kalerkantho


লে খা র ই শ কু ল

টমাস মানের প্রভাব

২১ এপ্রিল, ২০১৭ ০০:০০



টমাস মানের প্রভাব

১৯২৯ সালে নোবেল পুরস্কার পান জার্মান কথাসাহিত্যিক টমাস মান। তিনি প্রবন্ধকার ও সমাজ সমালোচক হিসেবেও সুপরিচিত। আধুনিক জার্মানির ঔপন্যাসিকদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ মনে করা হয় মানকে। তাঁর উপন্যাসের বিশেষ বৈশিষ্ট্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, প্রতীকের ব্যবহার ও দৃষ্টিভঙ্গির তির্যক দর্শন। তাঁর কথাসাহিত্যে তুলে ধরা হয়েছে শিল্পী এবং বুদ্ধিজীবী শ্রেণির মানুষদের মনোজগতের গহিন চিত্র। টমাস মান তীক্ষ দৃষ্টি দিয়ে পর্যবেক্ষণ করেছেন তাঁর সময়ের ইউরোপ তথা জার্মান মানস। টমাস মানের লেখার ওপর বিশেষ প্রভাব রয়েছে গ্যেটে, নিটেশ ও শোপেনহাওয়ারের। বলা হয়, জার্মান মানস প্রকাশ করার ক্ষেত্রে তিনি গ্যেটের উত্তরসূরি, কোমলতা আর সৌন্দর্যের দিক থেকে হাইনের উত্তরসূরি এবং গভীরতায় তিনি কান্টের অনুসারী। ১৯০১ সালে তাঁর উপন্যাস ‘বুডেনব্রুকস’ প্রকাশ করার পর থেকেই নিজের দেশে তাঁর নাম ছড়িয়ে পড়ে। তখন তাঁর বয়স মাত্র ২৬ বছর। ১৯২৪ সালে এটি ইংরেজিতে অনূদিত হয়।

তবে তার আগে শুধু জার্মানিতেই এ উপন্যাসের ৫০টি সংস্করণ প্রকাশ করা হয়। তখন ব্রিটিশ ও আমেরিকার সাহিত্য সমালোচকরা এ উপন্যাসটিকে জন গলসওয়ার্দির ‘দ্য ফোরসাইট সাগা’র সঙ্গে তুলনা করেন। ১৯২৯ সালে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর সারা বিশ্বের পাঠকদের নজর পড়ে তাঁর লেখার ওপর। ইউরোপে যেসব আন্দোলন জাতিতে জাতিতে ঐক্য তৈরির চেষ্টা করেছে, সেগুলোর সঙ্গে টমাস মানের নাম জড়িয়ে আছে। জার্মান সাহিত্যের ছাত্ররা দেখেছেন, দর্শনের দিক থেকে মান বহুলাংশে জার্মান। তবে একই সময়ে তিনি বিশ্বনাগরিক।

টমাস মানের পরিবারের লোকদের মধ্যে অনেকেই বিখ্যাত লেখক হয়েছেন। তাঁর বড় ভাই হাইনরিখ মান ছিলেন কথাসাহিত্যিক; তাঁর লেখায় প্রকাশ করেছেন ফ্যাসিবাদবিরোধী চেতনা। টমাস মানের ছয় সন্তানের মধ্যে তিনজন লেখক হয়েছেন। তাঁর প্রথম সন্তান ও বড় মেয়ে এরিকা মান একাধারে অভিনেত্রী এবং কথাসাহিত্যক ছিলেন। উল্লেখ্য, এরিকা ১৯৩৫ সালে ইংরেজ কবি ডাব্লিউ এইচ অডেনের সঙ্গে কাগজে-কলমে পরিণয়াবদ্ধ হন। তাঁরা একসঙ্গে জীবন যাপন করেননি। মানের বড় ছেলে ক্রস মানও লেখক ছিলেন। তাঁর দ্বিতীয় ছেলে গোলো মান ছিলেন জনপ্রিয় ইতিহাসবিদ, প্রবন্ধকার ও লেখক। পরবর্তী সময়ের অনেক লেখক-শিল্পীর ওপর রয়েছে টমাস মানের ব্যাপক প্রভাব। যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের নোবেলজয়ী লেখক হাইনরিখ বোল, আমেরিকার নাট্যকার ও ঔপন্যাসিক যোসেফ হেলার, জাপানের কবি, নাট্যকার, অভিনেতা ও চলচ্চিত্রকার ইউকিও মিশিমা, তুরস্কের নোবেলজয়ী কথাসাহিত্যিক ওরহান পামুক, কানাডার নোবেলজয়ী লেখক এলিস মুনরো প্রমুখের ওপর মানের স্পষ্ট প্রভাব রয়েছে। আরো স্পষ্ট উদাহরণ দিয়ে বলা যায়, ওলন্দাজ কথাসাহিত্যিক হ্যারি মুলিশের ‘দ্য ডিসকাভারি অব হেভন’ উপন্যাসে মানের প্রভাব দেখতে পাওয়া যায়। এডিনবরার ঔপন্যাসিক এন্ড্রু ক্রুমির উপন্যাস ‘মোবিয়াস ডিক’-এ একজন লেখক উপন্যাস লেখেন। সে উপন্যাসগুলো টমাস মানের উপন্যাসের মতো। হারুকি মুরাকামির উপন্যাস ‘দ্য নরওয়েজিয়ান উড’-এর প্রধান চরিত্র মানের ‘ম্যাজিক মাউন্টেন’ উপন্যাস পড়ে। এ ছাড়া ভারতীয় লেখক, নাট্যকার গিরিশ কর্নদ, মার্কিন এনিম্যাশন নির্মাতা ম্যাট গ্রোয়েনিং, আরেক মার্কিন এনিম্যাশন নির্মাতা সেথ ম্যাকফার্লেন, জাপানের চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব হেয়াও মিয়াজাকি, ইংরেজ চলচ্চিত্র পরিচালক ও প্রযোজক রিডলে স্কট প্রমুখের ওপরও পড়েছে টমাস মানের প্রভাব।

মানকে নিয়ে লেখা, তাঁকে স্মরণ করে তৈরি করা নাটক, কথাসাহিত্য, চলচ্চিত্র—সব কিছুতেই ঘটনাগুলো বাস্তবের মতোই মনে হয়। হয়তো আরো বহুকাল শিল্পী-সাহিত্যিকদের ওপর রয়ে যাবে টমাস মানের ছায়া।

 

আল মনসুর


মন্তব্য