছে। উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়োগপ্রাপ্ত অনেক চিকিৎসককেই কর্মস্থলে পাওয়া যায় না, এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। কর্তব্যে অবহেলা, সরকারি হাসপাতালের রোগীদের ক্লিনিকে যেতে বাধ্য করা, নানা অছিলায় রোগীদের পকেট কাটাসহ অনেক অভিযোগই রয়েছে চিকিৎসাসংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য ঠিক না থাকলে কোনো উন্নয়নই টেকসই হয় না। একদিকে ভেজাল ও বিষযুক্ত খাদ্য, অতি মাত্রায় পরিবেশদূষণসহ নানা কারণে দেশে রোগব্যাধির প্রকোপ বাড়ছে। এখন চিকিৎসাব্যবস্থাও যদি এভাবে ভেঙে পড়ে, তাহলে মানুষ যাবে কোথায়? এ অবস্থার পরিবর্তন করতে হবে। মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা বাড়াতে হবে। দুর্নীতি, অবহেলা ও অনিয়ম দূর করতে হবে।


মন্তব্য