kalerkantho


লে খা র ই শ কু ল

জীবনের স্কুল থেকে পাঠ নিয়েছেন লুইজি পিরানদেল্লো

১৯ মে, ২০১৭ ০০:০০



জীবনের স্কুল থেকে পাঠ নিয়েছেন লুইজি পিরানদেল্লো

ইতালির নাট্যকার, কথাসাহিত্যিক ও কবি লুইজি পিরানদেল্লো ১৯৩৪ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান। ‘মনোস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণকে উত্তম নাট্যরূপ দেওয়ার জাদুকরী শক্তির জন্য’ তাঁকে এ পুরস্কার দেওয়া হয়।

উপন্যাস, কবিতা ছাড়াও শতাধিক ছোটগল্প ও ৪০টি নাটক রচনা করেন তিনি। তাঁর ট্র্যাজিক প্রহসনকে বলা হয় অ্যাবসার্ড নাট্যধারার পথপ্রদর্শক।

পিরানদেল্লোর জন্ম ১৮৬৭ সালে দক্ষিণ সিসিলিতে। বাবার ইচ্ছা ছিল ছেলে তাঁর মতো ব্যবসায়ী হবেন। তবে সাহিত্যের দিকে ঝোঁক দেখে তাঁকে সাহিত্যের পথেই প্রস্তুতির জন্য পাঠানো হয়। ১৮৮৭ সালে তিনি রোম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। একজন ল্যাটিন প্রফেসরের সঙ্গে দ্বন্দ্বের কারণে পিরানদেল্লো রোম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কৃত হন। তাঁর আরেক প্রফেসরের একটি চিঠি নিয়ে চলে যান বন। সেখানে থাকেন দুই বছর।

ওই দুই বছরে জার্মান সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্পর্কে ব্যাপক পড়শোনা ও জ্ঞানলাভ করেন। এ ছাড়া তাঁর প্রিয় বিষয় হয়ে ওঠে জার্মান রোমান্টিকদের রচনা। তিনি গ্যেটের ‘রোমান এলিজি’ অনুবাদ করা শুরু করেন জার্মানিতে থাকতেই। পিরানদেল্লো যখন রোমে ছিলেন তখন বেশ কিছু লেখক ও সাংবাদিকের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব হয়। তাঁদের মধ্যে উগো ফ্লেয়ারস, টোমাসো সোলি, গুস্টিনো ফেরি ও লুইজি কাপুয়ানা অন্যতম। কাপুয়ানা পিরাদেল্লোকে আখ্যানমূলক লেখার দিকে বেশি মনোযোগ দেওয়ার পরামর্শ দেন।

নিজের লেখকসত্তার ধরন ও গঠন সম্পর্কে তাঁর নোবেল ভাষণে পিরানদেল্লো উল্লেখ করেন, ‘আমার সাহিত্যিক প্রচেষ্টাকে সফল করার জন্য আমাকে জীবনের স্কুলে যেতে হয়েছে। যদিও অন্যান্য মেধাবী মানসের জন্য সে স্কুল সহায়ক না-ও হতে পারে, আমার মতো মানুষের মানস গঠনের জন্য জীবনের স্কুলই বড় সহায়ক ছিল। ’

১৯০৩ সালে পিরানদেল্লোর বাবার সালফারের খনি প্লাবনে ডুবে গেলে তাঁদের পরিবার বিরাট আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ে। তাঁর বাবার বিনিয়োগের সঙ্গে যোগ করা ছিল পিরানদেল্লোর স্ত্রীর টাকাও। এই ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার জন্য পিরানদেল্লো কঠোর পরিশ্রম করেন। কিন্তু তাঁর স্ত্রী প্রচণ্ড মানসিক আঘাতে ভেঙে পড়েন। সারা দিন কাজ করার পর রাতে মানসিক অসুস্থ স্ত্র্রীর দেখাশোনা করেন তিনি। একসময় স্ত্রীকে চিকিৎসার জন্য মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অসুস্থ স্ত্রীকে হাসপাতালে রেখে কিছুতেই শান্তি পাননি পিরানদেল্লো। দুঃখের বিষয় হলো, তাঁর স্ত্রী আর হাসপাতাল থেকে ফিরে আসেননি। তাঁর স্ত্রীর দীর্ঘ অসুস্থতার প্রভাব পড়ে পিরানদেল্লোর লেখার ওপরে। তাঁর লেখার অনেকখানি জুড়ে আছে মানসিক সমস্যা, কুহক এবং বিচ্ছিন্নতা।

পিরানদেল্লো তাঁর সময়ের শ্রেষ্ঠ ইতালীয় নাট্যকার। তাঁর পরবর্তী নাট্যকারদের ওপরে তাঁর স্পষ্ট প্রভাব রেখে গেছেন। অস্তিত্বের মায়াবী স্বভাব আর মানুষের বিচ্ছিন্নতা নিয়ে হাহাকার পরবর্তী নাট্যকারদের দিকে জোরালো ইঙ্গিত করে : স্যামুয়েল বেকেট, হ্যারল্ড পিন্টার প্রমুখের পথ তৈরি হয়েছে তাঁকে দেখে দেখে। তাঁকে সংক্ষেপে ধরা যায় তাঁর নিজের মন্তব্যে, ‘আমার নিজের জন্মের প্রতিশোধ নেওয়া ছাড়া আর কোনো উচ্চাভিলাষ ছাড়াই আমি অন্যদের আমার সামান্য যা বলার ছিল বলেছি। ’ 

সরলতা ছিল তাঁর জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত। মৃত্যুর আগেই পিরানদেল্লো জানান, তাঁর দাফন যেন হয় অতি সাধারণের সাধারণ : তাঁর গায়ে কাফনের কাপড় থাকবে না। আত্মীয়-বন্ধু কেউ যেন তাঁর কফিনে ফুল দিতে না আসে। কোনো মোমবাতি যেন জ্বালানো না হয়। একজন নিঃস্ব ব্যক্তির দাফন হবে তাঁর। তবে গির্জার লোকেরা তাঁর কথা শোনেননি। ফ্যাসিস্ট দলের নেতারাও তাঁর কথা রাখেননি। এত বড় বিখ্যাত নাট্যকারকে তাঁরা এভাবে দাফন করতে দেননি। তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়।   

 

দুলাল আল মনসুর


মন্তব্য