kalerkantho


বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস
২৮ জুলাই ২০১৮

‘আসুন দেশকে ভাইরাল হেপাটাইটিসমুক্ত করি’

২২ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



‘আসুন দেশকে ভাইরাল হেপাটাইটিসমুক্ত করি’

ভাইরাল হেপাটাইটিস সম্পর্কে সর্বাত্মক সচেতনতাই যেকোনো ধরনের হেপাটাইটিস প্রতিরোধের উত্তম উপায়

হেপাটাইটিস সংক্রমণে লিভারের মারাত্মক কিছু রোগ হয়। সারা পৃথিবীর মতো বাংলাদেশেও এর ব্যাপকতা অনেক বেশি। বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস সামনে রেখে হেপাটাইটিস ও লিভার রোগ সংক্রান্ত কিছু প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন দেশের বিশিষ্ট লিভার ট্রান্সপ্লান্ট সার্জন, ন্যাশনাল লিভার ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ আলী


প্রশ্ন : হেপাটাইটিস কী? সাধারণত ‘এ’, ‘বি’, ‘সি’, ‘ডি’ এবং ‘ই’—এই পাঁচ রকমের হেপাটাইটিস ভাইরাস হয়। গুরুতর বা জটিল অবস্থা তৈরি করে কোনটি?

ডা. মোহাম্মদ আলী : হেপাটাইটিস হচ্ছে লিভার সেলের (কোষের) এক ধরনের প্রদাহ। এতে লিভার সেলের বিভিন্ন কার্যক্রম ব্যাহত হয়। একটি হচ্ছে অ্যাকুইট হেপাটাইটিস বা তাত্ক্ষণিক আর অন্যটি ক্রনিক হেপাটাইটিস বা দীর্ঘমেয়াদি। ভাইরাল হেপাটাইটিস ‘এ’, ‘বি’, ‘সি’, ‘ডি’ ও ‘ই’—সাধারণত এই পাঁচ ধরনের হয়। ভাইরাস ব্যতীত মদ্যপানজনিত (অ্যালকোহলিক) এবং ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় হেপাটাইটিস হয়ে থাকে। অ্যাকুইট বা তাত্ক্ষণিক হেপাটাইটিস অনেকাংশে সম্পূর্ণ ভালো হয়। তবে ক্রনিকের ক্ষেত্রে লিভারসিরোসিস এবং লিভার ক্যান্সারের মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগ হতে পারে। সারা বিশ্বে লিভার ক্যান্সারের ৮০ শতাংশই দায়ী হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’। বাংলাদেশে হেপাটাইটিস ‘এ’ এবং ‘ই’ বেশি ছড়ায় মূলত হাইজিন এবং সেনিটেশন ব্যবস্থার অপ্রতুলতার কারণে।

সবচেয়ে দুঃখজনক তথ্য হলো, হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’ ভাইরাসে আক্রান্ত ১০ জনের মধ্যে ৯ জনই তাদের শরীরে বাহিত ভাইরাসের উপস্থিতি সম্পর্কে অবগত নয় বা জানে না। এই দুই ভাইরাসকে তাই ‘নীরব ঘাতক’ বলা হয়, যার জন্য বিশেষ উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ রয়েছে। হেপাটাইটিস ‘ডি’ সাধারণত হেপাটাইটিস ‘বি’-এর সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকে।

 

প্রশ্ন : কেউ হেপাটাইটিসে আক্রান্ত হয়েছে কি না—কী পরীক্ষা-নিরীক্ষা করালে বোঝা যাবে?

ডা. মোহাম্মদ আলী : হেপাটাইটিস ‘এ’, ‘ই’, ‘বি’ ও ‘সি’ ভাইরাস নির্ণয়ের জন্য সুনির্দিষ্ট কিছু টেস্ট করাতে হয়। হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’-এর ক্ষেত্রে প্রাথমিক স্ক্রিনিং টেস্ট করার পর পজিটিভ হলে নিশ্চিতকরণ (কনফারমেটরি) টেস্ট করতে হয়। এরপর ভাইরাস দুটির ক্ষতিকর অবস্থা (ইনফেকটিভিটি) জানতে হেপাটাইটিস ‘বি’-এর ডিএনএ এবং হেপাটাইটিস ‘সি’-এর আরএনএ পরীক্ষা করতে হয়। ‘সি’-এর ক্ষেত্রে ‘জিনোটাইপ’ করতে হয়।

 

প্রশ্ন : ক্রনিক ও অ্যাকুইট হেপাটাইটিসের চিকিৎসা কী?

ডা. মোহাম্মদ আলী : ক্রনিক হেপাটাইটিসের চিকিৎসা দীর্ঘমেয়াদি। সাধারণত হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’ ভাইরাসের ক্ষতিকারক অবস্থা এবং লিভারের কার্যকারিতা আমলে নিয়ে সুনির্দিষ্ট ভাইরাস নির্মূলের অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ প্রয়োগ করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে তা দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যয়বহুল। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ আরোগ্য না-ও হতে পারে। মনে রাখতে হবে, অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ বিভিন্ন দিক বিবেচনা করে প্রয়োগ করতে হয়। সব ক্ষেত্রে প্রয়োগ হয় না।

অ্যাকুইট ভাইরাল হেপাটাইটিসের ক্ষেত্রে উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসা নিতে হয়। সর্বতোভাবে তাত্ক্ষণিক বা অ্যাকুইট লিভার ফেইলিওরের প্রতিরোধক ব্যবস্থা নিতে হবে। মনে রাখতে হবে, অ্যাকুইট লিভার ফেইলিওর একটি মারাত্মক অবস্থা। তাই এর প্রতিরোধক ব্যবস্থা ও যথাযথ চিকিৎসা যথাসময়েই নিতে হবে।

 

প্রশ্ন : হেপাটাইটিস ‘বি’ কিভাবে ছড়ায়? এর উপসর্গগুলো কী?

ডা. মোহাম্মদ আলী : ভাইরাস আক্রান্ত মা থেকে সন্তানের রক্ত সঞ্চালন, একই সুচের বহুল ব্যবহার, অসচেতনভাবে দাঁতের চিকিৎসা এবং অন্যান্য সার্জারির জন্য অপরিশোধিত (আনস্ট্রাইড) যন্ত্রের ব্যবহার মূলত হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’ সংক্রমণের জন্য দায়ী।

হেপাটাইটিস ‘বি’-এর বড় সমস্যা হলো, এর তেমন কোনো উপসর্গ নেই এবং লিভার অনেকখানি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত রোগীরা বিষয়টি তেমন টের পায় না। তবে ‘বি’ ভাইরাস দ্বারা সংক্রমণের দুই থেকে তিন মাস পর এর লক্ষণ ও উপসর্গগুলো যেমন—পেট ব্যথা, গাঢ় রঙের প্রস্রাব, অস্থিসন্ধিতে ব্যথা, ক্ষুধামান্দ্য, ক্লান্ত ও অবসাদ অনুভব, শরীরের চামড়া হলুদ হয়ে যাওয়া, চোখ সাদা বা ফ্যাকাসে হওয়া ইত্যাদি। হেপাটাইটিস ‘বি’ হলে লিভারে ক্ষত বা লিভারসিরোসিস, লিভার ক্যান্সার, লিভারের কার্যক্ষমতা নষ্ট হওয়া, হেপাটাইটিস ‘ডি’র সংক্রমণ, কিডনির সমস্যা, রক্তের ধমনিতে প্রদাহ ইত্যাদির মতো মারাত্মক জটিলতা দেখা দিতে পারে।

প্রশ্ন : হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাসে আক্রান্ত হলে করণীয় বা চিকিৎসা কী?

ডা. মোহাম্মদ আলী : যাদের হেপাটাইটিস ‘বি’ পজিটিভ ধরা পড়েছে, তাদের ঘাবড়ানোর কিছু নেই। অনেক সময় কোনো ধরনের ক্ষতি ছাড়াই ‘বি’ ভাইরাস বছরের পর বছর শরীরে সুপ্ত অবস্থায় থাকতে পারে। আবার লিভারে এই ভাইরাসের ইনফেকশনও থাকতে পারে। তবে এগুলো সক্রিয় কি না এবং এর কারণে লিভারে কোনো ক্ষতি হয়েছে কি না বা ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে কি না তা জানতে কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা, যেমন—HBeAg, AST (SGOT), ALT (SGPT), HBV-DNA, পেটের আলট্রাসাউন্ড ও এন্ডোসকপি (Endoscopy of upper GIT) করা দরকার। ভাইরাস সক্রিয় থাকলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছ থেকে নিয়মিত চিকিৎসা নিতে হবে।

৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে চিকিৎসা ছাড়াই হেপাটাইটিস ‘বি’ ছয় মাসের মধ্যে নিজে ভালো হয়ে যায় বা এটি নেগেটিভ হয়ে যায়। তবে একবার কেউ হেপাটাইটিস ‘বি’ দ্বারা আক্রান্ত হলে চিকিৎসায় তেমন ফল হয় না। কিন্তু আক্রান্ত হওয়ার আগে যদি কোর্স পূর্ণ করে টিকা নেওয়া হয়, তাহলে এই রোগে আক্রান্ত হওয়া থেকে ৯০ শতাংশ নিরাপদ থাকা যায়।

 

প্রশ্ন : হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাসে আক্রান্ত হলে চিকিৎসায় পুরোপুরি নিরাময়ের সম্ভাবনা কতখানি? কারো কারো ক্ষেত্রে নিরাময় না-ও হতে পারে—এমন ঘটে কি না?

ডা. মোহাম্মদ আলী : একবার হেপাটাইটিস ‘বি’ আক্রান্ত হলে সম্পূর্ণ আরোগ্য লাভ অনেক ক্ষেত্রে সম্ভব নয়। প্রথম দিকে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ হলেও আস্তে আস্তে আবার দীর্ঘমেয়াদি আক্রান্ত হতে পারে। এই চিকিৎসা দীর্ঘমেয়াদি—একনাগাড়ে কয়েক বছর চালাতে হয়। এর পরও অনেক ক্ষেত্রে প্রাথমিক নিয়ন্ত্রণের পর আবার আক্রান্ত বা ক্লোয়ার-আপ হতে পারে। হেপাটাইটিস বি-এর চিকিৎসার জন্য বিভিন্ন ওষুধ ও নানাবিধ পরীক্ষা চালিয়ে যেতে হয়—যা দীর্ঘমেয়াদি এবং ব্যয়বহুল।

 

প্রশ্ন : হেপাটাইটিস ‘বি’ টিকার গুরুত্ব কতটুকু, কারা নিতে পারে, এর ডোজ সম্পর্কে বলুন।

ডা. মোহাম্মদ আলী : নানা ধরনের হেপাটাইটিস ভাইরাসের মধ্যে হেপাটাইটিস ‘এ’ ও হেপাটাইটিস ‘বি’র টিকা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। যারা হেপাটাইটিস ‘বি’ দ্বারা আক্রান্ত নয়, তারাও জটিলতা এড়াতে এর টিকা নিতে পারেন। কেননা এ ভাইরাসের বিরুদ্ধে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা একবার পুরোপুরি তৈরি হয়ে গেলে আজীবন সুরক্ষা পাওয়া যায়। জন্মের পর থেকে ৭০ বছর বয়স পর্যন্ত যে কেউ এই টিকা নিতে পারে। তবে হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তি ও গর্ভবতী নারীরা টিকা নিতে পারবে না। আবার একবার টিকা নেওয়ার পর বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিলে, শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকলে পরবর্তী ডোজগুলো দেওয়া হয় না। টিকার আগে রক্ত পরীক্ষা করে নিশ্চিত হতে হবে যে শরীরে এরই মধ্যে ভাইরাসটি বাসা বাঁধেনি।

হেপাটাইটিস ‘বি’-এর ভ্যাকসিন ডোজ তিনটি। টিকার সঠিক পরিমাণ হচ্ছে শিশুদের ০.৫ মিলি এবং বয়স্কদের ১ মিলি মাংসের মধ্যে দিতে হয়। প্রথম ডোজ টিকা নেওয়ার এক মাস পর দ্বিতীয়টি এবং প্রথম ডোজ নেওয়ার দিন থেকে ছয় মাস পর তৃতীয় ডোজটি নিতে হয়। টিকা দিতে গ্যাপ হলে অতিরিক্ত একটি ডোজ দেওয়া উচিত। তৃতীয় ডোজ শেষ করার তিন মাস পর একটি HBs titer পরীক্ষা করে দেখা উচিত ভাইরাসের বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে উঠেছে কি না। তা না হলে পাঁচ বছর পর অতিরিক্ত ডোজ (বুস্টার ডোজ) নিতে হয়।

 

প্রশ্ন : এই টিকা নেওয়ার সময় কি অন্যান্য টিকাও নেওয়া যায়? একবার কারো হেপাটাইটিস ‘বি’ হলে পরে কি আবারও হতে পারে?

ডা. মোহাম্মদ আলী : একই সঙ্গে অন্য টিকা নেওয়া যেতে পারে, তবে আলাদাভাবে দেওয়া ভালো।

হ্যাঁ, একবার কারো হেপাটাইটিস ‘বি’ হলে আবারও হতে পারে। তবে তা নির্ভর করে আক্রান্ত ব্যক্তির রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কেমন তার ওপর।

 

প্রশ্ন : হেপাটাইটিস ‘সি’ কতটুকু ঝুঁকিপূর্ণ?

ডা. মোহাম্মদ আলী : দীর্ঘমেয়াদি লিভার রোগের অন্যতম প্রধান কারণ হেপাটাইটিস ‘সি’। হেপাটাইটিস ‘বি’ থেকে হেপাটাইটিস ‘সি’ নীরবে দীর্ঘমেয়াদী রোগ লিভার সিরোসিস এবং ক্যান্সারের অন্যতম প্রধান কারণ। কোনো কোনো সময় ১০ থেকে ১৫ বছর এই ভাইরাস নীরবে লিভারের ক্ষতি সাধন করে থাকে। তাই হেপাটাইটিস ‘সি’-কেও নীরব ঘাতক বলা হয়।

 

প্রশ্ন : চিকিৎসা নিয়ে কি হেপাটাইটিস ‘সি’ নির্মূল করা সম্ভব?

ডা. মোহাম্মদ আলী : হেপাটাইটিস ‘সি’-এর চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং দীর্ঘমেয়াদি—একজনের চিকিৎসায়ই কয়েক লাখ টাকা প্রয়োজন হয়। দীর্ঘদিন ইনজেকশনের মাধ্যমে চিকিৎসা করা হয়। ইদানীং হেপাটাইটিস ‘সি’-এর মুখে খাওয়ার ওষুধ আবিষ্কার হয়েছে। বাংলাদেশে একজনের চিকিৎসায় কমপক্ষে প্রায় এক লাখ টাকার মতো ব্যয় হয়। অন্যান্য দেশে অনেক বেশি। প্রাথমিকভাবে এই মুখে খাওয়ার ওষুধের (ডিএএ) মাধ্যমে সম্পূর্ণ আরোগ্য লাভের সাফল্য দাবি করলেও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারে এর প্রকৃত ফলাফল বোঝা যাবে।

প্রশ্ন : হেপাটাইটিস প্রতিরোধে করণীয় কী?

ডা. মোহাম্মদ আলী : টিকার মাধ্যমে ও বিভিন্ন সতর্কতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে নানা ধরনের হেপাটাইটিস ভাইরাস ও এর সমূহ ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। যেমন—

► হেপাটাইটিস ‘এ’ ও ‘ই’ প্রতিরোধের জন্য নিরাপদ খাদ্য ও পানীয় জলের ব্যবস্থা করা, সব ধরনের দূষিত খাদ্যদ্রব্য পরিহার, স্বাস্থ্যসম্মত পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থা, সাধারণ হাইজিন ও স্বাস্থ্য রক্ষার নিয়মগুলো পালন ও সতর্কতা গ্রহণ করা উচিত।

► হেপাটাইটিস ‘এ’ ভাইরাস প্রতিরোধের জন্য ভ্যাকসিন গ্রহণ করা উচিত, বিশেষ করে যেসব অঞ্চলে এই ভাইরাসের প্রকোপ অত্যন্ত বেশি।

► হেপাটাইটিস ‘বি’ প্রতিরোধের জন্যও টিকা গ্রহণ করতে হবে। তবে একটি অতি প্রয়োজনীয় বিষয় হলো—হেপাটাইটিস ‘বি’ আক্রান্ত মা থেকে সন্তানের সংক্রমণ রোধে নবজাতককে জন্মের সঙ্গে সঙ্গে (২৪ ঘণ্টার মধ্যে) হেপাটাইটিস ‘বি’-এর ভ্যাকসিন ও ইম্মোনোগ্লোবিউলিন দেওয়া উচিত। এরপর আরো অতিরিক্ত দুই ডোজ ভ্যাকসিন দিতে হবে। এ বিষয়টি আমাদের দেশে বেশ অবহেলিত।

► হেপাটাইটিস ‘সি’ প্রতিরোধের জন্য হেপাটাইটিস ‘বি’-এর মতোই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তবে হেপাটাইটিস ‘সি’-এর কোনো ভ্যাকসিন নেই—প্রতিরোধই একমাত্র উপায়।

► নিরাপদ রক্তসঞ্চালন, একই সুচের বহুল ব্যবহার পরিহার, নিরাপদ যৌনচর্চা ইত্যাদির ব্যাপারে সতর্ক থাকলে হেপাটাইটিস প্রতিরোধ সম্ভব। সর্বোপরি ভাইরাল হেপাটাইটিস সম্পর্কে সর্বাত্মক সচেতনতাই যেকোনো হেপাটাইটিস প্রতিরোধের উত্তম উপায়।

 

প্রশ্ন : হেপাটাইটিস নির্মূলে সারা বিশ্বের ‘নো হেপ’ কার্যক্রম চলছে। এ সম্পর্কে কিছু বলুন।

ডা. মোহাম্মদ আলী : পৃথিবীতে প্রায় ৩২৫ মিলিয়ন মানুষ ভাইরাল হেপাটাইটিসে আক্রান্ত, যার মধ্যে ২৯০ মিলিয়ন মানুষই জানে না যে তাদের শরীরে এই ভাইরাস রয়েছে। এ থেকে প্রায় ১.৩৪ মিলিয়ন মানুষ মৃত্যুবরণ করে অথচ এটা প্রতিরোধযোগ্য। তাই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং ওয়ার্ল্ড হেপাটাইটিস অ্যালায়েন্স যৌথ কার্যক্রমের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী হেপাটাইটিস নির্মূল বা ‘এলিমিনেট হেপাটাইটিস’ কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। এর লক্ষ্য, ২০৩০ সালের মধ্যে ভাইরাল হেপাটাইটিস নির্মূল করা, যাতে প্রায় ৭.১ মিলিয়ন মানুষ মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পাবে। এরই আলোকে জেনেভায় অবস্থিত ওয়ার্ল্ড হেপাটাইটিস অ্যালায়েন্স ২০১৬ সালের ওয়ার্ল্ড হেপাটাইটিস দিবস (২৮ জুলাই) থেকে ‘নো হেপ’ বা কোনো হেপাটাইটিস নয়—এই কার্যক্রমের মূল উদ্দেশ্য বিশ্বের সর্বস্তরের মানুষকে সচেতন করে প্রতিরোধক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে উৎসাহিত করা।

 

প্রশ্ন : আপনার নেতৃত্বে বাংলাদেশেও এ কার্যক্রম চলছে। সার্বিক অগ্রগতি কী?  

ডা. মোহাম্মদ আলী : ন্যাশনাল লিভার ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ ২০০৮ সাল থেকে জেনেভায় অবস্থিত ওয়ার্ল্ড হেপাটাইটিস অ্যালায়েন্সের সঙ্গে সম্পৃক্ত। ‘নো হেপ’ প্রচারণাকে যথোপযুক্ত মনে করে শুরু থেকে আমরা এ কার্যক্রম চালু করেছি। সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে লিফলেট, পোস্টার, ব্যানার, টিভি অনুষ্ঠান, প্রবন্ধ-নিবন্ধ লেখা, ক্রিকেট খেলা ইত্যাদি প্রচারণা চালাচ্ছি। ইতিমধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিশেষ করে আটটি বিভাগীয় সদরে ১২ দিনব্যাপী ‘নো হেপ বাংলাদেশ’ কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে। ব্রাজিলে অনুষ্ঠিতব্য দ্বিতীয় ওয়ার্ল্ড হেপাটাইটিস সামিটে দেওয়া বক্তব্যেও আমি তুলে ধরেছি বিশ্বে কিভাবে ভাইরাল হেপাটাইটিস সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করা যায়। এই বক্তব্য বেশ প্রশংসা অর্জন করেছে বলে ‘নো হেপ’-এর ওয়েবসাইটে এখনো প্রদর্শিত হচ্ছে এবং তারা আমাকে ‘নো হেপ’ পাইওনিয়ার হিসেবে প্রচার করছে।

ইতিমধ্যে ন্যাশনাল লিভার ফাউন্ডেশনের আওতায় ‘নো হেপ নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ’ নামের নেটওয়ার্ক তৈরি করছি সারা দেশে। সব জেলায় ভাইরাল হেপাটাইটিস প্রতিরোধ, সঠিক চিকিৎসা, অবৈজ্ঞানিক টোটকা চিকিৎসা প্রতিরোধের বিষয়েও কাজ চলছে। একটি ইন্টারকানেক্টিং নেটওয়ার্কের মাধ্যমে যোগাযোগ ও তথ্য বিনিময়ের চেষ্টা চলছে। বাংলাদেশ হবে ভাইরাল হেপাটাইটিসমুক্ত, প্রত্যাশা সেটাই।

 

সাক্ষাৎকার : আতাউর রহমান কাবুল



মন্তব্য