kalerkantho


যুদ্ধশিশুর নথি হারানো

ইতিহাসের প্রতি এ অবজ্ঞা কেন

১৬ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



যুদ্ধশিশুর নথি হারানো

সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণে আমাদের সোনালি অর্জন স্বাধীনতা। মুক্তিযুদ্ধে এ দেশের মানুষ যেমন জীবন দিয়েছে, তেমনি চরম মূল্য দিতে হয়েছে নারীদের। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যুদ্ধের ৯ মাসে শুধু যে বাড়িঘর লুটপাট করেছে, আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে তা নয়, দেশের নারীদের ধর্ষণ করেছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রায় সাড়ে চার লাখ নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এক অসহনীয় জীবন কাটিয়েছেন তাঁরা। সামাজিক বিড়ম্বনা সহ্য করতে না পেরে অনেকে আত্মাহুতি দিয়েছেন। ৯ মাস পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে বন্দি অনেক নারীই অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে গর্ভধারণ করেন। যুদ্ধের পর অনেকে গর্ভপাত করালেও অনেকের সে অবস্থা ছিল না। সন্তান জন্মের পর সামাজিক সম্মান রক্ষার্থে এই নারীদের অনেকেই তাঁদের সন্তানের মায়া ত্যাগ করেন। এই শিশুদের জায়গা হয় সরকারি শিশুসদনে। তখনকার সমাজকল্যাণ বিভাগের তত্ত্বাবধানে এই শিশুদের দত্তক দেওয়া হয়। কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, হল্যান্ড, অস্ট্রিয়া, নরওয়েসহ বিভিন্ন দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয় এই শিশুদের। তাদের বলা হয় যুদ্ধশিশু। বড় হয়ে এই যুদ্ধশিশুদের অনেকেই আজ বিদেশে

প্রতিষ্ঠিত। তাঁদের অনেকেই বাংলাদেশে আসেন। খুঁজে ফেরেন তাঁদের হারানো মাকে। যে দেশে তাঁর জন্ম সে দেশের প্রতি এক নিবিড় টান অনুভব করেন তাঁরা।

সরকারি নথিপত্র অনুযায়ী ১৯৭২ সাল থেকে পরবর্তী ১০ বছরে বাংলাদেশ থেকে প্রায় আড়াই হাজার যুদ্ধশিশু বিদেশে দত্তক হিসেবে পাঠানো হয়। কিন্তু এখন সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে আছে মাত্র ৭০০ নথি। বাকি এক হাজার ৮০০ নথি হারিয়ে গেছে, নাকি গায়েব করা হয়েছে সে বিষয়ে কোনো তথ্য নেই। যে ৭০০ নথি সমাজসেবা অধিদপ্তরে আছে, সেগুলোও সঠিকভাবে সংরক্ষিত হচ্ছে না। অযত্ন-অবহেলায় ফেলে রাখা হয়েছে।

১৯৭২ সাল থেকে ১০ বছরে যে যুদ্ধশিশুদের দত্তক হিসেবে বিদেশে পাঠানো হয়েছিল, তারা আমাদের ইতিহাসেরই অংশ, আমাদের গর্ব। তাদের মায়েদের ত্যাগের বিনিময়েই আমাদের অর্জন মহান স্বাধীনতা। তাদের সম্পর্কে সব ধরনের তথ্যই সংশ্লিষ্ট দপ্তরে থাকা উচিত। দত্তক পাঠিয়েই সব দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। দত্তক পাঠানোর পর তারা কোথায় কী অবস্থায় আছে, কিভাবে বেড়ে উঠেছে সে সম্পর্কেও তথ্য থাকা উচিত। দত্তক দেওয়ার পর প্রথম দিকে তাদের অবস্থা সম্পর্কে খোঁজখবর নিতে গেলেও পরবর্তী সময় খবর রাখা হয়েছে কি না, তা জানা দরকার। কালের কণ্ঠে প্রকাশিত গতকালের শীর্ষ সংবাদ অনুযায়ী যুদ্ধশিশুদের তথ্য সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট বিভাগ উদাসীন। এই উদাসীনতা কি অপরাধের পর্যায়ে পড়ে না? আমরা আশা করব, হারিয়ে যাওয়া নথি খুঁজে বের করা হবে। ইতিহাস সংরক্ষণ করা হবে। একটি সময়ে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতির চেষ্টা হয়েছে। যুদ্ধশিশুদের নথি হারিয়ে ফেলা বা নষ্ট করে ফেলা সে অপচেষ্টারই অংশ কি না, তা খতিয়ে দেখা উচিত বলে আমরা মনে করি।


মন্তব্য