kalerkantho


প্রদর্শনী

বাংলাদেশি চিত্রকলার নমুনা : সারসংক্ষেপ

মানব

২১ এপ্রিল, ২০১৭ ০০:০০



বাংলাদেশি চিত্রকলার নমুনা : সারসংক্ষেপ

মা ও শিশু। শিল্পী : রফিকুন নবী

বাংলাদেশের শিল্পকলার সার্বিক বিকাশে যাঁদের অবদান অপরিসীম, যাঁদের শ্রম, নিষ্ঠা ও সাধনায় বর্তমান শিল্পচর্চার এই সুস্থ সুপরিসর। তাঁদের ইতিহাস উজ্জ্বল, স্মরণীয় ও সুস্পষ্ট পদচারণে ম্লান হবে না কোনো দিন।

উক্ত বিষয়ে নতুন করে বলার বা স্মরণ করিয়ে দেওয়ার আবশ্যকতাও নেই। সম্প্রতি ঢাকার ‘গ্যালারি চিত্রকে শেষ হলো প্রদর্শনী ২০১৭’ নামে বাংলাদেশের বরেণ্য ১১ জন শিল্পীর যৌথ চিত্র প্রদর্শনী। ঐতিহাসিক ও বিরল কিছু ছবি কাছ থেকে গভীরভাবে দেখার এ সুযোগ শিল্পানুরাগীদের কাছে নিঃসন্দেহে বড় সৌভাগ্যের।

শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন শুধু যশস্বী শিল্পী হিসেবে নন, এ দেশের শিল্পচর্চার প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন ও বিশেষ ক্ষেত্র নির্মাণে আলোকোজ্জ্বল চিহ্নস্বরূপ। ১৯৪৩ সালে আঁকা দুর্ভিক্ষের রেখাচিত্রই শিল্পীকে বিশ্বখ্যাতি এনে দিয়েছিল। সচেতন মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির সূক্ষ্ম অনুভবই ছিল যার উপজীব্য। প্রদর্শনীতে মন্বন্তরের এক টুকরো অভাস দেখা যায় সে সময়কার একটি রেখাচিত্রে। শিল্পীর ‘বীরাঙ্গনা’ ছবিটি বিশেষভাবে আলোচনার দাবি রাখে। ছবিটি সম্ভবত অসমাপ্ত; তবু রং ও তুলির আঁচড়ের প্রাথমিক আবহে ভাব প্রকাশের ভূমিকা সুস্পষ্ট।

পটুয়া কামরুল হাসানের শিল্পকর্মে এমন এক বিশেষত্বের ছাপ সুস্পষ্ট, যা একই সঙ্গে লোকঐতিহ্য ও আধুনিকতার সার্থক সমন্বয়। কালো রঙে আঁকা গরু কিংবা কাঁধে বাঁক ঝুলিয়ে চলা কোনো দই বিক্রেতা, বাঁকের ওপর কাকের উত্সুক চাহনি—সবই যেন শাশ্বত বাংলার চেনা রূপ।

শিল্পী সফিউদ্দীনের কাজে বরাবরই প্রাধান্য পেয়েছে মানুষ, মানুষের কর্মময় জীবন, প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলি, নদী, নৌকা প্রভৃতি। মাছ ধরার হলুদ জাল—ছবিটি মূলত জ্যামিতিক কাঠামোগত নকশাধর্মী। একই ধারায় দেখা যেতে পারে ‘সরে যাওয়া বানের পানি’ ছবিটি। প্রদর্শনীতে ‘একাত্তরের স্মৃতি’ নামে শিল্পীর বিখ্যাত ছবিটি দেখার সুযোগ মেলে। ছবিটি রেখাধর্মী মুখের অবয়ব ও অসংখ্য অভিব্যক্তিপূর্ণ চোখের সমন্বয়। ছবিটি শুধু অনুভূতির সম্মিলন নয়, একটি নির্দিষ্ট সময়েরই প্রকাশভঙ্গি।

শিল্পী মোহাম্মদ কিবরিয়া বাংলাদেশে বিমূর্ত প্রকাশবাদী ধারার প্রবর্তক। কোনো বস্তু বা প্রতিমূর্তির পরিবর্তে তার ছবিতে প্রকাশ পায়। বিভিন্ন রঙের নিরীক্ষামূলক বিচিত্র বিন্যাস। ‘কালো ও বাদামি’ শিরোনামে ছাপচিত্রে দেখা যায়, বিয়ষবস্তু ছাপিয়ে তাঁর প্রকাশভঙ্গি মুখ্য ভূমিকা জুড়ে আছে। শিরোনামহীন-১ নামের লিথোগ্রাফে রূপ পেয়েছে কোনো ক্ষয়িষ্ণু দেয়ালের একাংশ। যা হয়তো শিল্পীর ভালো লাগা বা কোনো খেয়ালেরই প্রতিরূপ।

শিল্পী আমিনুল ইসলামের ভাবনার জগৎ অনেকটা প্রতীকী গড়নের। শিল্পীর বেশির ভাগ কাজের মধ্যেই  খুঁজে পাওয়া যায় সহজেই প্রকৃতির সঙ্গে মনুষ্যজীবনের গভীর অন্তরঙ্গতার উপলব্ধি। শিল্পীর ‘কৃষক পরিবার’ নামের অপূর্ব সুন্দর ছবিটি ভিন্নধর্মী বাস্তবানুগ সহজ প্রাণের গ্রামীণ প্রতিচ্ছবি।

শিল্পী রশিদ চৌধুরীর মূল আগ্রহের বিষয় রং।    ক্যানভাসে বরাবরই মৌলিক রঙের আধিপত্য, একই সঙ্গে সমান তালে রংয়ের ওঠানামায় ছবিতে একধরনের সংবেদনশীল আবেদন। প্রদর্শনীতে শিল্পীর একটি আত্মপ্রতিকৃতি দেখার সুযোগ মেলে, যা শিল্পীর পূর্ববর্তী কাজের বিরল নমুনা।

শিল্পী মুর্তজা বশীরের অ্যাকুইস্টিক এচিং মাধ্যমে আঁকা বিভিন্ন ছবি এক ধরনের জিজ্ঞাসা সামনে রাখে। মূর্ত বা বিমূর্তের মাঝামাঝি রূপ খুঁজে নেওয়ার মনোযোগ দাবি করে। সূর্য উদয় কিংবা লাল-নীল রংয়ের কম্পোজিশনে বিষয়বস্তুর বাইরে এক ধরনের স্বচ্ছ ইঙ্গিত আছে; যা শেষ কথা নয়, প্রবেশের পথ মাত্র।

শিল্পী আবদুর রাজ্জাকের ছবিতে ঘটনার তাত্ক্ষণিক বর্ণনার সন্ধান মেলে। এক ধরনের ক্ষিপ্রতা ও গতিময়তা দর্শককে বিষয়বস্তু ও তার তাৎপর্য সহজেই বুঝিয়ে দেয়। টর্নেডোর তাণ্ডবচিত্র যথার্থই প্রকাশ পেয়েছে শিল্পীর কালি-তুলির সবেগ চালনায়।

শিল্পী সমরজিৎ রায় চৌধুরী হৃদয়ে লালিত ঐতিহ্যকে সাজিয়েছেন নকশাধর্মী বহু জ্যামিতিক অনুষঙ্গে। তাঁর ক্যানভাস মনে হতে পারে বহু টুকরো টুকরো অনুভূতির কোলাজ। বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ উৎসব, প্রকৃতি প্রভৃতি প্রাণ পেয়েছে তাঁর ছবিতে গভীর আন্তরিকতায়।

গ্রামীণ জনপদ ও মধ্যবিত্ত বাঙালির জীবনালেখ্যই শিল্পী রফিকুন নবীর ছবির মূল বিষয়বস্তু। সব ছবিই উজ্জ্বল রংয়ে আঁকা। সব ক্ষেত্রেই বলিষ্ঠ রেখার গঠনশীল বুনট। শিল্পীর মা ও শিশু ছবিটি একটি সুন্দর ও অকৃত্রিম আটপৌরে জীবনেরই যেন গল্প বলে। শিল্পী পরম যত্নে এঁকেছেন সাধারণ মানুষের জোড়াতালির সংসারচিত্র। মানুষের পাশাপাশি গৃহপালিত পশু-পাখি ও প্রকৃতি ইত্যাদি অনুষঙ্গ হাজির করেছেন সরল সম্পর্কের রসায়নে।

শিল্পী মনিরুল ইসলামের চিত্রভাষা কিছুটা ভিন্ন মেজাজের। ব্যাবিলনের  ঝুলন্ত উদ্যান, স্বর্গের গান, শরতের কথা প্রভৃতি ছবির শিরোনামেই সুস্পষ্ট শিল্পীর ভাবনার পরিমণ্ডল। ছবির ভাষা সম্পূর্ণ বিমূর্ত না হলেও বাস্তবতার বেশ দূরে। যে ভাষা শুধুই অনুভূতির, স্থির চিন্তার। ধূসর জমিনে ঠাণ্ডা শীতলতার সঙ্গে শূন্য বোধের মিলিত আভাস।


মন্তব্য