kalerkantho

তোমাদের লেখা

ফেলে আসা দিনগুলি

১০ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ফেলে আসা দিনগুলি

অঙ্কন মাসুম

আমার জীবনের ঘটনাগুলো অদ্ভুতভাবে ঘটতে শুরু করে, যখন আমার কাছে একটার পর একটা আপেল নিউটনের মাথায় পড়ার মতো আসতে শুরু করে। আপেলগুলো আমার মাথায় আঘাত হানতে একটুও বাধা মানে না। অভিকর্ষজ ত্বরণের চেয়েও বেশি ত্বরণে তারা আমার কাছে আসে। আর এভাবেই ঘটেছে হাজারো ঘটনা।

স্কুলের বন্ধুরা আজ পর্যন্ত আমার প্রতিটি ভালো-খারাপ কাজের সাক্ষী। তাস, সোহা, লামিসা, বৃষ্টি, রুবা, অ্যানি—প্রত্যেককে সঙ্গে করে বেড়ানো হাজারো বোকামি, দুষ্টুমি, নাচানাচি। দুই দিন পর হয়ে যাবে শুধুই স্মৃতি।

মনে পড়ে, স্কুলে একবার অনুষ্ঠানের আয়োজন নিয়ে সবাই ব্যস্ত থাকায় ক্লাস হচ্ছিল না। এদিকে আমরাও শুধু শুধু বসে থাকতে পারছি না স্কুলে। ম্যাডামদের কড়া নির্দেশ, মেয়েদের অভিভাবক এলেই তবে যেতে দেওয়া হয়। এদিকে আমাদের তো কোনো অভিভাবক নিতে আসবেন না, আমরা একাই বাসায় যেতাম কি না! তাই গেটের সামনে দাঁড়িয়ে বাইরে দাঁড়ানো কোনো এক আন্টিকে আম্মু বানিয়ে টুপ করে বেরিয়ে পড়লাম। বাইরে গিয়ে ওই আন্টি দাদুকে চিত্কার করে বলেন—‘আরে এরা তো আমার মেয়ে না! আমার মেয়ে কই?’ দাদু ঘটনাটা বোঝার আগেই আমরা পগারপার। অন্যদিকে তাস আর জান্নাত পাশের কিন্ডারগার্টেন স্কুলের দেয়াল টপকে বাইরে চলে আসে। ওই দিন এত মজা হয়েছিল, কী যে বলব।

আরেকটি ঘটনা বলি। সিটি নির্বাচনের কেন্দ্র হওয়ায় ভোটের পরেও ক্লাসের দেয়ালগুলোয় ঝুলছিল ‘প্রিসাইডিং অফিসার’ আর ‘পোলিং এজেন্ট’ পোস্টার। আমি বৃষ্টির কাছে পোলিং এজেন্টের কাগজ দিয়ে কিছু মজার বাক্য লিখতে ভুলিনি। আমাকে ওরা দেয় প্রিসাইডিং অফিসারের কাগজটা। সেই থেকে বৃষ্টি হলো পোলিং এজেন্ট আর আমি প্রিসাইডিং অফিসার। এখন এগুলো স্থান পেয়েছে বৃষ্টির পড়ার টেবিল আর আমার ডায়েরির পাতায় স্মৃতি হিসেবে।

সোহার খুব ধনেপাতা ফোবিয়া আছে। ধনেপাতা সহ্যই করতে পারে না। তাই ওর বার্থডেতে কয়েকটা ধনেপাতা দিয়েছিলাম। ওর কী হাসি! স্কুলে ব্যাডমিন্টন খেলার সময় গাছে কর্ক আটকে গেলে দাদুর ঘরের সামনে থেকে বাঁশ চুরি করে এনে কর্ক নামাতাম। দাদুরা দেখলে বকাবকি করতেন। স্কুলে টিফিনের পরিমাণ বাড়িয়ে বলতাম—ভালো টিফিন দিলে বেশি নিতে হয়। সোহাকে একদিন আমার স্কার্ফটা ধরতে বলেছিলাম। ও তখন মজা করে সেটা গলায় ঝোলায়। মাথায় একটা, গলায় একটা। দেখার মতো দৃশ্যটা এখনো গেঁথে আছে মনে।

স্কুলের এই তিনকোনা সাদা দুটি স্কার্ফ ও বোকার মতো একটি কাঁধে, একটি মাথায় ঝুলিয়ে বাসায় চলে যায়। নিশ্চয়ই ওকে তখন জোকারের মতো লাগছিল। পরের দিন অবশ্য আমাকে আমার স্কার্ফটা ফেরত দিয়ে দিয়েছিল।

কত যে অকারণে শপিং মলের চলন্ত সিঁড়িতে চড়েছি শুধু মজা করার জন্য। কত যে জোর করে খেয়েছি আর খাইয়েছি একে অন্যের টিফিন। কত যে সত্য ঘটনা লিখে দিয়েছিলাম র্যাগডের টি-শার্টে। এর জন্য অবশ্য দৌড়ানিও খেয়েছি খুব। রাস্তায় মানুষের হাঁটা নকল করেছি বৃষ্টি, লামিসা আর আমি। মানুষ যে কতভাবে হাঁটে সেটা খেয়াল না করলে বোঝা যাবে না। তাস আর আমি আংকলের বাইকে বসে কতবার যে ক্লাস ফাঁকি দিয়েছি। কত যে লুকিয়ে লুকিয়ে স্কুলে ছবি তুলেছি, কতবার যে বৃষ্টি আমাদের ছবি নাড়িয়ে নষ্ট করেছে, স্কুলের স্যার-ম্যামদের যে কত আলাদা নাম দিয়েছি, একে অন্যের বাসায় গেছি লুকিয়ে, রুবা যে বৃষ্টিকে জুস বলে তিতা স্বাস্থ্যকর শরবত খাইয়ে বোকা বানিয়েছিল, তা-ও মনে পড়ছে খুব। তোরা আর কেউ নস, তোরা হলি ওই নিউটনের আপেলগুলো। সুইট সুইট মিষ্টি আপেল। যেখানেই থাকিস, ভালো থাকিস তোরা। গণিত, ইংরেজি, উচ্চতর গণিত, বায়োলজি ক্লাসের মজাগুলোর মতো ফ্রেশ থাকিস।

তাস (বোঝদার বাবু), সোহা (বিভ্রান্তির রানি), নাহেদা, লামিসা (সদা বিভ্রান্ত), রুবা (বকর বকর + গুনগুনানি), বৃষ্টি (রেইনি)।

 ইতি—তোদের সানজু (সানজিদা)

মন্তব্য