kalerkantho

সোমবার । ১৬ জানুয়ারি ২০১৭ । ৩ মাঘ ১৪২৩। ১৭ রবিউস সানি ১৪৩৮।


মুক্তিযোদ্ধার সনদ নিয়েও বাণিজ্য!

এই লজ্জা থেকে জাতিকে রক্ষা করুন

২৮ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



মুক্তিযোদ্ধার সনদ নিয়েও বাণিজ্য!

মুক্তিযুদ্ধকে জাতি উচ্চ মূল্য দেয়। মুক্তিযুদ্ধের শহীদ, মুক্তিযোদ্ধা, বীরাঙ্গনা শব্দগুলো উচ্চারিত হলে অধিকাংশ মানুষের মনে শ্রদ্ধাবোধ জাগ্রত হয়; যদিও স্বাধীনতা-পরবর্তী সাড়ে চার দশকে মুক্তিযুদ্ধকে দলীয় রূপ দিতে গিয়ে ক্ষমতায় থাকা বিভিন্ন সরকার মানুষের সেই শ্রদ্ধাবোধকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। সম্মান দেওয়ার নামে মুক্তিযুদ্ধের শহীদ, মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনাদের নানাভাবে অসম্মানই করা হয়েছে। সেই হীন চেষ্টাগুলো আর নেই, এমনটা পুরোপুরি বলা যাবে না। বর্তমান সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানী ভাতাসহ কিছু সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করেছে। এটি অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে। একই সঙ্গে অর্থের বিনিময়ে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা সংশোধন এবং ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের বাড়বাড়ন্তের যেসব খবর পত্রপত্রিকায় আসছে, তা আমাদের ব্যথিতও করে।

বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা তৈরি করেছে। অভিযোগ আছে, সেসব তালিকায় অনেক রাজাকারও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে অন্তর্ভুক্তি পেয়েছে, আবার অনেক প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা তালিকা থেকে বাদ পড়ে গেছেন। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পরও তালিকা সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছিল। আর তখনই দেখা যায়, কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরোতে থাকে। সচিব থেকে শুরু করে অনেকেরই নাম চলে আসে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে। সংগত কারণেই সেই তোড়জোড়ে একসময় ভাটা পড়ে। বাস্তবতা হচ্ছে, অনেক প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, আর ভুয়া মুক্তিযোদ্ধারা লুটেপুটে খাচ্ছে। বর্তমান মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের অপমানিত হয়ে ফিরে আসার বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। এমনকি অপমানিত মুক্তিযোদ্ধার আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটেছে।

কেন এমন হবে? অধিকাংশ মুক্তিযোদ্ধাই ভারতে গিয়ে প্রশিক্ষণ শেষে অস্ত্র নিয়ে দেশে এসে যুদ্ধ করেছেন। সেখানে প্রত্যেক মুক্তিযোদ্ধাকে নির্ধারিত ফরম পূরণ করতে হয়েছে। এর ভিত্তিতে তৈরি করা তালিকা ভারত বাংলাদেশকে দিয়েছে। অন্তত এই তালিকার কেউ মুক্তিযোদ্ধার তালিকা থেকে বাদ যাওয়ার কথা নয়, অথচ তা-ও হয়েছে। স্বাধীনতার পর ঢাকা সেনানিবাস থেকে তালিকাভুক্ত মুক্তিযোদ্ধাদের রেজিস্টারে সই নিয়ে এককালীন কিছু অর্থ দেওয়া হয়েছিল। শুদ্ধ তালিকা করতে চাইলে সেই রেজিস্টারের সহায়তা নেওয়া যেত। বিভিন্ন জায়গায় স্থানীয়ভাবে মুক্তিযোদ্ধারা সংগঠিত হয়েছিলেন, তাঁদের সঠিক সংখ্যা ও তালিকা তৈরি করাও কঠিন হতো না। কিন্তু সেই পথে কখনো কোনো সরকার এগোয়নি। এর বদলে বরাবরই দলীয়ভাবে তালিকা তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে। আর সে কারণেই প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা ছিটকে পড়েছেন, তালিকায় ভুয়াদের সংখ্যা বেড়েছে। মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী জামায়াত-শিবিরও তাদের মুক্তিযোদ্ধাদের সমাবেশ করতে পারে। ভিন্নমতের কোনো মুক্তিযোদ্ধা সেখানে গেলে তাঁকে বের করে দেওয়ার সাহস দেখাতে পারে। হায়, মুক্তিযোদ্ধার সম্মান! এসব কারণে অনেক মুক্তিযোদ্ধাই এখন বলে থাকেন, ‘আমরা আর সম্মান চাই না, শুধু অসম্মান থেকে রক্ষা করুন। ’

আমরা চাই মুক্তিযুদ্ধকে মুক্তিযুদ্ধের জায়গায় স্থাপন করা হোক, কোনো দলের প্ল্যাকার্ড না বানানো হোক। মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডারসহ অনেকেই এখনো জীবিত আছেন। তাঁদের নিয়ে একটি জাতীয় স্ক্রিনিং কমিটি হোক। কারা কী ধরনের সনদ পাওয়ার যোগ্য—একটি সঠিক নীতিমালার ভিত্তিতে যাচাই-বাছাইয়ের কাজটি দ্রুত সম্পন্ন করা হোক।


মন্তব্য