kalerkantho


মজার গল্প

ভূতের বাড়ি ভয়ের হাঁড়ি

ইমতিয়ার শামীম

৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



ভূতের বাড়ি ভয়ের হাঁড়ি

অঙ্কন : মাসুম

অনেক রাতে ঘুম ভেঙে গেল হিজলের। চোখ মেলতেই দেখল, ছাদের সমান উঁচু একটা লোক কী যেন খোঁজাখুঁজি করছে। বয়স বেশি না। কেমন হাসিখুশি আর চিকনচাকন। মন্দের মধ্যে এই যে লোকটার গোঁফ আর জুলফি অনেক বড়। এত বড় যে একটা আরেকটার সঙ্গে জোড়া লেগে গেছে।

হিজল মাথা উঁচু করে ঘুম ঘুম চোখেই বলল, ‘বাতি জ্বেলেছ কেন? ঘুমটা ভেঙে গেল যে!’

‘বাতি জ্বেলেছি? এহ্, তাহলে তো বেশ ভুল হয়ে গেল! আমাদের তো এসব জ্বালানো নিষেধ। হাঁড়িটাকে তো তা হলে খুঁজেই পাব না।’

‘হাঁড়ি? কিসের হাঁড়ি?’

‘মশকরা করো! ভয়ের হাঁড়িটা নিয়ে এসে লুকিয়ে রেখে এখন আবার বলছ কিসের হাঁড়ি?’

হিজলের এত ঘুম পেয়েছে যে কথাগুলো শোনার আগেই চোখ বুজে এলো। শুধু কি তাই, নাকও ডাকতে লাগল মেলা থেকে কিনে আনা পোঁ পোঁ বাঁশির মতো।

ঘুমটা এত ভালো হলো যে রাতের ঘটনা হিজলের সকালবেলা মনেই থাকল না। এমনকি নাইটগার্ড রবি এসে যখন বলল, গত রাতে তাদের কোনো গেস্ট এসেছে কি না, ভারি অবাক হয়ে গেল হিজল, ‘গেস্ট এসেছে মানে?’

দাদিও রবিকে জেরা করতে লাগলেন, ‘ব্যাপার কী রবি, তুমি গেস্টদের খোঁজখবর করছ?’

রবি বলল, ‘না, মানে ভোররাতের দিকে বারান্দায় একজন লম্বা, চিকনচাকন নতুন লোককে দেখলাম কিনা।’

‘কিন্তু বাপু, আমাদের বাসায় তো কোনো গেস্টই আসেনি! তার ওপর লম্বা, চিকনচাকন অমন কেউ আমাদের বংশেই নেই। এই বংশের বাপ-কাকা-ভাই-দাদাদের কেউই তো লম্বা না। লম্বা হলো আমার বাপ-দাদা-ভাইরা। লোকে বলে অবশ্য, নরনং মাতৃকুলনং; কিন্তু তা আর হলো কই? এই যে আমি এত লম্বা, আমার ছেলে-নাতিরা কেউ তো লম্বা হলো না!’

দাদি যে একটা লম্বা গল্প জুড়তে চলেছে, রবি সেটা বুঝতে পেরে নড়েচড়ে দাঁড়ায়। সটকে পড়ার চেষ্টা করে, ‘তা অবশ্য চিন্তারই বিষয়। কিন্তু বারান্দায় একটা নতুন লোককে কেন যে দেখলাম, মাথায় ঢুকছে না। চোখটাই নষ্ট হলো নাকি!’

‘আলাই-বালাই ষাট। চোখ কেন নষ্ট হবে? এটা প্রবাল চৌধুরীর বাড়ি, সেটা তো জানো? প্রবাল চৌধুরী আমার দাদার দাদাশ্বশুর, নাকি দাদার দাদার দাদাশ্বশুর, কয় পুরুষ আগের, তা বাপু আমাকে হিজলের দাদাও বলতে পারে না। আমার দাদাশ্বশুরও জানেন না তাঁকে দাদুভাই বলতে হবে, না কী বলতে হবে! তা হলেই বোঝো, যাঁদের পূর্বপুরুষ, তারাই জানেন না কত আগের মানুষ তিনি। আমি পরের বাড়ির মেয়ে। এ বাড়িতে এসেছি কত পরে! আমি এসব বলি কেমন করে? তবে বোঝোই তো, প্রবাল চৌধুরীর বাড়ি—এখানে কে এলো, কে গেল, এসব খোঁজখবর করা ভালো না।’

‘জি দাদি...প্রবাল চৌধুরীর খানদানি বাড়ি। এটা কি আমি জানি না নাকি! কত লোকজন আসত, এখনো আসে...।’

বলতে বলতে রবি পিছু হটতে হটতে ঘুরেই দৌড় লাগায়। হিজল বুঝতে পারে না, গার্ড কাকা হঠাত্ এমন করল কেন।

রাতে আবারও ঘুম ভেঙে যায় হিজলের। দেখে, লম্বা, চিকনচাকন সেই লোকটা তার শিয়রের কাছে। তা থাকুক, ওর মতো ও বসে আছে, হিজলের তাতে কি! সে বরং একটু সরে আরাম করে হাত-পা ছড়াতেই ফের রাজ্যের ঘুম নেমে আসতে থাকে চোখের পাতায়। কিন্তু লোকটা তাকে ঠেলতে ঠেলতে বলে, ‘এই শোনো। তোমার সঙ্গে কথা আছে।’

হিজল চোখটাকে কোনোমতে টেনেটুনে বলে, ‘আমার সঙ্গে আবার কিসের কথা? তোমাকে কি আমাদের ফুটবল টিমের ক্যাপ্টেন পাঠিয়েছে?’

‘তোমাদের ফুটবল টিমের ক্যাপ্টেন কে, তা কিভাবে জানব বলো? তবে কথা হলো কী, কাল তো কিছুই বললে না। নাক ডাকিয়ে ঘুমালে। আজ বলো দেখি, ভয়ের হাঁড়িটা কোথায় রেখেছ?’

‘ভয়ের হাঁড়ি মানে?’

‘তুমি না-ও জানতে পারো, তোমার দাদি খুব ভালো করেই জানে। সে-ও একবার হাঁড়িটা লুকিয়ে রেখেছিল। এই যে তুমি এত চ্যাটাং চ্যাটাং কথা বলছ, ভয়ের হাঁড়িটা যদি আমার কাছে থাকত, তাহলে তোমার সাহস টিপে টিপে বের করতাম।’

‘কী দিয়ে কী যে বলছ তুমি, আগামাথা কিছুই বুঝতে পারছি না।’

‘তা বুঝবে কেন? শোনো, আমাদের ভয়ের হাঁড়িটা তুমি কয়েক দিন আগে ছাদের কার্নিশ থেকে নিয়ে এসেছ। আমরা তাই কাউকে আর ভয় দেখাতে পারছি না, আমাদের দেখে কেউ আর ভয়ও পাচ্ছে না।’

‘তোমরা কারা, সেটাই তো জানি না।’

‘তা জানবে কোত্থেকে। আজকালকার ছেলেপেলেদের ধরনই তো এই—আত্মীয়-স্বজনের খোঁজখবর রাখে না! আমরা হলাম গিয়ে তোমার পূর্বপুরুষ। তবে অপঘাতে মারা গেছি তো, তাই ভূত হয়ে গেছি। ভূত হই আর যা-ই হই, আমরা কিন্তু তোমাদের খোঁজখবর নিতে প্রায়ই আসি।’

‘আমার আত্মীয়-স্বজন কেউ তো এত লম্বা না। দাদিমা বলছিল—।’

‘জানি, জানি। লম্বা ছিলাম না বলেই তো ভূত হওয়ার পর লম্বা হয়ে গেছি। অপূর্ণ ইচ্ছা পূর্ণ হয়েছে।’

‘বুঝতে পারছি। এ জন্য গার্ড কাকা বলছিল, কাল শেষরাতে নাকি অপরিচিত এক লোককে বারান্দায় দেখেছে!’

জিবটা লম্বা করে কেটে লোকটা বলে, ‘এহ হিজল বাবু, সত্যি ভারি ভুল হয়ে গেছে! এই ভয়ের হাঁড়িটা হারিয়ে যা বিপদে পড়েছি না! দুশ্চিন্তায় মাথার ঠিকঠিকানা নাই। খুঁজতে খুঁজতে হঠাত্ বারান্দায় চলে গিয়েছিলাম, হুঁশ ছিল না। তুমি চিন্তা কোরো না। ভয়ের হাঁড়িটা দিয়ে দাও, একটা ভয় ছেড়ে দিয়ে ব্যাটাকে এমন ডর দেখাব যে প্রবাল চৌধুরীর বাড়ির ধারেকাছে আর কেউ আসবে না।’

‘তাহলে যে মুশকিল হয়ে যাবে। গার্ড চাচা যদি পাহারা দিতে না আসে, তাহলে চোর জিনিসপত্র চুরি করে নিয়ে যাবে না?’

‘কী যে বলো না! এই বাসায় কোনো দিন কোনো কিছু চুরি হতে দেখেছ? এই বাসায় আমরা থাকি না?’

‘তোমরা থাকো, মানে? এই বাসায় তো আমরা থাকি!’

‘ওই হলো আর কি—আমরা তোমরা একই ব্যাপার। একই বংশের লোকজন। আমরা অপঘাতে মরে ভূত হয়ে গেছি, এই আর কি। তবে কথা কী জানো, ভয়ের হাঁড়িটা না দিলে কিন্তু সব গড়বড় হয়ে যাবে। আমরা ভয়ডর দেখাতে পারব না, তোমাদের জিনিসপত্রও চুরি হতে থাকবে।’

হিজল চিন্তায় পড়ে যায়। সত্যি কথা বলতে গেলে, হাঁড়ি জিনিসটা কেমন, সেটাই গুলিয়ে ফেলছে সে। মা হাঁড়িতে রান্নাবান্না করে, মাঝেমধ্যে তাড়াহুড়োয় হাঁড়িসুদ্ধ খাবারদাবার খাওয়ার টেবিলে এনে রাখে। কিন্তু অমন একটা হাঁড়ির মধ্যে ভয় জিনিসটা রাখা সম্ভব?

লম্বা লোকটা আরো কিছুক্ষণ হিজলের দিকে তাকিয়ে থেকে বলে, ‘এই যে তুমি আমাকে দেখেও ভয় পাচ্ছ না—কেন পাচ্ছ না বুঝতে পেরেছ? ভূতদের বাড়িতে ভয়ের হাঁড়ি থাকে। দৈনিক রাতে হাঁড়ির মধ্য থেকে দুই-এক মুঠো ভয় বের করে ট্যাকে গুঁজে বের হই আমরা। ওতেই কাজ হয়। তিন দিন হলো আমাদের কাছে কোনো ভয়-ডর নাই, তাই কেউ আমাদের দেখে ভয়ও পাচ্ছে না। এ রকম চললে আমরা কিন্তু মরে যাব, হতে পারি ভূত; কিন্তু আমরা তো তোমারই পূর্বপুরুষ। আমাদের এইভাবে মেরে ফেলবে?’

‘কিন্তু বাপু, আমি তো বুঝতেই পারছি না, আমি ওই হাঁড়ি আনলাম কোত্থেকে! আচ্ছা, ঠিক আছে...খুঁজেটুজে দেখব। এখন ঘুমাতে দাও, প্লিজ!’

‘ঠিক আছে, ঘুমাও। কাল কিন্তু অবশ্যই জিনিসটা এনে রাখবে।’

বলতে বলতে লোকটা মিলিয়ে যায়। ঘুমের মধ্যে ডুবে যেতে যেতে হিজল খেয়াল করে, পুরো ঘর অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে।

তা ঘুমের ঘোরে মানুষ কত কিছুই তো দেখে, অত খেয়াল থাকে নাকি? সকালে উঠে হিজল তাই আবারও ভুলে যায়, গত রাতে কী কথা হয়েছে। তাদের বাসাটা দোতলা। ছাদে উঠে সে মাঝেমধ্যে ঘুড়ি ওড়ায়, বুকডন দেয়, ফুটবল প্র্যাকটিসও করে। আজ বিকেলে ফুটবল খেলা আছে, হালকা একটু প্র্যাকটিস করতে ছাদে ওঠে ও।

ছাদের এদিক-সেদিক তাকাতে মনটা একটু দমে যায় হিজলের। খানিকটা জায়গায় মা-বাবা টবে সবজির চাষ শুরু করেছেন। মাঝখানে খানিকটা জায়গায় কোনোমতে একটা জাল লাগানো। ওইখানে তমা-অমা ব্যাডমিন্টন খেলছে। এসবের মধ্যে সে ফুটবল নিয়ে ছোটাছুটি করবে কেমন করে!

হিজলের চোখে পড়ে, দৌড়াতে দৌড়াতে আসছে নাইটগার্ড রবিউল। আর তা দেখে তার ভয়ের হাঁড়ির কথা মনে পড়ে যায়। তাড়াতাড়ি নিচতলায় নেমে আসে হিজল। বারান্দায় বেতের চেয়ারে বসে দাদিমা উলের দস্তানা বুনছেন। ছুটে এসে রবিউল তাঁর পায়ের কাছে শুয়ে পড়ে! কাঁদতে কাঁদতে বলে, ‘ভুলত্রুটি মার্জনা করবেন দাদিমা। কাল কী দিয়ে কী যে বলেছি!’

‘কী বলেছ রবি? তুমি তো কিছুই বলোনি! তোমার আবার কী হলো?’

‘কিছু যে হয়নি—সেটাই তো বিপদের কথা। একটা কিছু হলে তো বেঁচে যেতাম।’

‘তা কী হয়েছে, সেটা তো বলবে।’

‘লম্বা মতন একটা লোক, গতকাল শেষ রাতে সেই যে পিছু নিয়েছে, কিছুতেই আর তাড়াতে পারছি না। খালি বলে, বলতে গেলি কেন? বলতে গেলি কেন? তা আমি এমন কী বলেছি, বলেন তো দাদিমা?’

‘তা ঠিক, তুমি তো এমন কিছুই বলো নাই। তবে এখানে-সেখানে যাও, কোন বারান্দায় কী দেখলে এসব গল্প করে বেড়াও! বোঝোই তো, প্রবাল চৌধুরীর বাড়ি এটা, কত শখ করে এই বাড়ি বানিয়েছিলেন! কিন্তু নতুন বাড়িতে উঠতে না উঠতেই মরে গেলেন। এখন এই বাড়ি নিয়ে যদি এটা-সেটা গল্পগুজব করো...।’

‘কী বলেন দাদিমা! কেন গল্প করতে যাব? মুখ ফসকে দু-একটা কথা বের হয়ে গেছে। তাই বলে পিছু ছাড়বে না!’

ফুটবলটা বুকের কাছে ধরে সোল্লাসে চেঁচিয়ে ওঠে হিজল, ‘চিন্তা করবেন না রবি কাকা। আপনার আশপাশে ঘোরাফেরা করলেও কিচ্ছু করতে পারবে না। আরে, ভূতের বাড়ির ভয়ের হাঁড়ি তো আমার কাছে। ওরা ভয়-ডর দেখাবে কোত্থেকে?’

শুনে দাদিমার হাত থেকে উলের কাঁটা পড়ে যায়। কুড়িয়ে নিতে নিতে বলেন তিনি, ‘তুই আবার বড়দের কথার মধ্যে নাক গলাচ্ছিস কেন? যা, ভাগ এখান থেকে!’

হিজল ফুটবল নিয়ে ছাদে উঠে আসে। ভাবতে থাকে, ভয়ের হাঁড়ি কি সত্যিই তার কাছে? কোথায় রেখেছে? সে কথা মনে নেই কেন!

তবে মনে পড়লেই বা কী আর না পড়লেই বা কী! সে কি আর ভয়ের হাঁড়িটা ভূত আত্মীয়দের ফেরত দিতে যাবে? একে-ওকে ভয় দেখিয়ে বেড়াবে প্রবাল চৌধুরীরা, সেটা ভালো দেখাবে নাকি!



মন্তব্য