kalerkantho


বিজ্ঞান

সোনালি অনুপাত রহস্য

১.৬১৮। আপাতদৃষ্টে সাদামাটা একটা ভগ্নাংশওয়ালা সংখ্যা। আসলে তা নয়। হাজার বছর ধরে গণিতবিদ, স্থপতি, চিত্রশিল্পী, দার্শনিক, এমনকি সংগীতজ্ঞদেরও চিন্তার খোরাক জুগিয়ে আসছে সংখ্যাটি। এটি একটি অনুপাত। নাম গোল্ডেন রেশিও। জাদুকরী এ অনুপাতের আদ্যোপান্ত জানাচ্ছেন কাজী ফারহান পূর্ব

২ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



সোনালি অনুপাত রহস্য

প্রকৃতি মেনে চলে অঙ্কের সূত্র। সূর্যমুখির মাঝে পাবে সোনালি অনুপাত ও ফিবোনাচ্চি সিরিজ

সোনালি অনুপাত কী?

অন্যান্য অনুপাতের মতো গোল্ডেন রেশিও একটা অনুপাত। জ্যামিতির জনক ইউক্লিডের এলিমেন্টস গ্রন্থে গোল্ডেন রেশিওর প্রথম লিখিত সংজ্ঞা পাওয়া যায়। তিনি একটি সরল রেখার ওপর এমন একটি বিন্দু কল্পনা করেন, যাতে রেখাটি এমনভাবে দুই ভাগ হয় যে রেখার বড় অংশ ও ছোট অংশের ভাগফল তা রেখার সম্পূর্ণ অংশ ও বড় অংশের ভাগফলের সমান হয়। মাথার ওপর দিয়ে গেল? আরেকটু সহজ করি। ধরো একটি লাঠি তুমি অসমানভাবে দুই ভাগ করে বড় অংশটিকে নীল আর ছোটটিকে লাল রং করলে। এখন যদি নীল অংশ ও লাল অংশের দৈর্ঘ্যের ভাগফল এবং সম্পূর্ণ লাঠি (নীল ও লাল) ও নীল অংশের দৈর্ঘ্যের ভাগফলের সমান হয় তবেই তা হবে গোল্ডেন রেশিওর সমান। তার মান হবে ১.৬১৮০৩৩৯৮৮৭...।

যুগে যুগে সোনালি অনুপাত

কমপক্ষে ২৪০০ বছর ধরে গোল্ডেন রেশিও মানুষকে বিস্মিত ও মন্ত্রমুগ্ধ করে রেখেছে। ইসরায়েলি-আমেরিকান অ্যাস্ট্রোফিজিস্ট মারিও লিভিওর মতে, ‘গণিতের ইতিহাসে গোল্ডেন রেশিও সব ধরনের চিন্তাবিদকে যেভাবে অণুপ্রাণিত করেছে, আর কোনো সংখ্যা তা পারেনি।’  ঠিক কবে এর আবিষ্কার হয় তা সঠিকভাবে না জানতে পারলেও গোল্ডেন নাম্বার.নেট থেকে জানা যায়, প্রাচীন গ্রিক গণিতবিদরাই গোল্ডেন রেশিও নিয়ে প্রথম গবেষণা শুরু করেন। ইতালীয় গণিতবিদ লুকা প্যাচিওলি তাঁর দ্য ডিভিনা প্রোপোরশন বইতে গোল্ডেন রেশিও এবং জ্যামিতিতে তার ব্যবহার নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। বইটির চিত্রগুলো এঁকেছিলেন খোদ লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি। বিংশ শতাব্দীতে গণিতবিদ মার্ক বার সংখ্যাটিকে প্রকাশ করার জন্য একটি চিহ্ন সুপারিশ করেন। গ্রিক ভাস্কর ফাইডিয়াসের নামের প্রথম বর্ণ ‘ফাই’ দিয়ে এটাকে প্রকাশ করা হয়।

 

সোনালি আয়তক্ষেত্র ও সর্পিল রেখা

আয়তক্ষেত্র সম্পর্কে তো জানো। যেমন ক্রিকেট পিচ একটা আয়তক্ষেত্র। কিন্তু সোনালি আয়তক্ষেত্র বা গোল্ডেন রেক্টেংগেল হলো একটি বিশেষ আয়তক্ষেত্র, যাকে ভিআইপির মর্যাদা দিতে পারো। একটি আয়তক্ষেত্রের বড় বাহুটিকে ছোট বাহু দিয়ে ভাগ করে যদি ১.৬১৮ পাও তবে সেটাই হবে তোমার কাঙ্ক্ষিত আয়তক্ষেত্র। এখন এই গোল্ডেন রেক্টেংগেলের ছোট বাহুটিকে দৈর্ঘ্য ধরে একটা বর্গ আঁকলে দেখা যাবে পাশে আরেকটি ছোট আয়তক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। সেটাও গোল্ডেন রেক্টেংগেল। যার দৈর্ঘ্য-প্রস্থের অনুপাত ১.৬১৮! এভাবে একই পদ্ধতি অনুসরণ করে চলতে থাকলে দেখবে অনেক গোল্ডেন রেক্টেংগেল পেয়ে গেছ। এখন যদি আমরা বর্গের কর্ণগুলোকে বক্ররেখা দিয়ে যুক্ত করি, তবে একটি সর্পিল পথ তৈরি হবে, ওটাই গোল্ডেন স্পাইরাল। আরো জানতে http://youtu.be/2VtYyHx77cs এ লিংকে যেতে পারো।

 

ফিবোনাচ্চি সিরিজ

এটা হলো এমন একটা সিরিজ, যার প্রতিটি পদ আগের দুই পদের যোগফল। সিরিজটা হলো : ১,১,২,৩,৫,৮,১৩,২১,৩৪,৫৫,৮৯, ১৪৪...এখানে একটা মজা আছে। ফিবোনাচ্চি সিরিজের যেকোনো পদকে আগের পদ দ্বারা ভাগ করলে সেই সংখ্যাটি হবে ফাই-এর সমান। প্রথম কয়েকটা পদের জন্য হিসাব পুরোপুরি না মিললেও সিরিজ ধরে যত সামনের দিকে আগাবে ক্রমিক সংখ্যাদ্বয়ের অনুপাত তত ফাইয়ের দিকে আগাবে এবং ৩৯তম পদ থেকে অনুপাতটা একেবারে স্থির হয়ে যাবে। বিষয়টা গণিতজ্ঞদের কাছে একটি অসাধারণ বিষয় বটে।

 

গোল্ডেন রেশিও এবং জ্যামিতি

জ্যামিতিতে তো এটা থাকবেই। বৃত্তে আবদ্ধ সমবাহু ত্রিভুজ, বর্গ, পঞ্চভুজ ইত্যাদির গঠনে ওতপ্রোতভাবে গোল্ডেন রেশিও জড়িত আছে। জ্যোতির্বিদ জোহান্নেস কেপলার বলেছিলেন, ‘জ্যামিতির দুটি সম্পদ—একটি পিথাগোরাসের উপপাদ্য, আরেকটি হলো গোল্ডেন রেশিও।’

 

মানবদেহে ফাই

যেকোনো মানুষের ক্ষেত্রেই দেহের সম্পূর্ণ দৈর্ঘ্য নাভির নিচ থেকে বাকি অংশের দৈর্ঘ্যের অনুপাত ১.৬১৮—অর্থাৎ ফাই। আবার কাঁধ থেকে হাঁটু পর্যন্ত এবং হাঁটু থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত দূরত্বের অনুপাতও ফাই। আমাদের আঙুলের অগ্রভাগ থেকে কনুইয়ের দৈর্ঘ্য এবং কবজি থেকে কনুইয়ের দৈর্ঘ্যের অনুপাতও একই। এখানেই শেষ নয়। মানুষের মুখমণ্ডলের দৈর্ঘ্য ও প্রস্থের অনুপাতেও মিলবে গোল্ডেন রেশিও। গবেষকরা বলেছেন, মুখমণ্ডলের বিভিন্ন অংশের অনুপাত গোল্ডেন রেশিওর যত কাছাকাছি হবে সেই চেহারাকেই আমরা তত আকর্ষণীয় মনে করে থাকি। কারণ গোল্ডেন রেশিও মেনে চলা যেকোনো কিছুর প্রতি মানব মনের চিরায়ত দুর্বলতা আছে। তা ছাড়া মানুষের চেহারায় গোল্ডেন রেক্টেংগেল ও গোল্ডেন স্পাইরাল খাপে খাপে বসে যায়। দেরি কেন? একটা মেজারিং টেপ নিয়ে এখনই পরীক্ষায় নেমে পড়ো! আরো জানতে ঢুঁ মারো এই লিংকে http://www.sacred-geometry.es/?q=en/content/phi-human-bod।

 

জীবন ও প্রকৃতিতে

ফুলের পাপড়ি থেকে শুরু করে গাছে যত ধরনের বর্তুলাকার উপকরণ দেখা যায়, সবখানেই আছে ফাইয়ের অস্তিত্ব। প্রায় সব প্রাণী ও উদ্ভিদের গঠনেও ফাই বিদ্যমান। শামুক-ঝিনুক এসবেও কোনো না কোনোভাবে ফাই আছে। মৌচাকের স্ত্রী ও পুরুষ মৌমাছির সংখ্যার অনুপাতও ফাই। এগুলো বাহ্যিক ব্যাপার। আমাদের ডিএনএর গঠনও গোল্ডেন রেশিও মেনে চলে। গোল্ডেন নাম্বার.নেট থেকে জানা যায় ডিএনএ-এর প্রত্যেক পূর্ণ চক্রের দৈর্ঘ্য ও প্রস্থের অনুপাত ১.৬১৮। কানের ভেতর ককলিয়া নামের যে অংশটি আছে সেটাও গোল্ডেন স্পাইরালের সঙ্গে মিলে যায়।

 

শিল্প, স্থাপত্য ও সংগীত

খেয়াল করলে দেখবে যে কেউ একটা সুন্দর গ্রামের দৃশ্য আঁকলে আমরা বাহবা দিয়ে বলি, একেবারে সত্যিকারের গ্রাম হয়েছে! অর্থাৎ কোনো জিনিসের ছবি যতটুকু প্রকৃতির কাছাকাছি হয় সাধারণত আমাদের বাহবা দেওয়ার মাত্রাটাও ঠিক তত বেশি হয়। গ্রিসের মন্দির পার্থেনন তৈরির সময় ফাইডিয়াস গোল্ডেন রেশিও ব্যবহার করেন। মিসরের গির্জার পিরামিডেও আছে গোল্ডেন রেশিওর ছাপ। এ ছাড়া আগ্রার তাজমহল, প্যারিসের নটর ডেম, আইফেল টাওয়ার ইত্যাদির কাঠামো গোল্ডেন রেশিওর চিহ্ন বহন করছে। লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি তাঁর অনেক চিত্রকর্মে ফাই ব্যবহার করেছেন। এদের মধ্যে মোনালিসা, দ্য লাস্ট সাপার উল্লেখযোগ্য। খেয়াল করে দেখবে মোনালিসার ছবিতে গোল্ডেন রেক্টেংগেল পুরো খাপে খাপে বসে যায়। সালভাদর দালির ‘দ্য স্যক্রামেন্ট অব দ্য লাস্ট সাপার’ ফাই ব্যবহারের চমত্কার উদাহরণ। সংগীতের স্বরলিপির ক্ষেত্রেও ফাই আছে। ভায়োলিন এবং হাইকোয়ালিটি স্পিকারের তার তৈরিতেও ফাইর দরকার হয়। এমনকি লোগো ডিজাইনেও ব্যবহার করা হয় এটি। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক, এপল, এডিডাস, হোন্ডা ইত্যাদির লোগোতে গোল্ডেন রেশিও ব্যবহার করা হয়েছে।



মন্তব্য