kalerkantho


হরর ক্লাব

ধুমনি ঘাটের বুদ্বুদ

খাগড়াছড়ির মহালছড়ির ধুমনি ঘাট। সেখানে আছে এক রহস্যঘেরা ঝিরি। শুনুন নাঈম সিনহার মুখে

১৪ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০




ধুমনি ঘাটের বুদ্বুদ

ধুমনি ঘাটের ঝিরি। ছবি : লেখক

ভেঙে যাওয়া কর্দমাক্ত রাস্তা বেয়ে মোটরসাইকেলটা পাহাড়ে উঠছিল। চালকের পেছনে ঘাপটি মেরে বসেছিলাম আমি ও আমার বন্ধু-কাম-বড় ভাই আরশাদ আলী। বৃষ্টিতে আটার দলার মতো উবে আছে রাস্তায় কাদা। তৃতীয়বারের মতো মোটরসাইকেল থেকে নেমে বেশ খানিকটা পাহাড়ি পথ হাঁটতে হলো। তখনো জানি না কী বিস্ময় অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য।

সকালে খাগড়াছড়ির মহালছড়ি পৌঁছানোর পর শুনলাম, উপজেলা থেকে বেশ ভেতরে ধুমনি ঘাট নামে সুন্দর একটা জায়গা আছে। কেউ বলছে, সেখানে আছে বিশাল বড় পাথর। কেউ বলছে ঝরনা। আবার কেউ কেউ বলছে, সীতার পায়ের ছাপ। তবে আমরা ততক্ষণে বুঝে গেছি, সীতার পা পড়লেও সেখানে এখনো পর্যটকদের পা খুব বেশি একটা পড়েনি।

মোটরসাইকেল ভাড়া করে দ্রুত বেরিয়ে পড়েছিলাম। শহর থেকে ৪০ মিনিটের পথ শুনে থাকলেও পথ ক্রমেই বাড়ছে। দিনদুপুরেও রাস্তায় হিমশীতল নীরবতা। অচেনা পথে আমাদের একমাত্র ভরসা চালক মণি চাকমা। টুকটাক বাংলা বলেন তিনি।

প্রায় দেড় ঘণ্টা পর একটা দোকানের সামনে থামলাম। মোটা বাঁশের হুঁকায় তামাক খাচ্ছেন বৃদ্ধ জুয়ান আর কিছু শিশু। চোখে পড়ল অদ্ভুত বটগাছটা। গড়ন দেখে মনে হয়, গাছটির দুটি গোড়া। জলযোগ সেরে সেই অদ্ভুত বটগাছ পাশ কাটিয়ে পাহাড়ি ঝোপের মাঝ দিয়ে নিচে নামতে থাকলাম। সঙ্গে যোগ দিল আরো তিন স্থানীয় শিশু। দশ-পনেরো মিনিট হাঁটার পর একটা পাথরঘেরা সবুজ অন্ধকার জায়গায় পৌঁছলাম। পাথরের বুক চেপে পাথর লেগে আছে। মাঝে সাপের মতো আঁকাবাঁকা গলি। ঝরনার পানি চুয়ে চুয়ে নামছে। হঠাত্ হাততালি! আমরা দুই বাঙালি ঢালু পাথরের ওপর দাঁড়িয়ে দেখলাম, আমাদের মোটরসাইকেলচালক আর সেই তিন শিশু হাততালি দিয়ে যাচ্ছে কোনো কারণ ছাড়াই! ঝিরির স্বচ্ছ জলের ধারে দাঁড়িয়ে আমাদের কিছু একটা দেখাতে চাইছে তারা। প্রথমে গ্রাহ্য করলাম না। তবে তালি থামল না। তালির শব্দ পাথরঘেরা জায়গাটায় প্রতিধ্বনি তৈরি করছে। হঠাত্ যা দেখলাম, তাতে চোখ কপালে! ঝিরির স্বচ্ছ জল ঘোলা হয়ে বুদ্বুদ উঠছে। কিছুক্ষণের মধ্যে স্বচ্ছ জল একেবারে ঘোলা হয়ে গেল। একদিকে হাততালি, আরেক দিকে বুদ্বুদ। ভাবলাম, মাছ বা কোনো জলজ প্রাণীর কাণ্ড। কিন্তু পানিতে কিছুই নেই। প্রমাণ মিলল তালি থামার পর। দেখা গেল, স্বচ্ছ জলে কিছু নেই। একেবারে ফকফকা। আবার হাততালি শুরু। আবার উঠতে শুরু করল বুদ্বুদ।

শীতকালেও ধুমনির ঝরনায় পানির দেখা মিলবে
পাহাড়ি বন্ধুদের কাছে জানতে চাইলাম, কী হচ্ছে! উত্তর দেয় না। হয়তো বাংলা বোঝে না। পরে মণি মারমা জানালেন, এটা ধুমনি ঘাটের অলৌকিক ঘটনা। কিছুক্ষণ তালি দিলে জলদেবী নাকি সাড়া দেয়। ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের অনেকে আবার একেই বলে সীতার সাড়া। এটা নাকি সব সময়ই হয়।

বিষয়টি নিয়ে পাহাড়িদের মোটেও বিচলিত হতে দেখা গেল না। শিশুদের মুখেও নেই ভীতির ছাপ। তারা এটা প্রায়ই দেখে। জলদেবীর এই সাড়াকে তারা আশীর্বাদই মনে করে। ঝিরিপথ ধরে কিছুক্ষণ হাঁটলেই নাকি সীতার পায়ের ছাপ পাওয়া যায়। তবে পিচ্ছিল পাথরে পা ফসকে ক্যামেরাসহ পানিতে আছড়ে পড়তে পারি। এদিকে বেলাও পড়ে এসেছে। তাই দ্রুত স্থান ত্যাগ করলাম। সীতার সাড়া দেওয়ার রহস্যটার কোনো বিশ্লেষণে যেতে মন চাইল না। ওটা আপাতত অজানাই থাক।


মন্তব্য