kalerkantho

রবিবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


মীর কাসেমের ফাঁসি

মানবতাবিরোধীদের বিচারকাজ এগিয়ে যাক

৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



মীর কাসেমের ফাঁসি

১৯৭১ সালে পুরো বাঙালি জাতি যে বর্বরতার শিকার হয়েছিল, তা পৃথিবীর ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা। সেই বর্বরতা যেমন ছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর, তেমনি ছিল তৎকালীন জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রসংঘের সদস্যদের নিয়ে গঠিত বিভিন্ন বাহিনীর।

আর এই বর্বরতায় সবচেয়ে কুখ্যাতি অর্জন করেছিল আলবদর বাহিনী। এই বাহিনীরই তৃতীয় প্রধান কমান্ডার ছিলেন মীর কাসেম আলী। একাত্তরে মুক্তিকামী জনতার প্রতি তাঁর নিষ্ঠুরতা এতটাই প্রবল ছিল যে তখনকার চট্টগ্রামবাসী তাঁর নাম দিয়েছিল ‘বাঙালি খান’। তাঁরই নেতৃত্বে চট্টগ্রামের ডালিম হোটেল হয়ে উঠেছিল বর্বর নির্যাতনের একটি প্রধান কেন্দ্র, যা বিচারের রায়েও ‘মৃত্যুপুরী’ হিসেবে বর্ণিত হয়েছে। বহু মানুষকে এখানে এনে অমানবিক কায়দায় নির্যাতন করা হতো। সাক্ষীদের বয়ানে উঠে এসেছে সেসব নির্যাতনের লোমহর্ষক চিত্র। ফ্যানের সঙ্গে উল্টো করে ঝুলিয়ে পেটানো, ইলেকট্রিক শক দেওয়া, পানি চাইলে প্রস্রাব দেওয়া—কী-ই না করা হয়েছে সেখানে। অনেককে হত্যা করে লাশ নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে। তেমনি একজন ছিলেন কিশোর মুক্তিযোদ্ধা জসিম উদ্দিন, যাঁকে অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়। এই হত্যাকাণ্ডেই মীর কাসেমের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে।

স্বাধীনতাপরবর্তী সাড়ে চার দশকে অনেক তথ্য-প্রমাণ যেমন নষ্ট হয়েছে, তেমনি অনেক সাক্ষী দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছেন। আবার পঁচাত্তরপরবর্তী সময়ে, বিশেষ করে বিএনপি-জামায়াতের নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের আমলে অনেক তথ্য-প্রমাণ সুপরিকল্পিতভাবে নষ্ট করার অভিযোগও রয়েছে। তাই সর্বোচ্চ আদালতে অনেক অভিযোগের পক্ষে যথেষ্ট তথ্য-প্রমাণ তুলে ধরা ছিল একটি দুরূহ কাজ। তার পরও অভিজ্ঞ তদন্ত দল ও সরকারি কৌঁসুলিদের যথাসাধ্য চেষ্টায় ২০১৪ সালের ২ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মীর কাসেমকে দুটি অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এরপর রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হয়। গত মার্চে আপিল বিভাগ একটি মামলায় মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন। সেই রায় পুনর্বিবেচনার আবেদনও গত ৩০ আগস্ট খারিজ হয়ে যায়। আপিলে আরো কিছু মামলায় তাঁর অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় তাঁকে সর্বমোট ৫৮ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

মীর কাসেমের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ায় সারা দেশেই স্বস্তি প্রকাশ করা হয়েছে। অনেক জায়গায় তাত্ক্ষণিক মিষ্টি বিতরণের খবর পাওয়া গেছে। শুধু একাত্তরে স্বাধীনতাযুদ্ধের বিরোধিতাকারী জামায়াতে ইসলামীর মতোই দলটির বর্তমান অনুসারীরা এতে খুশি হতে পারেনি। তারা গতকাল রবিবার আধাবেলা হরতাল ডেকেছিল। এ ছাড়া অখুশি হয়েছে পাকিস্তান। পাকিস্তানের সরকার ও পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামী বিবৃতি দিয়ে তাদের ক্ষোভের কথা জানিয়েছে। কিন্তু কেন? যত ধরনের আইনি সুযোগ আছে, সবই তাঁরা নিয়েছেন। মীর কাসেমকে রক্ষার সব চেষ্টাই করা হয়েছে। তার পরও সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে এই হরতাল কেন? এসব কারণে অনেকেই মনে করেন, জামায়াত ও পাকিস্তানের বিষয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। তথ্য-প্রমাণ বলে একাত্তর থেকে এ পর্যন্ত জামায়াত ও পাকিস্তান কখনো বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে মেনে নেয়নি। নানাভাবে তারা বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়েছে। অনেকে মনে করেন, বর্তমান জঙ্গি কর্মকাণ্ডও তারই অংশ। তাই বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আমাদের আরো সচেতন হতে হবে। পাশাপাশি একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারকাজ চালিয়ে যেতে হবে।


মন্তব্য