kalerkantho

সোমবার । ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ । ৮ ফাল্গুন ১৪২৩। ২২ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৮।


গল্পটি অতঃপর মিথ্যা বনে গেল

রাশেদ রহমান

১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



গল্পটি অতঃপর মিথ্যা বনে গেল

অঙ্কন : মানব

যা কিছু শুনেছেন আপনারা—ঘটনা সত্য, একবিন্দুও মিথ্যা নাই এতে; মিথ্যা শোনেননি আপনারা। ঘটনাটি ঘটেছে আমার জীবনে—অর্থাৎ গল্পটি আমার নিজের, আমি নিজেই আপনাদের শোনাব...।

আপনাদের বলি, আমার নাম ফুলমতি। জানি, নামটি আপনারা পছন্দ করলেন না। তা না করারই কথা। কেমন সেকেলে নাম! নামটি আমার নিজেরও না-পছন্দ। আমি যদি স্কুলে পড়তাম, আমার বয়সী অনেক মেয়েই হাই স্কুলে পড়ে, আমি নিজের নাম বদলে রাখতাম—ফুল্লরা ইয়াসমিন। নামটা চমৎকার না? কিন্তু স্কুলে যেহেতু পড়ি না, নাম বদলের সুযোগ হয়নি। মা আমাকে ফুলমতি নামেই ডাকে। শুধু ফুল বা মতি বলে ডাকে না। আমি নদীর ধারে থাকলে মা বাড়ির বাইরে বেরিয়ে যখন ফুলমতি বলে জোরে জোরে ডাকে, তখন কিন্তু ভালোই লাগে। তখন আর নিজের নামটিকে না-পছন্দের বলে মনে হয় না। দাদি আমাকে কখনো ফুল, আবার কখনো মতি বলে ডাকে। কুসুমফুল বলেও ডাকে কখনো-সখনো। দাদি তখন ‘চোখ-বাঁধা-বুড়ি’ সেজে আমাকে ডাকে, ‘আয় রে আমার কুসুমফুল...। ’ আমি দাদির কপালে টোকা মেরে তার পেছনে গিয়ে দাঁড়াই। দাদি তার দুই হাত পেছনে নিয়ে আমাকে জড়িয়ে বলে, ‘এই তো আমার মতি, আমার কুসুমফুল...। ’

আমার শরীরের রং নাকি কুসুমফুলের মতো হালকা সোনালি, দাদি তাই আমাকে কুসুমফুল বলে ডাকে। অথচ কাণ্ডটা দেখুন—দাদি অন্ধ, নিজের ছায়াটা পর্যন্ত দেখে না; সে কিভাবে দেখল—আমার শরীরের রং কুসুমফুলের মতো! আমি যদি বলি, দাদি, তুমি তো অন্ধ, চোখে দেখো না, তুমি কী করে আমার শরীরের রং দেখলে? দাদি তখন ঠোঁট চেপে ধরে মিটিমিটি হাসে, বলে—‘অন্ধরাও চোখে দেইখে। আমি যা দেইখি, তুই তা দেইখিস না...। ’

দাদি যে অন্ধ, চোখে দেখে না কিছুই, দাদি কিন্তু তা মানতে চায় না। বলা ভালো, মানে না কিছুতেই। সারা দিন বাঁশের কঞ্চির লাঠিতে ভর করে টুকটুক করে হেঁটে বেড়ায় বাড়িতে। বাড়ির কুকরাগুলো কোথায় গেল, শেয়ালে ধরে কি না; হাঁসগুলো নদী থেকে ফিরল কি না—এসব দেখে দাদি। দাদিকে যদি বলি, তুমি পথ দেখো কেমনে, হাঁটাচলা করো কেমনে—দাদি তার স্বভাবমতোই মিটিমিটি হাসে, বলে—অন্ধরাও চোখে দেইখে...।

বাবার ছিল মাছ মারার প্রচণ্ড নেশা। তাও আবার রাতের বেলা। বৃষ্টি-বাদলা, অন্ধকার কোনো কিছুই মানত না সে। সাপ-খোপ কিংবা ভূত-প্রেতের ভয় ছিল না তার। রাতে খাওয়াদাওয়া সেরে বড়শি কিংবা ঝাঁকি জাল নিয়ে ছুটত নদীতে। অন্ধকার রাতে বাঁশের বুন্দা নিয়ে যেত। বুন্দা জ্বেলে রাখত নদীর কাছাড়ে। মাছ পাক বা না-পাক, কুছ পরোয়া নেহি—প্রত্যেক রাতেই মাছ মারতে সে যাবেই। রাত নামলেই নদী তাকে ডাকে। নদীর ডাক বাবা উপেক্ষা করতে পারে না। মা দু-একবার বলেছে, নিশুতি রাতে ঘরে একাকী তার ভয় করে। মায়ের কথা শুনে বাবা বলত, ‘মার ঘরে শুইয়ে থাক। আমি আইসে ডাইকে তুলব...। ’ বাবা শেষ রাতে বাড়িতে আসত...।

এক রাতে, তখন মধ্যরাত, বাবা তখনো পর্যন্ত একটা মাছও মারতে পারেনি, সব মাছ যেন আত্মগোপন করেছে নদীর তলদেশে, মেজাজ খিঁচড়ে গেছে বাবার। বড়শির ছিপ-সুতা গুটিয়ে দিয়ে, ঝাঁকি জাল ধুয়ে বাড়ির পথ ধরে সে...।

অন্ধকার রাত, বুন্দা জ্বেলেই রেখেছে বাবা। বুন্দার কেরোসিন কমে এসেছে, আলো কম। তবে পথ দেখতে অসুবিধা নাই। তা ছাড়া পথ তো মুখস্থ। ক্ষেতের আলপথ ধরে দ্রুত হাঁটে বাবা। মাছ না-পাওয়ার রাগে তার মেজাজ তো বিগড়ে গেছেই, শরীরটাও থরথর করে কাঁপছে। বাড়ির কাছাকাছি যাওয়ার পর ভূত দেখে মানুষ যেভাবে চমকে ওঠে, বাবাও সে রকম চমকে ওঠে। ঘরের পেছনে দাঁড়িয়ে আছে একটা লোক। আরেকজন সিঁদ কাটছে...।

বাবার শরীরের কাঁপুনি থেমে যায়। সে কিছুক্ষণ নিশ্চল বৃক্ষের মতো দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর দুই-চার পা এগিয়ে আবার দাঁড়ায়। তখন তার চমকানোর পালা দ্বিগুণ, তিন গুণ... সাত গুণ, দশ গুণ করে বাড়তে থাকে। সিঁদ কাটার তদারকি করছে ওমর মোল্লা, কয়েক দিন পর না সে মেম্বার পদে ভোটে দাঁড়াবে! এখনই কথাবার্তা বলতে শুরু করেছে। আর যে লোকটি সিঁদ কাটছে, তার মাথা নিচের দিকে ঝুঁকে থাকায় তাকে চেনা যাচ্ছে না। ওমর মোল্লারই কোনো চেলাচামুণ্ডা হবে...।

বাবা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবে, ওমর মোল্লা তো পয়সাওয়ালা লোক। চোর না। তা ছাড়া ঘরে চুরি করার মতো কিছু নাইও, একমাত্র তার বউ আয়নামতি ছাড়া। তাহলে কি আয়নামতিরে...!

হঠাৎ বাবার বুন্দার আলো ওমর মোল্লার চোখে পড়ে। কাঁপুনি শুরু হয়ে যায় মোল্লার। সে ফিসফিসিয়ে বলে, ‘এই নুরু, লোকমান শালায় কি আইজ এহনই ফিরা আইলে...?’

—কই...?

—ওই যে বুন্দার আলো...।

—ঠিকই কইছেন তুমি। ওইডে লোকমানেই। চলেন কাইটে পড়ি...।

জাত-চোরের মতোই ওরা নিঃশব্দ পায়ে কেটে পড়ে। ইসিস রে! আরেকটু হলেই ধরা পড়ে যেত। কিছু দূর যাওয়ার পর দাঁড়ায় ওমর মোল্লা। তাকে দাঁড়াতে দেখে নুরুও দাঁড়ায়। ওমর মোল্লা বলে, ‘লোকমান আমাগোর চিইনে ফেলে নাই তো...?’

—চিইননের তো কথা না। আপনের চোখ-মুখ, মাথা গামছা দিয়া প্যাঁচাইনে আছিল। আমার মাথা আছিল গর্তের মুহে। আর চিইনলেই কী? কিছু কইলে অর কল্লাটা নামায়ে দিমু...।

—ঠিকই কইছিস। লোকমান বাঁইচে থাকতে আয়নামতি আমার কাছে ধরা দিবানানে। সাত দিনের মধ্যেই কামডা সাইরে ফেলা...।

তার তিন দিন পরই বাবা খুন! রাতে মাছ মারতে নদীতে গেছিল। শেষ রাতে বাড়ি আসেনি। ভোরবেলা খবর আসে বাবা খুন হয়েছে। লাশ পড়ে আছে টোকে। শুধু ধড়টাই আছে, মুণ্ডু নাই...।

বাবা খুন হওয়ায় আমরা একেবারে অথৈ সাগরে পড়লাম। বাবা মাছ মেরে বাজারে বিক্রি করে যা পেত তাই দিয়ে চলত সংসার। এখন বাবা নাই, রোজগারও নাই। আমাদের উনুনে এক দিন আগুন জ্বলে তো, আরেক দিন জ্বলে না। মা হাঁস-মুরগি পালে, কিন্তু ডিম বেচে কতটুকু আর কী করা যায়। মা তখন এবাড়ি-ওবাড়ি কাজ করা শুরু করে...।

আমার শরীরে যখন কুসুমফুল ফুটতে শুরু করে, তখন এক রাতে দাদি কাঁদতে কাঁদতে শাস্তর বলার মতো করে—বাবা কেন খুন হয়েছে, কে খুন করেছে—আমাকে বলে...।

আমার মা যখন যোগীপাল বউ হয়ে আসে, ওমর মোল্লা তার আগে থেকেই বিবাহিত। ঘরে দুই বছরের কন্যাসন্তান। তাতে কী! লোকটা নোচ্চা কিসিমের। পরের বউ দেখলেই কার্তিক মাসের কুত্তার মতো ছোঁ ছোঁ করে। আগেই বলেছি, মায়ের শরীরে কুসুমফুল ফুটত। ওমর মোল্লার চোখ পড়ে মায়ের ওপর...।

 

আমাদের বাড়ির পাশ দিয়ে বাজারে যাওয়ার পথ। ওমর মোল্লা দুই বেলা বাজারে যায়। বাজারে যেতে-আসতে আমাদের বাড়িতে ওঠে। দাদির সঙ্গে খোশগল্প করে। গল্প আর থামে না। সকালে এলে দুপুর গড়িয়ে যায়, বিকেলে এলে সন্ধ্যা নামে। দাদির সঙ্গে খোশগল্প একটা বাহানা মাত্র, আসল উদ্দেশ্য মাকে বশ করা। গল্প করতে করতে একসময় বলবে, ‘খালা, নতুন ভাবিরে একটা পান সাইজে দিতে কও না। ভাবির হাতের পান যা মিঠা...!’

শুরুতে মা পান সেজে দিত। কিন্তু কিছুদিন যেতেই পান দেওয়া বন্ধ করে দেয় মা। পান নেওয়ার সময় ওমর মোল্লা যে চোখে মায়ের দিকে তাকায়, মা তাতেই বুঝতে পারে—লোকটা নোচ্চা...।

তারপর একদিন ওমর মোল্লা বাবাকে বশ করার পথ ধরে...।

—লোকমান ভাইয়ে, একটা কথা কইতে চাইছেলাম...।

—কন না, কী কইতে চাও...।

—মাছ মাইরে, মাছ বেইচে কয় ট্যাহা পাও। ঘরে এ্যাহন নয়া বউ...।

—না, মাছ বেইচে খারাপ চলে না। তা ছাড়া বউয়ের আর নতুন-পুরান কী? বউয়ে তো জাইনেই আইছে আমি মাছ মাইরে, মাছ বেইচে খাই...।

—আরে কথা এইডে না। বউয়ের কাছে, শালা-শালীর কাছে একটা সম্মান আছে না? মাছ বেইচে খাবে জাইলারা। তুমি কেনে? তোমারে দুইডো গরু কিইনে দিই, দুইডো বড়োসড়ো ক্ষ্যাত রাইখে দিই। চাষবাস কইরে খাও...।

বাবা বোঝে, ওমর মোল্লার কোনো কুমতলব আছে। মোল্লাবাড়ির কেউ কারো ভালো দেখতে পারে না—এটা যোগীপালের কে না জানে...!

তারপর একদিন মোল্লা মায়ের নামে বাজারে কুৎসা রটানো শুরু করে...।

—এই ছাদের, লোকমানের বউডির নাকি চরিত্র খারাপ...।

—কী কন তুমি চাচা! কে কইলে...?

—বাজারে শুইনে আলাম। চায়ের দোকানে বইসে ওমর মোল্লা কইতেছে...

—কী কইলে...?

—বিয়ার আগেই নাকি হেইডির প্যাটে বাচ্চা আইছিল...।

দাদি বলে, মায়ের শরীরে কুসুমফুল ফুটত, কিন্তু আমার শরীরেই নাকি সবচেয়ে বেশি কুসুমফুল ফুটেছে। আমি কথা বলতে জানি না, কিন্তু আমার শরীর কথা বলে! আমার শরীর যে কথা বলে, তা আমি নিজেও ইদানীং অনুভব করি। কখনো-সখনো মনে হয়, শরীরটা বুঝি আমার নিজের না, অন্য কারো...।

এই কুসুমফুলশোভিত শরীরটা নিয়েই হয়েছে যত যন্ত্রণা। সকালে হাঁস নিয়ে নদীতে যাই, সাঁঝের আগে আগে হাঁসগুলোকে বাড়িতে নিয়ে আসি; পথে কারো সঙ্গে দেখা হলেই—সে হোক জোয়ান পোলা, হোক বুড়ো মানুষ; সবাই আমাকে চোখ দিয়েই কেটে কেটে খেতে শুরু করে। কেউ কেউ তাদের হাতের আঙুলগুলো মুঠো করে আমাকে দেখায়—বলে, ‘ফুলমতি রে, তোর স্তন দুইডো বেশ বড়োসড়ো, ঠিক গাবের মতো। তুই দেখতেও খুব সোন্দর। ’ আমি কারো কথায় কান দিই না। আপন মনে হাঁটি। কেউ কেউ তো আরো এককাঠি সরেস। আমার হাত ধরার কিংবা বুকে হাত দেওয়ার চেষ্টা করে। যেন যোগীপালের যে মেয়েটির বাবা নাই, দাদি অন্ধ, মাও দিনের পর দিন রোগে-শোকে ভুগতে ভুগতে খরা-মৌসুমে জীর্ণশীর্ণ নদীর মতো দেখতে হয়েছে; তার শরীরে হাত দিলে আর দোষের কী? কিন্তু আমি কাউকে শরীরে হাত দিতে দিই না। কেউ হাত বাড়ালেই গোখরো সাপের মতো ফোঁস করে উঠি। তখন ওই হাতগুলো মাথায় লবণ দেওয়া জোঁকের মতো নুয়ে পড়ে...।

একদিন সকালে হাঁস নিয়ে নদীতে যাচ্ছি, পথে ওমর মেম্বরের সঙ্গে দেখা। উল্টো দিক থেকে আসছে সে। আমাকে দেখেই দাঁড়িয়ে পড়ল। সে দেখছেই—আমি হাঁস নিয়ে নদীতে যাচ্ছি, তবুও বলল, ‘কোনে যাস রে ফুলমতি, এই বিহানবেলা?’ আমি তো বোবা, কথা বলতে জানি না, চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলাম। হাঁসগুলো প্যাঁক প্যাঁক করছে—নদীতে যেতে দেরি হচ্ছে, ওরা ক্ষুধার্ত...।

ওমর মেম্বারের চোখ আমার বুকের দিকে, সে বলল, ‘এই রে ফুলমতি, তোয়ার মাইয়ের নাকি খুব অসুখ, তাইলে তরা খাস কী...?’ তারপর পকেট থেকে একটা এক শ টাকার নোট বের করে আমার হাতে গুঁজে দিয়ে বলল, ‘চাইল-ডাইল কিইনে নিয়া যাইস...। ’ বলতে বলতেই ওমর মেম্বার যা করল, আমি জানতাম সে এখন এটাই করবে, আমার বুকে হাত দিল। ‘ইস! ফুলমতি রে, তুই ুকী সুন্দর না...। ’

আগেও বলেছি আপনাদের; কেউ কেউ আমার বুকে হাত দেওয়ার চেষ্টা করেছে, কিন্তু পারেনি। তারা হাত বাড়ালেই আমি গোখরো সাপের মতো ফোঁস করে উঠতাম। কিন্তু সেদিন ওমর মেম্বার আমার বুকে হাত দিল, আমি ফোঁসফোঁস করতে পারতাম, তার হাতে কামড় দিতে পারতাম; কিন্তু কিছুই করলাম না। কেন করলাম না? করলাম না, কারণ আমিও তখন প্রচণ্ড ক্ষুধার্ত ছিলাম...।

দুদিন পর দুপুরবেলা ফজিলা চকিদার আমাদের বাড়িতে এসে খবর দিল, ওমর মেম্বার আমাকে ভোটঘরে যেতে বলেছে। চাল দেবে। ভোটঘর দশকীয়ায়। নদীর ওপার...।

ভোটঘরে যাওয়ার পর চোখ কপালে উঠে গেল আমার। একি! ভোটঘর না বন্ধ। সব ঘরে বড় বড় তালা। ফজিলা খালা কী খবর দিল আমাকে! চাল দিলে ভোটঘর বন্ধ থাকবে কেন? নাকি চাল দেওয়া শেষ করে সবাই চলে গেছে? ফজিলা খালা যে বলল, ওমর মেম্বার বইসে আছে, সে কই...?

কী করব এখন ভেবে পাচ্ছি না। কোথাও একটা লোকও নাই যে তার কাছ থেকে খোঁজখবর নেওয়া যায়—আজ এখানে চাল দেওয়া হয়েছে, কি হয়নি। দশকীয়া বাজারটাও বেশ দূরে। ওমর মেম্বার বাজারে গেছে কি না, তাই বা কে জানে...!

এতক্ষণ লক্ষ করিনি, হঠাৎ চোখে পড়ল—কুশালক্ষেতের বাতরে বসে আছে একটা ভীষণদর্শন মর্দা শেয়াল, শেয়ালটার চোখ-মুখে যেন ওমর মেম্বারের চোখ-মুখ বসানো; কটমট করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। এখনই হয়তো ঝাঁপিয়ে পড়বে আমার ওপর, ছিঁড়ে-খুঁড়ে খাবে আমাকে। আমি ভয়ে চিৎকার দিতে চাই, কিন্তু কেউ যেন আমার গলা চেপে ধরেছে; চিৎকার দিতে পারি না। কাঁপতে কাঁপতে মাটিতে পড়ে যাই। কতক্ষণ পড়ে ছিলাম বলতে পারব না। হঠাৎ কানে আসে ওমর মেম্বারের গলা—‘এই রে ফুলমতি, এইনে পইড়ে আছিস ক্যানে? কহন আইসেছিস...?’

মেম্বারের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি। ঠিক যেন শেয়ালটারই মুখ...।

—কান্দিসনে আর। ভয়ের কিছু নাই। তোয়ার দেরি দেইখে একটু চা খেইতে বাজারে গেছিলাম। আয়। তোয়ার লেগে চাইল রাইখে দিছি...।

মেম্বার আগে, আমি তার পেছনে পেছনে হাঁটি। আমার চোখে তখনো শেয়ালটার মুখই ভাসছে। হঠাৎ শুনি মেম্বার বলছে, যদিও সে বলছে মনে মনে; তবুও আমার কানে আসে—‘ফুলমতি রে, বহু দিন, বহু চেষ্টা কইরেও তোয়ার মাডিরে কিছু কইরতে পারি নাই, কিন্তু আইজ তোয়ারে খাইয়ে ফেলামু...। ’ আমি পেছন থেকে মেম্বারের শার্ট খামছে ধরি। ওদিকে কেন? ওদিকে তো কুশালক্ষেত...।

ওমর মেম্বার ঘুরে আমার দিকে তাকায়, সেই শেয়ালটার মতোই চোখ বড় বড় করে। তারপর আমার মুখ চেপে ধরে আমাকে নিয়ে কুশালক্ষেতের ভেতরে ঢোকে। আমি তার সামনে একটা ফোঁস করারও সুযোগ পাইনি...।

সেদিন সকালে হাঁস নিয়ে নদীতে যাওয়ার সময়, পথে ওমর মেম্বার আমার বুকে হাত দিয়ে আমাকে এক শ টাকা দিয়েছিল, আজ সে আমার হাতে পাঁচ শ টাকার একটি নোট ধরিয়ে দিয়েছে...।

উঠোনে পা দিতেই দাদি বলল, দাদি উঠোনেই বসে ছিল—‘তোয়ার চাইলের ছালা কই রে ফুল? তোয়ার পায়জামায় রক্ত ক্যানে...?’

দাদির কথা শুনে রাগে আমার মাথায় রক্ত উঠে গেল। চিৎকার করে বললাম, ‘দাদি, তুমি না অন্ধ। কিছুই দেখো না চোখে। আমার পায়জামায় রক্ত তুমি দেখলে কিভাবে...?’

পাদটীকা :

আমি থানায় মামলা করেছিলাম। পুলিশ ফাইনাল রিপোর্ট দিয়েছে—সেদিন দশকীয়া ভোটঘরের কাছে কুশালক্ষেতে একটা মর্দা শেয়াল ঝাঁপাঝাঁপি করেছে বৈ আর কোনো ঘটনা ঘটেনি। ওমর মোল্লা একজন জনপ্রতিনিধি, রাজনীতি করেন, তাঁর মতো একজন সম্মানীয় লোকের বিরুদ্ধে এ রকম মিথ্যা অভিযোগ তুলে মামলা দায়ের করা একেবারেই অনভিপ্রেত। মিথ্যা মামলা করায় ফুলমতি নামের ওই মেয়েটিরই শাস্তি হওয়া উচিত...।

দেখুন আপনারা, গল্পটি কিভাবে মিথ্যা বনে গেল! আপনাদের বলি, আমি এখন পাঁচ মাসের পোয়াতি। আমার পেটের ভেতর একটা মানবশিশু মাঝেমধ্যেই যমুনার বাঘাইর মাছের মতো ঘাই মারে। এখন আমি যদি থানায় গিয়ে ওসি সাহেবকে পাঁচ মাসের পেটটি দেখাই, আমি জানি, আপনারাও জানেন—ওসি সাহেব বলবেন, নষ্টা মেয়েটি কার সঙ্গে কুকাজ করেছে, তার আমি কী জানি...?


মন্তব্য