kalerkantho


ধারাবাহিক উপন্যাস

বান্দরবানের জঙ্গলে

মোস্তফা কামাল

২৭ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



বান্দরবানের জঙ্গলে

অঙ্কন : মানব

(গত সংখ্যার পর)

অপু ভয়ে ভয়ে বাসায় ঢোকে। ও ভেবেছিল, ওর বাবা ওকে খুব করে বকবেন। কী আশ্চর্য! ওর বাবা ওকে কিছুই বললেন না। তিনি শুধু বললেন, আর কখনো বাসায় ফিরতে দেরি কোরো না। সন্ধ্যার আগেই বাসায় ফিরে এসো। পাহাড়ি এলাকা। এখানে অনেক ধরনের বন্য প্রাণী আছে। বাঘ, ভালুক তো আক্রমণ করেই; বন্য হাতিও কিন্তু আক্রমণ করে। পাহাড়ি সাপও ভয়ংকর! কাজেই সাবধানে চলাফেরা কোরো।

জি, বাবা।

অপু, তোদের স্কুলে ক্লাস ঠিকমতো হচ্ছে তো?

জি, বাবা। স্যাররা খুব ভালো। যথেষ্ট কেয়ার নেন।

তোর লেখাপড়া ঠিক আছে?

জি, বাবা। কোনো অসুবিধা নেই।

অপু হঠাত্ আনমনা হয়ে যায়। তার মাথায় পাহাড়ে যাওয়ার ঘটনাটিই ঘুরপাক খায়। কাল কিভাবে যাবে; কিভাবে লেক পার হবে, তা নিয়ে গভীর ভাবনায় ডুবে যায় অপু। ওর বাবা ওকে ডাকে। কিন্তু অপু সেদিকে খেয়াল করে না। ছেলেকে আনমনা দেখে রাশেদুজ্জামান নিজেও ভাবেন। মনে মনে বলেন, অপু হঠাত্ এমন আনমনা হয়ে যাচ্ছে কেন?

তিন.

পাঁচ বন্ধু সকালে একসঙ্গে স্কুলে রওনা হয়েছে। ওদের পাঁচজনের কাঁধে ব্যাগ। ব্যাগে কিছু বই-খাতা আছে। তবে বেশির ভাগই ওদের অভিযানের জিনিসপত্র। কিছু দূর যাওয়ার পর সবার চোখে ধুলা দিয়ে ওরা পাহাড়ের দিকে চলে যায়। কেউ বুঝতেও পারে না, স্কুলে যায়নি।

পাহাড়ের ঢাল বেয়ে হাঁটতে হাঁটতে লেকের কাছে চলে যায়  ওরা। পথে পাহাড়ি কিছু লোকের সঙ্গে দেখা হয়। ওই পর্যন্তই। কারো সঙ্গে কোনো কথা হয়নি। হঠাত্ বনের ভেতর থেকে এক লোক দৌড়ে এসে ওদের সামনে দাঁড়ায়। হাঁপাতে হাঁপাতে বলে, আপনারা কই যাচ্ছেন? ওই দিকে এখন যাইয়েন না। আমাকে কিন্তু চিতা বাঘে তাড়া করছে। দৌড় মারেন! আর না হয় উঁচু গাছে ওঠেন! বাঁচতে পারবেন না কিন্তু! কইয়া দিলাম!

লোকটা আবার দৌড় শুরু করল। তার দেখাদেখি অপু, রাজনরাও দৌড় শুরু করল। লোকটার সঙ্গে ওরা সবাই পাহাড়ের এক গুহায় আশ্রয় নিল। গুহায় চুপচাপ বসে আছে। কিন্তু ওদের চোখেমুখে ভয় আর আতঙ্ক!

অপু হাঁপাতে হাঁপাতে লোকটাকে বলল, আপনাকে কি সত্যি সত্যিই বাঘে তাড়া করেছে?

না করলে কি মিথ্যা বলছি না কি? আরে বাপ রে বাপ! আরেকটু হইলেই ধইরা ফেলত! কিভাবে যে বাঁইচা আইছি!

আপনার বাড়ি কই?

ওই দিকে।

ওই দিকে মানে, কই?

ওই যে পাহাড়টা দেখতেছেন না? ওই পাহাড়ের ঢালে।

আপনার নাম?

প্রিয়জ্যোতি।

ও আচ্ছা। ওই দিকে কই গেছিলেন?

ওই দিকে আমার একটা ফলের বাগান আছে। বাগানটা দেখতে গেছিলাম।

তারপর?

তারপর আর কইয়েন না! আমি দেখি কী, একটা বাঘ দূর থেকে আমাকে ফলো করতেছে। আমি কিছুটা সতর্কই থাকছিলাম। হঠাত্ দেখি আমার দিকে আসতেছে। আমি অন্য দিকে ঘুইরা দৌড় মারলাম।

আচ্ছা আপনি বলেন তো, লেকের ওই পাশের পাহাড়ে যাওয়ার ব্যবস্থা কী?

অপুর প্রশ্ন শুনে প্রিয়জ্যোতি অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। কিছু বলছে না। রাজন তাকে উদ্দেশ করে বলল, আপনি অমন করে তাকিয়ে আছেন কেন?

না, মানে আপনারা ওই পাহাড়ে কেন যাইবেন?

এমনিতেই যাব। দেখতে যাব। ঘুরতে যাব।

ভাই, আপনাগো কি মরার ইচ্ছা হইছে নাকি?

কেন? অপু প্রশ্ন করল।

প্রিয়জ্যোতি বলল, ওখানে তো বাঘ, ভালুক আর বন্য হাতি ভর্তি। আমরাই ওই পাহাড়ে ভয়ে যাই না!

কী বলেন! বিস্ময়ের সঙ্গে অপু বলল।

বিশ্বাস না হইলে আপনারা যান। যা খুশি করেন।

ওই লেকে পানি কি অনেক?

জানি না। আমরা কোনো দিন নামি নাই।

পানি অমন কালো হয়েছে কেন জানেন?

না। তা-ও জানি না। সারাক্ষণ বাঘের ভয়ে থাকি। ওই সব দেখারও সুযোগ পাই না।

লেকটা কী করে পার হই বলেন তো!

আমি কেমনে বলব? কী বুদ্ধি দিব বুঝতে পারছি না। আমার মনে হয় আপনাগো যাওয়া ঠিক হইব না। গেলে বিপদে পড়বেন।

আমি এখন যাই।

প্রিয়জ্যোতি গুহা থেকে বের হয়ে নিজের বাড়ির দিকে হাঁটা শুরু করে। অপু, রাজনরাও একসঙ্গে গুহা থেকে বের হয়। তারপর আবার লেকের দিকে রওনা হয়। কিছুটা পথ যাওয়ার পর ওরা দেখে, কিছু বন্য হাতি রাস্তার ওপরের দিকে এক পাশ থেকে আরেক পাশে যাচ্ছে। এর মধ্যে কয়েকটি হাতি রাস্তার ওপর শুয়ে আছে। সামনে এগোলেই হাতি আক্রমণ করবে।

পাঁচ বন্ধুই মহাটেনশনে পড়ল। এখন কী করবে, কিভাবে সামনে আগাবে? এই রাস্তা ছাড়া বিকল্প কোনো পথ নেই। হাতির তাড়া খাওয়ার ভয়ে ওরা রাস্তার পাশে উঁচু পাহাড়ের ঢালে গিয়ে বসল। নাশতা-পানি খেতে খেতে ওরা পরস্পরের মধ্যে সলাপরামর্শ করছে। অপু রাজনের কাছে জানতে চায়, হাতি তাড়ানোর পথ কী বল তো!

আমার মাথায় একটা আইডিয়া আসছে। বলব?

অবশ্যই বলবি। আইডিয়াটা কী?

আমরা দূর থেকে ঢিল ছুড়ি। ঢিল হাতির গায়ে পড়বে না। আশপাশে মারতে হবে। আওয়াজ শুনে হাতি চলে যাবে।

তুই কী শিওর?

শিওর না। তবে কাজটা করা যেতে পারে।

রুবেল বলল, না না! এসব করা যাবে না। বন্য হাতি। খেপে গেলে সমস্যা আছে।

কেন খেপে যাবে? গায়ে মারব নাকি? রাজন বলল।

মুহিত বলল, চল আমরা চেষ্টা করি। চেষ্টা করতে তো দোষ নেই।

রনি মুহিতের সঙ্গে সুর মিলিয়ে বলল, হ্যাঁ চেষ্টা করতে দোষ কী?

সবাই ঢিল ছোড়া শুরু করল। দু-একটা মোড়ামুড়ি দেয়। শুঁড় নাড়ানাড়ি করে। কিন্তু কোনোটাই শোয়া থেকে উঠছে না।

অপু মনে মনে বলে, এ কী বিপদে পড়লাম! এখন উপায়! প্রতিদিন তো আর স্কুল ফাঁকি দিতে পারব না। মুহিত, একটা বুদ্ধি বের কর তো! আজ আমাদের লেক পার হয়ে ওই পাহাড়ে যেতেই হবে।

শোন, লেকের ওপর সাঁকো তৈরি করতে তো বাঁশ লাগবেই। ওই যে একটা বাঁশঝাড় দেখতে পাচ্ছি। ওখান থেকে বাঁশ কেটে রেডি রাখি। যখনই হাতিগুলো পথ ছাড়বে, সঙ্গে সঙ্গে আমরা লেকের কাছে চলে যাব। মুহিত বলল।

অপু আমতা আমতা করে বলল, কথাটা মন্দ বলিসনি! এত দূর থেকে বাঁশ নিয়ে...।

এত দূর কেন বলছিস? এখান থেকে কতটুকু আর দূর! রাজন, তুই বল তো আমার বুদ্ধিটা কেমন?

রাজন বলল, ফাটাফাটি।

তাহলে দেরি করছিস কেন? চল, বাঁশ কাটতে যাই! মুহিত বলল।

অপু, মুহিত ও রাজন বাঁশঝাড়ের দিকে এগিয়ে গেল। ওদের দেখে রনি, রুবেলও গেল। প্রথমেই রাজন একটি বাঁশ কাটল। তারপর অপু ও মুহিত কাটল। রনি বাঁশ কাটার জন্য দা হাতে নেয়। অপু ওকে থামিয়ে দিয়ে বলে, আর দরকার নেই। তিনটাতেই হয়ে যাবে। কী বলিস মুহিত?

হ্যাঁ। চল এবার যাই।

অপু, রাজন ও মুহিত তিন বাঁশের মাথা ধরে টানতে টানতে সামনের দিকে যায়। ওদের মাঝেমধ্যে সহায়তা করে রনি ও রুবেল। ততক্ষণে বন্য হাতির দল চলে গেছে নিজ গন্তব্যে। আপাতত বিপদমুক্ত বলেই মনে হয় ওদের কাছে। অপু সেটা প্রকাশও করে। মুহিত, রাজনসহ সবাই তাতে সায় দেয়।

বাঁশ নিয়ে লেকের পারে যেতে একটা দীর্ঘ সময় লেগে যায়। সেখানে যাওয়ার পর অপু ও রাজন প্রথমে একটা বাঁশ আড়াআড়িভাবে লেকের ওপর ফেলে। তারপর অন্য দুটি বাঁশ পাশাপাশি ফেলে। তিন বাঁশে লেক পার হওয়ার মতো ব্যবস্থা হয়ে যায়। প্রথমে অপু পার হওয়ার চেষ্টা করে। দু-তিন কদম যাওয়ার পর কাঁপাকাঁপি শুরু হয়। এতে অপু ভয় পেয়ে যায়! লেকের পানিতে পড়ে যাওয়ার ভয়!

রাজন বলল, আমি চেষ্টা করে দেখি তো!

অপু ওকে সামনে ঠেলে দিয়ে বলল, আচ্ছা যা।

রাজন এক পা-দুই পা করে সামনের দিকে এগিয়ে যায়। কিছু দূর যাওয়ার পর কাঁপাকাঁপি শুরু হয়। রাজনও পড়ে যাওয়ার ভয়ে ফেরত আসে। এবার মুহিত চেষ্টা করে। তারও একই অবস্থা হয়। একে একে পাঁচজনই চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। দ্বিতীয় দফা চেষ্টা করে। এভাবে চেষ্টা করতে করতে একপর্যায়ে সাকো পার হয়ে অপর প্রান্তে চলে যায় ওরা। যাওয়ার পর স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়ে। যেন বিশাল একটা বিজয় লাভ করেছে। কারণ প্রথম দিন ওরা ব্যর্থ হয়ে ফিরে গিয়েছিল।

এবার অপু সবার উদ্দেশে বলল, সবাই খুব মনোযোগ দিয়ে শোনো, আমাদের মনে রাখতে হবে, এই পাহাড়টা খুবই বিপজ্জনক। যেকোনো মুহূর্তে আমরা বিপদে পড়তে পারি। খুব সাবধানে পা ফেলতে হবে। চারদিকে তীক্ষ দৃষ্টি রাখতে হবে। কোনো রকম বিপদের আশঙ্কা দেখলে অবশ্যই আওয়াজ দিতে হবে। আমি আগে হাঁটব। তোরা আমাকে ফলো করবি।

সবাই ইতিবাচক মাথা নেড়ে সায় দিল।

অপু সামনের দিকে এগিয়ে যায়। ওকে অনুসরণ করে অন্যরা।

     (চলবে)



মন্তব্য