kalerkantho


গল্প

ডাইনোসরের হাসি

শিবব্রত বর্মণ

১৪ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



ডাইনোসরের হাসি

অনেক অনেক দিন আগে চীন দেশে এক ধরনের ডাইনোসর ছিল। তাদের নাম ছিল পেলিওসরাস। পৃথিবীতে এখন কোনো ডাইনোসর নেই। পেলিওসরাসও নেই। তারা সবাই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। তবে তাদের হাড়গোড় মাটির নিচে এখনো পাওয়া যায়। তা থেকে অনেক কিছু জানা যায়। তারা কী খেত, কিভাবে হাঁটত, কিভাবে ঝগড়াঝাঁটি করত—এসব।

হাড়গোড় মেপে পেলিওসরাসদের সম্পর্কেও জানা গেছে অনেক কিছু। যেমন জানা যায়, পেলিওসরাসরা হাসতে পারত। পৃথিবীর প্রাণিকুলের মধ্যে এরাই প্রথম হাসতে শেখে। আজ থেকে ২০ কোটি বছর আগের এক প্রাচীন পৃথিবীতে অতিকায় বাওবাব আর একাশিয়াগাছের তলায় ঝিম ধরানো দুপুরে ঘাস খেতে খেতে পেলিওসরাসরা নাকি মাঝেমধ্যে খিকখিক করে হেসে উঠত। তবে বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে দেখেছেন, ওই হাসির সঙ্গে এখনকার মানুষ বা হোমো সেপিয়েন্সদের হো হো হাসির কোনো মিল নেই। অনেকে জোর দিয়ে বলেন, কৌতুক-হাস্যেরই জন্ম হয়নি তখনো।

একবার এমনই এক পেলিওসরাস হঠাত্ গম্ভীর হয়ে গিয়েছিল। খুব গম্ভীর। সবার সঙ্গে কথাবার্তা বলা বন্ধ করে দিয়েছিল সে। মাথা নিচু করে ঘাস খেত। মাঝেমধ্যে আকাশের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলত (দীর্ঘশ্বাসেরও জন্ম হয়নি তখনো। এটা দীর্ঘশ্বাসের আগের পর্যায়)। তারপর আবার ঘাস খেত। সবচেয়ে বড় কথা, তাকে কেউ কখনো আর হাসতে দেখেনি। সবাই ভাবত, ব্যাপার কী? এই ডাইনোসরটা হাসে না কেন? অনেকে জিজ্ঞাসাও করত। কিন্তু কোনো জবাব পেত না।

মাত্র কদিন আগে আমি বুঝতে পেরেছি, ওই পেলিওসরাসটা কেন ও রকম মনমরা হয়ে গিয়েছিল, কিভাবে সে হাসতে ভুলে গিয়েছিল।

আমি এখন নিশ্চিত জানি, ওই সময় ওই বনের প্রান্তে এক বুড়ো লোমশ হাতি এসে বসতি গেড়েছিল। এই হাতি ছিল ত্রিকালদর্শী। যে কারো হাত দেখে সে ভবিষ্যত্ বলে দিতে পারত। আমাদের পেলিওসরাসটি সেই হাতির ডেরায় গিয়েছিল, নিশ্চিত। গিয়ে হাত দেখিয়েছিল। তার হাত দেখে বুড়ো হাতি বলেছিল, ‘সর্বনাশ! তোদের পুরো বংশই তো নির্বংশ হয়ে যাবে রে! তোরা ডাইনোসররা সব ঝাড়েবংশে বিলুপ্ত হয়ে যাবি আর কয়েক কোটি বছরের মধ্যে।’

বুড়ো হাতির কথা কখনো মিথ্যা হয় না। এটা সবাই জানে।

এরপর যা হওয়ার তা-ই হয়েছে। নিজের প্রজাতির নিয়তি এভাবে জেনে যাওয়ায় মনমরা হয়ে গেছে পেলিওসরাস। কিন্তু সে কাউকে বলেনি কথাটা। এই সত্য সে নিজের মধ্যে রেখে দিয়েছিল।

এ সবই বহু বছর আগেকার কথা। তখন চীন দেশে চীনারা ছিল না। রুশ দেশেও ছিল না রাশানরা।

কিন্তু কথাটা আমি কী করে জানলাম? ২০ কোটি বছর আগের একটি ঘটনা সম্পর্কে কী করে এত নিশ্চিত হলাম?

বলছি।

আমি এটা জেনেছি, কেননা কদিন ধরে আমারও ভীষণ মন খারাপ। বন্ধু-বান্ধবরা আমাকে জিজ্ঞেস করছে, কেন আমি সারাক্ষণ মুখ গোমড়া করে থাকি, কেন আমি হাসতে ভুলে গেছি। আমি তাদের কিছু বলিনি। বলিনি যে কদিন আগে আমি এক বুড়ো গণত্কারের কাছে হাত দেখাতে গিয়েছিলাম। ওই গণত্কারও ত্রিকালদর্শী।

কিন্তু আমি আর কিছুই বলব না। মুখ বন্ধ।



মন্তব্য