kalerkantho


কাজির বিচার : গোলাম মোস্তফা

সলিমুল্লাহ খান

১৯ মে, ২০১৭ ০০:০০



কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতিচারণা করিতে বসিয়া বুদ্ধদেব বসু একদা গোলাম মোস্তফার কয়েকটি চরণ উদ্ধার করিয়াছিলেন। বুদ্ধদেব লিখিয়াছিলেন, ‘সে-কালে বোহিমিয়ানের চাল-চলন অনেকেই অভ্যাস করেছিলেন—মনে মনে তাঁদের হিশেবের খাতায় ভুল ছিলো না—জাত-বোহিমিয়ান এক নজরুল ইসলামকেই দেখেছি। অপরূপ তার দায়িত্বহীনতা। সেই যে গোলাম মুস্তফা [সঠিক বানান ‘গোলাম মোস্তফা’] একবার ছড়া কেটেছিলেন— কাজী নজরুল ইসলাম/বাসায় একদিন গিছলাম/ভায়া লাফ দেয় তিন হাত,/হেসে গান গায় দিন রাত,/প্রাণে ফূর্তির ঢেউ বয়;/ধরায় পর তার কেউ নয়। এর প্রতিটি কথা আক্ষরিক সত্য। ’ (বসু ১৯৬৬ : ৮৭-৮৮)

আজিকার কোন নবীন কবিযশপ্রার্থী যদি জিজ্ঞাসা করেন কে সেই ছড়াকার, কে এই গোলাম মোস্তফা, তাঁহাকে বেশি দোষ দেওয়া যাইবে না। গোলাম মোস্তফা অবশ্য চিরদিন এতখানি খ্যাতিহীন ছিলেন না। একদা ‘পূর্ব্ব পাকিস্তানের জাতীয় কবি’ বলিয়াও তাঁহার পরিচয় ছড়াইয়া পড়িয়াছিল। আবদুল কাদির যে একবার লিখিয়াছিলেন, ‘গোলাম মোস্তফা রবীন্দ্রযুগের প্রথম সার্থক মুসলিম কবি’ কথাটা মোটেও অতিরঞ্জন নয়। (কাদির ১৯৭১ : [এক])

সার্থক কোন অর্থে? এই প্রশ্নের কিছুটা উত্তর দেওয়ার চেষ্টাও একটা করিয়াছেন জসীমউদ্দীন। তিনি লিখিয়াছেন, “তাঁর কবিতার মধ্যে মিলের, ধ্বনির এবং ছন্দের এমন চাতুর্য আছে, যা শুধু নজরুলেই মেলে। বাঙালি মুসলমান সেদিনও কায়কোবাদ ও ‘জাতীয় মঙ্গলে’র কবিতায় ডুবে ছিল। ” (জসীমউদ্দীন ২০০০ : ২১৫)

গোলাম মোস্তফার প্রথম কবিতার বই ‘রক্তরাগ’ (১৯২৪) প্রকাশিত হইয়াছিল কাজী নজরুল ইসলামের প্রথম কাব্য ‘অগ্নিবীণা’র (১৯২২) আগে নয়—এ কথা বিলকুল সত্য। তবে তাঁহার কবিখ্যাতি নজরুল ইসলামের আগেই রাষ্ট্র হইয়াছিল। জসীমউদ্দীন যাহা একবার লিখিয়াছিলেন তাহার মধ্যে ঢের সত্য আছে : ‘কবি গোলাম মোস্তফা রবীন্দ্রলোক হতে কাব্যসুধা আহরণ করে এনে মৃতপ্রায় মুসলিম সমাজে প্রথম গীতি-কবিতার বীজ বপন করেন। তাঁর আবির্ভাবের পরে নজরুল এসে সেই কাব্যধারাকে আরও প্রসারিত করেন। তাই বলে গোলাম মোস্তফার দান এখানে কম নয়। ’ (জসীমউদ্দীন ২০০০ : ২১৫)

জসীমউদ্দীন গোলাম মোস্তফার বিচার করিয়াছেন ইতিহাসের কুশীলবস্বরূপে। তিনি লিখিয়াছেন, ‘যাঁরা কবি গোলাম মোস্তফাকে মোল্লা কবি বলে বিদ্রূপ করেন তাঁরা জেনে রাখুন, প্রথম জীবনে কবিকে দেশের গোঁড়া এবং কূপমণ্ডূক মুসলিম সমাজের বিরুদ্ধে কত সংগ্রাম করতে হয়েছিল। মওলানা আকরম খাঁরও কত আগে তিনি সমাজে গান গাওয়ার সপক্ষে প্রচারকার্য করে বেড়িয়েছেন। আজ যে ঘরে ঘরে ছেলেমেয়েদের মধ্যে গানের চর্চা হয়, রেডিও-গ্রামোফোনে এত মুসলিম গায়কের কণ্ঠ শুনতে পাওয়া যায়, তার পেছনে কবি গোলাম মোস্তফা ও নজরুলের দান অনেকখানি। ’ (জসীমউদ্দীন ২০০০ : ২১২-১৩)

১৯৬৪ সালে কবি গোলাম মোস্তফার অকালমৃত্যুর পরপর জসীমউদ্দীন অকপটে লিখিয়াছেন, ‘কবির শেষ জীবনে আমাদের তরুণ সাহিত্যিকেরা কবির সাহিত্যকৃতিকে ভালো চক্ষে দেখেননি। কবির মুষ্টিমেয় গুণগ্রাহীদের মধ্যে আমিই বোধ হয় কবিকে সবচাইতে উচ্চ আসন দিতাম। তাঁর ‘বিশ্বনবী’ এবং অন্যান্য গদ্য রচনাকে আমি বহু স্থানে অকুণ্ঠভাবে প্রশংসা করেছি। তাঁর মতো এমন কবিত্বপূর্ণ ললিতগতিসম্পন্ন গদ্য লেখক আমাদের বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে একজনও নেই। ’ জসীমউদ্দীন অধিক গিয়াছেন, ‘অচিন্ত্য [কুমার] [সেনগুপ্তের] ‘পরমপুরুষ শ্রীরামকৃষ্ণ’ পুস্তকের চাইতে তাঁর ‘বিশ্বনবী’ অনেক গুণে শ্রেষ্ঠ। অচিন্ত্যকুমারের মতো তিনি তাঁর গ্রন্থকে সস্তা লোকপ্রিয় করতে কুসংস্কার ও গোঁড়ামি দ্বারা কলঙ্কিত করেননি। কিন্তু অচিন্ত্যের মতো অর্থ এবং সুনাম তিনি ‘বিশ্বনবী’ হতে পাননি। এ জন্য চিরকালই আমার মনে ক্ষোভ রয়ে গেছে। ’ (জসীমউদ্দীন ২০০০ : ২১৪)

সাহিত্য সমালোচক পরিচয়েও সেকালে গোলাম মোস্তফার একটা পরিচয় ছিল। নজরুল ইসলামের নিন্দা করিয়া তিনি অনেক প্রবন্ধ-নিবন্ধও লিখিয়াছিলেন। হয়তো অকালমৃত্যুর একেবারে পায়ে পায়ে বলিয়াই—নিতান্ত সৌজন্যের খাতিরে—জসীমউদ্দীন বিষয়টি এড়াইয়া গিয়াছিলেন। মোকাবেলা করিলে তাঁহাকে নিশ্চয়ই সত্য কথাটা বলিতে হইত আর তাহাতে তিনি হয়তো বিষণ্নই হইতেন; কিন্তু সেদিনকার তরুণ সাহিত্যিকরা কেন কবির সাহিত্যকীর্তি ভালো চোখে দেখিতেন না সে প্রশ্নের একটা উত্তরও—উপরি-পাওনাস্বরূপ—পাইয়া যাইতেন। আমরা একটা উদাহরণ দিতেছি।

পাকিস্তান কায়েম হইবার পরপর—১৯৪৯ সালে—ঢাকায় প্রথম পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হইয়াছিল। ঐ সম্মেলনে সভাপতির অভিভাষণ পড়িয়াছিলেন পণ্ডিত মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। তিনি যাহা বলিয়াছিলেন তাহা এত দিনে আমাদের মুখস্থ হইয়াছে, ‘মা প্রকৃতি আমাদের বুকে বাঙ্গালীত্বের যে ছাপ মারিয়া দিয়াছেন, তাহা টুপি-দাড়ি-লুঙ্গি দিয়া ঢাকা যাইবে না। ’ সম্মেলনটি পরের বছর অনুষ্ঠিত হয় চট্টগ্রামে, সভাপতি আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ। তাঁহার অভিভাষণে তিনি যাহা বলিয়াছিলেন তাহাতে গোলাম মোস্তফার আঁতে ঘা লাগিয়াছিল, ‘কোন দেশেরই ইতিহাস খণ্ডিত ও বিচ্ছিন্ন নহে। দেশের সাহিত্য, রাজনীতি ও সমাজজীবনের ইতিহাসেও আছে এক অখণ্ড ধারাবাহিকতা। ব্যক্তিগত ও জাতীয় জীবনের ঐতিহ্য ও তমদ্দুন নির্ভর করে এই ধারাবাহিকতার উপর; তার পরিচয় গ্রহণ ও তাকে আত্মস্থ করার শক্তির উপর। ‘জারজ’ সন্তান নিন্দিত, কারণ সে বিচ্ছিন্ন, সে ভুঁইফোড়, তার কোন অতীত নাই, কোন ধারাবাহিকতা নাই, বংশগত ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার হইতে সে বঞ্চিত। ’ আবদুল করিম অতঃপর যোগ করিলেন, ‘পূর্ব্ব পাকিস্তানের সাহিত্যসেবী ও সাহিত্যিক উত্তরাধিকারীগণও যদি ভুঁইফোড়ের বিড়ম্বিত [ভূমিকায়] অভিনয় করিতে না চাহেন, তাহা হইলে তাঁহাদিগকেও আমাদের সাহিত্যিক ঐতিহ্য, তার ধারাবাহিক গতিপ্রবাহের সঙ্গে পরিচিত হইতে হইবে। তাকে গ্রহণ করিতে হইবে, হজম করিতে হইবে। ’ (সাহিত্যবিশারদ ২০১০ : ১২৩)

পূর্ব পাকিস্তানের আধুনিকতা যশাভিলাষী তরুণ সাহিত্যিকদের উদ্দেশে আবদুল করিম এক্ষণে নিবেদন করিলেন, “পুঁথি সাহিত্যের ভাষা ও তার রচনাভঙ্গি প্রাচীন ও সেকেলে সন্দেহ নাই। কিন্তু আপনারা আপনাদের প্রতিভা ও সাধনা দ্বারা তাহাকে আধুনিক করিয়া তুলুন না কেন? যেমন সেক্সিপয়ার ও গ্যেটে করিয়াছেন, তাহারা ত প্রাচীন কাহিনীকে শুধু আধুনিক করিয়া সন্তুষ্ট থাকেন নাই, তাঁহারা সেই সব উপকরণকে সাহিত্যের চিরন্তন সম্পদ করিয়া তুলিয়াছেন। রবীন্দ্রনাথের ‘চিত্রাঙ্গদা’ হইতে অত্যাধুনিক আর কি আছে? সেই চিত্রাঙ্গদার কাহিনী কি অতি প্রাচীন, এমন কি প্রাগৈতিহাসিক যুগের ‘মহাভারত’ হইতে সঙ্কলিত হয় নাই? এখনো ত আপনারা কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ পড়িয়া থাকেন, তাহার উপকরণ কি প্রাগৈতিহাসিক যুগের ‘রামায়ণ’ হইতে গ্রহণ করা হয় নাই?” (সাহিত্যবিশারদ ২০১০ : ১২৬)

তরুণদের অভয় দিয়া অশীতিপর বৃদ্ধ আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ আহ্বান জানাইলেন, ‘যাঁহার প্রতিভা ও সাধনা আছে, এই সব ব্যাপার লইয়া তাঁহার মনে কোন দুর্ভাবনা থাকিবার কথা নয়। তরুণ নজরুল ইসলাম যখন অকস্মাৎ ধূমকেতুর মত বাংলা সাহিত্যে আবির্ভূত হইয়া অজস্র আরবী, ফারসী, উর্দ্দু শব্দ ও মুসলমানী ভাবধারার বন্যাস্রোত প্রবাহিত করিয়াছিলেন, তখন কেহই ত কোন আপত্তি করে নাই। আপত্তি করার কোন প্রয়োজন বোধই করে নাই। হিন্দু-মুসলমাননির্বিশেষে সব পাঠক তাঁহার সেই সাহিত্যকে দুই বাহু বাড়াইয়া লুফিয়া লইয়াছেন। ’ (সাহিত্যবিশারদ ২০১০ : ১২৬-২৭)

১৯৫০-এর দশকে ‘নওবাহার’ নামে একটি সাহিত্য পত্রিকা বাহির হইত গোলাম মোস্তফার সম্পাদনায়। ঐ পত্রিকার ১ম বর্ষ ৬ষ্ঠ সংখ্যার এক সম্পাদকীয়যোগে গোলাম মোস্তফা আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের একটা তিতিবিরক্ত সমালোচনা সবিস্তার লিখিয়াছিলেন। এই লেখায় অহমিকায় মোড়া সমালোচনা-প্রতিভার কিংবা হঠকারিতা শক্তির চূড়ান্ত নিদর্শন দেখা যায়। সাহিত্যবিশারদের কথার পিঠে পিঠ ঠেকাইয়া গোলাম মোস্তফা লিখিলেন : ‘যে ভাষার সহিত আমার নাড়ীর যোগ রহিবে না, আমার জীবন ও দর্শন যে ভাষায় রূপায়িত হইবে না, সে ভাষা কেমন করিয়া আমার মাতৃভাষা হইবে?’ শুধু কি তাহাই! আরো আগাইয়া গেলেন তিনি : ‘বিজাতীয় পরিবেশ ও ধ্যান-ধারণা লইয়া কি করিয়া একটা জাতির সাহিত্য রচনা করা চলে? জাতি ও তার সাহিত্য এক ধর্মাবলম্বী হওয়া চাই। মাতৃভাষার কাজ হইল জাতির ধর্ম্ম, আদর্শ, ধ্যান ও স্বপ্নকে রূপ দেওয়া। হিন্দুরা তাহা করিয়াছে, মুসলমানদিগকেও তাহা করিতে হইবে। অন্য কোন কারণে নয়, মুসলমানের জাতীয় জীবনের সংগঠন, সংরক্ষণ ও পরিপুষ্টির জন্যই ইহার প্রয়োজন। ’ (মোস্তফা ২০১০ : ১৮৬)

এই পর্যন্ত দেখিতেছি, গোলাম মোস্তফার সহিত সাহিত্যবিশারদ সাহেবের কোন সত্যকার বিবাদ নাই। বিবাদের বিষয় শুধু একটা জায়গায়—ঐতিহ্যের প্রশ্নে—পূর্ব বাংলার জাতীয় ঐতিহ্য কোনটা? আমরা দেখিয়াছি, আবদুল করিমের বিচারে যে কোন দেশের সাহিত্য, রাজনীতি ও সমাজজীবনের ইতিহাসে একটা অখণ্ড ধারাবাহিকতা থাকে। এদিকে গোলাম মোস্তফার ধারণা, ‘মুসলিম কবি-সাহিত্যিকদেরও আপন আপন জাতির ঐতিহ্য লইয়া সাহিত্য রচনা করা উচিত। ’ হিন্দু ও মুসলমান প্রভৃতি নানা ভিন্ন ধর্মাবলম্বীর সমবায়ে যে অখণ্ড বাংলা সাহিত্য ও সমাজ গোলাম মাস্তফা—এককথায়—তাহার অস্তিত্ব স্বীকার করেন না। উপরন্তু ভাষার সীমা ছাড়াইয়া ধর্মভিত্তিক ভাবধারার ধারাবাহিকতায় মাত্র আস্থা রাখেন তিনি।

আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদকে ছোট করিবার মতলবে তিনি ‘নওবাহারে’র পাতায় অভিযোগ করিয়াছিলেন : ‘অখণ্ডতা ও ধারাবাহিকতার খাতিরে নজরুলকে তিনি মাইকেল-বঙ্কিম-রবীন্দ্রনাথের পংক্তিভুক্ত দেখিলেই বেশী খুশি হন, হাফিজ-সাদী-ইকবালের পংক্তিতে নয়। ’ (মোস্তফা ২০১০ : ১৮৭)

অন্য বিচারে না হোক অন্তত সাহিত্য বিচারে ভাষাই জাতি গড়িবার প্রথম সোপান। সেই বিচারে মাইকেল, বঙ্কিম ও রবীন্দ্রনাথের সহিত নজরুল ইসলামের তুলনা না করাটাই বাতুলতা। তাই বলিতে হয়, গোলাম মোস্তফার যুক্তি অদ্ভুত এবং অবিশ্বাস্য। তিনি লিখিতেছেন, ‘সাহিত্যবিশারদ নজরুল ইসলামকে কি করিয়া মাইকেল-বঙ্কিম-রবীন্দ্রনাথের পর্যায়ে ফেলিলেন বুঝিলাম না। মাইকেল-বঙ্কিম-রবীন্দ্রনাথ উপকরণ সংগ্রহ করিয়াছেন রামায়ণ-মহাভারত হইতে। অতএব আমাদিগকে তাহাই করিতে হইবে, এর মানে কি? মাইকেল-বঙ্কিম ও রবীন্দ্রনাথ যদি রামায়ণ-মহাভারত ও গীতা-উপনিষদ হইতে উপকরণ লইয়া থাকেন, তবে তাঁহারা অন্যায় কিছু করেন নাই। ইহা দ্বারা তাঁহারা নিজেদের ধর্ম্ম ও জাতীয় আদর্শকেই বড় করিয়া তুলিয়া ধরিয়াছেন। অতীত ঐতিহ্য বলিয়াই যে তাঁহারা রামায়ণ-মহাভারতের আশ্রয় লইয়াছেন, তাহা নহে, জাতীয় ঐতিহ্য বলিয়াই তাঁহারা ঐ সব উপকরণ গ্রহণ করিয়াছেন। হিন্দু জাতি তাঁহাদের নিকট যাহা আশা করিয়াছিল তাঁহারা তাহাই দান করিয়াছেন। এখানে জাতির প্রতি তাঁহাদের মর্ম্মান্তিক দরদ ও বিশ্বস্ততারই প্রমাণ পাওয়া যাইতেছে। ’ (মোস্তফা ২০১০ : ১৮৭)

গোলাম মোস্তফার আরেকটা অভিযোগ : “বাংলা ভাষা হিন্দু-মুসলমানের মিলিত ভাষা হইলেও হিন্দু সাহিত্যিকদের কেহই মুসলমানের পুরাণ বা ধ্যান-ধারণা লইয়া কোন কাব্য রচনা করেন নাই। বরং নানাভাবে তাঁহারা মুসলিম সমাজকে বিদ্রূপ করিয়াছেন, বঙ্কিমের মুসলিম-বিদ্বেষ ত সর্ব্বজনবিদিত। বিরাট রবীন্দ্র-সাহিত্যেও একমাত্র ‘শাহজাহান’ [‘শা-জাহান’] কবিতা ছাড়া আর কোন মুসলমানী বিষয়বস্তু নাই। বস্তুতঃ মাইকেল-বঙ্কিম-রবীন্দ্রনাথ হিন্দু কালচারকেই জগতের সম্মুখে বড় করিয়া দেখাইয়া গিয়াছেন। ” (মোস্তফা ২০১০ : ১৮৭; ঠাকুর ১৩৯৯ : ৫৩৯-৫৪৪)

তর্কের খাতিরে ধরিয়া লওয়া যাক, অভিযোগটা সত্যই। এই পরিস্থিতিতে নজরুল ইসলাম কি করিতে পারিতেন? গোলাম মোস্তফা চাহিয়াছিলেন, নজরুল ইসলাম মুসলিম কালচারকেই জগতের সম্মুখে বড় করিয়া দেখাইয়া ছাড়িবেন। দুঃখের মধ্যে, নজরুল তাঁহার বাঞ্ছা পূরণ করিলেন না, তাঁহাকে হতাশ করিলেন। তিনি লিখিতেছেন, ‘ঠিক এর পাশাপাশি নজরুল ইসলাম কি করিয়াছেন? তিনিও সেই রামায়ণ, মহাভারত ও বেদ-পুরাণ হইতেই তাঁহার উপকরণ ও প্রেরণা সংগ্রহ করিয়াছেন। এমন কোন দেবদেবী নাই যার বন্দনা-গান তিনি গান নাই। ’ (মোস্তফা ২০১০ : ১৮৭)

গোলাম মোস্তফা স্বীকার করিতেছেন, “অবশ্য বহু আরবী ফার্সী শব্দ এবং ইসলামী ভাবধারাও তিনি প্রবর্ত্তন করিয়াছেন, কিন্তু তাহা গৌণ, মুখ্য নহে। তিনি গাহিয়াছেন ‘অখণ্ড ভারতের’ গান, তিনি শুনাইয়াছেন বেদান্তদর্শন ও উপনিষদের বাণী। মাইকেল-বঙ্কিম-রবীন্দ্রনাথের আদর্শের অনুকরণ না করিয়া তিনি তাঁহাদিগকেই অনুকরণ করিয়াছেন। দেবদেবীর বেলায় তিনি আদৌ ‘বিদ্রোহী’ নন। তিনি বিদ্রোহী শুধু খোদার বেলায়। কাজেই মাইকেল-বঙ্কিম-রবীন্দ্রনাথকে আমরা বুঝি, কিন্তু নজরুল ইসলামকে বুঝি না। ” (মোস্তফা ২০১০ : ১৮৭)

গোলাম মোস্তফার ‘কাজির বিচার’ বুঝিবার গোড়ার কথা এইটাই বলিয়া আমাদের মনে হইয়াছে। তাহার কাণ্ড ও শাখার কথা আরেক দিন আলোচনা করা যাইবে। এক্ষণে গোলাম মোস্তফার সিদ্ধান্ত দাঁড়াইল কি? সিদ্ধান্ত এই : “নজরুল ইসলামকে আমরা একটি ‘যুগ প্রবর্তক’ প্রতিভা বলিয়াই জানি। কিন্তু আজ আমাদের মনে এই জিজ্ঞাসা জাগে, কোন্ যুগের তিনি প্রবর্তন করিলেন? পাকিস্তানী যুগের? নিশ্চয়ই না; কারণ তিনি ছিলেন এই যুগ-প্রবাহের সম্পূর্ণ বিপরীত দিকে দাঁড়াইয়া। যুগ প্রবর্তনের কথাই যদি আসে, তবে বলিতে হইবে তিনি চাহিয়াছিলেন, ‘অখণ্ড ভারতের’ যুগ। তাঁর সমস্ত লেখায় আছে সেই ধ্যান, সেই বাণী। কিন্তু সে যুগ তো আসে নাই! ‘পাকিস্তান’ আসিয়া নজরুলের সে সাধের স্বপ্ন একদম ‘মাটি’ করিয়া দিয়াছে। ’ (মোস্তফা ১৯৬৮ : ২৬০)

 

দোহাই

১.  আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ, ‘অভিভাষণসমগ্র’, ইসরাইল খান সম্পাদিত (ঢাকা : বাংলা একাডেমী, ২০১০)।

২.  আবদুল কাদির, ‘ভূমিকা’, গোলাম মোস্তফা ‘কাব্যগ্রন্থাবলী’, প্রথম খণ্ড (ঢাকা : আহমদ পাবলিশিং হাউস, ১৯৭১), পৃ. [এক]-[আট]।

৩.  গোলাম মোস্তফা, ‘প্রবন্ধ সংকলন’, মাহফুজা খাতুন সম্পাদিত (ঢাকা : আহমদ পাবলিশিং হাউস, ১৯৬৮)।

৪.  [গোলাম মোস্তফা], “ ‘নওবাহার’-এর সম্পাদকীয় : চট্টগ্রাম সাহিত্য সম্মেলন ১৯৫০ প্রসঙ্গে’, আব্দুল করিম সাহিত্যবিশারদ, ‘অভিভাষণ সমগ্র’, ঐ, পৃ. ১৮৫-১৮৮।

৫.  জসীমউদ্দীন, স্মৃতির পট, ৫ম সংস্করণ (ঢাকা : পলাশ প্রকাশনী, ২০০০)।

৬.  বুদ্ধদেব বসু, ‘প্রবন্ধ সংকলন’  (কলিকাতা : ভারবি, ১৯৬৬)।

৭.  রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ‘সঞ্চয়িতা’, সংশোধিত পুনর্মুদ্রণ (কলিকাতা : বিশ্বভারতী, ১৩৯৯)।


মন্তব্য