kalerkantho


শীতে বয়স্কদের অসুখবিসুখ

শীতকালে শ্বাস-প্রশ্বাস, ত্বকের সমস্যাসহ নানা ধরনের অসুবিধা হয় বয়স্কদের। এসব বিষয়ে গ্রহণ করা দরকার বিশেষ সতর্কতা। পরামর্শ দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ

২০ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



শীতে বয়স্কদের অসুখবিসুখ

বয়স্কদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকায় অল্প ঠাণ্ডায়ও তাঁদের নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে। শীতের এই সময়ে তাঁরা ভোগেন নানা অসুখবিসুখে। সতর্ক পদক্ষেপ গ্রহণ করলে এবং শীত থেকে রক্ষা করতে পারলে অনেক ক্ষেত্রেই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হয় না।

 

শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত সমস্যা

বয়স্ক মানুষের কমন সমস্যা শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত সমস্যা বা শ্বাসনালির প্রদাহ, যা ঠাণ্ডা আবহাওয়ায় বাড়তে পারে। এ ছাড়া শীতের সাধারণ সর্দি-কাশি বা ফ্লু থেকে হতে পারে নিউমোনিয়া কিংবা অ্যাজমা। অনেক সময় এতে প্রাণহানিও ঘটতে পারে।

যাঁদের অ্যাজমা বা শ্বাসকষ্টজাতীয় সমস্যা প্রকট, তাঁদের উচিত সব সময় গরম কাপড় পরিধান করা, গরম পানি পান ও ব্যবহার করা। তায়াম্মুম করে নামাজ পড়া উচিত। ঠাণ্ডা আবহাওয়ায় ঘরের বাইরে যাওয়া কোনোমতেই উচিত নয়। বিশেষ প্রয়োজনে বাইরে গেলে অবশ্যই কানটুপি, মাফলার, জুতা-মোজা, হাতমোজাও ব্যবহার করা উচিত। যাঁদের অ্যাজমা আছে, তাঁরা সব সময় ইনহেলার প্রস্তুত রাখুন এবং প্রয়োজন হলেই ব্যবহার করুন। যে বাড়িতে অ্যাজমার রোগী আছে, সেখানে কার্পেট ব্যবহার না করাই ভালো। পোষা প্রাণী থেকে তাঁরা দূরে থাকবেন। সমস্যা বেশি মনে হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

 

জয়েন্ট পেইন

যাদের আগে থেকেই রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস, অস্টিও-আর্থ্রাইটিস এবং অন্যান্য অস্থিসন্ধি বা বাতজনিত ব্যথা ছিল, তাদের এসব সমস্যা শীতে কিছুটা বেড়ে যেতে পারে। এ ছাড়া অ্যানকাইলোজিং স্পন্ডিওলাইটিস, স্পন্ডাইলো আর্থ্রাইটিস, রি-অ্যাকটিভ আর্থ্রাইটিস ইত্যাদি সমস্যাও বাড়ে। এসবের মূল কারণ অবশ্য শীত নয়, বরং শীতকালে কাজকর্ম, শারীরিক পরিশ্রম বা নড়াচড়া কম হয় বলে এই সমস্যাগুলো বাড়ে।

তাই শুধু শুয়ে-বসে না থেকে যতটা সম্ভব বয়স্কদের সক্রিয় বা প্রাণবন্ত রাখার চেষ্টা করুন। ঘরের ভেতর হাঁটাহাঁটিসহ হাত-পা নড়াচড়ার মতো হালকা ব্যায়ামগুলোর অনুশীলন করান। এতে শরীরে তাপ উৎপন্ন হবে, শীত কম লাগবে। তা ছাড়া এসব সমস্যা সমাধানে ও শরীরের জন্য ভিটামিন ‘ডি’ খুবই দরকারী। এর ৮০ শতাংশ উৎস হচ্ছে সূর্যের আলো। সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১২টার মধ্যে কমপক্ষে ১৫ থেকে ২০ মিনিট রোদ পোহাতে দিন।

 

রেনোড ফেনোমেনন

তীব্র ঠাণ্ডায় হাত-পা নীল হয়ে যাওয়াকে ‘রেনোড ফেনোমেনন’ বলে। এটা বাত রোগীদের বেশি হয়। এতে ত্বকে অস্বাভাবিক অনুভূতি হওয়া, রক্তপ্রবাহ সঠিকভাবে না হওয়া, হাতে ও আঙুলে ব্যথা, কবজি ফুলে যাওয়া, ত্বকের ক্ষত, মাংসপেশিতে ব্যথা ইত্যাদি হতে পারে।

যাদের এই সমস্যা হয়, তাদের উচিত মোজা পরিধান করে থাকা, গরম সেঁক দেওয়া, ঘরেই হালকা মুভমেন্ট করা ও চিকিৎসকের নির্দেশনা মেনে চলা। এসব রোগীর বারবার পানি ব্যবহার নয়।

 

মানসিক সমস্যা

প্রবল শীতে মানুষ অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ে, নানা মানসিক রোগ দেখা দেয়।  প্রবীণ বা বৃদ্ধদের এই সমস্যা বেশি হতে পারে শীতের সময়। তখন তাঁরা সব কিছু থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন ভাবতে শুরু করেন। ট্রমা ও বিষণ্নতায় ভোগা এসব মানুষের দিকে বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে। এ সময় পরিবারের অন্য সদস্যদের তাঁদের সঙ্গে বেশি সময় দেওয়া উচিত। বিশেষ করে তাঁদের নিয়ে একসঙ্গে টেলিভিশন দেখা বা গল্প করার কাজটি করা উচিত। তাঁরা যেন একা একা না থাকেন।  

 

চর্মরোগ

শীত এলেই কিছু চর্মরোগ নতুন করে আবির্ভূত হয়, যা গরমকালে খুব একটা দেখা যায় না। বিশেষ করে চামড়ার শুষ্কতা, চুলকানি, হাত-পা ফেটে যাওয়া, মুখে-জিহ্বায় ঘা ছাড়াও নানা ধরনের চর্মরোগ বা খোস-পাঁচড়া বেশি দেখা দেয়।

এ সময় বয়স্কদের বিশেষ যত্ন নিতে হবে, কেননা এসব রোগের প্রবণতা তাদের বেশি থাকে। তাই তাদের বিছানা বা পরনের কাপড় যথেষ্ট পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখুন। এক বিছানায় গাদাগাদি করে যেন না ঘুমায়, সেদিকে খেয়াল রাখুন। হাত ও পায়ের তালু এবং ঠোঁটে পেট্রোলিয়াম জেলি লাগাতে দিন। ত্বকের সুরক্ষায় ময়েশ্চারাইজার যেমন—ভ্যাসলিন, গ্লিসারিন, অলিভ অয়েল ও সরিষার তেল ব্যবহার করুন। তবে বেশিক্ষণ রোদে থাকা বা কড়া আগুনে তাপ পোহানো ঠিক নয়। এতে চামড়ায় সমস্যা তৈরি হয়।

 

হাইপোথার্মিয়া

এটি এমন একটি অবস্থা, যখন কারো তাপমাত্রা স্বাভাবিকের (৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা ৯৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট) তুলনায় কমে যায় এবং বিপাকীয় কার্যাবলি স্বাভাবিকভাবে সম্পন্ন হয় না। অতিরিক্ত শীতে বয়স্কদের এ সমস্যা বেশি হয়। তখন শরীরে কাঁপুনি শুরু হয়, সে স্বাভাবিক ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে না। এ সময় দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে হাত-পা বেশি ঠাণ্ডা হয়ে অঙ্গগুলো বিকল হয়ে যেতে পারে। এ রকমটি দেখা দিলে রোগীর শরীর দ্রুত গরম করার ব্যবস্থা করতে হবে। তাৎক্ষণিক গরম দুধ, চা, কফি বা স্যুপ খাওয়ানো যেতে পারে। রোগীর গায়ের পোশাক ঢিলেঢালা ও আরামদায়ক কি না, সেটিও খেয়াল রাখতে হবে।

 

আরো কিছু পরামর্শ

বয়স্কদের নড়াচড়া, হাঁটাচলা ও কাজকর্ম অনেক কম হয়। ফলে শরীরে উত্তাপ সৃষ্টি ও তাপ ধরে রাখার ক্ষমতাও কমে যায়। তাই এ সময় শরীর গরম রাখার জন্য জরুরিভাবে কিছু ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। যেমন—শীতে বয়স্ক মানুষদের জন্য শুধু মোটা কাপড় নয়, বরং আরামদায়ক কাপড় নির্বাচন করুন। পাকা মেঝের ঠাণ্ডা থেকে রক্ষা পেতে ঘরে চটি বা স্পঞ্জ পায়ে দিন। হাত ও পায়ে মোজা পরিয়ে রাখুন। 

♦ ত্বক, ঠোঁট, হাত-পা, নখসহ নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে বাঁচতে বিভিন্ন ক্রিমসহ প্রয়োজনীয় ওষুধ ব্যবহার করুন।

♦ চাদর, বালিশের কাভার নিয়মিত পরিষ্কার করে রোদে শুকাতে দিন।

♦ শোবার ঘরটির দিকে নজর দিন। বিছানা যেন শীতল না হয়ে যায়, সেদিকে বিশেষ খেয়াল রাখুন। ঘরে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা বা গরম রাখুন। তবে রুম হিটার ব্যবহারে সাবধানতা অবলম্বন করবেন। কেননা এতে চামড়ায় সমস্যা দেখা দেয়।

♦ অজু, গোসলসহ নানা কাজেও গরম পানি ব্যবহার করতে দিন, এতে রক্ত চলাচল স্বাভাবিক থাকবে।

♦ শীতের সময় রাত জাগা ক্ষতিকর। তাই দ্রুত শুয়ে পড়ার অভ্যাস করান। পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করুন।

♦ প্রবীণ বা বৃদ্ধদের মদ্যপান, ধূমপান, অতিরিক্ত চা-কফি পান থেকে বিরত রাখুন।

♦ জ্বর, কাশি, শ্বাসকষ্ট, বুকে ব্যথাসহ অন্য যেকোনো সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন।

 

খাবারদাবার

♦ প্রতিদিন খেতে দিন শীতের শাকসবজি, বিশেষ করে গাজর, টমেটো, ফুলকপি, বাঁধাকপি ইত্যাদি।

♦ খাদ্যতালিকায় রাখুন ফলমূল, ভিটামিন, মিনারেল ইত্যাদি, যা শীতে সুস্থ থাকতে সাহায্য করবে।

♦ সব সময় গরম গরম খাবার পরিবেশন করুন।

♦ পানি কম পান করলে কিডনির কার্যক্ষমতা নষ্টসহ নানা জটিলতা তৈরি হতে পারে। এ জন্য গরম পানি এবং কেমিক্যালমুক্ত দেশি ফলের রস পান করতে দিন।



মন্তব্য