kalerkantho


বইমেলা কেমন চাই

বইমেলা কেমন হলে আরো ভালো হতো? জানতে চাওয়া হয়েছিল তোমাদের কাছে। বাছাই করা কিছু পরামর্শ ছাপা হলো। বলা তো যায় না, আগামী মেলায়ই হয়তো এসব বাস্তবে দেখতে পাবে

১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



বইমেলা কেমন চাই

বইমেলার আনন্দটাকে আরেকটু বাড়িয়ে দিতে কিছু প্রমাণ আকারের কাটআউটের ব্যবস্থা করা যায়। লেখক বা তাঁদের গল্পের চরিত্রদের আদলে ইয়া বড় একটা কাগুজে মূর্তি থাকল অনেকগুলো। যেমন মিসির আলী, হিমু বা প্রিয় তিন গোয়েন্দাকে দেখা গেল, পাঠকদের স্বাগত জানাচ্ছে মেলার ঠিক মাঝে দাঁড়িয়ে। দূরে আবার দেখা গেল, মাথায় হ্যাট পরে নাইন মিলিমিটার পিস্তল হাতে বেশ ভাব নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন মাসুদ রানা সাহেব। 

—শেখ তাসনিয়া, দ্বাদশ শ্রেণি, মতিঝিল মডেল কলেজ, ঢাকা।

 

বইমেলা মানে মন ভালো করার জায়গা। তবে এবার মেলায় একটা ব্যাপার দেখে মনটা বড্ড খারাপ হয়ে গেল। পর্যাপ্ত পরিমাণে ডাস্টবিন থাকা সত্ত্বেও কিছু মানুষ যত্রতত্র কফির কাপ, ঠোঙা, আবর্জনা ফেলে নষ্ট করছে মেলার পরিবেশ। পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের চেয়ে এই দূষকদের সংখ্যাই বেশি! কেমন হয়, যদি দায়িত্বটা আমরাই নিই? কী করতে পারি? তাদের ওপর একটা ব্যতিক্রমধর্মী জরিমানা বসালে কেমন হয়? যখনই দেখব কেউ মেলার পরিবেশ নষ্ট করছে, তখনই হাতেনাতে ধরে জরিমানা চেয়ে বসব। টাকা নয়। জরিমানা হিসেবে আমাদের কিনে দিতে হবে একটা বই। বইপোকারা তক্কে তক্কে থাকবে শিকার ধরার! আর দূষণকারীরাও লজ্জায় পড়ে আমাদের বই কিনে দেবে। ভয়ে ভয়েও থাকবে। সহজে আর মেলায় ময়লা ফেলবে না।

—মার্জিয়া জাহান মম, একাদশ শ্রেণি, আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মতিঝিল, ঢাকা।

বইমেলায় ছুটির দিনে শিশু প্রহর থাকলেও সেটা খুব কম সময়ের জন্য। মাত্র এক ঘণ্টা। এত কম বিনোদনে চলবে? আরো কিছু যদি থাকত। এই যেমন স্থায়ী খেলাধুলা কিংবা আনন্দ করার জন্য শিশু চত্বরের মধ্যেই স্থায়ী শিশু কর্নার। বড়দের সঙ্গে লেখকদের কাছাকাছি করতে আলাদা মঞ্চ আছে। শিশুরা কী দোষ করেছে? শিশুদের নিয়ে লেখা গল্প, ছড়া স্বয়ং লেখকদের মুখে শোনার ব্যবস্থা থাকলে কত্ত মজা হতো!

—সামিয়া জান্নাত, অষ্টম শ্রেণি, বাংলাদেশ ব্যাংক আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়, ঢাকা।

 

সবার মতো এত সিরিয়াস ব্যাপার ভাবার সময় আমার নেই। আমি ঘুমপাগলা। সুতরাং বইমেলায় আমরা যারা অনেক দূর থেকে আসি (যেমন লক্ষ্মীপুর থেকে। এখন অবশ্য আমি ঢাকায়ই আছি), তাদের জন্য একটা ঘুমের মানে হালকা বিশ্রামের ব্যবস্থা থাকলে ভালো হতো। এক ঘণ্টা ঘোরাঘুরি আর দশ মিনিট বিশ্রাম। বইমেলার ভেতর বসার জায়গা নিতান্তই কম। অনেক বয়স্ক মানুষেরই কষ্ট হয়। আর মেলার সময়টা দুপুর তিনটা থেকে না করে সকাল থেকে শুরু করলে সময় পাওয়া যেত ঢের।

—সুমাইয়া খানম, দ্বাদশ শ্রেণি, উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ঢাকা।

বইমেলায় নতুনত্ব আনতে লেখকদের কাছ থেকে অটোগ্রাফ নেওয়ার জন্য থাকতে পারে অটোগ্রাফ চত্বর। সবাই সেখানে লাইন ধরে প্রিয় লেখকের কাছ থেকে অটোগ্রাফ নিতে পারবে। এতে করে মেলা প্রাঙ্গণে হুটহাট ভিড় হবে না। এ ছাড়া মেলার প্রবেশপথটা আরো দৃষ্টিনন্দন করা যেতে পারে। থাকতে পারে বিক্রির হিসাবে সেরা দশ বইয়ের তথ্য এবং সমালোচকদের মতে সেরা বিশ বা ত্রিশটি বইয়ের একটি তালিকা।

—খাদিজা আক্তার সায়মা, দশম শ্রেণি, উইমেন্স মডেল কলেজ, সিলেট।

 

বইমেলার ধুলাবালির বিরুদ্ধে ‘ঘাস লাগাও না হয় মাস্ক দাও’ স্লোগানে তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। মেলার হাঁটাচলার পথটা ঘাসে ছাওয়া থাকলে এত ধুলাবালি খেতে হতো না। সেটা না হলে অন্তত ৫০০ টাকার বই কিনলে একটা মাস্ক ফ্রি ঘোষণা দেওয়া হোক। এ ছাড়া বিশেষ অভিযোগ বাক্সও থাকা দরকার। মেলাসংক্রান্ত অভিযোগ ও আইডিয়া জমা দেওয়া যাবে তাতে।

—ফাইয়াজ বিন শফিক, রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ, ঢাকা।

 

বইমেলায় কত দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসে। তাদের জন্য একটুখানি বসে বই পড়ার মতো সুন্দর একটা জায়গা থাকলে মজার মতো। বইমেলা মানে তো অনেক ধরনের বই। কিন্তু এখানে শিক্ষামূলক বইয়ের বেশ ঘাটতি দেখা যায়। শিক্ষামূলক মানে কিন্তু গাইড বই নয়। আরো অনেক বিষয় আছে, যেগুলো ক্লাসে পড়ানো হয় না। সেগুলোর কথাই বলছি। আমার মনে হয় আমরা একটা গণ্ডির মধ্যে আছি। আর বাংলা একাডেমি থেকে ভালো বইয়ের জন্য সনদপত্রের ব্যবস্থা থাকলে ভালো হতো। তা হলে নতুন পাঠকদের জন্য বই বাছাই করার কাজটা সহজ হয়ে যায়। নতুন লেখকদের ক্ষেত্রে তো তাদের নাম আর প্রচ্ছদ দেখে বই সম্পর্কে আঁচ করা যায় না।

—তাসফিয়া রশিদ তানাজ, একাদশ শ্রেণি, ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ঢাকা।

আমি একটু পয়েন্ট করে বলি। 

১. মেলায় নতুন প্রকাশিত বইগুলোর নাম মাইক্রোফোনে ঘোষণা দেওয়া হয়। ব্যাপারটা আরেকটু ডিজিটাল হলে ভালো হতো। মেলায় বড় একটি বা দুটি স্ক্রিনে সদ্য আসা বইয়ের প্রচ্ছদ ও বিস্তারিত দেখানো গেলে কোনো বইয়ের ঘোষণাই মিস হতো না।

২. শেষ বিকেলে একটা ছোটখাটো সাংস্কৃতিক আয়োজন থাকলে বেশ হতো। কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলায় কিন্তু এটা হয়।

৩. বাংলা একাডেমির পক্ষ থেকে একটা অনলাইন শর্ট রিভিউর ব্যবস্থা করলে ভালো হতো। এত এত বইয়ের খোঁজ আগে নেওয়া সম্ভব নয়। অনেক ভালো বইও বাদ পড়ে যায়। আগে থেকে সারসংক্ষেপ জানা থাকলে বই বাছাই করতে সুবিধা হয়। 

—মুহসিন মুন্সী, দৌলতপুর দিবা-নৈশ কলেজ, খুলনা।

 

সবার আগে চাই, প্রতিটি বইয়ের নাম যেন শুদ্ধ বাংলায় হয়।  বাঙালির ভাষার জন্য যে আত্মত্যাগের ইতিহাস আছে এবং ইউনেসকোর যে স্বীকৃতি আমরা পেয়েছি, তার একটা স্মৃতিস্তম্ভ মেলা প্রাঙ্গণে থাকলে মন্দ হতো না।

—সাইফুল ইসলাম রিফাত, অষ্টম শ্রেণি, মিজমিজি পশ্চিমপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়, গেণ্ডারিয়া, ঢাকা।

 

হুট করে পছন্দের বই কিনতে গিয়ে দেখা গেল, সঙ্গে পর্যাপ্ত টাকা নেই। তাই বইমেলার আশপাশে একটি-দুটি ব্যাংকের এটিএম বুথ থাকলে ভালো হতো। আর না হলে আমাকে অন্তত কিছু টাকা ধার দেওয়ার ব্যবস্থা থাকলে...। হা হা হা...।

—ইয়াশ রুদ্র, বেপজা পাবলিক কলেজ, দ্বাদশ শ্রেণি, সাভার।

 

মেলার কিশোর উপযোগী বইগুলো যেন সব কটাই সায়েন্স ফিকশন ও শিক্ষামূলক হয়। এর বাইরে আমার কিছু পড়তে ভালো লাগে না। 

—সাবিহা খাতুন মেঘলা, ঢাকা।

 

বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে গেলাম বইমেলায়। বই তো মনের খিদে মেটায়; কিন্তু মনের ইঞ্চি দুয়েক নিচে থাকা পেটেও যে খিদে লেগেছে। এখন কী করা! মেলার ত্রিসীমানায় তো কোনো খাবারের দোকান দেখছি না। তাই বলছিলাম কী, বইমেলায় ছোটখাটো কিছু মজার খাবারের স্টল থাকলে ভালোই হতো। তবে আগে চাই পরিচ্ছন্নতা। মেলায় ধুলাবালিটা একটু বেশিই। 

—ইসরাত জাহান ইরা, সাভার ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক কলেজ, দ্বাদশ শ্রেণি, সাভার।

 

এবার বইমেলা ঘুরলাম। ভালোই লাগল। নতুনত্ব আছে কিছু। তবে প্রতিটি প্রকাশনীর উচিত মন্তব্য প্রকাশের ব্যবস্থা করা। এ ছাড়া উন্মুক্ত আলোচনা ও বই নিয়ে কুইজের আয়োজন করা যেতে পারে। যেখানে পাঠক ও লেখকরা অংশ নেবে। বইমেলাটির আরো বিস্তৃতি বাড়ানো প্রয়োজন। একেক মাসে একটি বিভাগীয় শহরে বাংলা একাডেমির উদ্যোগে বড়সড় একই বইমেলা করলে ভালো হয়। অনেকের ইচ্ছা থাকলেও দূর থেকে মেলায় যাওয়া সম্ভব হয় না। —এহসানুল মাহবুব লাব্বী, একাদশ শ্রেণি, রংপুর সরকারি কলেজ।

শ্রুতলিখন : গাজী খায়রুল আলম ও জুবায়ের ইবনে কামাল



মন্তব্য